ঘরের ভেতরে সহজেই যেন আলো প্রবেশ করতে পারে, এ জন্য জানালায় কাচের ব্যবহারের প্রচলন অনেক আগ থেকেই। তবে কাচের এই ব্যবহার মাত্র একটি উপযোগে সীমাবদ্ধ রাখতে নারাজ প্রযুক্তি উদ্ভাবকেরা। তাঁরা চান এর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে। এ জন্য কাচ নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। সম্প্রতি কিছু গবেষক সৌরালোককে কাজে লাগিয়ে বিশেষ ধরনের কাচের মাধ্যমে উৎপাদন করছেন বিদ্যুৎ। বিশেষ ধরনের এই কাচের নাম ‘ফটোভোলটাইক কাচ’। এই কাচ আবার ঘরের জানালায় ব্যবহার করছেন তাঁরা। এতে একদিকে যেমন ঘর আলোকিত হবে, তেমনি এই আলো থেকেই উৎপন্ন হবে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ।
আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নতুন কিছু নয়। আমাদের দেশেই ২০১৬ সালে প্রায় আড়াই শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছে সূর্যের আলো থেকে। চলতি বছরেও সোলার প্যানেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২১ মেগাওয়াট। সূর্যের আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে যে ধরনের সোলার প্যানেল ব্যবহৃত হচ্ছে তা আলোক পরিবাহী নয়। এমনকি সূর্যের তীব্র আলো ছাড়া এটি ভালোভাবে কাজও করে না। সেই জন্য এ ধরনের প্যানেল সাধারণত বাড়ির ছাদে বা এমন কোনো স্থানে বসানো হয়, যেন সারা দিন যথেষ্ট পরিমাণে আলোর সংস্পর্শে থাকতে পারে। অন্যদিকে ফটোভোলটাইক কাচের সুবিধা হচ্ছে, তুলনামূলক কম ইনটেনসিটির আলোতে কাজ তো করেই, একই সঙ্গে কিছু অদৃশ্য আলো যেমন, ইনফ্রারেড আলোতেও কাজ করতে সক্ষম। আবার এটি আলোক পরিবাহী হওয়ায় ছাদের পরিবর্তে জানালায় ব্যবহার করা সম্ভব।
স্বচ্ছ সোলার প্যানেল বানানোর জন্য বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন অনেকেই। কারণ, এগুলো জানালায় ব্যবহারের মতো যথেষ্ট স্বচ্ছ নয় অথবা স্বচ্ছ হলেও এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এতটাই কম যে তা ব্যবহারের উপযোগী নয়। ফলে এ অবস্থা থেকে বেরোনোর একমাত্র উপায় হিসেবে নির্মাতারা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে কোনোভাবে যদি দৃশ্যমান আলোর পরিবর্তে অদৃশ্য আলো (যেমন, ইনফ্রারেড) ব্যবহার করা যায়, তাহলে একসঙ্গে দুটি সুবিধাই পাওয়া সম্ভব। আর এ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি ‘ফটোভোলটাইক কাচ’।
ফটোভোলটাইক কাচ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে স্বল্প আলোতেও এটি যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। একটি অর্ধপরিবাহী (সেমিকন্ডাক্টর) ফটোভোলটাইক সেলকে দুটি কাচের মধ্যে রাখা হয় আর কাচের এক প্রান্ত দিয়ে এর সংযোগ তার বের করা হয় ঠিক সাধারণ সোলার সেলের মতো করে। সাধারণত মনো ক্রিস্টালাইন সিলিকন, পলি ক্রিস্টালাইন সিলিকন বা থিন ফিল্ম টাইপের ম্যাটেরিয়াল এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এই কাচের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাধারণ ফটোভোলটাইক সোলার সেলের মতো এটি স্থাপনের জন্য সবদিক থেকে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না। বাড়ির ছাদ, জানালা, এমনকি উত্তরমুখী বাড়ি বা ভবনের জানালায়ও সহজেই এটি স্থাপন করা যায়।
এখানে বলে রাখা ভালো, ফটোভোলটাইক কাচ কিন্তু পুরোপুরি স¦চ্ছ নয়, তবে বেশ ভালো পরিমাণে আলো এর মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এই কাচ দিয়ে শতকরা ১০ ভাগ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত আলো যেতে সক্ষম। এটা আনেকটা রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পুরোপুরি পর্দা টানানো ঘরের মধ্যে যে আলো পাওয়া যায়, সে আলোর মতো। বর্তমানে কাচ দিয়ে ঘেরা নতুন নতুন যেসব বহুতল ভবন তৈরি হচ্ছে, সেসব ভবনে সাধারণ কাচের পরিবর্তে ফটোভোলটাইক কাচ ব্যবহার করলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, তা দিয়ে ভবনের বিদ্যুৎ চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। এই কাচের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো, বিশেষ করে যেসব এলাকায় রৌদ্রের তাপ অতিরিক্ত বেশি, সেসব এলাকায় এটি এয়ারকন্ডিশনের খরচ কমিয়ে আনতে পারে। এই অস্বচ্ছ কাচ ঘরের ভেতরে রোদ ঢুকতে বাধা দিয়ে তাপমাত্রা কম রাখতে সাহায্য করে। ফলে তুলনামূলক কম এয়ারকন্ডিশন চালু রাখতে হয়। যে কারণে বিদ্যুতের ব্যবহারও কম হয়।
পরিবেশ, আবহাওয়া বা বাইরের আলোর চাহিদার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন স্বচ্ছতার কাচ তৈরি করা হয়। যেমন শার্প কোম্পানি তৈরি করছে শ্লিটেড সোলার গ্লাস। শ্লিটেড সোলার গ্লাসে ফটোভোলটাইক সেলগুলো গ্লাসজুড়ে বিস্তৃত থাকে না। সেলগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে কাচের মাঝে বসানো হয়। এভাবে বসানোর ফলে দুটি সেলের মাঝে থাকে অনেক জায়গা। কাচের যেসব জায়গায় সেল থাকে না সেই সব জায়গার স্বচ্ছতা প্রায় অপরিবর্তিত থাকে এবং সেখান দিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে আলো ঘরে বা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।
অন্যদিকে ওনিক্স কোম্পানি কাচের স্বচ্ছতার সঙ্গে সঙ্গে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এর নান্দনিকতার দিকটিও। তারা বিভিন্ন রং, নকশা আর গ্রেডিয়েন্টের আকর্ষণীয় সব ফটোভোলটাইক কাচ তৈরি করছে। ফটোভোলটাইক কাচের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আলোক পরিবহন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বানাচ্ছে ডাবল বা ট্রিপল গ্লেজড কাচও। জানালায় বা ভবনে কাচ ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য যেহেতু ভেতরে আলো প্রবেশ করা, একই সঙ্গে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা, তাই ওনিক্সের তৈরি কাচ আর্কিটেক্ট বা ডিজাইনারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলেই অনুমেয়।
ওনিক্স কোম্পানি তাদের কাচের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় জানিয়েছে, ‘এটা ছাদে বা সমতলে ব্যবহার হয় এ রকম কোনো সাধারণ ফটোভোলটাইক মডিউল নয়। এটাকে বিল্ডিংয়ের টেকনিক্যাল কোডের সব ধরনের শর্ত পূরণ করে একটি সেফটি গ্লাস হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।’ বিভিন্ন পুরুত্ব, স্বচ্ছতা ও আকারের এসব ফটোভোলটাইক কাচ প্রায় সব ধরনের আবহাওয়ায় কাজ করতে সক্ষম। এসব মডিউল স্বল্প আলো বা মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়াতেও বেশ ভালোভাবে কাজ করতে পারে। এটি অনেক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে এবং তুলনামূলকভাবে অনেক কম সময়ের মধ্যে এর খরচ উঠে আসে। এই কাচের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো, ফটোভোলটাইক সুবিধা পাওয়ার জন্য এটি স্থাপন করতে আলাদা কোনো ফ্রেম ব্যবহার করতে হয় না। ফলে এটিকে সাধারণ কাচের মতোই ভবনের যেকোনো অংশে সুবিধামতো স্থাপন ও ব্যবহার করা যায়।
অন্য আরেকটি কোম্পানি পলিসোলারের ভাষ্যমতে, তারা যে ধরনের কাচ বানাচ্ছে তা জানালায় ব্যবহৃত সাধারণ কাচের পরিবর্তে, কাচের ছাদে, বাড়ি বা ভবনের সম্মুখভাগে অথবা দেয়ালসহ যেকোনো জায়গায় ব্যবহার সম্ভব। অর্থাৎ আপনি চাইলে একটি সম্পূর্ণ বাড়িকেই সোলার প্যানেলে রূপান্তরিত করতে পারেন। আর এটা করতে গিয়ে যে খরচ হবে তা এখান থেকে পাওয়া বিদ্যুতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ইতিমধ্যে পলিসোলার তা করেও দেখিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ক্যানারি ওয়ার্ফে একটি বাস স্টপেজ তৈরি করা হয়েছে এ ধরনের ফটোভোলটাইক কাচ ব্যবহার করে। এটি বছরে দুই হাজার কিলোওয়াট আওয়ার পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। গড়ে প্রতিবছর লন্ডনের একটি বাড়িতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, এটি তারই সমান।
এদিকে অন্য আরেকটি কোম্পানি ‘সোলার উইন্ডো’ ঘোষণা দিয়েছে যে তারা শিগগিরই যে ধরনের ‘পাওয়ার জেনারেটিং উইন্ডো’ বাজারে নিয়ে আসছে তা পুরোনো পদ্ধতির সোলার প্যানেলের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারবে। তাদের দাবি, একমাত্র তারাই সবচেয়ে কম খরচে এ ধরনের সুবিধা দিতে সক্ষম। বর্তমানে ব্যবহৃত একটি সোলার প্যানেল যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, তাতে এর খরচ উঠে আসতে সাধারণত পাঁচ থেকে এগারো বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। কিন্তু সোলার উইন্ডোর ফটোভোলটাইক ‘পাওয়ার জেনারেটিং উইন্ডো’-এর খরচ এক বছরেই উঠে আসে। আরও আশার কথা হলো যে একটি যানবাহন দুই মিলিয়ন মাইল চললে যে পরিমাণ কার্বন নির্গত করে, তাদের একটি উইন্ডো সেই পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে বলে জানায় তারা। যদিও বিশ্বের অনেক স্থাপনা এই কাচ ব্যবহার করা শুরু করেছে, তারপরও এটি এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়েই রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
তারপরও এটি আমাদের জন্য দারুণ সুসংবাদ। বর্তমানে আমাদের এখানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ দেশজ মোট চাহিদার মাত্র ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সবার্ধিক আসে জল বিদ্যুৎ থেকে। সমতল ভূমিতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কাপ্তাই ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কোনো উৎস নেই। উষ্ণায়নের ফলে আমাদের জলবায়ু যে রূপ ধারণ করছে, তাতে ফটোভোলটাইক প্রক্রিয়ায় সমাধান ছাড়া হয়তো আর কোনো বিকল্প ভবিষ্যতে থাকবে না।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।