স্থাপত্য ইতিহাসে সিঁড়ি বা সোপান অত্যন্ত প্রাচীনতম ও প্রয়োজনীয় উদ্ভাবন। ঠিক কবে এর উৎপত্তি তা বলা বেশ কঠিন হলেও ধারণা করা হয় ৬০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে সিঁড়ির ব্যবহার শুরু। মানবসভ্যতার ধারাবাহিকতায় সিঁড়ির রয়েছে কেন্দ্রীয় ভূমিকা। স্থাপত্য যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির আকৃতি ও ব্যবহারে পরিবর্তন লক্ষণীয়। সাধারণত আমরা ভবনের এক তলা থেকে অন্য তলায় নিরাপদে, অনায়াসে যাওয়ার জন্য ছোট ছোট উল্লম্ব দূরত্বের ধাপ সংযোজনের মাধ্যমে নির্মিত একটি বড় উল্লম্ব দূরত্বের পথকে সিঁড়ি বা সোপান বলে থাকি। এটি একটি স্থায়ী কাঠামো। ইমারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আগে সিঁড়ি শুধু ভবনের দুটি ভিন্ন তলার মাঝে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতো। সিঁড়ি যে বাড়ির অন্দরসজ্জা বা বাইরের রূপ বদলে দিতে পারে এমন চিন্তা হয়তো খুব একটা কাউকে ভাবায়নি তখনো। কিন্তু আধুনিক ইন্টেরিয়র কনসেপ্ট বলছে ভিন্ন কথা। ইন্টেরিয়রের অংশ এই সিঁড়ি খুব সহজেই বাড়ির পুরো দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে। এক চিলতে নান্দনিক সিঁড়ি ঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। সিঁড়ির রয়েছে বিভিন্ন রকমভেদ। যেমন-
একমুখী সিঁড়ি (স্ট্রেইট রান)
এ ধরনে সিঁড়ি কোনো রকম টার্নিং ছাড়াই পরবর্তী তলার সঙ্গে যুক্ত। এটি সিঁড়ির সবচেয়ে প্রাচীনতম ধরন। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী উল্লম্ব দূরত্ব ১র্২-এর বেশি হলে সেই সিঁড়ি ব্যবহারের উপযোগী নয়। সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও আকর্ষণীয় উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণ করলে এ ধরনের সিঁড়ি অভ্যন্তরীণ পরিবেশে জুড়ে দিতে পারে নতুন ও ভিন্নমাত্রা।
কোয়ার্টার ল্যান্ডিং সিঁড়ি
সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা পথ ওঠার পর ৯০ ডিগ্রি টার্ন করে পরবর্তী ধাপের সম্মুখীন হলে এ ধরনের সিঁড়িকে কোয়ার্টার ল্যান্ডিং সিঁড়ি বলা হয়। এ ধরনের ল্যান্ডিংয়ে সাজানোর সুযোগ প্রচুর। ল্যান্ডিংয়ে ছোট মূর্তি কিংবা মেটালের ফুলদানি বা সুন্দর ল্যাম্পশেড রাখা যেতে পারে। আর যদি ল্যান্ডিংয়ে কোনো জানালা থাকে সেক্ষেত্রে জানালায় ঘষা কাচ কিংবা ডিজাইনার গ্লাস লাগালে ভালো লাগবে।
হাফ-টার্ন সিঁড়ি
এ ধরনের সিঁড়ি গমনাগমনের পথে ১৮০ ডিগ্রি টার্ন করে পরবর্তী ধাপের সম্মুখীন হয়, তাই এ ধরনে সিঁড়িকে হাফ-টার্ন সিঁড়ি বলা হয়। সাধারণত একমুখী সিঁড়ির তুলনায় হাফ-টার্ন সিঁড়ির কমপ্যাক্ট বেশি।
স্পাইরাল সিঁড়ি
বাড়ির বাইর দিয়ে দোতলা যেতে কিংবা ছাদে ওঠার ঘোরানো সিঁড়িকে বলা হয় স্পাইরাল স্টেয়ারস। কিন্তু এই সিঁড়ি খুব কম বা সরু জায়গার মধ্যে তৈরি করতে হয়। আর তাই এ ধরনের সিঁড়ি কংক্রিটের না করে মূলত মেটাল দিয়ে তৈরি করাই ভালো।
বৃত্তাকার সিঁড়ি
একটা বৃত্তাকার প্ল্যানকে অনুসরণ করে বৃত্তাকার সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে এ ধরনের সিঁড়ির জুড়ি নেই। তবে এ সিঁড়ি নির্মাণের জন্য প্রচুর স্পেস প্রয়োজন।
ভবনের অভ্যন্তরীণ স্পেসে সিঁড়ি নির্মাণে আলো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সিঁড়িতে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো-ছায়ার বিচ্ছুরণ গৃহের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে জুড়ে দিতে পারে নৈসর্গিক অনুভূতি। এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক আলোর প্রাধান্য থাকাটা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি কৃত্রিম আলোর ব্যবহারও জরুরি। সিঁড়ির আলোকসজ্জাটা একটু ভিন্ন আঙ্গিকে সাজাতে উপযোগী অনেক ধরনের লাইট এখন দেশেই পাওয়া যায়। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঝুলে থাকবে এমন কিছু লাইটও এখন পাওয়া যাচ্ছে লাইটিং শোরুমগুলোতে। সিঁড়ির ওপর থেকে স্পটলাইট সাজিয়ে তৈরি করা যেতে পারে আলো-ছায়ার ছায়াপথ। আলো খুব সহজেই যেকোনো স্পেসকে হাইলাইট করতে সক্ষম। সিঁড়িকে স্পটলাইটের সাহায্যে হাইলাইট করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনে খুব বেশি লাইট ব্যবহার না করাই উত্তম। প্রতিটি সিঁড়ির নিচে সাইট থেকে একটি করে স্পটলাইট দেওয়া যেতে পারে। পেইন্টিংয়ের ওপর একটি ছোট স্পটলাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ছবিটি দূর থেকে ফোকাস হবে। পটারির মধ্যে চাইলে হালকা আলোর স্পটলাইট ব্যবহার করতে পারেন। খেয়াল রাখতে হবে যেন ঘরের অন্য জায়গার সঙ্গে এই আলোর সামঞ্জস্যতা বজায় থাকে।
সিঁড়িটা এমন জায়গাতে হতে হবে যে স্থানটার অবস্থান মোটামুটি ঘরের সব স্থান থেকেই দেখা যায়। ইন্টেরিয়রের সঙ্গে যুক্ত করতে এই সিঁড়ি নানাভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সিঁড়ির ব্যবহার নির্ভর করছে বাড়ির আকৃতি, আয়তন ও ঘরের অন্যান্য ইন্টেরিয়রের অবস্থানের ওপর। সিঁড়ির অবস্থানটি তাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে নির্বাচন করাটা জরুরি। সিঁড়িটি যদি ডুপ্লেক্স দোতলায় জুড়ে দিতে হয় সে ক্ষেত্রে সিঁড়ির অবস্থানটা ঘরের এক পাশ থেকে তৈরি করা ভালো। যদি সিঁড়ি ছাদের সঙ্গে জুড়তে হয়, তাহলে সিঁড়ির অবস্থান হতে পারে ঘরের ঠিক মাঝ বরাবর। আর এই সিঁড়ির অবস্থান এমন হতে হবে, যেন সব ঘর থেকেই সহজে এই সিঁড়ি ব্যবহার করে ওপরে ছাদে ওঠা যায়। অনেক সময় বাড়ির বাইরের বাগান থেকে সিঁড়ি পেঁচিয়ে ঘরের মধ্যে টেনে আনা যায়। তবে সেক্ষেত্রে বাইরের সিঁড়িটা কোনো বড় জানালা, দরজা অথবা কাচের দেয়াল ঘেঁষে হওয়া উচিত, যেন ঘরের ভেতর থেকেও বাইরের সিঁড়িটার অবস্থান টের পাওয়া যায়। সিঁড়ির নিচের অংশে বেশ স্পেস থাকে, যা ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা যায়। একটা ছোটখাটো পাঠাগার তৈরি করা যেতে পারে সিঁড়ির নিচের অংশে। অথবা স্টোর হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
সিঁড়ি তৈরির উপকরণেও ভিন্নতা ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে এনে দিতে পারে চমকপ্রদ নান্দনিকতার ছোঁয়া। ঘরের ইন্টেরিয়রে যদি এথনিক ভাবটা বজায় রাখতে সিঁড়িটা কাঠের করা যেতে পারে। ঘরের মাঝের সিঁড়িটা একটু হালকা ডিজাইনের হলেই ভালো। কাঠের স্পাইরাল সিঁড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কাঠের হাতল ব্যবহারে কিছুটা আধুনিক আবার একই সঙ্গে এথনিক ভাবও বজায় থাকবে। যদি ইন্টেরিয়র পুরোপুরি জিওমেট্রিক স্টাইলের হয় তাহলে সিঁড়িতেও তার একটা আঁচ থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে সিঁড়ি তৈরিতে অ্যালুমিনিয়াম অথবা স্বচ্ছ কাচ ব্যবহার করা যেতে পারে। সিঁড়ির হাতলে কিছুটা ভিন্নতা আনতে স্টেইনলেস স্টিলের ফ্রেম অথবা রাফ কাঠ ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্দরের সিঁড়িগুলোতে হাতলটা একটু হালকা গড়নে তৈরি করা উচিত। যদি পুরো সিঁড়িটা কংক্রিটের তৈরি করতে হয়, তাহলে খেয়াল রাখতে হবে ধাপগুলোর মাঝে যেন কিছু স্পেস ফাঁকা থাকে নতুবা সিঁড়িটা ঘরের মাঝে একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
সিঁড়িকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে সাজাতে অভ্যন্তরীণ কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন। এতে করে সিঁড়িটি আর একটু প্রাধান্য পাবে। প্রথমেই এর জন্য সিঁড়ির পাশের দেয়ালে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। দেয়ালটা একটু রাফ হতে পারে। এর জন্য রাফ টাইলস ব্যবহার কিংবা কাঠের কোনো পরত দিয়েও তৈরি করা যেতে পারে দেয়ালটি। এই দেয়ালটা ভেঙে যদি নতুন করে তৈরি করা হয়, তবে কাচের ব্লক দিয়েও তৈরি করা যেতে পারে নতুন দেয়াল। এতে করে আলোর চলাচলটা যেমন বাড়বে তেমনি দেয়ালটাও পাবে ভিন্নতা। দেয়ালে থাকতে পারে বড় কোনো পেইন্টিং তবে ছোট ছোট তিন-চারটা পেইন্টিং ব্যবহার করতে চাইলে পেইন্টিংগুলোর কম্পোজিশন ও দেয়ালের লাইটিংটা একটু মাথায় রাখতে হবে। ছোট বাড়ির ক্ষেত্রে সিঁড়িটা এমন করে তৈরি করা উচিত, যাতে এর বাইরের অংশটা ব্যবহার করা যায়। সিঁড়ির পাশ ঘেঁষে একটা ছোট্ট লিভিং স্পেস অথবা সিঁড়ির নিচের অংশে হতে পারে ছোট একটা ডাইনিং স্পেস।
ভবনের সিঁড়ির নকশা ও নির্মাণের ক্ষেত্রে যে যে বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষণীয়Ñ
সিঁড়ির প্রস্থ/পাশ বা চওড়া
সিঁড়ি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ জনের কম হলে সিঁড়ির প্রস্থ কমপক্ষে ৭৫ সে.মি. হওয়া উচিত আর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ জনের বেশি হলে সেক্ষেত্রে ৯৫ সে.মি.। দুই বা ততোধিক পরিবার হলে ১০০ সে.মি. কিন্তু ব্যবহারকারী ১০ জনের অধিক হলে ১২৫ সে.মি. হওয়া উচিত। পাবলিক এরিয়ার (হোটেল, অফিস, সিনেমা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ইত্যাদিতে) সিঁড়ির চওড়া হবে ১৫০ সেন্টিমিটার। ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০০ জনের অধিক হলে দুইটি সিঁড়ি ব্যবহার করা উচিত।
সিঁড়ির পাদানি বা ট্রেড
সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ের চওড়া অন্ততপক্ষে সিঁড়ির মতো হবে। সিঁড়ির ধাপের চওড়া আবাসিক ভবনে ২৫০ মি.মি. আর অন্য ক্ষেত্রে ৩০০ মি.মি. হওয়া উচিত।
সিঁড়ির রাইজার বা ধাপের উচ্চতা
আবাসিক ভবনে সিঁড়ির ধাপের উচ্চতা সর্বোচ্চ ২০০ মি.মি. হওয়া উচিত, কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫০ মি.মি. হওয়া উচিত। ওঠা-নামার সুবিধার জন্য প্রতি ফ্লাইটে ১০-১২টি ধাপ রাখা শ্রেয়। তবে ৩টির কম ধাপ রাখা উচিত নয়।
সিঁড়ির ঢাল বা স্লোপ
সিঁড়ির ঢাল ২৬ থেকে ৪৫ ডিগ্রির মধ্যে থাকা ভালো যদিও ৩০ ডিগ্রি একটি সঠিক পরিমাপ।
সিঁড়ির হ্যান্ডরেইল বা হাতল
সিঁড়ির হ্যান্ডরেইল বা হাতলের উচ্চতা ৮০০ মি.মি. থেকে ৯০০ মি.মি.-এর মধ্যে রাখা ভালো।
সিঁড়ির হেডরুম
সিঁড়ির হেডরুমের উচ্চতা ২১০০ মি.মি.-এর ওপরে রাখা উচিত। তা না হলে ফার্নিচার বা অন্যান্য সামগ্রী ওঠানামা করার সময় সমস্যা হতে পারে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।