ইতালির ফ্লোরেন্স শহর থেকে মাত্র ২০ মিনিট দূরত্বে রেগেলো মিউনিসিপ্যালিটির ছোট্ট এক গ্রাম লেসিও। এই লেসিও গ্রামেই রয়েছে এক অনন্য সুন্দর প্রাসাদ আর প্রাসাদবাগান। ওকগাছের বনবেষ্টিত পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত সামেজান ক্যাসল (Sammezzano Castle) যেন রূপকথার রাজ্য থেকে উঠে আসা চমৎকার এক স্থাপত্য। প্রাসাদটিকে ঘিরে রয়েছে বর্ণিল রং, নান্দনিক ডিজাইন, শৈল্পিকতা, যা স্থাপনাটিকে করে তুলেছে রহস্যময়।
এই অপূর্ব সুন্দর নান্দনিক প্রাসাদটি নির্মিত হয় ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে! প্রাসাদটির বর্তমান যে রূপ তার জন্য অবশ্য ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচি জিমেন্স এরাগনা নামক সম্ভ্রান্ত স্প্যানিশ পরিবারের মহৎ ব্যক্তিটির ধন্যবাদ প্রাপ্য। ১৮৪৩ থেকে ১৮৮৯ সাল, এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই প্রাসাদটিকে বিভিন্ন রং আর রহস্যময় প্রতীকের ব্যবহার করে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন। সব মিলিয়ে প্রাসাদটি হয়ে ওঠে মুরিশ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
রোমান সাম্রাজ্য থেকেই প্রাসাদটির অস্তিত্ব ছিল। মধ্যযুগে রেনেসাঁ বিপ্লবের সময়ে এই এস্টেটটির বেশ কয়েকবার মালিকানা বদল হয়। বেশ কটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের হাত বদলে এটি শেষ পর্যন্ত ‘দ্য মেডিসি’ পরিবারের হাতে আসে। পরে দ্য মেডিসি পরিবার এস্টেটটি জিমেন্স এরাগনা পরিবারের কাছে বিক্রি করে। জিমেন্স পরিবারের সর্বশেষ প্রতিনিধি ফার্দিনান্দ ১৮১৬ সালে মৃত্যুবরণ করলে ফার্দিনান্দের সব সম্পত্তি, উপাধি ও খ্যাতির উত্তরাধিকার হন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচি। ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচি হচ্ছেন বর্তমান সামেজান ক্যাসলের রূপকার। ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচি ছিলেন সে সময়ের একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। অন্য বুদ্ধিজীবীদের মতোই ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচির অকৃত্রিম ও ব্যতিক্রমী যেকোনো কিছুর প্রতিই ছিল সীমাহীন আগ্রহ। বলা যায়, তাঁর এই আগ্রহই সামেজান ক্যাসলকে স্থাপত্যের এক অনিন্দ্য উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলেছে। ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচির মৃত্যুর পরে প্রাসাদটির ইতিহাস তেমন সুখকর নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাসাদটি বেদখল হয়ে যায়। পরে সত্তরের দশকে এটিকে বিলাসবহুল হোটেল এবং রেস্তোরাঁ হিসেবে চালু হয়। একসময় এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। পরিত্যক্ত অবস্থায় প্রাসাদটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৯৯৯ সালে এক অ্যাংলো-ইতালীয় কোম্পানি এটি কিনে নিয়ে এর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে। সংস্কারকাজ শেষেও প্রাসাদটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে এর দেখভালের জন্য ২০১২ সালের এপ্রিলে একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির নাম রাখা হয় FPXA, যা কি না Ferdinand Panciatichi Ximenes dOAragona-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
সামেজানা প্রাসাদটি মুরিশ স্টাইলের জটিল নকশা সমন্বিত শ্বাসরুদ্ধকর রং আর প্যাটার্নের অপূর্ব মিশেল। প্রাসাদটিতে আছে ৩৬৫টি কক্ষ, বছরের প্রতিটি দিনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কক্ষ। আর প্রতিটি কক্ষই একটি আরেকটি থেকে রং, নকশা ও অন্দরসজ্জায় আলাদা! এমনকি প্রতিটি কক্ষের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা নাম। যেমন পিক্ক রুম মানে ময়ূরকক্ষে প্রবেশ করলে আপনি দেখতে পাবেন অসম্ভব সুন্দর রং আর জ্যামিতিক নকশার সমাহার। আবার যেটির নাম হোয়াইট রুম সে কক্ষে প্রবেশ করলে আপনার জন্য রয়েছে মরক্কোর সাদা মোজাইকের চোখ ধাঁধানো রূপ। সিলিং থেকে নেমে আসা মোমের ঝাড়বাতি, আয়নামহল, স্মোকিং রুমের অষ্টভুজাকৃতি, দ্য হল অব লিলি, দ্য স্টেলেকটাইটস, দ্য লাভারস এমনকি একটি ছোট চ্যাপেলও আছে আপনাকে মুগ্ধ করার জন্য। এর ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে একের পর এক লুকানো ঘুলঘুলি, কর্নার, কলাম, গোলকধাঁধা, খিলান, ভল্ট আর গম্বুজ। খিলানপথের ওপরে খোদাই করা নান প্লাস আল্ট্রা (“No Plus Ultra”) ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘এর পরে আর কিছুই নেই’ যা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে গ্রিক মিথোলজির সেই সমতল পৃথিবীর ধারণা, যেখানে স্থপতি আক্ষরিক অর্থেই এর দর্শনার্থীদের এক অপার্থিব সৌন্দর্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চেয়েছেনÑ এর পরে আর কিছুই দেখার প্রয়োজন নেই!
সামেজান ক্যাসলের চারপাশে রয়েছে সাড়ে চার শ একরের বিশাল এক পার্ক। পার্কটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত। ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচি তাঁর এই প্রাসাদের চারপাশের কৃষি ভূমি আর ওকগাছের বনটিকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি অসংখ্য বিজাতীয় গাছ রোপণ করেছিলেন, সে সঙ্গে মুরিশ স্টাইলে বিভিন্ন স্থাপত্যের উপাদানও এনেছিলেন। যেমন সেতু, কৃত্রিম গুহা, ভেনাস দেবীর মূর্তি, কয়েকটি খাল, ঝরনা এবং টেরাকোটার তৈরি সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন জিনিস। দুর্ভাগ্যক্রমে ফার্দিনান্দ প্যান্সিয়াতিচির সেই স্বপ্নের উদ্যান বেশি দিন টেকেনি। সে সময়ে রোপণকৃত গাছের খুব সামান্যসংখ্যকই এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে। অবশ্য এসব বিরল প্রজাতির গাছগুলোকে রক্ষার জন্য রয়েছে একটি প্রকল্পও। উদ্যানবিদেরা পার্কের সেই হারানো জৌলুশ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন নিরন্তর। অবশ্য এখনো এই পার্কটিতেই রয়েছে ইতালির সর্ববৃহৎ সেকুয়া বৃক্ষের সারি (মোট ৫৭টি সেকুয়া, যার সবগুলোই ৩৫ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচু)।
পার্কের মধ্য দিয়ে ১৫০০ মিটার দীর্ঘ উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা ধরে হেঁটে যে কেউ প্রাসাদে পৌঁছাতে পারে। এই অপূর্ব সৌন্দর্যের আধার যে প্রাসাদ আর তার উদ্যান, সেটি অবশ্য বিশেষ উপলক্ষ্য ব্যতীত সর্বসাধারণের জন্য খোলা হয় না। সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রাসাদটি পরিত্যক্ত অবস্থাতেই আছে। এখানে কোনো বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ নেই! এই মুহূর্তে যদিও সর্বসাধারণের জন্য এটি উন্মুক্ত নয়, তবুও এর কমিটি মালিকের সঙ্গে সমঝোতা করে মাঝে মাঝে দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রাসাদটির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অবশ্য একটি বিকল্প উপায় আছে! আপনি চাইলে ইউটিউবে ইতালিয়ান ব্যান্ড dolcenera-এর “Ora o mai piu,”এই গানটি সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন। গানটির শ্যুটিং যে এখানেই হয়েছিল!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।