‘ভাই, আমার বাড়িটা এমনভাবে করবেন যেন খরচটা কম হয়’, একজন স্থপতি হিসেবে এমন আবদার আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়। এরপর আমি ক্লায়েন্টকে বোঝাতে চেষ্টা করি আমাদের এখানে যে স্ট্রাকচারাল সিস্টেম প্রচলিত, তাতে বাড়ির ডিজাইন করতে গেলে খরচ কমার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কারণ, আমাদের যথারীতি একই রকম বিম-কলাম ডিজাইন করতে হয়। স্ল্যাবের থিকনেস কমানোর কোনো পদ্ধতি জানা নেই আমার, যা আমাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু একটু অপ্রচলিত অথচ বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন করলেই কিন্তু অনেক সুন্দর স্ট্রাকচারাল সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব, যা একই সঙ্গে আমাদের সুরক্ষা দেবে এবং খরচ হবে বাড়ির ডিজাইন খরচের অর্ধেকেরও কম।
কিন্তু এই কথাগুলো ক্লায়েন্ট শোনার পরই তার মনের মধ্যে শুরু হয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব। খরচ কমাতে গিয়ে বাড়ি ভেঙে পড়বে না তো! বাড়ির কোনো ক্ষতি হবে না তো! এত খরচ করে বাড়ি করার পর প্রাণহানি হবে না তো! এই চিন্তাগুলো কিন্তু সরকারের মাথায়ও আছে। আছে সরকারিভাবে গবেষণারত স্থপতি ও প্রকৌশলীদের মাথায়ও। এ ছাড়া এগুলোর পদ্ধতি নিয়ে এর আগেও দেশে-বিদেশে অনেক গবেষণা হয়েছে। উইন্ড লোড ঠিকমতো নিতে পারবে কি না, লাইভ লোড নিতে পারবে কি নাÑ এসব গবেষণাগারে কত যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমি এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঝে নেই, যা পরীক্ষা করার তা প্রকৌশলীরা করে ফেলেছেন। এখন আমার কাজ এগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। আসুন, ধীরে ধীরে বিষয়গুলো আলোচনা করি।
প্রথম ধাপে আমি আলোচনা করব বাড়ির স্ট্রাকচার নিয়ে। আমাদের বাড়ির স্ট্রাকচার হয় বিম-কলামের। বিম-কলামের ভেতর ইচ্ছেমতো রড ঢোকানো থাকে। না ভাই, আমাকে রড দিয়ে আরসিসি ঢালাইয়ের বিরোধী মনে করবেন না। কিন্তু আমি চাই এই রড ব্যবহার না করে কীভাবে আরও মজবুত স্ট্রাকচার করা যায়? এ জন্য গবেষণা করে দেখা গেছে বিম-কলামের ভেতর রড কমিয়ে দিলে খরচ কিছুটা বাঁচে। কিন্তু রড কমিয়ে দিলে কি এটা বাড়ির লোড নিতে পারবে? স্ল্যাবের লোড নিতে পারবে? আচ্ছা স্ল্যাবের লোড যদি কমিয়ে দেওয়া হয়, তখন কী হবে?
মূলত পাঁচ ইঞ্চি পুরু স্ল্যাব ডিজাইন করা হয় এখানে। অনেকে চার ইঞ্চি পুরুও করে থাকেন। কিন্তু আমি যদি স্ল্যাবে রড না দিই! কীভাবে সম্ভব? আমি যদি স্ল্যাবের ভেতর রড না দিয়ে তারের জালি ব্যবহার করি? আমরা রড বিছাই ছয় ইঞ্চি পর পর। আর এই তারের জালি থাকে আধা ইঞ্চি পর পর। মানে লোড ডিস্ট্রিবিউট হয়ে যাচ্ছে অনেক কাছাকাছি। অথচ তারের থিকনেস খুবই কম। বেশি হলে তিন মিলিমিটার। যেখানে ছাদের রড হচ্ছে দশ মিলিমিটারের! অথচ একই লোড নিচ্ছে। ফলে এটা কম জায়গা দখল করছে। ফলাফল আমি এখানে স্ল্যাবের থিকনেস দেব তিন ইঞ্চি। ব্যস এক ইঞ্চি কমে গেল মানে আমার এক শ বস্তা সিমেন্ট কমল। এক শ বস্তা সিমেন্টের দাম কম করে হলেও ৪০ হাজার টাকা। এই টাকা বেঁচে গেল। এবার আসুন খরচ কমানোর আরও কিছু উপায় বলা যাক। আমরা মূলত স্ল্যাব ডিজাইন করার সময় ক্লিয়ার কভার রেখে দিই। কিন্তু ক্লিয়ার কভার যদি রাখি আধা ইঞ্চি তাহলে তো ক্ষতি নেই। ক্লিয়ার কভার রাখা হয় যেন ভেতরের রড ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এখন রডই যদি না থাকে তবে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা আছে কি? যেহেতু নেই, সেহেতু আমি ক্লিয়ার কভার রাখব আধা ইঞ্চি। এবার আধা ইঞ্চি সিমেন্ট ঢালাই দেওয়ার পর আমি তারের জালি বিছিয়ে দেব। তারের জালির এক স্তর বিছানোর পর এর ওপর আমি যদি শোলার একটা স্তর বিছিয়ে দিই, যা কি না একই সঙ্গে শব্দ ও তাপ প্রতিরোধক এবং অবশ্যই অনেক বেশিই হালকা এবং ভঙ্গুর নয় কিন্তু আবার একই সঙ্গে আণবিক গঠনের দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী; তাহলে কেমন হয়? এই শোলার ওপর আমি আবারও তারের জালি বিছিয়ে দিই। এরপর আমি আধা ইঞ্চি ঢালাই করে দিলেই হয়ে গেল তিন ইঞ্চি পুরু স্ল্যাব, যাতে আমার সিমেন্টের খরচ বেঁচে যায় ৫০ শতাংশ। রডের খরচ বেঁচে গেল পুরোটাই। খরচ নেমে এল অর্ধেকেরও কমে।
আপনি যদি বিশ্বাস না করেন তাহলে একটু হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটে গেলেই টের পাবেন। এখানে এমন বাড়ি বানানো আছে। শুধু আপনি এর কার্যকারিতা দেখেই নিজে বুঝতে পারবেন এটা আসলেই সম্ভব।
আমি এতক্ষণ যে পদ্ধতির কথা বললাম, এটা হলো ফেরোসিমেন্টের মূল ইনগ্রেডিয়েন্টস। ফেরো আর সিমেন্ট। এই শব্দ দ্বয়ে তৈরি ফেরোসিমেন্ট শব্দটা, যার মানে হলো লোহা আর সিমেন্ট। লোহা হলো সেই তারের জালি, যা সিমেন্টের সঙ্গে শক্ত একটা স্ট্রাকচার তৈরি করে। ফেরোসিমেন্টের ঢালাইয়ে কোনো লোহার বারের দরকার হয় না। দরকার হয় কলামে তাও সংখ্যায় অনেক কম। কারণ, ফেরোসিমেন্টের স্ল্যাবের ওজন হয় অনেক কম। অথচ তা সেই স্ল্যাবের মতোই অনেক বেশি শক্ত। এর ওপর আপনি নিজে লাফাতে পারবেন। এর ওপর রাখতে পারবেন অনেক ওজনের ভারী বস্তুও। অবশ্যই ওজন আগে থেকে জেনে সিমেন্টের ঘনত্ব ও স্ল্যাবের থিকনেস হিসাব করতে হবে। এটি নরমাল উইন্ড লোডেও টিকে থাকবে। বৃষ্টিতে কিছুই হবে না। ভেতরের লোহা জং ধরার আশঙ্কা নেই। এর ভেতর শোলা ব্যবহার করলে সেই শোলাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। অথচ এটি আপনাকে রাখবে সুরক্ষিত। ভূমিকম্প হলে সাধারণ যেকোনো বাড়ি ভেঙে যায় কিংবা ক্র্যাক হয়। এটিও হবে। কিন্তু এর ক্র্যাকের জায়গায় আপনি তারের জালিগুলো অন্য তার দিয়ে বেঁধে আবারও সিমেন্ট ঢালাই করে দিলে এটি আবার আগের মতো কার্যকরী হয়ে যাবে। আপনি পাবেন আপনার পুরোনো সেই স্ট্রাকচার, যা আগের মতোই ভূমিকম্প সহনীয়। এগুলো কিন্তু আমার মনগড়া কথা নয়। সরকারি ইঞ্জিনিয়াররা এটি ল্যাবে টেস্ট করে পেয়েছেন। এটি অনেক শক্তিশালী ও মজবুত। সরকারিভাবেই অনেক স্ট্রাকচারই এভাবে বানানো।
এতক্ষণ বললাম ছাদ নিয়ে। এবার আসুন বলি কলামের কথা। আচ্ছা কলাম যদি আমি কম রড দিয়ে ডিজাইন করি তাহলে তো খরচ কমেই যায়। কলামের থিকনেসও কমে যাচ্ছে। কারণ, লোড কম। গেল কলামের ইস্যু।
এখন আসি দেয়ালে। দেয়াল মানেই ইট এমন একটা ধারণা আমাদের অনেক বছর ধরে বদ্ধমূল হয়ে আছে। কিন্তু যদি দেয়ালে ইটের জায়গায় আমরা সেই ফেরোসিমেন্ট ব্যবহার করি, তবে কেমন হবে? হ্যাঁ, আমরা ফেরোসিমেন্টের তৈরি দেয়াল তৈরি করব। এর জন্য দরকার সিমেন্ট, তারের জালি ও শোলা। শোলার থিকনেস হয় মূলত দুই ইঞ্চি। দেড় ইঞ্চি শোলাও পাওয়া যায়। শোলার ওপর তারের জালি বিছিয়ে দিয়ে এর দুই ফুট পরপর দশ মিলি রড বিছিয়ে দিয়ে এর ওপর আধা ইঞ্চি সিমেন্ট ঢালাই করে দিলেই দাঁড়িয়ে গেল দেয়াল। প্রি-কাস্ট দেয়ালগুলো আপনি আগে থেকে একটা জায়গায় বানিয়ে রাখবেন, এরপর সুবিধামতো যথাস্থানে নিয়ে শুধু জোড়া লাগিয়ে দেবেন। চিন্তা করছেন আমি কীভাবে দরজা লাগাব? দরজা হবে কাঠের। কিন্তু দরজার চৌকাঠ হবে ফেরোসিমেন্টেরই। এটাও আবিষ্কার করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। এতে দরজার চৌকাঠ হবে সুন্দর। কাঠের মতোই রং করা যাবে এতে। দরকার শুধু এটিকে প্রি-কাস্ট তৈরি করে বসিয়ে দেওয়া। জানালা হিসেবে সাধারণ জানালা ব্যবহার করলে বাকি থাকে শুধু
রঙের কাজটুকু। এটুকু করলেই আপনার বাড়ি তৈরি হলো। চিন্তা করবেন না, এই বাড়ি পাঁচ তলা পর্যন্ত লোড নিতে পারবে। আপনি যা কোনোভাবেই কখনো চিন্তা করেননি সেই প্রি-কাস্ট ফেরোসিমেন্টকে কাস্ট করার কারণেই এখন বাড়ি করা অনেক সহজ। অনেক কম টাকাতেই শুধু জমি থাকলেই আপনি করতে পারবেন আপনার স্বপ্নের বাড়ি। সময় বেঁচে যাবে অনেক। একটা কংক্রিটের বাড়ি করতে যদি সময় লাগে ছয় মাস। স্ল্যাব কিউরিংয়ে লাগে ২৮ দিন। শাটারিং এবং সেন্টারিং করতে লেগে যায় অনেক সময়। সেই একই বাড়ি প্রি-কাস্ট ফেরোসিমেন্ট দিয়ে করলে কত দ্রুত এটি চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় আপনি নিজেও কল্পনা করতে পারবেন না। মাত্র মাস তিনেকের মধ্যেই আপনি নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়বেন তল্পিতল্পাসহ। ব্যাপারটা স্বপ্নের মতো; তাই না?
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।