ঢাকার আবাসিক এলাকা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

নগরপরিকল্পনা, নগরায়ণ, ভূমির ব্যবহার, রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্টের বিষয়গুলো মানুষের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সম্প্রতি। অথচ কিছুদিন আগেও এ বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে তেমন করে কেউ ভাবেনি। আবাসিক এলাকাতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিষয়টি নিয়ে শুরুতেই হয়েছে বিস্তর আলোচনা। বিষয়টির বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা শেয়ার করতে চাই মূল বিষয়বস্তুকে বোঝাতে। বন্ধু বা পরিচিতজনরা যখনই নিজের স্থপতি কিংবা ডেভেলপার পরিচয় পায়, মন্তব্যের আক্রমণ শুরু হয়ে যায় আপনারা তো শহরটা শেষ করে দিচ্ছেন বিল্ডিং নির্মাণ করে। একবারও ভাবতে চান না কী বিশাল কর্মযজ্ঞ করে এতগুলো মানুষকে ঢাকায় থাকার উপযুক্ত আধুনিক পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন এই উদ্যোক্তারা। সময়ের বিবর্তনে মানুষের চাহিদা কতটা এ খাতে বেড়েছে কোনো ধারণাই হয়তো নেই মন্তব্যকারীর।

ঢাকার বাস্তব কিছু চিত্র

একই ভবনে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আছে সুপারশপ, বিউটি পার্লার, সেলুন, গোডাউন, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, স্টেশনারি দোকানসহ বাণিজ্যিক অনেক প্রতিষ্ঠানই। ভবনের ওপরে আবাসিক বসতি। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলে এর চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা রয়েছে গোটা রাজধানীজুড়ে। এক কথায় বললে, আবাসিক চরিত্র হারিয়েছে ঐতিহ্যের এই মহানগরী। এখন গোটা শহরই যেন বাণিজ্যকেন্দ্র। মানুষের বসবাস আর ব্যবসায়িক স্বার্থে যথেচ্ছ ব্যবহারে সবকিছুই মিলেমিশে একাকার। পুরো শহর ঘুরেও বোঝার উপায় নেই কোনটি আবাসিক আর কোনটি অনাবাসিক এলাকা। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) বলছে, বিশ্বে বসবাস অযোগ্য নগরীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ঢাকা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের ‘বৈশ্বিক বসবাস উপযোগিতা জরিপ-২০১২’-এর ফলাফলে বসবাসের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে অযোগ্য শহর হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকার নাম। কেন এমন হলো? এ তো হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, আমাদের নগর পরিকল্পনার গোড়াতেই ১০০ শতাংশ আবাসিক এলাকা নামক ধারণাটিকে কেন্দ্র করে যে নগর পরিকল্পনা করা হয়েছিল সময়ের বিবর্তনে আজ তা অকেজো বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশুদ্ধ আবাসিক এলাকা উন্নয়নের ধারণাটি এখন সেকেলে হিসেবে বিবেচিত। ব্যাপারটিকে এখন নিরুৎসাহিত করা হয়; অন্ততপক্ষে ৩০ শতাংশ প্লটের অনাবাসিক-মিশ্র ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়। তবে সেসব ব্যবহার অবশ্যই আবাসিক ব্যবহারের সঙ্গে পরিপূরক হতে হবে। আধুনিক নগর-পরিকল্পনার স্মার্ট সিটি, টিওডি ইত্যাদি ধারণাও মিশ্র ভূমি ব্যবহারের কথা বলে। কিন্তু কারণটা কী? মোটরগাড়ি শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত বিশ্বে একসময় ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর শহর তৈরি হলো। ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘একক-কার্যভিত্তিক (mono-functional)’ এলাকা গড়ে তোলার মাধ্যমে নগর-পরিকল্পনা করা হতো। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন, কেনাকাটার মার্কেট, বাজার, শিল্প, প্রাতিষ্ঠানিক ভবনকে প্রতিটি এলাকাভিত্তিক আলাদা করে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন করা হতো। ফলে মানুষের আবাসিক এলাকা তার কর্মক্ষেত্র, সামাজিক ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য কাজের জায়গা থেকে আলাদা হতে থাকে। প্রতিদিনের কাজ করতে মানুষ ক্রমেই সড়ক ও গাড়ি নির্ভর হয়ে পড়ে।

অধুনা উন্নত বিশ্বের শহরগুলো মিশ্র ভূমি ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা করছে। গণপরিবহন, পথচারীবান্ধব নিরাপদ ফুটপাত, সামাজিকভাবে দেখা করার স্থানসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করার মতো পরিকল্পনা থাকছে তাদের নগর ভাবনায়। কোনো কোনো শহরে আইন করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অনাবাসিক ভূমি ব্যবহারের কথা বলা হয়। সেই পরিমাণটি ওই শহরের স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। পরিকল্পনায় পরস্পর পরিপূরক এমন ধরনের ভূমি ব্যবহারগুলোকে কাছাকাছি রেখে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করাকে উৎসাহিত করা হয়। এতে গাড়ি ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা কমে এবং নগরকে পথচারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন করা হয়। বর্তমানে পথচারীবান্ধব শহর, জ্বালানিসাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা, মিশ্র ভূমি ব্যবহার ইত্যাদি স্মার্ট সিটির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আবাসিক এলাকায় অননুমোদিত ভূমি বা ভবন ব্যবহার বন্ধ হোক, এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী জনগণের কিছু সামাজিক ও নিত্যদিনের প্রয়োজন আছে, যা ওই এলাকায় স্থানীয়ভাবেই মেটাতে হবে। আবাসিক এলাকায় পরস্পরের পরিপূরক ভূমি ব্যবহারগুলোকে কাছাকাছি রেখে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করাকে আধুনিক নগর-পরিকল্পনায় উৎসাহিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণা জার্নালে এ বিষয়ে, বিশেষত ধানমন্ডির বিষয়ে গবেষণালব্ধ যেসব ফলাফল এসেছিল, তার মধ্যে নিচের বিষয়গুলো ধর্তব্য-

ধানমন্ডি যখন আবাসিক এলাকা

১৯৫০ সালে গণপূর্ত বিভাগ ৫০০ একর জমির ওপর উচ্চবিত্তদের আবাসনের জন্য ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ১ হাজার ৮৫টি প্লট তৈরি করে। মূলত সরকারি আমলা, মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশাজীবীকে এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। শুরুতে এক বিঘার একেকটি প্লটের সামনে বাগানসহ দোতলা বাড়ির কথা বিবেচনা করে এই আবাসিক এলাকা ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের বসবাসের জন্য পরিকল্পনা করা হয়। সেখানে ৬১ শতাংশ ভূমি আবাসিক প্লট, ৯ দশমিক ২ শতাংশ লেক, ৯ দশমিক ২ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান, ১৮ শতাংশ রাস্তা, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ মসজিদ এবং ৪ দশমিক ২ শতাংশ স্কুলের ব্যবস্থা রেখে পরিকল্পনা করা হয়। সে সময় অন্যান্য সামাজিক সুযোগ-সুবিধা অথবা প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদা অনুয়ায়ী কেনাকাটা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এখানে বিবেচনায় আনা হয়নি। বিশুদ্ধ আবাসিক এলাকার এই ধারণা বর্তমানে অচল, একে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ, এতে সোশ্যাল সেগ্রিগেশন বাড়ে, বৈষম্য তৈরি হয়, শহরের রাস্তার ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

প্রথমত, দফায়-দফায় সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার প্লট বিভক্ত হয়েছে। বেশির ভাগ এক বিঘার প্লট ভাগ হয়ে পাঁচ কাঠার প্লটে পরিণত হয়েছে, ইমারতের উচ্চতা দুই তলা থেকে ছয় তলায় রূপান্তরিত হয়েছে। এতে এলাকায় পরিবারের সংখ্যার পাশাপাশি আনুপাতিক হারে বেড়েছে জনসংখ্যাও। কিন্তু গণপরিসর ও নাগরিক সুবিধা আনুপাতিক হারে বাড়েনি বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। আজ ধানমন্ডির দেড় লাখ মানুষের জন্য আইনত যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা আছে, যা ২০ হাজার মানুষের জন্য ছিল।

দ্বিতীয়ত, কোনো গবেষণা ছাড়া এলাকার সত্যিকার চাহিদা নিরূপণ না করে সাতমসজিদ রোড, মিরপুর রোড, ২৭ নম্বর রোড ও ২ নম্বর রোডের প্লট কোনো ধরনের ‘নীতিমালা’ ছাড়াই বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে ঘোষণা করার ফলে এমন ধরনের ভূমি বা ভবন ব্যবহার করা হয়েছে, যা আবাসিক এলাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভূমি বা ভবন ব্যবহারের ধরন এমন যা এখানে শহরের অন্যান্য এলাকা থেকেও মানুষ ও গাড়ি আসতে উৎসাহিত করে। এই রাস্তাগুলো ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি গাড়ি বহন করে। প্রধান সড়কে দেখা যায় ৫৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ গাড়ি এলাকার বাইরে থেকে আসে।

তৃতীয়ত, একটা গবেষণা বলছে, ৪০ দশমিক ৬৮ শতাংশ প্লটে পার্কিং থাকলেও তা অনুমোদিত পার্কিংয়ের তুলনায় কম, পার্কিংয়ের স্থান বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয়। শুধু ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ প্লটে বেসমেন্ট পার্কিং আছে আর ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ প্লটের আইনসম্মত পার্কিং ছিল না।

নগর-পরিকল্পনার সূচক ও ড্যাপের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য কমপক্ষে দুই বা সর্বোচ্চ তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজন হবে। সুতরাং ধানমন্ডি এলাকায় ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী দেড় লাখ মানুষের জন্য শুধু স্থানীয় প্রয়োজন মেটাতে ২৪ থেকে ৩৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় দরকার।

ঢাকা শহরের জন্য যে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) করা হয়েছে, সেখানে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের চাহিদার কথা চিন্তা করে বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ বা জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান, উপাসনালয় ও নাগরিক সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তালিকাও রয়েছে। এমনকি কোন ধরনের সুবিধা কী পরিমাণে রাখতে হবে তা জনসংখ্যার অনুপাতে সূচকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এর জন্য ভূমি বা ভবন ব্যবহার কত বর্গমিটার হবে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের প্রণীত ‘বেসরকারি আবাসিক এলাকার ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা-২০০৪’-তে এবং সেখানকার সর্বোচ্চ জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, উন্মুক্ত স্থান, বাসিন্দাদের কেনাকাটার স্থান ইত্যাদির সূচকসহ তফসিল করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি আবাসিক এলাকা ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। বর্তমান বাস্তবতা ও আধুনিক নগর-পরিকল্পনার ধারণা বিবেচনায় নিয়ে আবাসিক এলাকাগুলোর ভূমি ও ভবন ব্যবহারের জন্য পেশাজীবীদের পরামর্শে নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

সংকটে ঢাকার আবাসন

রাজধানী ঢাকায় এখন রয়েছে তীব্র আবাসনসংকট। ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যার ১ কোটি ৩০ লাখ। তাদের ৮০ শতাংশের নেই নিজস্ব বাড়ি। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। ২০০১ সালে ঢাকার জনসংখ্যার গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৯ শতাংশ। প্রতি বছর ঢাকা মহানগরে যোগ হচ্ছে পাঁচ লাখেরও অধিক নতুন মুখ। প্রতি বছর ঢাকা শহরে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না আবাসনব্যবস্থা। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, রাজউক ও বেসরকারিভাবে যে আবাসনব্যবস্থা করা হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এক পরিসংখ্যান মতে, ঢাকার রাস্তায় রাত কাটায় প্রায় ৫০ হাজার বাস্তুহারা মানুষ। বাসস্থান, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ নানা সমস্যার মূল কারণ এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। জনসংখ্যাবিদেরা ধারণা করছেন, চলতি ২০১৬ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। তখন ঢাকা পৃথিবীর চতুর্থ ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে পরিণত হবে।

আসলে আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সবকিছুই স্বল্পমেয়াদি করতে চাই। ঢাকার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল একটি সুন্দর পরিকল্পিত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নগরের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যায়। আবার নগরের ওপর চাপ কমাতে আরও বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, যেগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ নগরী করে থাকে।

নগরের যানজট কমাতে আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ নগরীগুলোতে কিন্তু সাবওয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিল্লিতে সাবওয়ে চালু হয়েছে। কলকাতার মতো শহরে দশ-পনেরো বছর আগে থেকেই সাবওয়ে চালু আছে। ঢাকার মাটি সাবওয়ের জন্য খুবই উপযুক্ত। জাইকা আমাদের এখানে সাবওয়ে করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল।

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে মহাখালী পর্যন্ত যে লাইনটা রয়েছে, এটার নিচে আমরা সাবওয়ে নির্মাণ করতে পারতাম। সবচেয়ে ভালো জায়গা ছিল এটি। কিন্তু দেখা গেছে আমরা ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণ করে ফেলেছি।

দ্বিতীয় যে পদক্ষেপ নেওয়া আমাদের জন্য জরুরি ছিল তা হলো, কমিউটার ট্রেন সার্ভিসকে প্রমোট করা। তার মানে ঢাকার আশপাশের শহরগুলো যেমন, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গাজীপুর শহরে বৃত্তাকারে কমিউটার সার্ভিস চালু করা। এর জন্য আমাদের কিন্তু যথেষ্ট ভালো অবকাঠামো আছে। তার মানে, রেললাইন তো আছেই। তাই খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হতো না। শুধু ট্রেনের সার্ভিসটা আরেকটু উন্নত করলেই হতো। কোথাও কোথাও ডাবল লাইন করে দিলেই হতো।

ঢাকায় এখন ভাসমান জনগোষ্ঠী বাড়ছে, এ জন্যই যে এখানে ভালো মানের কমিউটার সার্ভিস নেই। তাই লোকে যেকোনো মূল্যে এ নগরীর মধ্যেই নিজের ঠিকানা গড়তে সচেষ্ট হচ্ছে। এসব আলোচনা এবং পরিসংখ্যান এটাই প্রমাণ করে, বিশুদ্ধ আবাসিক এলাকা (অর্থাৎ কোনোই বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই সে রকম এলাকা) আধুনিক প্রযুক্তির যুগে একটি অচল ধারণা। কেননা, শুধু গাড়িকেন্দ্রিক এলাকা নয়, হাঁটা দূরত্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার সুবিধাসংবলিত এলাকাই এখন কাম্য এবং সে জন্য ভূমি এবং দালানের মিশ্র পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলা এখনকার চরম বাস্তবতা। আমাদের পরিকল্পনা সে ধারাতেই এগিয়ে নিতে হবে। মেগা সিটি নিউইয়র্ক, প্যারিস, রোম, লন্ডনের নগর পরিকল্পনা এরই নগদ দৃষ্টান্ত।

নগরের আবাসন সংকুলান করতে গিয়েও আমরা মানুষের কল্যাণের দিকটি চরমভাবে উপেক্ষা করছি। নগরের মধ্যে এবং শহরের কাছে স্থানে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্লটভিত্তিক উন্নয়ন করায় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ কমছে। এ ধরনের আবাসিক এলাকায় কাছাকাছি বাজার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, অফিস না থাকায় দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এ ছাড়া বিনোদনের সুবিধা ও মানুষের মেলামেশার জন্য উন্মুক্ত স্থান না থাকায় পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়।

একটি বসবাসের উপযোগী নগরী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন:

মিশ্র এলাকা

মিশ্র এলাকা একটি শহরের জন্য উত্তম। আমাদের মনে রাখতে হবে মানুষের মূল উদ্দেশ্য যাতায়াত নয় বরং দ্রব্য ও সেবা প্রাপ্তি। এসব সুবিধা বাসস্থানের খুব কাছাকাছি পাওয়া গেলে আমাদের যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা কমবে, এর ফলে অবকাঠামো গঠনের সময় আমরা রাস্তাঘাট নির্মাণের থেকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে পারব। উপরিউক্ত সুবিধাগুলো নগর পরিকল্পনায় সমন্বিত করার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি একটি আন্তরিক, পরিবেশবান্ধব বসবাসের উপযোগী শহর গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের দেশের নগরগুলোর অধিকাংশ এলাকা মিশ্র ব্যবহারভিত্তিক। এখানে খুব অল্প দূরত্বেই প্রায় সব নাগরিক সুবিধাদি পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের বর্তমান নগর পরিকল্পনা বা পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষ করে ঢাকায় ক্রমেই এই সুবিধাটুকু নষ্ট হচ্ছে। মানুষ ক্রমেই বেশি দূরত্বে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে যানজট।

ঢাকা শহরের কর্মকাণ্ডকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ১৩টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। কোন জোন কী কাজে ব্যবহৃত হবে, সেটিও নির্ধারণ করার চেষ্টা হচ্ছে। কোনটি আবাসিক কোনটি আবার বাণিজ্যিক। শহরেরে কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য জোন ভাগ করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রতিটি জোনের জন্য কী কী সুবিধা থাকা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা কঠিন। তারপরও কিছু বিষয় বা উপাদান রয়েছে, যেগুলো মানুষের বসবাসের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয়। যেমন-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাজার, বিনোদন, আবাসন, কর্মসংস্থান ইত্যাদি। প্রতিটি জোনে অল্প দূরত্বে এসব সুবিধা থাকলে যাতায়াতের চাহিদা কমবে। এদিক থেকে ঢাকা শহরের কাঠামোটি ইতিবাচক। তবে সমস্যা হলো ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। শহরে কোনো একটি এলাকায় গড়ে উঠছে ভালো ভালো শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, বাজার, অফিস, বিনোদনকেন্দ্র। শহরের প্রতিটি জোনে প্রয়োজনের ভিত্তিতে এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যা যানজট নিয়ন্ত্রণ করবে এবং যাতায়াতের চাহিদা কমায় মানুষ অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে মুক্তি পাবে।

গণমুখী নগর পরিকল্পনার স্বার্থে কতিপয় সুপারিশ

  • নগর পরিকল্পনায় মিশ্র এলাকা গড়ে তোলার ওপর মনোযোগ দিতে হবে। যেমন-আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, বাজার, কর্মস্থল, বিনোদন ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা যেন কাছাকাছি দূরত্বে থাকে
  • ঢাকার জলাধারগুলো সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে
  • জলাবদ্ধতা নিরসনে রিটেনসন পন্ড রাখার ব্যবস্থা করতে হবে
  • পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য অপসারণে বা ট্রিটমেন্ট প্লান্ট তৈরি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে
  • নাগরিকদের বিনোদনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ উন্মুক্ত পরিসরের ব্যবস্থা করতে হবে
  • নগরের পরিবহন পরিকল্পনায় পায়ে হাঁটাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে এবং পথচারীদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই সব অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা সংস্কার করতে হবে
  • ঢাকার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যান্য শহরগুলোর উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।

স্থপতি মোহাম্মদ আল আমিন
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top