যেকোনো নির্মাণকাজে ইটের ব্যবহার চলে আসছে আবহমানকাল থেকে। কাঁচা ইট, পোড়ামাটির ইট, কংক্রিট ব্লক বা কাচের ইটের কথাও আমরা জানি। কিন্তু ইটের এই পরিচিত গণ্ডির বাইরেও এখন নিত্যনতুন উপাদান ও পদ্ধতির সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে ইট। মানুষের আবিষ্কারের যেন শেষ নেই। প্রকৃতির প্রতি সচেতনতা মানুষকে আরও নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য অনুপ্রাণিত করছে প্রতিনিয়ত। আগে নির্মাণ উপকরণ তৈরিতে মূলত স্থায়িত্ব ও ব্যয়ের দিকটাই ভাবা হতো বেশি। এখন এর পাশাপাশি সেটা যেন পরিবেশবান্ধব হয়, সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে বিভিন্ন বর্জ্য থেকে ইট উৎপাদন করতে চাওয়া এমনই একটি ধারণা। জৈব-ইট উৎপাদনের এই অভিনব পদ্ধতির ধারণা নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি কোম্পানিই। বায়োম্যাসন (Biomason) নামক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই স্টার্ট-আপ কোম্পানিটি সম্প্রতি ক্র্যাডল টু ক্র্যাডল প্রোডাক্ট ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ (Cradle to Cradle Product Innovation Challenge)-এর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া থেকে জৈব-ইট উৎপাদনের পদ্ধতির জন্য প্রথম স্থান অর্জন করেছে।
বায়োম্যাসনের উদ্ভাবিত পদ্ধতি হচ্ছে মাইক্রো-অর্গানিজম ব্যবহার করে কোনো সামগ্রী উৎপাদন। নির্মাণশিল্পের চারটি চিরায়িত প্রধান উপাদান হচ্ছে কংক্রিট, স্টিল, কাচ আর কাঠ। এগুলোরই প্রাকৃতিক উৎস কিন্তু সীমিত আর এগুলোর পেছনে ব্যয়িত শক্তিও নেহাত কম নয়। বায়োম্যাসনের মতে, ‘২০০৮ সালে বিশ্বে প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন টন সিমেন্ট উৎপাদিত হয়েছে। এর কারণে পরিবেশে প্রায় সমপরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইডও নিঃসরণ হয়েছে।’ শক্তিবহুল নির্মাণ প্রক্রিয়া, কাঁচামাল সংগ্রহের ঝক্কি, পরিবহন, জ্বালানি ইত্যাদি সব মিলিয়ে নির্গত বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইডের শতকরা ৪০ ভাগের জন্যই আসলে এই নির্মাণশিল্প কোনো না কোনোভাবে দায়ী।
একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেন, ক্যালসিয়াম আর পরিপোষকের সাহায্যে পরিবেষ্টিত তাপমাত্রায় পাঁচ দিনেরও কম সময়ে প্রাকৃতিক জৈব-সিমেন্ট উৎপন্ন করতে পারে। বায়ো-সিমেন্টের কাঁচামাল হচ্ছে সস্তা ও পরিত্যাক্ত বর্জ্য বা আবর্জনা। এটি উৎপাদনে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন নেই, স্বাভাবিক পরিবেষ্টিত তাপমাত্রাতেই এর উৎপাদন সম্ভব। এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পানি চক্রবদ্ধ পদ্ধতিতে বারবার করা যায়। এ ছাড়া পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের থেকে জৈব-সিমেন্ট গঠনের প্রক্রিয়াটিও ভিন্ন। সম্প্রতি সামুদ্রিক পানি ব্যবহার করেও সাফল্য পাওয়া গিয়েছে। সামুদ্রিক পানির উৎস অফুরন্ত আর এর ব্যয়ও যৎসামান্য।
হয়তো খুব শিগগিরই আপনার বাড়ির ইট কারখানার চুল্লিতে পোড়ানোর বদলে এমনি কাদামাটির ছাঁচেই তৈরি হবে। অন্তত বায়োম্যাসনের দাবি সেটাই বলে। প্রাকৃতিক অণুজীব আর রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে উৎপন্ন জৈব-সিমেন্ট এবং ব্যাকটেরিয়ার উপজাত থেকে উৎপাদিত জৈব-ইট এই দুইয়ের সমন্বয় মজবুত বাড়ি তৈরির জন্য যথেষ্ট।
জৈব-ইট তৈরির সব কাঁচামালই পরিত্যক্ত বর্জ্য যথা- প্রক্রিয়াজাত আবর্জনা এবং বর্জ্য থেকে সংগৃহীত দ্রব্য। যেমন- ইউরিয়া, লবণ আর ঈস্টের বিক্রিয়ায় জন্মানো ব্যাকটেরিয়া। পরিবেষ্টিত তাপমাত্রায় জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া পাঁচ দিনেরও কম সময় নেয়। উৎকর্ষতা এবং খরচের কথা ভাবলে এটি সাধারণ নির্মাণ ইটের থেকে বেশ ভালো। সাধারণ নির্মাণ ইট কাদামাটি মথে, ছাঁচের সাহায্যে নির্দিষ্ট আকৃতি দিয়ে চুল্লিতে পোড়ানো হয়, যা কি না প্রচুর দূষিত পদার্থের নির্গমন ঘটায়, এতে প্রচুর জ্বালানি পোড়ে, যার কারণে কার্বন নিঃসরণও হয় প্রচুর পরিমাণে। সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ইট উৎপাদিত হয়, যা কিনা ৮০০ মিলিয়ন টনের মতো কার্বন নিঃসরণ করে। জৈব ইট তৈরির ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। এমনকি সমুদ্রের লোনা পানি ব্যবহার করেও এর উৎপাদন সম্ভব। তাই যেসব অঞ্চলে পরিষ্কার পানির সংকট রয়েছে বা এমন পানি ব্যয়বহুল, সেখানেও সহজেই সামুদ্রিক পানি ব্যবহার করে জৈব-ইট উৎপাদন সম্ভব। তাই জৈব-ইট অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়ের দিক থেকে অনেকটাই সাশ্রয়ী।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারোলিনাস্থ বায়োম্যাসন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জিনজার ক্রেইগ ডোসিয়ার একটি নতুন ধরনের ইট তৈরির প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। তিনি তাঁর তৈরি এই ইটের নাম দেন জৈব-ইট। এই ইট তৈরির পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে সেটি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণাটি এতক্ষণে পেয়ে গেছেনÑ প্রাকৃতিক অণুজীব আর রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে। আক্ষরিক অর্থেই এটি ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে উৎপাদিত হয় ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, বালু আর মূত্রের মিশ্রণে! এটি তৈরিতে কোনো চুল্লির প্রয়োজন নেই, বদ্ধ কক্ষের তাপমাত্রাতেই উৎপাদন সম্ভব।
এই জৈব-ইট তৈরির প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মাইক্রোবায়াল-ইনডিউসড প্রিসিপেশন’ বা সংক্ষেপে এমআইসিপি (Microbial-Induced precipitation-MICP)। এমআইসিপির সময়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া বালুর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাগুলোকে আঠার মতো একসঙ্গে আটকে দেয়। এই রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয় ইউরিয়া ও সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লবণ এবং ঈস্টের মিশ্রণের সাহায্যে। এর ফলে যে ইট তৈরি হয়, সেটা অনেকটা বেলে পাথরের মতো। এই জৈব-ইট মার্বেলের মতোই শক্ত। ডোসিয়ারের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াতে পাঁচ দিনের চেয়েও কম সময় প্রয়োজন।
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, অবশেষে ডোসিয়ার একটি কার্যকর পদ্ধতি গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান বায়োম্যাসন ছোট আকারের ক্ষুদ্র জৈব-ইট উৎপাদন করতে পাওে, যেটাকে ডোসিয়ার লেগো-সাইজড (Lego-Sized) বলে অভিহিত করেন। যা হোক, এখন এটি নির্মাণকাজে উপযুক্ত আকারের করে উৎপাদনের সময় এসেছে আর বায়োম্যাসন কোম্পানি সেটি করার জন্যই গঠিত হয়েছে। এই লেগো-সাইজড জৈব-ইট উৎপাদন করতে এক সপ্তাহের মতো সময় লাগে, বড় মাপের নির্মাণকাজের উপযোগী ইটও এ রকম সময়ের মধ্যেই উৎপাদন সম্ভব হবে বলেই অনেকের ধারণা। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন নির্মাণশিল্পে জৈব-ইটের ব্যবহার সম্ভব হবে। আর এটি একটি পরিবেশবান্ধব কার্যকরী আগামীর নির্মাণ অনুষঙ্গ হিসেবে জনপ্রিয় হবে, এটিই এর উদ্ভাবকের প্রত্যাশা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।