নৈসর্গিক প্রকৃতি আর মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বুকে ধারণ করে রয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুর। দিগন্তজোড়া চা-বাগান ও তদসংলগ্ন অঞ্চলে ১৯৭১ সালে গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও যুদ্ধঘাঁটি। মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো এসব ঘাঁটি থেকেই। একের পর এক সফল অভিযান পরিচালনা করেন মুক্তিসেনারা আর জঙ্গল কেটে রাস্তা তৈরি করেন, খাবার ও আশ্রয় দিয়ে সে পথকে সুগম করে তোলেন এখানকার চা-শ্রমিকেরা। এভাবে সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের এমন গৌরবময় স্মৃতিবিজড়িত এ জনপদের একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী আলহাজ মো. আলী আজম (জজ মিয়া)। তেমুনিয়া, জগদীশপুরের, ‘মেসার্স আফজাল ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে সফল এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-কথন এবারের আখ্যানে। সহযোগী ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল ইসলাম।
ব্যবসায়ী মো. আলী আজম (জজ মিয়া)-এর জন্ম ১৯৬৪ সালের ১ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরের বেজুড়া গ্রামে। বাবা মরহুম হাজি মো. আনোয়ার আলী ও মা হাজি মোছা. মনোয়ারা বেগম। বাল্যকালেই জড়িয়ে পড়েন কর্মজীবনে। ঠিকাদারির মাধ্যমেই পেশাজীবনের শুরু। এ পর্যায়ে এলাকার প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার তিনি। ঠিকাদারি করার সুবাদে নির্মাণপণ্য ব্যবসা সম্পর্কে রয়েছে গভীর ধারণা। বুঝতে পারেন ব্যবসাটির আগামীর সম্ভাবনা। এ উপলব্ধি থেকেই ১৯৯৬ সালে শুরু করেন নির্মাণপণ্য ব্যবসা। প্রথমে সিমেন্ট এবং পরে ব্যবসায় যুক্ত করেন রড, এলপি গ্যাস, চুলা ও হার্ডওয়্যারসামগ্রী।
মাত্র ২০০ বস্তা সিমেন্ট দিয়েই শুরু নিজস্ব নির্মাণপণ্য ব্যবসার। ব্যবসার শুরু থেকেই গুণগতমান, সুলভ মূল্য ও সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতা আস্থা অর্জন করেন। দূর-দূরান্তের ক্রেতারা তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকেই পণ্য কিনতে আসেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, কৌশল আর ক্রেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় কয়েক বছরের মধ্যে তিনি মাধবপুরের অন্যতম একজন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্টের একজন এক্সক্লুসিভ রিটেইলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ টেরিটরির সর্বোচ্চ বিক্রেতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও যেন সেরা বিক্রেতার স্থানটি অক্ষুণ্ন থাকে সে লক্ষ্যেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। অন্যান্য পণ্য বিক্রিতেও তিনি অনন্য। স্থানীয় পর্যায়ে আরএফএল চুলার একজন ডিলার। তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন টেলিভিশন, ডিজিটাল ক্যামেরা, ডিনারসেট, মোবাইল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহার ও সম্মাননা। এ ছাড়া আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ওমরাহ হজ, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের সুযোগ। নির্মাণপণ্য ব্যবসা ছাড়াও ঠিকাদারি ও পরিবহন ব্যবসায় সক্রিয় তিনি। বর্তমানে তাঁর পরিবহন বহরে রয়েছে পাঁচটি ট্রাক।
ব্যবসায়ী জজ মিয়া বিয়ে করেন ১৯৮৯ সালে। সহধর্মিণী মোছা. ছাবাহা আজম। এ দম্পতির পাঁচ ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মো. ওয়াজিদুর রহমান জুয়েল, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে এলএলবি পড়ছে, দ্বিতীয় মেয়ে নাসিমা আক্তার (নিপা)-এর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে, তৃতীয় ছেলে মো. আফজাল মিয়া ব্যবসা দেখভাল করে, চতুর্থ ছেলে মাওলানা মো. বাহার মিয়া আজরাবাদ টাইটেল মাদ্রাসা, ঢাকায় তাহরম পড়ছে, পঞ্চম ছেলে মো. রুবেল মিয়া কাজী শফিকুল ইসলাম কলেজ, বি.বাড়িয়া থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে এবং ছোট ছেলে মো. আকিল মিয়া জগদীশপুর হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ব্যবসায়ী জজ মিয়া ব্যস্ততার মধ্যেও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সময় দেন। তিনি বেজুড়া গ্রামের কোরআন তফসির কমিটির সভাপতি, একই গ্রামের নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রাসার সেক্রেটারি এবং তেমুনিয়া মাদ্রাসার কোষাধ্যক্ষ। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও বিচার-সালিসেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ।
মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান, এশিয়ার বৃহত্তম চা-বাগান ‘সুরমা’ ও অন্যান্য নৈসর্গিক চা-বাগান ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় মাধবপুরের অবস্থান সুবিধাজনক স্থানে। পর্যাপ্ত গ্যাসসুবিধা থাকায় এ অঞ্চলে একের পর এক গড়ে উঠছে শিল্পকারখানা। অদূর ভবিষ্যতে এ জনপদটি হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক জোন। উন্নয়নের এমন জোয়ারে অংশীদার হতে চান ব্যবসায়ী জজ মিয়াও। সুদীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, কৌশল ও এলাকায় নিজস্ব পরিচিতি কাজে লাগিয়ে ঘটাতে চান তাঁর নির্মাণপণ্য ব্যবসাটির ব্যাপক প্রসার। তাঁর এ সুপ্রত্যাশা পূরণ হোকÑ এমনটাই বন্ধন পরিবারের চাওয়া।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।