বাহারি নামের ঢাকা

ঢাকা ইতিহাসের প্রাচীন এক জনপদ ও স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী। সমুদ্র-নদীপথে সংযুক্ত ঢাকা একসময় ছিল পৃথিবীর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রও। সে সময় ঢাকার মসলিন ছিল জগদ্বিখ্যাত। মোগলদের আগমন থেকে ঢাকার বয়স হিসেবে করা হলেও বাস্তবে এর বহু আগে থেকে এখানে নগরায়ণ গড়ে ওঠে। তবে এর প্রকৃত সূচনাকাল আজও রহস্যাবৃত! শাশ্বত আমলে বাংলার হিন্দু ও মুসলিম শাসকেরা ঢাকার পাশে তাঁদের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো বিক্রমপুর, সোনারগাঁও ও ভাওয়ালে বিদ্যমান। বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বড় বড় পরিব্রাজক, ধর্মপ্রচারক ও বণিকদের এখানে আগমন ঘটেছে এবং তুর্ক-আফগান, পাঠান, পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান, ফরাসিরা এখানে বসতি গড়ে তুলে ছিল। নারিন্দাস্থ বিনট বিবির মসজিদের শিলালিপিতে দেখা যায়, এটি ১৪৩৫ সালে তৎকালীন বাংলার পাঠান সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে নির্মিত। বিনট বিবি ছিলেন সে যুগে ঢাকায় আগত জনৈক তুর্কি ব্যবসায়ী হার হামাটের কন্যা। নগরীর বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের আরও কিছু উপাসনালয়, কেল্লা, দুর্গ ইত্যাদি দেখা যায়। তন্মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিখ উপাসনালয়টি (সংগত) এখনো সদর্পে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বলা হয়, নগরীর বিভিন্ন স্থানে নাকি শিখ সম্প্রদায়ের এ ধরনের আরও অনেকগুলো সংগত বা উপাসনালয় ছিল, অথচ আজ কালচক্রে দেশে শিখ সম্প্রদায়ের অস্তিত্বই নেই বললেই চলে। তবে নদী পরিবেষ্টিত ঢাকার চতুর্দিকের লোকালয়ে এখনো সে যুগের কিছু মসজিদ-মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। যার সূত্র ধরে পরিচিতি ঘটেছে বিশেষ কিছু জায়গার। 

ইতিহাসে ‘ঢাকা’ নামের উৎস নিয়েও রয়েছে নানামুখী মত-অভিমত। কিংবদন্তি আছে, এই জায়গায় একসময় প্রচুর ঢাক গাছ ছিল, যা থেকেই ঢাকা নামের স্বতঃস্ফূর্ত উৎপত্তি। অনেকে বলে থাকেন, পৌরাণিক আমলে সেন-পাল রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুর ও সোনারগাঁওয়ের অদূরে নিরাপত্তার জন্য যে স্থানটি  ‘ঢেক্কা’ বা ‘ঢাক্কা’ তথা ঢাক চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তা থেকেই এই নাম নেওয়া হয়েছে। কারও কারও মতে, প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র ঢাক থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি। সে সময় বিদেশি পর্যটক ও বণিকদের মনোরঞ্জনে এখানে অনেক নর্তকী, বাঈজি ও বীরাঙ্গনাদের আসর ছিল, যাঁরা অত্র এলাকার সুগন্ধযুক্ত সাঁচি পান দিয়ে তাঁদের অতিথিদের আপ্যায়ন করত, ঢাক বাজিয়ে নাচ-গানের আসর হতো। কথিত আছে, সুবেদার ইসলাম খাঁ যখন তাঁর বজরার বহর নিয়ে পশ্চিম দিকে বুড়িগঙ্গার বাকে (সাঁচিবন্দর ঘাটে) আসেন, তখন এসব লোকজন সেখানে ঢাকঢোল বাজিয়ে ঢাকের ঢেঁকুরের সুরে পূজা-অর্চনা করছিল। ইসলাম খাঁ নাকি ওই আওয়াজে বেশ মজা পেয়ে তাঁর বজরা থেকে লোক পাঠিয়ে বাদকদের আরও জোরে ঢাকডোল বাজানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তিনজন সফরসঙ্গীকে তিন দিকে পাঠান। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ চওড়া বুড়িগঙ্গা, তাই উত্তর দিকে নদী তীরে যেখান পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ শোনা যায় সেখানে তিনি খুঁটি পোতার নির্দেশ দেন। আর সেই সীমানা খুঁটিই হয়ে গেল তাঁর রাজধানীর সীমানা এবং বুড়িগঙ্গা নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা বসতিটির নতুন নাম হয়ে যায় সুবেদার ইসলাম খাঁ এর নামে ‘ইসলামপুর’।

ঢাকার প্রতিষ্ঠা ও নামকরণ নিয়ে এ রকম আরও গল্প প্রচলিত রয়েছে। অনেকের মতে, রাজা বল্লাল সেন নির্মিত ‘ঢাকেশ্বরী’ মন্দিরের নামে ঢাকার নামকরণ হয়েছে। আর সুবেদার ইসলাম খাঁ জায়গাটির দখল নেওয়ার পর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে এর নতুন নামকরণ করেছিলেন ‘জাহাঙ্গীরনগর’। কিন্তু অজ্ঞাতকারণে সেই নামটি বিকশিত হয়নি অর্থাৎ ‘ঢাকা’ই রয়ে যায়। ইতিহাসের পাতায় বিভিন্ন গবেষকদের লেখনীতে ঢাকার নামকরণ, উৎপত্তি ও সেকালের পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে আরও অনেক স্মৃতিচারণা ও বর্ণনা রয়েছে। যুগে যুগে অনেকে ঢাকাকে অলিগলি ও বাজারের শহর, মসজিদের শহর, রিকশার শহর ইত্যাদি বিভিন্ন নামেও আখ্যায়িত করেছেন। তবে আমার মতে, শাশ্বত আমল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা ঢাকাকে ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি’র শহর নামটিতে বেশ মানানসই মনে হয়। লক্ষ করলে দেখা যায়, আজও ঢাকার বিকাশ ধারায় সেই বিষয়টি রয়ে গেছে। নগরীর মাঝখানে কিছু পরিকল্পিত এলাকা ও সড়ক ছাড়া পুরো নগরীই অনেকটা অলিগলির শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে। তবে হালে ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবেও পরিচিত। কারণ, দুনিয়ার আর কোথাও এক জায়গায় এতসংখ্যক মসজিদ আছে কি না সন্দেহ! 

বাস্তবে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় যুুগে যুগে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা, স্থাপনা এবং রাস্তা-সড়কের নামকরণ হয়েছে। তন্মধ্যে ইতিহাসের পাতায় কিছু জায়গার নামকরণ নিয়ে স্পষ্ট বর্ণনা থাকলেও বেশির ভাগ জায়গার নামকরণের তথ্য অজ্ঞাত। আসলে অনেক জায়গার পরিচিতি বা নামকরণ হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অর্থাৎ লোকমুখে বা কথায় কথায়। তাই কিছু জায়গার নামের তো কোনো অর্থই মেলে না। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পাড়া-মহল্লা, হালট, পল্লী, গ্রাম-মৌজার নামেই অনেক জায়গার নাম হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব জায়গায় আগন্তুক ও বসবাসকারীদের পেশা, ব্যবসা ও সংস্কৃতির বিবেচনায় কিছু জায়গার সঙ্গে ‘নগর’, ‘বাজার’, ‘গঞ্জ’, ‘পুর’, ‘বাগ’, ‘বাগান’, ‘টোলা’ ইত্যাদিও যোগ হয়েছে। আবার কিছু জায়গায় জমির গঠন, প্রকৃতি, ব্যবহার ইত্যাদির ভিত্তিতেও নামকরণ হয়েছে- যেমন, ধানমন্ডি (ধানক্ষেত থেকে), সেগুনবাগিচা, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, বেগুনবাড়ী ইত্যাদি। তদ্রুপ প্রাক-মোগল ও মোগল আমলে কিছু জায়গার নামকরণ হয়েছিল তাঁদের নির্র্মিত বাগ-বাগান-বাগিচার নামে বা ব্যবহারের ভিত্তিতে, যদিও পরে এসব অনেক নাম বদলে যায়। যেমন চকবাজারের আগের নাম ছিল ‘পাদশাহী’ বা ‘বাদশাহী বাজার’ হিসেবে। গুলিস্তান ছিল ‘গুল-ই-স্তান’ এবং দিলকুশা ছিল ‘বাগ-ই-দেলখোশ’ নামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আগের নাম ছিল সঙ্গতটোলা। সে যুগে এই এলাকায় অনেক শিখ পরিবারের বসবাস ও উপাসনালয়ের (সঙ্গত) অবস্থান থেকে জায়গাটির ওই নাম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আর এর অদূরে মোগল শাসকদের হাতির আস্তাবল ছিল বিধায় জায়গাটির নাম হয়ে যায় পিলখানা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই নামটি হারিয়ে যায়নি। 

শুরুতেই জানিয়েছি, ঢাকার কিছু জায়গার নামকরণ হয়েছে এখানে বিভিন্ন সময়ে আগত শাসক ও পেশাজীবী গোষ্ঠীর নামে। যেমন আজিমপুর নামকরণ হয়েছে সম্রাট আওরঙ্গজেব এর পৌত্র ঢাকার নায়েবে নাজিম প্রিন্স আজিম-উস-সানের নামে। পরিবাগ, লালবাগ, শাহবাগ ইত্যাদি নামও অনুরূপভাবে আবির্ভূত। আর কিছু জায়গার নাম হয়ে যায় রাজপরিবারের চাকর-বাকর ও লস্কর-তস্করদের বসতবাটিকে কেন্দ্র করে- যেমন বখশিবাজার, দেওয়ানবাজার ইত্যাদি। তবে শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার, গোয়ালনগর, কুমারটুলি ইত্যাদি নাম হয়েছে পেশাজীবীদের নামে। উর্দু রোড, নবাবপুর, মোগলটুলি ইত্যাদি নাম হয়েছে উচ্চগোত্রীয় লোকজনের বসতিকে কেন্দ্র করে। এভাবে কিছু জায়গার নামকরণ বিভিন্ন ব্রিটিশরাজ প্রতিনিধিদের নামে, শহরের প্রভাবশালী মানুষ, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, দাতা বা দানশীল বা গুণীজ্ঞানী ব্যক্তিদের নামে। মোগল রাজা-বাদশাহের হাতি-ঘোড়া যেখানে থাকত তার নাম হয়ে যায় তদানুসারে-মাহুতটুলি, হাতিরপুল, হাতিরঝিল ইত্যাদি।

তবে প্রচলিত নিয়মে বিভিন্ন সরকারের আমলে কিছু সড়ক ও জায়গায় নাম হয়েছে সংশ্লিষ্টদের জনহিতকর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ। যেমন, গুলশানের মাদানী অ্যাভিনিউ বা ব্রিটিশ আমলে পুরান ঢাকায় নর্থব্রুক হল রোড, জনসন রোড ইত্যাদি। অবশ্য কেউ শ্রম দিয়ে, কেউ চাঁদা দিয়ে এবং কেউ কেউ পদাধিকার বলেও কিছু সড়কের নাম লিখিয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারের নির্দেশ কিংবা অভিপ্রায়েও কিছু সড়কের নামকরণ হয়েছে। যেমন, বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ। আশির দশকে আধুনিক তুরস্কের জনকের ঢাকায় ভ্রমণকালে তাঁর সম্মানার্থে এই সড়কটির নামকরণ করা হয়। ঢাকার নগর পরিকল্পক ডিআইটি পরবর্তী সময়ে রাজউকও অনেক সড়কের নামকরণ করেছে। তবে বিষয়টির বিধিবদ্ধ দায়িত্ব হলো, সিটি করপোরেশনের। ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা নগরীর অনেক সড়কের নাম পরিবর্তন করে ও নবনির্মিত কিছু সড়কের নাম বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করে যান। কিন্তু যথাযথভাবে তথ্য লিপিবদ্ধ না থাকায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত কার সম্মানার্থে সড়ক বা স্থানের নামকরণ হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। যেমন পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার ঢাকা কালেক্টরের দেওয়ান রায় হরিরাম মল্লিকের নামে না-কি ‘রায়সাহেব’ উপাধিপ্রাপ্ত মদনমোহন বসাক এর নামে হয়েছে তা অস্পষ্ট।

অদ্ভুতভাবে আমাদের এই দেশটিতে নাম পরিবর্তন নিয়ে একধরনের বাজে সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে তেমন দেখা যায় না। ভালো-খারাপ অতীত ইতিহাস সংরক্ষণার্থে তথা প্রজন্মের জানার জন্য প্রায় দেশে তাদের অতীত শাসকদের সৃষ্ট স্থাপনা বা তাঁদের নামে দেয় শিলালিপি রেখে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশেও মোটামুটি একই অবস্থা বিদ্যমান ছিল। দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনামলে যাঁরা এ দেশ থেকে সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছেন, তাঁদের নামে দেয়া বা স্থাপিত বেশির ভাগ অবকাঠামোর নাম অপরিবর্তিত থাকলেও স্বাধীনতার পর পাকিস্তানি শাসকদের দেওয়া প্রায় নাম বা শিলালিপি ধুয়ে-মুছে ফেলা হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ওপর রাগ-ক্ষোভে জনতার মুখে মুখে অনেক জায়গার নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। পাকিস্তানের জাতির জনক কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামে সড়কটি রাতারাতি বঙ্গবন্ধুর নামে পরিবর্তিত হয়ে যায়। নবাবপুরে লিয়াকত আলী অ্যাভিনিউয়ের নাম তার আগের নামে চলে যায়। শাহবাগের উত্তরে পাক-মটর নামের জায়গাটি জনমুখে পরিবর্তন হয়ে বাংলা-মটর হয়ে যায়। জেনারেল আইয়ুব খান ঢাকায় তাঁর নামে তেজগাঁও এ যে নতুন শহরটি (আইয়ুবনগর) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটির নাম রাখা হয় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নামে।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসক এরশাদের শাসন আমলে ঢাকার ইংরেজি বানান Dacca পরিবর্তন করে Dhaka করা হয়। তবে হালে সবকিছু নিয়ে রাজনীতির কারণে, জেদাজেদিতেও অনেক নাম পরিবর্তিত হচ্ছে বা কিছু মহান ও যোগ্য লোকজন এই সম্মাননা লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সম্প্রতি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর হয়েছে। শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যান আর চন্দ্রিমা উদ্যান নামকরণ নিয়ে চলছে রাজনৈতিক খেলা। অন্যদিকে দেশের এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে দেশের প্রথম নোবেল লরিয়েট ড. মুহম্মদ ইউনূসের নামে আজ পর্যন্ত দেশের কোনো জায়গা বা বিষয়ের নামকরণ করা হয়নি, যদিও এই মানুষটির নামে ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক জায়গায় অনেক কিছুর নামকরণ করা হয়েছে। অথচ অতি রাজনীতিতে দেশের অনেক কিছুতে কিছু অখ্যাত মানুষের নাম লেগে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ফাঁকতালে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের নামেও অনেক কিছু হচ্ছে।

১৬০৮ সালে সুবেদার ইসলাম খান প্রথম ঢাকায় আসেন ‘চাঁদনী’ নামক শাহি বজরার বহরে এবং বুড়িগঙ্গা নদীতে যেখানে তাঁর বজরাটি নোঙর করা হয় সেই জায়গাটির নাম ‘চাঁদনীঘাট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলতেন- ‘চান্নিঘাট’। চান্নিঘাটসংলগ্ন একটি দুর্গে ছিল ইসলাম খানের বসবাস এবং তাঁর নামে জায়গাটির নাম হয় ‘ইসলামপুর’। অতঃপর এর আশপাশে বিভিন্ন ধরনের জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে পাড়া-মহল্লার পত্তন ঘটে। আর অদ্ভুতভাবে এসব অনেক বসতির সঙ্গে বাজার, গঞ্জ, বাগবাগিচা, তলি, টুলি-টোলা, পুর, মন্ডি ইত্যাদি লেগে যায়। যেমন চকবাজার, উর্দুবাজার, বাবুবাজার, বখশিবাজার, রহমতগঞ্জ, ইমামগঞ্জ, মোগলটুলি, লালবাগ, আমলিগোলা, নবাবপুর, আজিমপুর, ধানমন্ডি প্রভৃতি। চকবাজার ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিম শাসকরা বিশ্বের যেখানে ঝান্ডা উড়িয়েছেন, সেখানে (শহরের প্রাণকেন্দ্রে) প্লাজা ধাঁচের এ ধরনের চতুষ্কোনাকৃতি বাজার গড়েছেন। প্রায় ১০০ বছর পরে সুবেদার মুর্শিদকুলি খান চকবাজারের নাম পরিবর্তন করে ‘বাদশাহি বাজার’ করলেও এটি আগের নামেই রয়ে যায়। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তর তথা অবহেলায় চকবাজারসহ পুরো ঢাকা হতশ্রী ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়লেও গৌরব-ঐতিহ্য ও আবেগের চকবাজার আজও ঢাকার পাইকারি ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম স্থান। যেভাবে নগরীর মধ্যভাগে দাঁড়িয়েছে ঢাকার আরেক আবেগের জায়গা ‘রমনা’।

রমনীয় ‘রমনা’ এলাকাটির পত্তন হয়েছিল সুবেদার ইসলাম খান চিশতির শাসনামলে। তিনি এখানে মহল্লা চিশতিযান এবং মহল্লা শুজাতপুর নামে দুটি আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুজাতপুর নামকরণ হয়েছিল তাঁর ভাই শুজাত খান চিশতির নামে, আর সে সময় এসব এলাকায় মূলত মোগল পরিবারের লোকেরাই বাস করত। রমনার সীমা ও প্রকৃতি একেক বয়সীর কাছে একেক রকম। তৎকালীন ঢাকার উত্তরে বিস্তীর্ণ সেগুনবাগানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা ‘সেগুনবাগিচা’র পাশে ব্রিটিশ শাসনামলে নিসর্গ স্থপতি প্রাউড লক-এর পরিকল্পনায় ‘রমনা’ এলাকাটির দ্বিতীয় পত্তন হয়। অনুরূপভাবে গুলিস্তানের দক্ষিণে কাঁসারি পল্লীর কাঁসার ঝনঝনানি ও ঠুনকো ঠাটের বাহারে জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘ঠাঠারীবাজার’, যা পরবর্তী সময়ে জনৈক ইংরেজ ক্যাপ্টেনের নামে ক্যাপ্টেন বাজার হয়ে এখন বিকৃতরূপে ‘কাপ্তানবাজার’ নামেও পরিচিত। বাস্তবে এভাবে বিকৃত নামে ঢাকার আরও অনেক জায়গার নামকরণ প্রতিষ্ঠা পায়। যেমন ‘গ্রান্ড এরিয়া’ থেকে ‘গ্যান্ডারিয়া’, ম্যাজিস্ট্রেট অয়্যার-এর নামে প্রতিষ্ঠিত ঢাকার প্রথম বনেদি আবাসিক এলাকা বিকৃত হয়ে উয়ারী হয়ে আজকের ‘ওয়ারী’তে পরিণত হয়। অনেকে অবশ্য গ্যান্ডারিয়া এলাকায় সে যুগে প্রচুর আখ বা গ্যান্ডারি জন্মাত বলে এই জায়গাটির নাম গেন্ডারিয়া হয়েছে বলে মনে করেন। অনেকটা একইভাবে, ধোলাই খালের তীরে ইংরেজ আমলে ব্যাঙ্কশাল পোতাশ্রয়ও কালক্রমে রূপান্তরিত হয়ে ‘বংশালে’ পরিণত হয়। আর মোগল আমলে পুরান ঢাকায় নির্মিত ‘আওরঙ্গবাদ কেল্লা’য় লাল ললনার লীলা ললিত-লতিকায় দুর্গ-প্রাসাদটির নাম হয়ে যায় ‘লালকেল্লা’য়।  

‘মিল ব্যারাক’ ছিল ঢাকায় ব্রিটিশ বাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যূহ বা প্রথম ক্যান্টনমেন্ট। বুড়িগঙ্গা ও ধোলাইখালে সন্ধিক্ষণে সূত্রাপুরে কোম্পানি আমলে জনৈক ইংরেজ বণিকের প্রতিষ্ঠিত সুগার মিলের পরিত্যক্ত এলাকায় ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহী দমনে আনা ব্রিটিশ সেনাদের ব্যারাক স্থাপিত হয়েছিল। তখন থেকে এই জায়গাটি ‘মিল ব্যারাক’ নামে পরিচিত। ১৮৫৭-৫৮ সালে সিপাহি বিদ্রোহ দমনের পর মিল ব্যারাক এলাকাকে ব্রিটিশরা ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট ঘোষণা করে। অতঃপর ১৯০০ শতাব্দীতে ঢাকাকে পুনঃ রাজধানীকরণ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মিল ব্যারাক থেকে ক্যান্টনমেন্ট পুরানা পল্টন-রাজারবাগ হয়ে উত্তরে তেজগাঁওয়ে স্থানান্তরিত হয়। অনুরূপ, মোগল আমলে পিলখানা ছিল মোগল সৈন্যদের প্রতিরক্ষাগার, কালক্রমে যা পরিণত হয়েছে বিডিআর পরে বিজিবির হেডকোয়ার্টারে। আর রাজারবাগ হয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার।             

কালচক্রে এসব অনেক জায়গা ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন হয়েছে। নবাবপুরের পূর্ব নাম ছিল উমরাপাড়া, যেখানে সে সময় আমির-উমরা ও অন্যান্য অভিজাতশ্রেণির লোকজন বাস করতেন বিধায় একপর্যায়ে এই জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘নবাবপুর’। নবাবপুরের পাশে ছিল প্রাচীন বনেদি হিন্দুদের আবাসস্থল ‘ধমরাপুর’, যেটি কালচক্রে নবাবপুরের সঙ্গেই বিলীন হয়। উত্তর দিকে ছিল আলুরবাজার, যেখানে নাজিরদের বসবাস শুরু হলে এর অংশবিশেষের নাম হয়ে যায় ‘নাজিরাবাজার’। ইসলাম খাঁর পরে ঢাকার আরেক বড় সংস্কারক ছিলেন সুবেদার মীর জুমলা। তিনি ঢাকার নতুন সীমান পরিধি চিহ্নিত করে সেখানে একটা গেট নির্মাণ করেন, যেটি ইতিহাসে ‘মীর জুমলা’র গেট নামে লিপিবদ্ধ থাকলে ব্রিটিশ আমলে এটি ‘ঢাকা গেট’ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত মিটফোর্ড হসপিটাল এখনো সেই নামে রয়ে যায়। প্রকাশ, ১৮০০ শতাব্দীর মাঝামাঝি ঢাকায় কলেরা রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন ঢাকার কালেক্টর ও বিচারক স্যার রবার্ট মিটফোর্ড এই হাসপাতালটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং তাঁর সম্পত্তির বেশির ভাগ হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য উইল করে দেন। পরবর্তী সময়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের পাশে নির্মিত ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলটির উন্নয়নে নবাব পরিবারের অবদানের কথা স্মরণ রেখে কলেজটির নাম হয় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ। বাংলার শেষ নবাব ছিল বাহাদুর শাহ। তাঁর নামে স্থাপিত বাহাদুর শাহ পার্কের নাম ব্রিটিশ শাসনামলে রানি ভিক্টোরিয়ার নামে করা হলেও আজ অবধি এটি আগের নামেই বেশি পরিচিত।

সে সময় নবাবপুরস্থ অমরাপুরে হিন্দুদের একটা বড় মন্দির ছিল, যেখান থেকে এর ভক্তকুল ঢাকায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী তথা বিভিন্ন রথযাত্রা (পুষ্পযাত্রা, ঝুলনযাত্রা, জন্মযাত্রা, গোবর্ধনযাত্রা, রাসযাত্রা, দোলনযাত্রা ইত্যাদি) শুরু করত। তন্মধ্যে রথযাত্রার লোকজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে রথখোলা এলাকাটি। এভাবে পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আরও কিছু বিশেষায়িত লোকজনের সমন্বয়ে বিভিন্ন সময়ে টাকার হাট, মহাজনপুর ইত্যাদি চমকপ্রদ নামে কিছু জায়গা গড়ে ওঠে, যেসবের নাম থেকে এই  জায়গাগুলোতে কারা বাস করত অনুমান করা যায়। যুগে যুগে এ ধরনের আরও অনেক জায়গার নাম পরিবর্তন হয়ে ইতিহাসের পাতা থেকে আজ বিস্মৃত হয়ে গেছে। চকবাজার এলাকার ভেতরে মোগলটুলি নামে একটি পল্লী ছিল, যেটিও এখন আর নেই। এভাবে হারিয়ে গেছে-ঢাকার ভিস্তিওয়ালা সম্প্রদায়, যাঁরা ছাগলের চামড়ায় তৈরি একধরনের বিশেষ ব্যাগে করে ঘরে ঘরে পানি সরবরাহ করত। তখন এসব ভিস্তিওয়ালাদের লোকজন ‘সাক্কা’ বলে ডাকত এবং এভাবে তাদের বসবাসের জায়গাটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘সিক্কাটুলী’। ব্রিটিশ আমলে (১৮৭৪ সালে) চাঁদনীঘাটে ওয়াটার ওয়ার্কস নির্মাণ করে শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। সে থেকে এর সংলগ্ন রাস্তাটির নাম হয়ে যায় ‘ওয়াটার ওয়ার্কস রোড’।

এভাবে ঢাকায় আরও অনেক ব্রিটিশ রাজপ্রতিনিধি ও ইংরেজ শাসকদের নামে রয়েছে নর্থব্রুক হল রোড, জনসন রোড, অয়্যার স্ট্রিট, লারমিনি স্ট্রিট, র‌্যাংকিন স্ট্রিট, ইংলিশ রোড, হেয়ার রোড, বেইলি রোড। ফুুলবাড়িয়ার নাম হয় এই জায়গায় ফুলের ব্যবসা হতো বলে। আবার অনেকে বলে থাকেন, ফুল শাহ নামক এক বুজুর্গের মাজারকে কেন্দ্র করে জায়গাটির এই নামকরণ। ১৮৫৩ সালে ফুলবাড়িয়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত প্রথম এ দেশে রেলওয়ের প্রচলন হয়। ফুলবাড়িয়ার রেলগেট ছিল তৎকালীন পুরান ও নতুন ঢাকার সীমানা। এর পরের বছর রেলওয়ের বিস্তৃতি ঘটে নীলক্ষেত-তেজগাঁও-টঙ্গী হয়ে উত্তরে জয়দেবপুর পর্যন্ত। ফুলবাড়িয়ার সে সময় বাঁশের তৈরি আসবাবের দোকানে ভর্তি ছিল, তাই এই জায়গাটিকে অনেকে বাঁশপট্টিও বলত। বাঁশপট্টির পেছনে ছিল সিদ্দিকবাজার এলাকা। জনৈক ধর্মীয় পীর মিয়া মহম্মদ সিদ্দিকের নামে জায়গাটির নাম হয় ‘সিদ্দিকবাজার’। সিদ্দিকবাজারের পাশে ‘আলুরবাজার’। কিন্তু এখানে কখনো আলুর চাষ বা ব্যবসা হতো না। জায়গাটির মালিক ছিলেন জনৈক আল্লাইয়ার খান, যিনি ছিলেন আওরঙ্গজেবের একজন কর্মকর্তা, তিনি বাস করতেন আওরঙ্গবাদ কেল্লায় (লালবাগ দুর্গে)। সময়ের পথ বেয়ে আল্লাইয়ার বাজার নামটি বিকৃত হতে হতে প্রথমে আল্লুর বাজার, তারপর আলুর বাজার হয়ে যায়।

ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা ওয়ারী। ১৮৮৪ সালে ম্যাজিস্ট্রেট মি. অয়্যারের নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে যুগে বলধা গার্ডেনসংলগ্ন খ্রিষ্টান গোরস্থানের পাশে বনেদি তথা অভিজাত এলাকা হিসেবে এটি পরিকল্পিত হয়। ‘অয়ার এস্টেট’ থেকে বিকৃত হয়ে ওয়ারী হয়ে গেলেও তাঁর নামে অয়্যার স্ট্রিটটি এখনো সঠিকভাবে আছে। শুরুতে এর বেশির ভাগ আদি বাসিন্দা হিন্দু হলেও এখন এটি একটি পুরোপুরি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। অনুরূপ সে যুগে স্বামীবাগ-গোপীবাগ ছিল আরেক বনেদি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, যেখানে এখনো রামকৃঞ্চ মঠ ও আশ্রম স্ব-মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। তারপর ঢাকার আরেক পরিকল্পিত এলাকা ছিল পল্টন, যা সময়ের প্রেক্ষিতে নগরীর অত্যন্ত জনঅধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হযেছে। পাকিস্তান আমলে নগরীর পশ্চিমে ধানক্ষেতের জমি হুকুমদখল করে পরিকল্পিত হয় ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। অতঃপর ডিআইটির অধীনে পরিকল্পিত হয় বনানী-গুলশান ও উত্তরা। তন্মধ্যে ডিআইটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জি এ মাদানীর স্ত্রী ‘গুলশান’-এর নামে গুলশান আবাসিক এলাকাটির নামকরণ করা হয়।

নারিন্দা-নারায়ণদিয়া বা নারায়ণদি শব্দের অপভ্রংশ-আগে এটি একটি দ্বীপ ছিল, যা নারায়ণের দ্বীপ অর্থাৎ হিন্দুদের নিকট ঈশ্বরপ্রদত্ত দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। প্রকাশ ১৭০০ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত নারিন্দা বাহাদুর শাহ পার্ক পরবর্তী সময়ে ভিক্টোরিয়া পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দয়াগঞ্জ নামটি মোগল আমলের শেষদিকে জনৈক প্রভাবশালী হিন্দু দিয়াচান্দ বা দয়াচান্দের নামানুসারে হয়েছে, পরে (ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে) স্থানীয় আরেক প্রতাপশালী ব্যক্তি শরৎচন্দ্র গুপ্তের নামে দয়াগঞ্জের প্রধান সড়কটির নামকরণ হয়। রায়সাহেব বাজার- ১৭৭৫ সালে ঢাকা কালেক্টরেটের দেওয়ান রায় হরিরাম মল্লিকের নামে শত বছরের পুরোনো বাজারটির নামকরণ হয়ে যায় রায়সাহেব বাজার। ধোলাই খালের ওপর লোহার পুলটি তৈরি হয়েছিল ১৮২৩ সালে ঢাকা কালেক্টর ওয়ালটারের উদ্যোগে- ঢাকার উন্নয়নে ওয়ালটারের অনেক অবদান রয়েছে, অথচ তাঁর নামে পুরান ঢাকায় ছোট্ট একটা রোডের নাম ছাড়া (ওয়ালটার রোড়) ঢাকায় আর কিছু নেই। ওই সময় তাঁর উদ্যোগে প্রথম (১৮৬৪ সালে) মিউনিসিপাল কমিটি গঠিত হয়।

মিল ব্যরাক-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে প্রথম এখানে বিভিন্ন ধরনের মিল যেমন- ফ্লাওয়ার মিল, চিনি কল ইত্যাদি স্থাপিত হয়। অনেকে জায়গাটিকে মিল পাড়াও বলে থাকেন। আলমগঞ্জ-বাদশাহ আওরঙ্গজেব বা আলমগীরের নামে হয়। ঢাকা শহরের ঐতিহ্য অনুসারে, যে এলাকায় যে বা যাঁরা বাস বা ব্যবসা-বাণিজ্য করত, তাঁদের পেশায় সেসব পল্লীর নাম হতো। আরমানিটোলা-আর্মেনিয়ানদের নামে। ফরাশগঞ্জ যদিও বলা হয় যে ফরাসিদের বসবাসের জায়গা হিসেবে জায়গাটির নাম হয়, তবে ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, ১৯১৮ সালে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মি’ এফ সি ফ্রেঞ্চের নামে প্রথমে ফ্রেঞ্চ রোড তারপর বিকৃত হয়ে ফরাশগঞ্জ হয়ে যায়। ইংলিশ রোড-ঢাকার জনৈক বিভাগীয় কমিশনার মি. ইংলিশের নামে ধোলাই খাল তীরবর্তী রাস্তাটির নামকরণ হয়।

নবাবপুর তথা অমরাপুরের অদূরে মালাকারটোলা বা মালাকার নগর, কালচক্রে যা দাঁড়ায় ‘মালিটোলা’য়। ঢাকায় হিন্দু-মুসলিম সবার মধ্যে ফুলের ছিল ভারি কদর। তাই বাগানেরও ছিল ছড়াছড়ি। লালবাগ, শাহবাগ, পরীবাগ, দিলকুশা, শান্তিবাগ, মোমিনবাগ ইত্যাদি এলাকায় ফুল বাগানের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণে যেসব মালিরা কাজ করত তাদের বসবাসের জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘মালিবাগ’। সে সময় ফুলবাড়িয়া বা ফুলমন্ডি ছিল সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার। এটা লক্ষণীয় যে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সহজভাবে প্রাপ্তিতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় একই নামে অনেকগুলো জায়গার পত্তন হয়েছে। যেমন-গোয়লানগর, গোয়ালপাড়া, গোয়ালটুলি ইত্যাদি। এসব পল্লীতে গোয়ালাদেরই বসবাস বেশি। 

ইস্কাটন এসেছে স্কটিশ শব্দ থেকে। চামেলী হাউস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হোস্টেল, আগে যা ছিল ‘চামাদিয় হাউস’ নামে পরিচিত। মতিঝিল ছিল বিস্তীর্ণ জলরাশিতে পূর্ণ। পল্টন ছিল কোম্পানি আমলে বিশাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ছাউনি, যা তখন গার্ড বাজার নামেও পরিচিত ছিল। এখান থেকে সেনাবাহিনী সরে গেলেও আজও পুরো এলাকটি পুরানা পল্টন ও নয়া পল্টন নামে রয়ে গেছে, পল্টন ময়দান ছিল ঢাকার সবচেয়ে বড় মাঠ। তোপখানা ছিল গোলন্দাজ বাহিনীর আস্তানা (তোপখানা), গোলন্দাজ বাহিনী অন্যত্র সরে গেলেও জায়গাটি ওই নামেই রয়ে যায়।  

ঢাকা শহরে তৎকালীন নাগরিকদের জন্য চিত্তবিনোদনের তেমন ব্যবস্থা ছিল না, তাই শহরবাসীর অধিকাংশই পাড়ায় পাড়ায় বারবনিতা ও বাইজিদের সঙ্গ লাভ করে আনন্দ ও ফূর্তি উপভোগ করত। এসব জায়গার মধ্যে ইসলামপুরে কিছু ঘরবাড়ি, নবাবপুরের কান্দুপট্টি, সাঁচিবন্দর, জিন্দাবাজার, কুমোরটুলি; নারায়ণগঞ্জের টানবাজার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব অনেক জায়গার নামের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলেও কান্দুপট্টি নামের কারণ অস্পষ্ট। তবে কারও কারও মতে, এই পট্টির লোকজন অনেকে কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করে, মাঝেমধ্যে কেউ কেউ পুরুষকুলের লোভে পড়ে বের হয়ে কয়েক দিন যেতে না-যেতেই আবার কেন্দে কেন্দে ফেরা এবং এভাবে অসহায় এসব নারীর সারা জনম ধরে কাঁদা-কাঁদিতে জায়গাটির নাম কান্দুপট্টি হয়েছে বলে প্রকাশ। আর একটা বিষয়, এসব পল্লীতে ছিল পান-সুপারির খুব কদর, তাই এর আশপাশে উন্নতমানের পানের দোকান গড়ে ওঠে। বিভিন্ন ধরনের পান ও পানবাহারে চলে ব্যবসা। এভাবে ‘সাঁচি পান দারিবা’ অর্থাৎ সাঁচি পান বিক্রির জায়গাকে কেন্দ্র করে একটা জায়গার নাম সাঁচিবন্দর হয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top