ইমারত নির্মাণ অত্যাবশ্যকীয় একটি বিষয়, যা চলে আসছে মানবসভ্যতার শুরু থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে; চলবে শেষ অবধি। ফলে নির্মাণশিল্পের প্রসার ঘটায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে এ বিষয়ক নানা প্রযুক্তি ও জ্ঞানের পরিসর। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, আমাদের দেশে ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও যেসব ইমারত নির্মিত হয়েছিল তার অধিকাংশই ব্রিক বিল্ডিং, যা রড ও সিমেন্ট কংক্রিটের (আরসিসি) বিম, কলাম ছাড়াই শুধু ইটের গাঁথুনির ওপর লাইম কংক্রিট কিংবা আরসিসি ছাদে নির্মিত এবং উচ্চতায়, যা ছিল তিন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ তলা পর্যন্ত। কিন্তু এখন সেই ব্রিক বিল্ডিং আর নেই। বর্তমানে, আরসিসি ফ্রেম স্ট্রাকচার নির্মাণ করে কম পুরুত্বে ইটের দেয়াল কিংবা অন্য কোনো হালকা মালামাল ব্যবহারে পার্টিশন ওয়াল তৈরির মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে সুউচ্চ ইমারত। যেভাবেই হোক না কেন, নির্মিতব্য এসব ইমারতের নির্মাণকাজের গুণগতমান নিশ্চিত করে নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাটা অতীব জরুরি একটি বিষয়।
মনে রাখা দরকার, ইমারত নির্মাণকাজে ব্যবহৃত প্রতিটি মালামাল ও কাজের গুণগতমান সর্বোতভাবে নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিকভাবে নির্মাণকাজের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কালের আবর্তে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে নির্মাণসামগ্রীর ধরন, গুণগতমান ও দাম। সুতরাং, চলমান এই পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করতে হবে সব কাজের মান ও ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাণসংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তেমন কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এমনও কেউ কেউ বলে থাকেন, বাড়ি বানানো ‘সহজ কাজ’। তাই, যাঁরা বিষয়টিকে এত সহজ মনে করেন, তাঁদের সেই গতানুগতিক ধারণা বদলে দিতেই আজকের এ প্রয়াস। পূর্ণাঙ্গ একটি ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে এর অন্তর্নিহিত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে ভাবলে, এটি আদৌ কোনো ‘সহজ কাজ’ নয় বলে আমি মনে করি। প্রসঙ্গত নাপিতের ফোড়া কাটার গল্পটি মনে পড়ল। হতে পারে এটি একটি রূপক কাহিনি। তারপরও এই গল্পটি যাঁরা শোনেননি, তাঁরা শুনলে হয়তো বাড়ি বানানো আসলেই যে ‘সহজ কাজ’ নয়, কথাটি যৌক্তিক বলেই মানবেন।
ফলে গল্পটি যাঁদের কাছে অজানা, তাঁদের জন্যই বলছিÑ এক গ্রামে পাস করা কোনো ডাক্তার ছিল না। গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তাররাই ওই গ্রামের সবার চিকিৎসা করতেন। এসব সেবাদানকারী তথাকথিত ডাক্তারদের একজন ছিলেন নাপিত, তাঁর হাতে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি থাকায় রোগীর দেহে অস্ত্রোপচারের কাজটি তিনিই করতেন। বিশেষ করে ফোড়া, বাগী ইত্যাদি কাটাকাটির মতো ছোটখাটো কাজগুলো নাপিত খুব সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যেই করে ফেলতেন। ভালো হলে ভালো, নইলে ভবিতব্যÑ এসব নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু বিভ্রাটটা ঘটল তখনই, যখন ওই গ্রামে পাস করা একজন ডাক্তার এলেন। দিন যায়, কিন্তু ডাক্তার সাহেব তাঁর ডাক্তারির প্রসার ঘটাতে পারেন না। কারণ, তাঁর কাছে রোগী এলে তিনি এত সহজে কোনো অস্ত্রোপচার করতে চাইতেন না। অস্ত্রোপচারের সুবিধা-অসুবিধাগুলো সবিস্তারে রোগীর সঙ্গে আলাপ করে তাঁকে এ থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতেন।
যদিও রোগীর মঙ্গলার্থেই তাঁকে এই অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হতো। কিন্তু একজন রোগী এতে আশ্বস্ত হতে না পারায় ডাক্তার তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারেননি। ফলে নাপিতের প্রসার দিন দিন বাড়তেই থাকল। স্থানীয় রোগীদের ভ্রান্ত ধারণাÑ ফোড়া, বাগী কাটা আর এমন কী কঠিন কাজ? এসব পুষে রেখে এত কষ্ট করার প্রয়োজন নেই, অস্ত্রোপচারই এর সহজ চিকিৎসা। গত্যন্তর না দেখে ডাক্তার সাহেব একদিন নাপিতকে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যে অস্ত্রোপচার করার বিষয়টি তুলে ধরেÑ মানুষের শরীরে কোথায় কী আছে, কোথায় কাটলে কী বিপদ হতে পারে ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয় সবিস্তারে জানিয়ে এই সহজ কাটাকাটির ক্ষতিকর দিকগুলো নাপিতকে বুঝিয়ে দিলেন, জানালেন বিষয়টি এত সহজ নয়। সামান্য একটু ব্যতিক্রম হলে, তাতে মানুষের প্রাণ সংহারের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এ কথা শোনার পর থেকে নাপিতের আর অস্ত্র চলেনি। তদ্রƒপ, একটি ইমারত নির্মাণকাজে যদি এর গুণগতমান যথাযথভাবে রক্ষা করা না হয়, তবে তার ফলটা কী ভয়ানক হতে পারে, সেটা বোঝাতে পারলে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি বানানো ‘সহজ কাজ’ এমন কথা ভাবাটা আর সহজ হবে না।
এ ছাড়া কাজের গুণগতমান রক্ষা করার পাশাপাশি নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাও মুখ্য বিষয়, যা নিশ্চিত করে কর্মদক্ষতা আর বাস্তব অভিজ্ঞতা; যা এ ধরনের কাজে কোনো বিকল্প নেই। ইমারতের রয়েছে রকমফের, যেমন- আবাসিক, বাণিজ্যিক, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও কলকারখানা, গুদামঘর নির্মাণ ইত্যাদি। এই বিভিন্ন ধরনের ইমারত নির্মাণকল্পে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রয়োজন এবং এই অভিজ্ঞতার দ্বারাই নিশ্চিত করা সম্ভব প্রতিটি নির্মাণকাজ সম্পাদন করতে কাজের কোয়ালিটি রক্ষা করা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার মতো জরুরি বিষয়গুলো। ফলে, অত্র বিষয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট সবার সম্যক ধারণা থাকাটা অত্যাবশ্যক।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেশের সব নির্মাণকাজই সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক চুক্তিভিত্তিকভাবে কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। যখন একটি সংস্থা চুক্তিভিত্তিকভাবে কোনো কাজ পরিচালনা এবং তদারকির দায়িত্ব পালন করে, তখন নিয়োগপ্রাপ্ত সংস্থার পক্ষে জবাবদিহির অবকাশ কিন্তু থেকেই যায়। ফলে ওই সংস্থা অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি টিম গঠন করে সব ধরনের কাজের তদারকি করে, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করে থাকে। কিন্তু মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মালিক একাই সবকিছু দেখভাল করে কিংবা অনভিজ্ঞ কোনো সুপারভাইজর বা প্রকৌশলীর ওপর অর্পণ করেন এ ধরনের দায়িত্ব। যাতে নির্মাণকাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা কিংবা নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়গুলো হয়ে পড়ে উপেক্ষিত।
তাই যেকোনো নির্মাণকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর ওপর মৌলিক কিছু জ্ঞান থাকা জরুরি। যেমনÑ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রকারভেদ এবং এদের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য কী হতে পারে? কোন কাজে কী পরিমাণ মালামালের প্রয়োজন? একটি কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে কী পরিমাণ ব্যয় হতে পারে? এমনকি, কীভাবে সম্পাদিত কাজের পরিমাপ করতে হয়? ইত্যাদি বিষয়ের ওপর সম্যক ধারণা থাকা অপরিহার্য। এ ছাড়া একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন সুবিন্যস্ত এক সেট নকশা এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতে পারে তার একটি এস্টিমেট বা প্রাক্কলন। নইলে নির্মিতব্য ইমারতটির নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটতে পারে এমনকি প্রকল্পটি মাঝপথে এসে অর্থাভাবে আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে মালিকানাধীন প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ রকম আশঙ্কা থাকে বেশি।
অতএব, একটি ইমারত নির্মাণ করতে উল্লেখিত বিষয়গুলোর ওপর ন্যূনতম ধারণা রেখে নির্মাণকাজ শুরু করা উচিত, উচিত এর কর্মকাণ্ডের সার্বিক বাস্তবায়ন। এ লক্ষ্যে, কত বর্গফুট ক্ষেত্রবিশিষ্ট এবং কত তলা ইমারত নির্মিত হবে সে ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। সংগ্রহ করতে হবে এর সুবিন্যস্ত নকশা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্তরের কাজ সম্পাদন করতে আনুমানিক কত ব্যয় হতে পারে তার একটি প্রাক্কলনও জেনে নিতে হবে। সাধারণত বহুতল ইমারত নির্মাণে বর্তমান বাজারদর বিশ্লেষণপূর্বক নির্দিষ্ট হারে আনুমানিক একটি নির্মাণব্যয় হিসাব করে কাজ শুরু করা হয়। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী বিভিন্ন কাজের আনুমানিক নির্মাণব্যয়-
| ক্রমিক | স্থাপনার নানা অংশ | খরচ (প্রতি তলার জন্য প্রতি বর্গফুটে) | বিশেষ ক্ষেত্রে |
| ১. | পাইলিং | ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা | মাটির অবস্থা এবং ইমারতের উচ্চতার ওপর নির্ভরশীল |
| ২. | ভিত বা ফাউন্ডেশন | ১৮০ থেকে ২০০ টাকা | মাটির অবস্থা এবং ইমারতের উচ্চতার ওপর নির্ভরশীল |
| ৩. | সুপার স্ট্রাকচার বা ভিতের ওপরের অংশ | ১৫০০ থেকে ১৭০০ টাকা | ব্যবহৃত মালামালের মানের ওপর নির্ভরশীল |
| ৪. | লিফট, জেনারেটর, সাব-স্টেশন সোলার প্যানেল ইত্যাদি | সর্বসাকুল্যে ৫০ লাখ থেকে ৬০ লাখ টাকা | প্রস্তুতকারী কোম্পানির মানের তারতম্যের ওপর নির্ভরশীল |
উদাহরণস্বরূপ, উপরোল্লিখিত দর অনুসারে ১৫০০ বর্গফুট প্লিন্থ এরিয়াবিশিষ্ট ৮ তলা একটি ইমারত নির্মাণকল্পে মোট ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব-
| ক্রমিক | স্থাপনার নানা অংশ | ৫০০ বর্গফুট প্লিন্থ এরিয়াবিশিষ্ট ৮ তলা ভবন | মোট খরচ (টাকা) |
| ১. | পাইলিং | ১৪০x১৫০০x৮ = | ১৬,৮০,০০০ |
| ২. | ভিত বা ফাউন্ডেশন | ১৮০x১৫০০x৮ = | ২১,৬০,০০০ |
| ৩. | সুপার স্ট্রাকচার | ১৫০০x১৫০০x৮= | ১,৮০,০০,০০০ |
| ৪. | লিফট জেনারেটর সাব-স্টেশন সোলার প্যানেল ইত্যাদি | – | ৫০,০০,০০০ |
| সর্বমোট | ২,৬৮,৪০,০০০ টাকা | ||
খরচের আনুমানিক এই হিসাবটি কমবেশি হতে পারে, যা ব্যবহৃতব্য মালামালের ধরন, বৈশিষ্ট্য, গুণগতমান আর অপচয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
চলবে….
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।