নিরাপদ নিরাপত্তায় সিসিটিভি

আধুনিক সমাজে সিসিটিভি ক্রমেই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে গত এক দশকে। এখনকার সমাজব্যবস্থায় সহজেই কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন। স্থপতিরা বাড়ির ডিজাইন করেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা করেন ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং। কিন্তু মানবসৃষ্ট অনৈতিক অপরাধ ঠেকানো তো স্থপতি কিংবা ইঞ্জিনিয়ারের কাজ নয়। অপরাধ আটকানো স্থপতি বা ইঞ্জিনিয়ারের কাজ নয় বলে আগে থেকেই ক্যামেরা বা ডিজিটাল আই-এর ওপর নির্ভরশীল মানুষ। এখনকার স্থপতিরা এখন সিসিটিভি কীভাবে, কোথায় বসাবেন এমন ড্রয়িংও করছেন, যা ১০ বছর আগেও ভাবা যেত না। এখন সিসিটিভি ছাড়া একটা রাস্তা তো বাদ দিন, একটা বাড়িও কল্পনা করা যায় না। চোখের অলক্ষ্যে ঘটিত অপরাধ ঠেকাতে এই সিসিটিভি। না, সিসিটিভি অপরাধীকে আটকাবে না। অপরাধী অপরাধ করলে সিসিটিভিতে থাকবে তার সব রেকর্ড। অপরাধ করার পর অপরাধীকে খুঁজে পাওয়া যাবে সহজেই। আর এ কারণেই সিসি ক্যামেরা বা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা অনেক বেশি জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক এখন।

সিসিটিভি কী?

সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবহার আমাদের দেশে শুরু হয়েছে ১০-১৫ বছর আগে। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ায় আরও আগে থেকেই এটি প্রচলিত। সেকালের সিসিটিভি ক্যামেরা সাদা-কালো। সাদা-কালো ক্যামেরায় অল্প আলোয় পরিষ্কার ছবি দেখা গেলেও রং বোঝা যেত না। আর তাই অন্ধকার পরিবেশে রংহীনতায় অপরাধী শনাক্ত করা  কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বাজারে আসে রঙিন ক্যামেরা। বর্তমানে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে অনেক কম আলোতেই ডিজিটালাইজড রঙিন ক্যামেরায় পরিষ্কার ছবি দেখতে পাওয়া যায়। ফলে এখন আর সাদা-কালো সিসিটিভি ক্যামেরা বা সিস্টেম বাজারে নেই। তবে আপনি চাইলে রঙিন সিসিটিভির আউটপুট সাদা-কালো সিস্টেমে নিতে পারেন। আপনার ইচ্ছে এটি। বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী দুই ধরনের সিসিটিভি মনিটরিং সিস্টেম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। স্ট্যান্ড অ্যালোন এমবেডেড ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার)-সংবলিত সিসিটিভি মনিটরিং সিস্টেম এবং পিসি বেইজড সিসিটিভি মনিটরিং সিস্টেম। ব্যবহারের ভিন্নতার কারণে বর্তমানে রঙিন সিসিটিভি ক্যামেরা হয় নানা ধরনের। যেমন- ডিজিটাল ক্যামেরা, ডোম ক্যামেরা, হিডেন ক্যামেরা, স্পাই ক্যামেরা, স্পিড ডোম পিটিজেড ক্যামেরা, ডে-নাইট ক্যামেরা, জুম ক্যামেরা, ভেন্ডাল প্র“ফ ক্যামেরা এবং আইপি ক্যামেরা। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত সিসিটিভি নিয়ে হচ্ছে গবেষণা।

সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরা

যে জায়গাটি সিসিটিভি সিস্টেম দ্বারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে প্রচার করার প্রয়োজন, সেই জায়গায় নরমাল ক্যামেরা লাগানো হয়। যাদের বডি ক্যামেরা বা বক্স ক্যামেরাও বলে। সাধারণত রাস্তাঘাট, কলকারখানা, ব্যাংক-বীমাসহ অন্য সব অফিসে প্রকাশ্যেই এসব ক্যামেরা লাগানো হয়। এ জাতীয় ক্যামেরায় প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের লেন্স (স্ট্যান্ডার্ড লেন্স, ওয়াই অ্যাঙ্গেল লেন্স এবং জুম লেন্স) ব্যবহার করা হয়। এসব ক্যামেরা, ক্যামেরা মাউন্টিং ব্রাকেট দিয়ে দেয়ালে বা কলামে লাগানো হয়। এসব ব্রাকেট তৈরি হয় ১০ মিলিমিটার মোটা লোহার রড দিয়ে, যেন কেউ সিসিক্যামেরা চুরি বা আঘাত করে নষ্ট করতে না পারে। তবে অনেক দূর থেকেও আজকাল সিসিক্যাম নষ্ট করে দেওয়া যায়। খোদ সিসি ক্যামেরাই চুরি হয়। এমন চক্র দূর থেকে ক্যামেরার ভেতরের কার্যকলাপ চুম্বকের সাহায্যে নষ্ট করে ফেলে। ফলে অপরাধীকে আর চেনা যায় না।

ডে-নাইট ক্যামেরা

ডে-নাইট ক্যামেরাগুলো দেখতে ডিজিটালাইজড সাধারণ ক্যামেরার মতো। ক্যামেরা মাউন্টিং ব্রাকেট দিয়ে দেয়ালে বা কলামে লাগানো হলেও এর দক্ষতা অনেক বেশি। এই ক্যামেরার লেন্সের চতুর্দিকে বৃত্তাকারে সাজানো রয়েছে অনেকগুলো ইনফ্রা-রেড ইলুমিনেটর ও একটি সেন্সর। দিনের বেলায় যেমন ঝকঝকে রঙিন ছবি পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ আলো না থাকলে তখনই সেন্সরটি ইলুমিনেটরকে জ্বালিয়ে দেয়। যার ফলে ঘুটঘুটে অন্ধকারেও ৫০ ফুট দূরের বস্তু পরিষ্কার দেখা যায়। এ ধরনের ক্যামেরা বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে এখন ঢাকাসহ সারা দেশে।

ডোম ক্যামেরা

বাসায় দেয়ালে ক্যামেরা লাগানোর সুবিধা নেই কিন্তু সিসিক্যাম লাগাতে হবে এমন পরিস্থিতিতে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় ডোম ক্যামেরা লাগানোর মাধ্যমে। এ ক্যামেরায় একটি নির্দ্দিষ্ট ধরনের লেন্স থাকে। এসব ক্যামেরায় সাধারণত ক্যামেরা মাউন্টিং ব্রাকেট লাগে না। একটা গোল কাচ দিয়ে ঢাকা থাকে এটি। সাধারণত শুধু সিলিংয়ে লাগানো হয়। চোর-ডাকাতরা এই ক্যামেরা চিনতে পারে না সহজে। এটি দেখতে অনেকটা লাইটের মতো। তাই এটাকে অনেকেই লাইট ভেবে ভুল করে। তবে একটু ভালোভাবে তাকালে ভেতরে সেন্সর দেখা যায়, যা আপনার ছবি তুলছে সেকেন্ডে ২৪টা।

ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার)

কোনো বড় বাড়ির নিরাপত্তা বাড়াতে ব্যবহৃত হতে পারে ৮ বা ১৬ চ্যানেলের স্ট্যান্ড অ্যালোন এমবেডেড ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার) এবং বিল্ট-ইন ডিভিডি রাইটার। এই সিস্টেমে ৮-১৬টি ক্যামেরার ছবি একই পর্দায় একসঙ্গে দেখা যায় আলাদা আলাদাভাবে, যা হার্ডডিস্কে রেকর্ড হয়। এই রেকর্ড পুরো এক বা দুই মাস পর্যন্ত থাকে। এরপর নিজে থেকেই মুছে যায়। তাই বিশেষ কোন প্রয়োজনীয় মুহূর্তের ছবি ডিভিডিতে রাইট করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন সফটওয়্যার বিশেষ করে ঈগল আই নামের এন্ড্রয়েড বা অ্যাপলের অ্যাপস দিয়ে দুনিয়ার যেকোনো প্রান্ত থেকে সিসিক্যামেরায় চোখ রাখা যায় সহজেই। এক ক্লিকে কে কী করছে তাও বসে বসে দেখা যায় যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ বা ওয়াই-ফাই সংযোগ আছে।

পিসি বেইজড সিসিটিভি মনিটরিং ও রেকর্ডিং সিস্টেম

যাঁরা একটু কম খরচে সিসিটিভি মনিটরিং বা রেকর্ডিং সিস্টেম চান, তাঁদের জন্য পিসি বেইজড সিসিটিভি মনিটরিং এবং রেকর্ডিং সিস্টেমই সবচেয়ে ভালো। ৮ চ্যানেলের সিস্টেমের জন্য যেকোনো একটি সিপিইউর পিসিআই স্লটে একটি ডিভিআর কার্ড (১৬ চ্যানেলের সিস্টেমের জন্য দুটি ডিভিআর কার্ড) লাগিয়ে তার সঙ্গে পাওয়া সফটওয়্যারটি ইনস্টল করে নিয়ে এর সঙ্গে একটি মাউস ও মনিটর হলেই সিসিটিভি মনিটরিং এবং রেকর্ডিং সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেল। এবার ক্যামেরাগুলো এর সঙ্গে যুক্ত করে চালু করলেই পেয়ে যাবেন কম খরচে সিসিটিভি মনিটরিং ও রেকর্ডিং সিস্টেম।

ফিশ আই ক্যাম

এই ক্যামেরায় ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ভিউ পাওয়ার সুবিধা আছে। অনেকটা মাছের চোখের মতো দেখায় সবকিছু। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর পুরো অবয়ব দেখা যায়। এ জন্য এর নাম ফিশ আই টেকনোলজি। ক্যামেরা আর লাইট সেন্সর আছে ফলে রাতের ভিউও পাওয়া সম্ভব এর সাহায্যে।

হিডেন সিসিটিভি

এই সিসি ক্যামেরা যে বসানো আছে কোনোভাবেই কারও পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। অনেকটা স্পাইক্যামেরার মতো এই ক্যামেরা নিজেই কাজ করে। সাইজ নিতান্তই ক্ষুদ্র হওয়ায় অনেকে এটাকে ক্যামেরার সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় ব্যবহার করেন। ক্যামেরার লেন্স বেশ শক্তিশালী। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাউন্ড সেন্সর থাকে। ফলে কথা ও ছবি একই সঙ্গে রেকর্ড করা যায়। তবে তা কেউ বুঝতে পারে না।

আইন হচ্ছে সিসিটিভি ব্যবহারে

এখন নিশ্চয় মনে হচ্ছে এই সিসিটিভি ব্যবহারে একটা শক্ত আইন জরুরি? খুব শিগগিরই সিসিটিভি ব্যবহারেও আইন আসছে। কারণ, বর্তমানে বাংলাদেশে সিসিটিভি ব্যবহারে নেই কোনো ধরনের নীতিমালা। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যক্তি সিসিক্যাম ব্যবহার করে নানা ধরনের অপরাধ করছেন। এই তো কদিন আগে একটা প্রথম সারির বিউটি পার্লারে কাপড় পাল্টানোর কক্ষে পাওয়া যায় সিসিটিভি। শুরু হয় হইচই। অথচ সেখানে থাকার কথা নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা। অনেক সময় দুই পাশেই দেখা যায় এমন কাচের পেছনে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে রাখা হচ্ছে। অসাধু কিছু ব্যবসায়ী সেই ক্যামেরা ফুটেজ বিক্রি করছে আপত্তিকর ওয়েবসাইটে। এ ছাড়া আছে সিসিক্যাম ব্যবহার করে বিভিন্ন হোটেল কক্ষে বিভিন্ন রকমের অপরাধ কার্যক্রম। আবার সিসিক্যামেরা বিক্রির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকারের রেট নির্ধারণ করছে। এতে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়ছে। কেননা কোনো একটা সিসিক্যাম হয়তো এক দোকানে ২ হাজার ৫০০ টাকা আবার একই সিসিক্যাম অন্য দোকানে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়।

এসব কারণে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিসিক্যামেরা ব্যবহারে সতর্কতার, যার থাকবে একটি নীতিমালাও। এই নীতিমালা প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সিসিটিভি ব্যবহার হচ্ছে। প্রথমে সীমিত পরিসরে এর ব্যবহার শুরু হলেও ক্রমান্বয়ে পরিধি বেড়েছে, যা ভবিষ্যতেও আরও বাড়বে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সিসিটিভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে বৈঠক করা হয়। বৈঠকে সিসিটিভির ছবি ও ভিডিও ফুটেজকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ব্যাপারে আলোচনা হয়। বর্তমানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সন্ত্রাসীদের শনাক্তে সিসিটিভি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ও নিয়মানুযায়ী সিসিটিভি প্রতিস্থাপিত না হওয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর পলায়নরত সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া আইনিভাবে সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ উপস্থাপনের বিষয়টিও বৈঠকে আলোচিত হয়। এসব বিষয়ও সিসিটিভির নীতিমালায় বিবেচনার জন্য বলা হয়েছে।

এদিকে রাজধানীতে খুব শিগগিরই ৫০০ সিসিক্যামেরা বসানো হবে, যাতে গাড়ির নম্বর প্লেটও পড়া যাবে সহজে। এমন হলে বেশ সুফল পাবে বাংলাদেশ তা বলাইবাহুল্য। তবে সিসিটিভি বসানোর নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত এর ব্যবহার ও প্রয়োগ নিয়ে আগের মতোই সন্দেহ ও শঙ্কা  থেকেই যায়। অপরাধী অপরাধ করলেও চেনা যাচ্ছে না। অ্যাক্সিডেন্ট করে যাওয়া গাড়িকে ধরা যাচ্ছে না নাম্বারপ্লেট পড়তে না পারায়। এমন কুফলে সুফল বয়ে আনবে সিসি ক্যামেরা এ আশা কিন্তু করাই যায়!

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top