উন্নয়নের মহাসড়কে পা রেখেছে চট্টগ্রাম। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলের যে এলাকাকে ঘিরে দৃশ্যমান হবে আগামী দিনের সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সেই এলাকাটির নাম চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চল। এই অঞ্চলের শেষ প্রান্তে মাতারবাড়ীতে গড়ে উঠবে এক নতুন মহানগর, যা আগামীর দুবাই কিংবা সিঙ্গাপুর। বলছি সেই সম্ভাবনার কথাই। একটু খুলেই বলা যাক। অর্থনৈতিক দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের ছায়ায় অবস্থানের পাশাপাশি আশিয়ান (ASEAN) দেশগুলোর নৈকট্য চট্টগ্রামকে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থলে পরিণত করেছে। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে চট্টগ্রামের অবস্থান একদিন চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম নগরীকে এ অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ এবং শিল্প-বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করবে। সেই সম্ভাবনাটিই এখন দেখা দিয়েছে। আমরা যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারি, তখনই শুধু এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে। অন্যথায় নয়।
সবার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং বন্ধুত্ব বজায় রেখে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার কৌশলে বাংলাদেশ সরকার সফল হয়েছে এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৫ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো রাশিয়া, ভারত, চীন ও জাপান একসঙ্গে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হয়েছে। নিজ নিজ দেশের জন্য স্পেশাল ইকোনমিক জোনের জন্যও আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশ। উন্নয়ন সহযোগিতার এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দরাদরি করার মতো সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। ঋণের সুদের হার নিয়ে বাংলাদেশ এখন দরাদরি করতে পারে এবং দরাদরি করছেও। একসময়ের আস্থার সংকটের বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বের জন্যই আস্থা আর দৃঢ়তার প্রতীক। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে বিস্ময়কর মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। স্বয়ং বিশ্বব্যাংকের প্রধান জিম ইয়াং কিম ছুটে এসেছিলেন ঢাকায় স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্য বাংলাদেশের চলমান সাফল্য। অকপটে স্বীকার করলেন দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের রোল মডেল। জাতি হিসেবে এতে আমরা আনন্দিত একই সঙ্গে গর্বিত।
অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ২৮টি প্রকল্পে চীন বিনিয়োগ করবে ২৩ বিলিয়ন ডলার। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে বেশ কটি প্রকল্প সরাসরি চট্টগ্রাম নগরী এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
যার মধ্যে-
- কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে পতেঙ্গা থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত ৩ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল এবং ৫ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক (প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা)।
- সীতাকুন্ড-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রোড (প্রাক্কলিত ব্যয় ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার)।
- আনোয়ারায় চায়নিজ এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (৩৪১ হেক্টর জমিতে স্থাপিত হবে, প্রাক্কলিত ব্যয় ২৮০ মিলিয়ন ডলার)।
- আনোয়ারার গন্ডামারায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার, যৌথ প্রযোজনায় বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিতব্য, এস আলম পাওয়ার প্লান্ট (প্রাক্কলিত ব্যয় ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। এতে কয়লা নামানোর জন্য জেটিও থাকবে)।
এ ছাড়া চলমান কিংবা প্রস্তাবিত অন্যান্য প্রকল্পসমূহ, যা চট্টগ্রাম নগরী কিংবা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে, প্রভাবিত করবে তার মধ্যে রয়েছে-
- জাপানি সহায়তায় মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গভীর সমুদ্রবন্দর (প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার)।
- কক্সবাজারে বি ও টি ভিত্তিতে নির্মিতব্য এলএনজি টার্মিনাল (প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি ডলার)।
- কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস পাইপ লাইন (প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা)।
- দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমঘুম রেলপথ (প্রাক্কলিত ব্যয় ১৮ হাজার কোটি টাকা, অউই-এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে)।
- মিরসরাই ইকোনমিক জোন (প্রায় ৮ হাজার একর জমি)।
- বে টার্মিনাল: হালিশহর আনন্দবাজার থেকে দক্ষিণ কাট্টলীর রাশমনির ঘাট পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে জেটি নিয়ে বন্দর (১ হাজার ৬০০ একর নতুন জেগে ওঠা চরের জমি + ৯০৭ একর উপকূলীয় জমি নিয়ে গঠিত হবে)।
- বায়েজিদ বোস্তামী থেকে ঢাকা ট্রাংক রোড পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে চার লেইনের সংযোগ সড়ক (প্রাক্কলিত ব্যয় ২০৯ কোটি টাকা)।
- জাপানি সহযোগিতায় ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে চট্টগ্রাম আউটার রিংরোড (প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা)।
- জাপানি সহায়তায় চট্টগ্রাম নগরীর জন্য কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প (প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২০২ কোটি টাকা)।
- ২ হাজার ৫০০ একর জমিতে আনোয়ারায় কোরিয়ান ইপিজেড।
- চট্টগ্রামের পানি সরবরাহ উন্নয়ন ও সেনিট্রেশন প্রজেক্ট; চযধংব-১ (১৭০ মিলিয়ন ডলার)।
- কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প চযধংব-২ (প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা)।
- চলমান ফ্লাইওভার প্রকল্প।
চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরেই চট্টগ্রাম নগরীর গোড়াপত্তন এবং দীর্ঘ দুই হাজার বছরের নিরবচ্ছিন্ন বেড়ে ওঠা। এই বেড়ে ওঠা কখনো কখনো স্থবির কিংবা মন্থর হলেও কখনো একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি; অন্তত গত ১ হাজার ৩০০ বছরের জানা ইতিহাস তা-ই বলে। চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে নিয়ে সবারই আগ্রহ। কোরিয়া, চীন, জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ অনেকেই এই অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ভারত, চীন, আমেরিকার আগ্রহ কিংবা পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং অর্থনৈতিক কারণে সম্ভবত বাংলাদেশ সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের আলোচনার আড়ালেই থেকে গেল আরেকটি গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটি চট্টগ্রামের দক্ষিণে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে নির্মিত হচ্ছে। জাপানের অর্থায়নে এখানে পাওয়ার প্লান্ট এবং বন্দর হবে, যেখানে ৬০ ফুট গভীরতার জাহাজ অনায়াসে ভিড়তে পারবে। বৃহদায়তনের মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি এই বন্দরে ভিড়ে মাল খালাস করতে পারবে। তিন স্তরে সম্পন্ন হবে এর নির্মাণকাজ। নির্মাণকাজ শেষ হলে মাতারবাড়ী হবে একটি অত্যন্ত ব্যস্ত আন্তদেশীয় যোগাযোগ কেন্দ্র; বন্দর এবং শিল্পনগরী। মাতারবাড়ী হবে সিঙ্গাপুর কিংবা দুবাই মানের উন্নত নগরী, বন্দর এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু।
ফৌজদারহাট কাট্টলীতে বে টার্মিনাল নির্মিত হলে সেখানে ৪০ ফুট গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। গুপ্তখালে বড় বাঁকের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ঢুকতে পারে না। জোয়ার-ভাটা নির্ভরতার কারণে বন্দরে সবসময় জাহাজ ঢুকতে কিংবা বের থেকে পারে না। চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের গভীরতার সীমাবদ্ধতা তো আছেই। বে টার্মিনালের চ্যানেলটিতে কোনো বাঁক নেই। এটি সরল ও সোজা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারা জাহাজসমূহের দ্বিগুণ আয়তনের জাহাজও এই নতুন বন্দরে ভিড়তে পারবে। লাইটারিং জাহাজ বাবদ খরচ এতে অনেক কমে যাবে। চীন মেরিটাইম সিল্ক রুট পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রাম এই রুটের একটি অন্যতম প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্র। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত এবং মিয়ানমারের নৌসীমান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের আওতাধীন নতুন পাওয়া বঙ্গোপসাগরের এই এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরালো করা দরকার। একটা বড় সুযোগ এখানে সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলটাকে কর্মচঞ্চল করার সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ আমাদের গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে চট্টগ্রামের একটা ঐতিহাসিক এবং আত্মিক সম্পর্ক আছে। চট্টগ্রামের গ্রামগঞ্জে এখনো বার্মিজ বউ কিংবা তাদের বংশধরদের খুঁজে পাওয়া যায়। ভারত ও চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন স্মরণকালের মধ্যে যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। বাংলাদেশ-চীন-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার (বিসিআইএম) ইকোনমিক করিডোর চাঙা করা গেলে সংশ্লিষ্ট সব দেশই উপকৃত হবে। চট্টগ্রামের উন্নয়নেও একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে।
কর্ণফুলী টানেল কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরকে পশ্চিম তীরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। পশ্চিম তীরে নগরীর বিস্তৃতি হলেও পূর্ব তীরে এখনো অন্ধকার। মূলত সংযোগহীনতার কারণে কর্ণফুলীর পূর্ব তীর দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত থেকে গেছে; পশ্চিম তীরের মূল শহরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে পারেনি। শাহ আমানত ব্রিজ এবং কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে নদীর পূর্ব তীরে শহর বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। দুনিয়ার অনেক দেশেই নদীর দুপারে শহর গড়ে উঠেছে। চীনের সাংহাই নগরী এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এত দিন আমরা নগর নিয়ে ভেবেছি। কাজে লাগাই বা না লাগাই, আমাদের প্রতিটি প্রধান শহরের একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে। যেটিকে এত দিন আমরা সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছি সেটি হলো, অঞ্চল পরিকল্পনা বা রিজিওনাল প্ল্যান। পূর্বে বর্ণিত বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ অর্থনৈতিক করিডোরটি হবে এই অঞ্চলের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং কর্মচঞ্চল অর্থনৈতিক এলাকা। এটাই এখন বাস্তবতা। এই অঞ্চলটির জন্য অবিলম্বে একটি রিজিওনাল প্ল্যান (অঞ্চল পরিকল্পনা) প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় যেখানে সেখানে, রাস্তার দুই পাশে এলোপাতাড়ি ছড়ানো-ছিটানো এবং অপরিকল্পিতভাবে জনপদ, জেটি, শিল্পকারখানা ইত্যাদি গড়ে উঠবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুষঙ্গ হিসেবে আসবে পরিবেশের বিপর্যয়।
এই অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। কোথায় জেটি হতে পারবে, শিল্পকারখানা বা জনপদ গড়ে উঠবে, কী ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে ওঠাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, পর্যটন এবং বিনোদনব্যবস্থা কী হবে, ভূমিকম্প এবং জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি প্রতিরোধক ব্যবস্থা ইত্যাদির দিকনির্দেশনাসহ অবিলম্বে একটি রিজিওনাল মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়ন করতে হবে, অন্যথায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফৌজদারহাট-পতেঙ্গা আউটার রিং রোড, বায়েজিদ বোস্তামী-ঢাকা ট্রাংক রোডের সংযোগ সড়ক হয়ে গেলে, আউটার রিং রোডের শুধু একটি অংশ বাকি থেকে যাবে। সেটি হলো কর্ণফুলী ব্রিজ থেকে সদর ঘাট পর্যন্ত সংযোগ সড়ক। এই সড়কে সদর ঘাটের কাছে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বন্দরের একটি স্থাপনা। বন্দরের সঙ্গে আলোচনা করে এই স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে কিংবা স্থাপনাটিকে বাইপাস করে সড়কটি সম্পূর্ণ করা উচিত। এই সড়কটি হয়ে গেলে চট্টগ্রাম নগরীর চারপাশের আউটার রিং রোড সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। এতে যেসব যানবাহনের চট্টগ্রাম নগরীতে প্রবেশের প্রয়োজন নেই, সেগুলো চট্টগ্রাম নগরীকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, আনোয়ারা, বাঁশখালী, কক্সবাজার কিংবা ঢাকায় চলে যেতে পারবে। এখানে উল্লেখ্য যে ১৯৬১ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে প্রণীত সব মাস্টারপ্ল্যান এবং ড্যাপে এই সড়কটিকে অগ্রাধিকার নম্বর-১ বলা হয়েছিল। ১৯৬১ সাল পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর অবকাঠামো উন্নয়নে প্রচুর সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে কিন্তু এই সংযোগ সড়কটি নির্মাণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম নগরী হবে এই অঞ্চলের সব মানুষের জন্য টারশিয়ারি লেভেলের (তৃতীয় উচ্চস্তরের) সার্ভিস সেন্টার। এখানে উন্নত মানের হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, বিনোদনব্যবস্থা, বিমানবন্দর ইত্যাদি থাকতে হবে। আশপাশের শিল্পনগরী কিংবা শিল্পকারখানা থেকে উচ্চতর সেবার জন্যই শুধু লোকজন চট্টগ্রাম নগরীতে আসবে-সেভাবেই চট্টগ্রাম নগরীকে গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম নগরীর অভ্যান্তরে উত্তর-দক্ষিণে, পূর্ব-পশ্চিমে আরও সড়ক প্রয়োজন, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য আরও খালের প্রয়োজন। মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে এই কাজগুলো অবিলম্বে করে ফেলতে হবে। চট্টগ্রাম শহরের প্রান্তÍসীমায় অবস্থিত হাটহাজারী, পটিয়া, বোয়ালখালী, শিকলবাহা ও রাঙাদিয়াকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অবহেলিত কর্ণফুলীর পূর্বপারের জন্য উপযুক্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করা গেলে, গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হলে পার্শ্ববর্তী ছোট শহরসমূহ থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনে সকালে লোকজন চট্টগ্রাম নগরীতে আসবে এবং কাজ শেষে সন্ধ্যায় ফিরে যাবে। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-পটিয়া, চট্টগ্রাম-দোহাজারী একাধিক কমিউটার ট্রেন থাকতে পারে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই ট্রেন লাইনের কথা চিন্তা করা যায়। প্রান্তিক শহরগুলোকে চাঙা করা না গেলে চট্টগ্রাম অকার্যকর নগরীতে পরিণত হবে। এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে। চট্টগ্রাম-নতুনপাড়া ক্যান্টনমেন্ট-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-হাটহাজারী আরবান করিডোরটি এখন দৃশ্যমান। এলাকাটিতে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে এখানেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে টেকসই এবং সুশৃঙ্খল করতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরী এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলকে ঘিরে এক অপার সম্ভাবনার জগৎ উন্মুক্ত হচ্ছে। উপযুক্ত অঞ্চল পরিকল্পনার ভিত্তিতে এই অর্থনৈতিক করিডোরের বিভিন্ন উপযুক্ত স্থানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রিসোর্ট টাউন, মেডিকেল টাউন, ট্যুরিস্ট টাউন, ইউনিভার্সিটি টাউন, স্পোর্টস টাউন ইত্যাদি গড়ে তোলা যায়। কক্সবাজার নগরীর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৫-৩০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী-কক্সবাজার-টেকনাফ আরবান করিডোরটিতে দ্রুত নগরায়ণ হবে। এখন থেকেই এই অঞ্চলে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে। এখন প্রয়োজন অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা। আশা করছি আমরা সেটি করব। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব ইনশা আল্লাহ।
অধ্যাপক প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ একজন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাবিদ। সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রোভিসি এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। ১৯৯৫ সালে প্রণীত চট্টগ্রাম নগরীর মাস্টারপ্ল্যান এবং ২০০৮ সালে প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান প্রণয়নের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক হিসেবে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার হেলথি সিটি প্রকল্পেও বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের বর্তমান সভাপতি এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।