পৃথিবীর মানুষ যখন নিজের ঘরটিই ভালো করে বানাতে শেখেনি, তখন মায়ানরা নির্মাণ করেছিল বিশাল অট্টালিকা, পাথুরে বাড়িঘর, নগর কাঠামো, এমনকি সভ্যতা। অধিকাংশ জাতির ভাষাই যখন পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, তখন মায়ান জাতি-গোষ্ঠীর ছিল লেখার ভাষা, ছিল দিনপঞ্জিকা। তারা চাঁদ, তারকা, গ্রহ, নক্ষত্র নিয়ে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা করত। শুধু তা-ই নয়, তারা গান গাইত, কবিতা লিখত, করত সাহিত্য চর্চা! এ সভ্যতাটিই পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ঘনবসতিপূর্ণ একমাত্র সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতা ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রাগ্রসর এক সমাজ। কিন্তু কীভাবে তারা সেই সময়ে এতটা উন্নত ছিল, আর কেনই-বা হারিয়ে গেল কালের গহ্বরে, তা আজও রহস্যময়। অপার রহস্যের ঐতিহ্যবাহী মেসো-আমেরিকান এ সভ্যতাকে ইউনেসকো ২০০৫ সালে ‘এ মাস্টারপিস অব দ্য ওরাল অ্যান্ড ইন্ট্যানজিবল হেরিটেইজ অব হিউম্যানিটি’ ঘোষণা করে।
ভৌগোলিক বিবরণ
মায়া অঞ্চলকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিচুভূমি, উচ্চভূমি এবং উত্তরাঞ্চলীয় নিচুভূমি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মায়ানরা মেক্সিকোর দক্ষিণে এবং উত্তর-মধ্য আমেরিকাতে বাস করত। সভ্যতাটি মেক্সিকোর দক্ষিণে চাপাস, তাবাস্কো এবং ইয়ুকাটান উপ্লিপের কুইন্টানা রোওকাম্পেছ এবং ইয়ুকাটানজুড়ে প্রসারিত। উত্তরাঞ্চলীয় মধ্য আমেরিকার অঞ্চল যা বর্তমানে গুয়াতেমালা, বেলিজ, এল সালভাডোর এবং পশ্চিমে হন্ডুরাসজুড়ে মায়া সভ্যতা প্রসার ঘটেছিল।
ইতিহাস
খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল মায়ান সভ্যতা। বেলিজের কিউল্লোতে আবিষ্কৃত স্থাপনা নমুনার কার্বন পরীক্ষা থেকে মিলেছে এ তথ্য। প্রায় ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মায়ারা চাষাবাদ শুরু করে এবং উৎপত্তি ঘটে কৃষিজীবী গ্রামের। প্রায় ১৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথম মায়া জনবসতি প্রশান্ত উপকূলের সোকোনুস্কো অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়টি প্রাথমিক প্রাক ধ্রুপদি নামে পরিচিত। ওল্মেক সভ্যতার লোকেরা ছিল মায়াদের পূর্বসূরি। ধ্রুপদি যুগটি (প্রায় ২৫০-৯০০ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল মায়াদের শ্রেষ্ঠ যুগ। এ যুগে মায়া নগরীগুলো উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছেছিল। স্প্যানিশদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত পুরো পোস্টক্লাসিক যুগজুড়ে উন্নয়নের যাত্রা অব্যাহত রেখেছিল। এই যুগে বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ, বিস্ময়কর শিলালিপির লিপিবদ্ধ এবং উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিল্পকর্মের উন্নয়ন ঘটে। ৪০০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত নগররাষ্ট্র টিয়োটিহকান এই সময়ে অত্যন্ত ক্ষমতাধর হয় এবং মেক্সিকান উচ্চভূমিতে গড়ে ওঠে তাদের রাজধানী। ক্যারিকল, তিকাল, পালেকং, কোপান, জুনান্টিনেচ এবং কালাকমুল ছিল সুপরিচিত শহর। এ ছাড়া লামানাই, ডস পিলাস, কাহাল পেচ, আলতুন হা, বোনাম্পাক প্রমুখ শহরগুলোও বেশ সমৃদ্ধি লাভ করে। তখন মায়ার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লক্ষ। দক্ষিণ-পূর্বে কোপান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর আর উত্তরে কোবা ছিল মায়ায় রাজধানী। মায়ানরা অন্যান্য আমেরিকান গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্বে বাণিজ্য করত। এ ছাড়া তারা আরও দূরবর্তী ক্যারিবিয়ার দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দলের সঙ্গে বাণিজ্য ও পণ্য বিনিময় করত। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পণ্য ছিল কোকো, লবণ, ঝিনুকখোসা, পাথর এবং কাচের মতো দেখতে একজাতীয় আগ্নেয়শিলা।
মায়া সভ্যতার নগররাষ্ট্র, বাড়িঘর ও স্থাপনা
মায়ারা মেক্সিকোর বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন নগররাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এক বিশাল সাম্রাজ্য নির্মাণ করেছিল। প্রতিটি শহর ছিল এক একটা নগররাষ্ট্র। এগুলোকে ঘিরে থাকত কয়েকটা ছোট শহর বা বড় গ্রাম। প্রতিটি নগররাষ্ট্রে থাকত একজন স্থানীয় রাজা। রাজা ও অভিজাত ব্যক্তিরা শহরে নিখাদ গ্রানাইট পাথরের বাড়িতে বাস করত। তাতে বাগান বাড়ি ও বিরাট স্নানাগার থাকত। সাধারণ মায়ানরা গ্রামে ক্ষেতের পাশে কুঁড়েঘরে থাকত। এসব ঘর তৈরি হতো মাটি দিয়ে। বাড়ির ছাদ হতো পামগাছের পাতায়। তবে কিছু কিছু মায়ান পাথরের বাড়িতে বাস করত; তবে তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবে সব বাড়িই মাটি থেকে বেশ উঁচুতে মাচার ওপরে বানানো হতো। বন্যা থেকে রেহাই পেতেই এমন ব্যবস্থা। কারণ, অধিকাংশ মায়া নগররাষ্ট্র এবং সংলগ্ন অঞ্চল ছিল সমুদ্রতীরে। বিশেষত, ইউকাটায়েন উপ্লিপ অঞ্চলে সুনামি বা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হতো প্রায়ই।
মায়ারা নির্মাণে অনেক দক্ষ হলেও অ্যাজটেকদের মতো পরিকল্পিত ও সুগঠিত নগররাষ্ট্র তৈরি করতে পারেনি। তারা প্রথমে একটা মন্দির বানিয়ে তার আশপাশে কয়েকটা বড় গ্রাম বানাত। এরপর ঠিক মাঝে একটা শহর বানাত। ফলে নগররাষ্ট্রগুলো হতো ছন্নছাড়া প্রকৃতির। প্রতিটি নগররাষ্ট্রের একেবারে মাঝখানে সূর্য মন্দির বানানোটা ছিল খাঁটি মায়ারীতি। টাইকাল, কোপায়েন, টেওটিহুয়াকান এবং চিচেন ইটজায় সূর্য মন্দিরের অসাধারণ নমুনা দেখা গিয়েছে। সব সূর্য মন্দির ছিল পিরামিডের মতো, যা সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে ওপরে উঠে যেত। সব পিরামিডই ছিল দেবতার প্রতি উৎসর্গিত। পিরামিডে উঠতে পারত শুধু পুরোহিতরা। তারা বছরে পাঁচ দিন বাদে বাকি দিনে পিরামিডের চূড়ায় উঠত। সেখানে তারা নরবলি এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করত। রাজারও বারণ ছিল সেখানে যাওয়ার। কেবল যেসব দিন শুভ ছিল, সেসব দিনে রাজা এবং অভিজাতরা পিরামিডে উঠত। সাধারণ মানুষের জন্য বছরে মাত্র একদিনই পিরামিডে ওঠার সৌভাগ্য হতো। সেটা হলো রাজার জন্মদিনে! মায়ানদের নগররাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম-
এল মিরাডর (El Mirador)
এল মিরাডর প্রথম মায়া নগররাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রে বাস করত প্রায় ১ লাখ মানুষ। এখানে প্রায় ১ হাজার ভবন ছিল। পুরাতাত্ত্বিকেরা এখানে তিনটি বিশাল পিরামিডের খোঁজ পেয়েছেন। সেগুলো হলো, এল টাইগ্রে (১৮০ ফুট), লস মোনোস (১৫৭ ফুট) এবং লা ডানটা (২৫০ ফুট)। কার্বন আইসোটোপ পরীক্ষা থেকে অনুমান করা হয় এল মিরাডর প্রায় ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ উদ্ভব হয়েছিল, যা প্রথম শতক অবধি টিকে ছিল। অনুমান করা হয় ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে এটি পরিত্যাগ করে বাসিন্দারা অন্যত্র যেতে শুরু করে।
কামিনালজুয়ু (Kaminaljuyu)
গুয়াতেমালা উচ্চভূমি এবং দক্ষিণ মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিল বিখ্যাত এই নগররাষ্ট্র। বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে ধারণা করা হয় নগরটি টিকে ছিল ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিষ্টাব্দ অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার বছর। তারপর এই শহর পরিত্যক্ত হয় এল মিরাডর শহরের মতোই।
টাইকাল (Tikal)
টাইকাল ছিল মায়া সভ্যতার সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নগররাষ্ট্র। উৎপত্তি ঘটে ধ্রুপদি যুগে। অর্থাৎ ২৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এই শহর আয়তনে অন্য মায়া শহরের তুলনায় ছিল অনেক ছোট। তবে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ছিল ছয়টি পিরামিড, যা যেকোনো মায়া শহরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে চতুর্থ পিরামিডটি ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত ছিল বৃহত্তম পিরামিড। এর উচ্চতা ছিল ২৩০ ফুট। টাইকাল শহরে তার স্বর্ণযুগে মোট বাসিন্দার সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার থেকে ৭৫ হাজারের মধ্যে। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে এই ঐতিহাসিক নগররাষ্ট্র ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়।
টেওটিহুয়াকান (Teotihuacan)
টেওটিহুয়াকান শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা ছিল অন্যান্য মায়া নগররাষ্ট্রের তুলনায় বেশ কম। তবে বাণিজ্যনগরী হিসেবে এর গুরুত্ব ছিল অসীম। মধ্য মেক্সিকো উপত্যকায় অবস্থান এই নগররাষ্ট্রের। অনেকেই বলেন এটি একটি টল্টেক নগর, মায়া নগররাষ্ট্র নয়। মেক্সিকো সিটি থেকে ৩০ মাইল বা ৪৯.৮ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। এই নগরের মোট আয়তন ছিল ৮ বর্গমাইল বা ২১ বর্গ কিলোমিটার। মায়া সংস্কৃতিতে এই নগররাষ্ট্রের প্রচুর অবদান রয়েছে। এখানে বেশ কিছু বৃহৎ অট্টালিকা ছিল, যার মধ্যে চন্দ্রদেবের পিরামিড ও সূর্যদেবের পিরামিড। এ নগরের বাসিন্দা ছিল ১৫ হাজার।
কারাকল (Caracol)
আনুমানিক ২৫০ খ্রিষ্টাব্দে খারাখোল শহরের উৎপত্তি হয়েছিল টাইকাল শহরের যমজ হিসেবে। ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে এই শহর টাইকালের করদ রাজ্যের তকমা ঝেড়ে স্বনামে মহীয়ান হয়ে ওঠে। এই শহর আজকের বেলিজে শহরের চেয়ে আকারে ও আয়তনে বড় ছিল। আয়তন ছিল আনুমানিক ২০২.৩ বর্গ কিলোমিটার। প্রায় ২ লাখ মানুষের বাস ছিল এখানে।
চিচেন ইটজা (Chichen Itza)
চিচেন ইটজা উত্তর ধ্রুপদি যুগের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মায়া নগররাষ্ট্র ছিল। ৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে চিচেন ইটজা খুবই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। রূপান্তরিত হয় রাজধানীতে। পরবর্তী ২০০ বছর ধরে এটাই ছিল শ্রেষ্ঠতম মায়া শহর। এই সময়ে বিশ্ববিখ্যাত মায়ান পিরামিড চিচেন ইটজাও নির্মিত হয়। এখানে অনেক বিখ্যাত একশিলা স্তম্ভের স্থাপত্য ছাড়াও অট্টালিকা ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- এল কাস্টিল্লো: এক বিশাল পিরামিড, যা নির্মিত হয়েছিল মায়া দেবতা কুকুল্কানের উদ্দেশ্যে। ৩২১ ফুট উঁচু এ পিরামিড আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে নির্মিত হয়েছিল। এর প্রতিটি প্রান্তে মোট ৯১টি ধাপ ছিল এবং একেবারে ওপরে আয়তক্ষেত্রাকৃতির ভবন ছিল। ৩৬৫টি ধাপ মিলিয়ে এই পিরামিড গড়া হয়েছিল। একটা সিঁড়ির ধাপ এক পার্থিব দিনকে বোঝাত।
- গ্রেট বল কোর্ট: এটা ছিল বিখ্যাত মায়ান ভলিবল গোছের খেলার মাঠ। এই মাঠ লম্বায় ৫৫১ ফুট এবং ২৩০ ফুট চওড়া ছিল। মোট আয়তন ছিল ১২৬৭৩০ বর্গফুট। মাঠের চারপাশে থাকা দেয়ালের উচ্চতা ছিল ২৬ ফুট। উত্তরের দেয়ালের ওপারে ছিল জাগুয়ার দেবতার মন্দির।
- যোদ্ধাদের মন্দির: এর গঠন ছিল অনেকটাই চিচেন ইটজার মতো। তবে সিঁড়ির ধাপ ছিল ২০০টি।
কোপায়ন (Copan)
এই নগররাষ্ট্রটির বর্তমান অবস্থান হন্ডুরাসে। শহরের অদূরের কোপায়েন নদী থেকেই এমন নামকরণ হয়। জ্যোতির্বিদ্যার এবং সাংস্কৃতিক কারণে শহরটি বিখ্যাত ছিল। খ্রিষ্টীয় নবম শতকে এখানে ২০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দা ছিল। এখানে অনেক একশিলা স্তম্ভে তৈরি অতিকায় গ্রানাইট পাথরের মূর্তি, দুটি পিরামিড এবং বলকোর্ট ছিল। আনুমানিক ৩০০ খ্রিষ্টাব্দে এই শহর গড়ে উঠলেও ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে তা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়। ১৯৮০ সালে শহরটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত হয়। বছরে প্রায় ৭ লাখ পর্যটক এ শহরটি ভ্রমণ করে।
পালেনকুয়ে (Palenque)
কোপায়েন শহরের মতোই এটিও এক বিখ্যাত মায়া নগররাষ্ট্র। ১৯৫২ সালে মার্কিন ঐতিহাসিক মেক্সিকোর চিয়াপাস রাজ্যে সমুদ্রের তীরে এক ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী আবিষ্কার করেন। এই নগরী অনেক অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। এর মধ্যে চারতলা ময়দান, একটি পিরামিড, একটি দুর্গ, দুটি ভুলভুলাইয়া প্রসিদ্ধ। কেননা আর কোনো মায়া শহরে ভুলভুলাইয়া নেই। তবে পালেংখুয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য শিলালিপির মন্দিরের জন্য। এই মন্দিরকে বলা হয় সবচেয়ে সুন্দর মায়া মন্দির। মন্দিরের ভেতরে বিচিত্র সব শিলালিপি এবং নকশা অঙ্কিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় নকশা হলো এক মহাকাশযাত্রীর। হাজার বছর আগে তো মহাকাশযাত্রী দেখতে কেমন তা ধারণা ছিল না পৃথিবীর বাসিন্দাদের। তবে কেমন করে রকেটে চাপা ওই মহাকাশযাত্রীর নকশা আঁকল পালেংখুয়ের বাসিন্দারা? সেটা কোনো ভিনগ্রহের বাসিন্দা নাকি কোনো দেবতা, তা আজও অজানা। ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে এই শহরের পত্তন করেছিল মায়ারা কিন্তু ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ শহর পরিত্যাগ করে চলে যায়।
উক্সমাল (Uxmal)
দক্ষিণ-পূর্ব মেক্সিকোর ইউকাটায়েন রাজ্যে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক মায়া নগররাষ্ট্র। আনুমানিক ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে এই শহরের নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং ১ হাজার খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ শহরের নির্মাণকার্য অসমপূর্ণ রেখে শেষ করে দেওয়া হয়। এই নগররাষ্ট্র মায়াপান সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র রাষ্ট্র ছিল। যখন মায়াপান নগররাষ্ট্রের পতন হয়; তখন অন্যান্য উত্তরের মায়া নগররাষ্ট্রের মতোই আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে উক্সমাল পরিত্যক্ত হয়। এখানে জাদুকরের পিরামিড, কচ্ছপের রাজপ্রাসাদ ও চতুষ্কোণীয় ময়দান ছিল।
মায়ানদের প্রথা, জীবনযাপন ও পোশাক
মায়ানদের জীবনধারণব্যবস্থা ছিল বেশ বিচিত্র। সম্রাট ও অভিজাত ব্যক্তিরা অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপন করত। তারা সাধারণত জন্তু-জানোয়ারের চামড়া ও লোমের তৈরি কাপড় ও মাথায় বড় বড় টুপি পরত। মহামূল্যবান রত্ন ও সোনার গয়না পরতে খুবই পছন্দ করত তারা। সাধারণ মায়ানদের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টের ও কঠিন পরিশ্রমের। প্রায় সবাই ছিল কৃষক। মায়ানরা চ্যাপ্টা কপালের অধিকারী ছিল। অভিজাত মায়ান পরিবারে মায়েরা শিশুদের কপাল ঘষে দিত, যাতে কপাল চ্যাপ্টা হয়। এমনকি চোখ ট্যারা করানোর চেষ্টাও করত তারা। গুণী-মানী ব্যক্তিদের নাক কোণবিশিষ্ট করার জন্য তারা পুডিং ব্যবহার করত। আজকালকার প্লাস্টিক সার্জারির ধারণা সেখান থেকেই পেয়েছে মানুষ। মায়ারা ভাবত যে মঙ্গোলিয়ানদের ন্যায় টানা চোখ, চওড়া কপাল এবং লম্বা ও বড় নাক সৌন্দর্যের প্রতীক। এর কোনোটাই না থাকলে সেই মায়া বিবাহের পক্ষে অযোগ্য বলে মনে হতো। এ জন্য তারা অস্ত্রোপচার এবং সাজসজ্জা করে নাক বড় ও চোখ টানা করার ব্যবস্থা করত। উভয়েই বিয়ের পরে গায়ে উল্কি মেরে রাখত নিজেদের বিবাহিত প্রমাণ রাখতে। সমাজের অভিজাত নারীরা দাঁতে বিন্দু এঁকে নকশা করত।
মায়ারা অন্তত ১১১ রকমের নৃত্যকলা জানত। এর মধ্যে প্রায় ১৫ রকমের নৃত্যকলা আজও প্রচলিত। বাঁদর নাচ, সাপ নাচ, স্ট্যাগ হরিণের নাচ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ছুটির দিনে ও ধর্মীয় দিবসে তারা নাচ, গান ও খেলার আয়োজন করত। ভলিবল ছিল তাদের জনপ্রিয় খেলা। ধারণা করা হয় ভলিবলের জনক তারাই। তবে হেরে যাওয়া দলের শিরñেদ করা হতো। মায়ানদের চিকিৎসাবিদ্যা ছিল বেশ আধুনিক। তারা শরীরের ক্ষত মানুষের চুল দিয়েই সেলাই করে ফেলত। দাঁতের গর্ত পূরণ করা, এমনকি নকল পা লাগানোতেও পারদর্শী ছিল তারা। তারা প্রকৃতি থেকে ব্যথানাশক সংগ্রহ করত, সেই সব গাছগাছড়া তারা পূজায় ব্যবহার করত। ধর্মীয় রীতি অনুসারে আবার ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করত। রোগীকে অজ্ঞান করার জন্যও তারা ওষুধের ব্যবহার জানত।
মায়ানরা অন্যান্য সভ্যতার মতো লোহা বা ব্রোঞ্জের অস্ত্র ব্যবহার করত না। তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত আগ্নেয় শিলা অথবা অবিসিয়ান অর্থাৎ কাচের মতো দেখতে একপ্রকার পাথর। তারা বন্দী বা দাসদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করত। মেরে ফেলার আগে বন্দীর সারা গায়ে নীল রঙে রাঙানো হতো এবং নির্মম অত্যাচার চালাত। তাদের পিরামিডের ওপর শুইয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে হৃৎপিণ্ড বের করে ফেলত। কখনো কখনো বন্দীদের চামড়া তুলে ফেলা হতো। মধ্যযুগেও এ ধরনের বর্বরতা ছিল, যাকে স্কাফিজম নামে অবহিত করা হয়। বন্দীদের গায়ের চামড়া তুলে ফেলার পর মায়ানদের ধর্মযাজক সেই চামড়া পরে নাচ পরিবেশন করত।
কৃষি ও খাদ্য
মায়াদের কাছ থেকেই বিশ্ব বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য উপহার পেয়েছে। যেমন, চকলেট, টমেটো, রাঙ্গালু, সূর্যমুখী বীজ, তুলা, কালো শিম, স্কোয়াশ, লঙ্কা ও পেঁপে। তারা কোকো বীজ থেকে চকলেট উৎপন্ন করেছিল। এই গাছ ও চকলেটকে মনে করত চকলেট হলো ঈশ্বরের অবদান। এমনকি কোকোর বীজকে তারা মুদ্রার বিকল্পরূপে ব্যবহার করত। মায়াদের প্রধান খাবার ছিল ভুট্টার তৈরি বিভিন্ন খাবার। যেমন টর্টিলা, ডালিয়া এবং পনির-জাতীয় খাদ্য। এমনকি ভুট্টা পচিয়ে তার মদ তৈরি করত। সামুদ্রিক মাছও ছিল তাদের পছন্দের খাবার।
লিখনপদ্ধতি
মায়ানদের লেখার পদ্ধতি সমসাময়িক যেকোনো সভ্যতার তুলনায় অগ্রবর্তী ছিল। তাদের হাজারো লিপি থাকলেও কোনোটাই উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে টেকেনি। ক্যাথোলিক যাজক থেকে শুরু করে স্প্যানিশরা পর্যন্ত মায়াদের বই পুড়িয়েছে অবিবেচকের মতো। এখন পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে চারটি বই টিকে আছে। ফলে ঠিক কোন সময়ে মায়ানরা নতুন করে উন্নত হতে শুরু করে তা জানতে গবেষকদের ভরসা করতে হয়েছিল পাথরের খোদাই করা মায়া দিনপুঞ্জিতে, সুসজ্জিত মৃৎশিল্প এবং জৈব পদার্থগুলো থেকে পাওয়া রেডিওকার্বন পরীক্ষার ওপর (কার্বন ডেটিং হচ্ছে কার্বন আইসোটোপ ব্যবহার করে জৈব পদার্থের বয়স নির্ণয় প্রক্রিয়া)। তবু ২০-২১ শতকে তাদের অনেক লেখা ল্যাবরেটরিতে অনুবাদ করা গেছে। মায়া একমাত্র প্রচীন কলম্বীয় সভ্যতা, যা রেখে গিয়েছে অনেক উৎকীর্ণলিপি। মায়া লিখন ছিল একটি logosyllabic, যেটিতে প্রতি চিহ্ন বা বর্ণ, নিজে থেকেই প্রতিনিধিত্ব করতে পারত একেকটি শব্দ বা অর্থের প্রকাশ। নির্দেশ করতে পারত একটি শব্দের উচ্চারণের কণ্ঠস্বর। মোট, এক হাজারের চেয়েও বেশি আলাদা বর্ণ লিপি রয়েছে, যদিও কয়েকটি একই চিহ্ন অথবা অর্থের পরিবর্তনশীলতা আছে এবং অনেকগুলোকে দুর্লভ মনে হয় অথবা বিশেষ স্থানে সীমাবদ্ধ করা হয়। যেকোনো সময়ে প্রায় ৫০০টির চেয়ে বেশি বর্ণ ব্যবহার হত না, এগুলোর মধ্যে প্রায় ২০০টি ধ্বনি অথবা শব্দের (পরিবর্তনশীলতাসহ) অনুবাদ করা হয়েছিল। তারা পশুর লোম দিয়ে তুলি এবং পাখির পালকে তৈরি কলম দিয়ে লিখত।
বর্ষপঞ্জিকা
মায়ানরা যে জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল তার অন্যতম উদাহরণ হলো তাদের তৈরি ক্যালেন্ডার। তাদের দিনপঞ্জি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত, যাতে সৌর বছরের প্রতিটি মিনিটের নিখুঁত বর্ণনা ছিল। তাদের তিনটি ক্যালেন্ডার ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল দহাবদ, যেখানে বছরকে আধুনিক ক্যালেন্ডারের মতোই ৩৬৫ দিনে ভাগ করা হয়েছিল। তাদের দীর্ঘতম ক্যালেন্ডারটি ছিল ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিনের। তারা এমন কিছু দিনপঞ্জি তৈরি করেছিল, যা অসাধারণ ত্র“টিহীন হিসাব রাখতে সক্ষম হয়েছে। পঞ্জিকাতে আজ পর্যন্ত যত ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তার প্রতিটিই কালের আবর্তে সত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণীর ছিল ২০১২ এর ২১শে ডিসেম্বরে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সে হিসাব অনুযায়ী ক্যালেন্ডারটি শেষ হয় ২০১২ সালে। তবে তাদের সে ভবিষ্যদ্বাণী ফলেনি। তারা মনে করত, বছরের ৩৬০ দিন পয়া এবং ৫ দিন অপয়া (৩৬০ দিন = ১ বছর)। যে পাঁচ দিন অপয়া ছিল সেদিন কোনো শুভকাজ তারা করত না, উপবাসে থাকত, কাজে বের হতো না। আর যেসব দিন অত্যন্ত শুভ ছিল, সেসব দিনেই তারা ধর্মীয় উৎসব পালন করত। ক’রহ হলো মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি সময়, যা একটি দিনের অনুরূপ; আর উইনাল (মাস) হলো মায়া বর্ষপঞ্জিকার একটি চক্র যা ২০ দিনের একটি পর্যায়কাল সংশ্লিষ্ট হয়। ১৮ উইনাল হলো ১ হাব (বছর)-এর একটি চক্র, যা ৩৬০ দিন বোঝায়। এগুলোর সঙ্গে যোগ করা হয়েছিল পাঁচ দিন, যা ওয়েব ডাক হতো। বর্ষপঞ্জিকা গঠন করা হয়েছিল ২০ দিনের ১ ‘মাস’ আর ১৯ মাসে ১ বছর।
মায়ানরা মনে করত সব কিছুতেই সময়ের প্রভাব রয়েছে। প্রতিটি জিনিস সময় অনুযায়ী একেকটি অবস্থানে অবস্থান করছে। পুরোহিতরা নভোমণ্ডল এবং পঞ্জিকা ব্যাখ্যা করতে পারত। মায়া সভ্যতার সময় এবং সৃষ্টির এক সুন্দর বিন্যাস সম্পর্কে তারা অনেক আগেই অবগত হয়েছিল। তারা নিখুঁতভাবে সময় গণনা করতে পারত। এ কারণে সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের হাতে থাকত। কখন বীজ রোপণ করতে হবে, কখন ফসল ঘরে তুলতে হবে, কবে থেকে বর্ষা শুরু হবে, কবে থেকে গরম শুরু হবে এসব সম্পর্কে তারা জানত বলে তারা ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। তাদের সময়, ঋতু, চক্র উপলব্ধি করার খুব উচ্চ ক্ষমতা ছিল।
মায়ানদের পতন
৬০০-৮০০ খ্রিষ্টাব্দ কালে মায়ারা উন্নতির শিখরে অবস্থান করে। অথচ তারা জানত না, এই উত্থানের পরেই আসবে পতন। পরবর্তী শতক থেকে মায়ারা তাদের সমৃদ্ধ শহরগুলোকে একে একে পরিত্যাগ করতে শুরু করে। পরবর্তী ২০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাদের অসীম গৌরবের খুব সামান্যই অবশিষ্ট ছিল। যদিও পরে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নগরের পুনরুত্থান ঘটে কিন্তু সভ্যতাটির সেই জৌলুশ তত দিনে চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়। তাদের উত্থান এতই নাটকীয় ছিল যে শত বছরের গবেষণার পরেও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কিছুতেই তাদের পতনের কারণ নিয়ে একমত হতে পারেননি। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সভ্যতাটি পরিবেশগত দুর্যোগ, মহামারি রোগ, বনভূমিকে কেটে চাষাবাদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে বাধ্য হয়েছিল শহর ত্যাগে। সম্প্রতি কিছু বিশেষজ্ঞ লেক তলদেশ, প্রাচীন পরাগরেণু এবং অন্যান্য তথ্য গবেষণা থেকে অনুমান করছেন, ২০০ বছরের একটি তীব্র খরা মায়া সভ্যতার পতনের কারণ। তবে বহিরাক্রমণ, গৃহযুদ্ধ, বাণিজ্যপথের অবসানও তাদের ক্রমেই পতনের জন্য কম দায়ী নয়। এ ছাড়া স্প্যানিশরা মায়া ইউকাটান উপ্লিপ এবং গুয়াতেমালার পার্বত্য অঞ্চলের ঔপনিবেশিক স্থাপন ও মায়ানদের বন্দী করে ক্রীতদাস হিসেবে নিজ দেশে চালান করায় সাম্রাজ্য পতনের ভিত রচিত হয়।
পরবর্তী সময়ে অনেক দিগি¦জয়ী মায়ান সভ্যতার খোঁজে এসেছিল। কিন্তু তারা বিলুপ্তপ্রায় সভ্যতা ছাড়া কিছুই পায়নি। যে জঙ্গলের ভেতরে একসময় গড়ে উঠেছিল এই সভ্যতা, সেই জঙ্গলই আবার গ্রাস করে একে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে এ সভ্যতার বেশ কিছু শহরের সন্ধান মিললেও চলমান রয়েছে প্রক্রিয়াটি। মেক্সিকোর প্রাচীন এক শহর খননকালে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা একটি গণকবরের সন্ধান পান ,যেখানে প্রতিটি দেহের মাথা বিচ্ছিন্ন। এই হতভাগ্য মানুষগুলো ছিল হয় সমাজচ্যুত, নয়তো যুদ্ধে ধরে আনা শত্র“পক্ষের সদস্য। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ নিকোলাস সিফিল্ড প্রায় ১৪০০ বছর পুরোনো উজুল শহরের প্রাচীন আমলের পানি পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার সময় বিরাট এক মাটির ঢিবি খনন করে সেখানে ২৪টি মৃতদেহ পান। সেগুলো নুড়িপাথর দিয়ে ঢাকা ছিল এবং পানির সংরক্ষণাগারটি কাদামাটি দিয়ে সিল করা। বাতাস চলাচল না করায় কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে প্রায় অবিকৃত অবস্থায়। এই শহর খননের মাধ্যমে মায়া সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন সম্পর্কে জানা যায়। সম্প্রতি স্যাটেলাইট ইমেজ ও মায়ান জ্যোতির্বিদ্যা অনুসরণ করে কয়েকটি হারানো শহর আবিষ্কৃত হয়েছে। সেগুলোর অধিকাংশ গভীর জঙ্গলের মধ্যে। শহরগুলোতে খনন ও প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করা গেলে সভ্যতাটি সম্পর্কে জানা যাবে আরও অজানা তথ্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।