কর্ণফুলীপাড়ে জেলেপল্লির পুনর্বাসন

কর্ণফুলী নদীর তীরে কালুরঘাট ব্রিজের পার্শ্ববর্তী ছোট্ট এক গ্রাম ‘দক্ষিণ কৈবরতপাড়া’। প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে গ্রামটিতে জেলে সম্প্রদায়ের বাস। নদীই তাদের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস। বংশপরম্পরায় জেলে পেশাকে তারা তাই ধর্মের অনুষঙ্গ হিসেবে মানে। গ্রামটির একাংশের ওপর দিয়ে ‘Karnaphuli Riverfront Development’ প্রকল্পের অধীনে একটি সড়ক বাঁধ (Embbankment-Cum-Road) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই পরিকল্পনাকে ঘিরে নির্ধারিত হয় আমার থিসিসের বিষয়, যার শিরোনাম ‘Resettlement of A Riverine Fishermen Village on The Bank of Karnaphuli’. এই থিসিসের উদ্দেশ্য ছিল নদীতীরবর্তী গ্রামটির অধিবাসীদের পুনর্বাসন ও তাদের পেশাগত ঐতিহ্যকে রক্ষা করেই জীবনমান উন্নয়নে একটি টেকসই ও কার্যকরী ডিজাইন সলিউশন প্রদান করা।

এখনো জেলে সম্প্রদায় ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এর পেছনের কারণগুলো কী? দেখা গেছে, নানাবিধ পরিবেশগত কারণে কর্ণফুলীতে মাছের অপর্যাপ্ততা জেলেপল্লির হাহাকারে রূপ নিয়েছে। বছরের ছয় মাস হালদা নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময় নামমাত্র সরকারি সাহায্য বাস্তবিক অর্থে জেলেদের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে পারে না। পাশাপাশি অশিক্ষা ও কুসংস্কারে জর্জরিত জেলেদের উন্নত জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা তাদের পিছিয়ে রেখেছে। ফলে বিগত ১০ বছরে পেশা পরিবর্তনের হার বেড়েছে আশংকাজনকভাবে। সেই সঙ্গে বিলীন হতে বসেছে তাদের শত বছরের পেশাগত ঐতিহ্য।

জেলেপাড়ার অতীত ও বর্তমান অবস্থার নিরিখে মাস্টারপ্ল্যানের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোকে প্রধানত বিবেচনা নেওয়া হয়েছে তা হলো-

  • বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া
  • জেলেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
  • মৌলিক সামাজিক সুবিধাদি
  • ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও নিম্নমানের হাউজিং
  • অর্থনৈতিক অবস্থা (বিশেষত অফ-সিজনে)
  • জেলেদের আর্থিক সামর্থ্য এবং
  • জেলেপল্লির ঐতিহ্যগত জীবনযাপন ধারাকে সংরক্ষণ

মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম পর্যায়ে গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা ও কমিউনিটি ফ্যাসিলিটিগুলো ডিজাইন করা হয়েছে। যেমন, জেলে পরিবারের শিশুদের জন্য স্কুল, প্রসূতি মায়ের জন্য হেলথ কেয়ার সেন্টার, গ্রামবাসীর জন্য কমিউনিটি কমপ্লেক্স বিবেচনায় নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যাকে ভিত্তি ধরেই ডিজাইন করা হয়েছে। গ্রামের প্রধান মাঠটিকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হবে কমিউনিটি ফ্যাসিলিটিগুলো। পাশাপাশি হাউসিং পলিসি অনুযায়ী ঘরগুলোকে মজবুত, স্বাস্থ্যসম্মত ও তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে মধ্যে ডিজাইন করা হয়েছে। বিশেষত দুর্যোগকালীন ও পরবর্তী সময়ে জেলেদের তাদের থাকার ও কাজের জায়গা নিয়ে ভয়ংকর দুর্ভোগের পড়তে হয়। বছরের নির্দিষ্ট কয়েক মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ঋণের চক্রে পড়ে অনেক জেলে পরিবারই।

এমন বাস্তবতায় ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিস’ প্রক্রিয়ায় তাদের ঘরগুলোকে নির্মাণের চিন্তা করা হয়েছে। পাশাপাশি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে প্রতি ৮-১০টা ঘরে একটা কমন স্পেস থাকে, যেখানে তারা নিত্যদিনের কাজ যেমন, জাল বোনা, মাছ কুটা, মাছ ধরার সরঞ্জামাদি রাখতে পারে। জেলে নারীদেরও হস্তশিল্প, সবজি চাষ, সমিতি ভিত্তিতে মাছ চাষ ইত্যাদির মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অফ-সিজনে বাড়তি আয় যেন ঋণচক্রের হাত থেকে তাদের রক্ষা করে। 

প্রস্তাবিত বাঁধের কল্যাণে বন্যাক্রান্ত হওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি হয়তো পাবে জেলেপল্লির মানুষ কিন্তু নদীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাবে অনেক ক্ষেত্রে। মাস্টারপ্ল্যানের দ্বিতীয় পর্যায়ে তাই নদী ও খালপাড়ের ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করা হয়েছে। গ্রামসংলগ্ন বৃহৎ খালপাড়ে বড় নৌকা ও ট্রলার রাখার ঘাট ডিজাইন করা হয়েছে। আবার গ্রামের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া খালগুলোকে যুক্ত করে তাদের নৌকাগুলোকে পাড়ে বেঁধে রাখার প্রথাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। সেই সঙ্গে খাল ঘেঁষে মন্দিরপারে বিকেলের জেলেদের একসঙ্গে বসে গল্প-গুজব করা কিংবা উৎসবের আনন্দ উদ্যাপনের জায়গা হারিয়ে না যায়। কারণ, কয়েক ঘরের মাঝে উঠানে, খালপাড়ে নিত্যদিনের কাজের ফাঁকেই জেলেপল্লির মানুষগুলো নিজেদের মাঝের বন্ধনকে দৃঢ় করবে প্রতিদিন।

সরকারি সহায়তায় জেলেপাড়ার অধিবাসীদের জন্য আরও ভালোভাবে জীবনযাপনের উপাদানগুলোকে নতুনভাবে তৈরি ও সাজিয়ে দেওয়াই ছিল আমার থিসিসের প্রধান বিবেচ্য। কিন্তু নতুন করে তৈরির সময় যুগ যুগ ধরে চলে আসা তাদের জীবনধারার কোনো কিছু বাদ না দিয়ে তা সংরক্ষণ করার প্রতি ডিজাইনার হিসেবে অগ্রাধিকার ছিল আমার। জেলেদের পেশাগত ঐতিহ্য, ধর্মীয় রীতি পালন জায়গা বা সংঘবদ্ধভাবে বসবাসের অভ্যাসকে ডিজাইনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি অভাব, নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাছের প্রাদুর্ভাব, দাদনদারের অত্যাচারে যেন জেলেদের পেশা পরিবর্তন করতে না হয়, তাই তাদের গ্রামটিকেই একটি স্বনির্ভর নতুন গ্রাম ডিজাইনই ছিল আমার থিসিসের মূল উদ্দেশ্য।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।

স্থপতি সারাহ বিনতে হক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top