কাঠের আয়ুষ্কাল বাড়াবেন যেভাবে

সেই প্রাচীনকাল থেকেই নির্মাণ আর আসবাব তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে কাঠ ও বাঁশ। এ ছাড়া নৌকা, জাহাজ, রেলওয়ে স্লিপার, বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ নানা ব্যবহার্য তৈরিতে কাঠের জুড়ি মেলা ভার। গ্রামের মানুষেরা ঘরবাড়ি নির্মাণে বাঁশ-কাঠকেই প্রাধান্য দেয়। কিন্তু কাঠে তৈরি উপকরণগুলো সহজেই কীট-পতঙ্গ (উইপোকা, বিটল, ঘুণপোকা) ও ছত্রাকে আক্রান্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্তও হয় নানাভাবে। এই যেমন বাঁশের খুঁটি এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই পচে যায় আবার শাল ও সেগুন কাঠ ছাড়া অন্যান্য অসার কাঠ দুই-তিন বছরের মধ্যেই পোকায় আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। তাই কাঠ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও উপকারী হলেও বিড়ম্বনা কম নয়। তবে নির্মাণসামগ্রী ও আসবাব তৈরির আগে কাঠ বা বাঁশকে যদি কিছু রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাত করা যায়, তাহলে সহজেই সমস্যাগুলোর সমাধান করে ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ বা ছত্রাকের আক্রমণ থেকে কাঠকে রক্ষার মাধ্যমে এর ব্যবহারিক আয়ুষ্কাল বাড়ানো সম্ভব।

কাঠ সেলুলোস, হেমিসেলুলোস ও লিগনিন উপাদানে গঠিত হওয়াই মাটি-পানির সংস্পর্শে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণে যেসব কাঠ সামগ্রী মাটি, পানির সংস্পর্শ কম পায় অর্থাৎ গৃহস্থালি আসবাব, সেগুলো সংরক্ষণে রাসায়নিক হিসেবে প্রয়োজন বোরাক্স-বরিক অ্যাসিডের (বিবি) দ্রবণ। আর যেগুলো মাটি-পানির সংস্পর্শে থাকবে সেসব দ্রব্যসামগ্রীর জন্য কপার-ক্রোম-বোরনের (সিসিবি) মিলিত দ্রবণ ব্যবহৃত হয়।

সংরক্ষণী প্রস্তুত ও প্রয়োগ করবেন যেভাবে

রাসায়নিক সংরক্ষণীর মিশ্রণ প্রস্তুত প্রণালি

আসবাব ও ঘরের ভেতরের ব্যবহার্য জিনিসপত্রের জন্য বোরাক্স-বরিক অ্যাসিড (বিবি) দ্রবণের প্রস্তুতে এক ভাগ বোরাক্স ও এক ভাগ বরিক অ্যাসিড সমভাবে নিতে হবে (অনুপাত ১ঃ১)। বাইরে ব্যবহৃত সামগ্রীর জন্য কপার-ক্রোম-বোরনের (সিসিবি) দ্রবণ তৈরিতে সালফেট (তুঁতে)-সোডিয়াম ডাইক্রোমেট-বরিক অ্যাসিডের দ্রবণ প্রস্তুতের জন্য দুই ভাগ কপার সালফেট, দুই ভাগ সোডিয়াম ডাইক্রোমেট এবং এক ভাগ বোরিক অ্যাসিড নিতে হবে (অনুপাত ২ঃ২ঃ১)।

সংরক্ষণী প্রয়োগের নিয়মাবলি

  • চাহিদা অনুয়ায়ী কাঠ চেরাই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
  • নির্দিষ্ট আসবাব বা দরজা-জানালা প্রস্তুতের জন্য সাইজমতো প্রয়োজনীয় কেটে টুকরো করে নিন। যান্ত্রিক কাজ-রানদা, ছিদ্র করা ইত্যাদি কাজ দ্রুত শেষ করুন।
  • কাঠের মতো বাঁশও ব্যবহারের আগে সাইজমতো কেটে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
  • সংরক্ষণী প্রয়োগের পর কাটা-ছেঁড়া না করাই ভালো।
  • আসবাব সংরক্ষণের জন্য বোরাক্স-বরিকে অ্যাসিড (বিবি) এবং বাইরে ব্যবহারের জন্য নির্মাণসামগ্রীর বেলায় কপার সালফেট (তুঁতে), সোডিয়াম ডাইক্রোমেট ও বরিক অ্যাসিড (সিসিবি) মিলিত দ্রবণ তৈরি করুন।
  • সাইজ করা কাঠ ও বাঁশ চুবানোর জন্য একটি ট্যাংক লাগবে।
  • ট্যাংকটি পাকা, টিন (প্লেইন শিট), বা কাটা ড্রাম দিয়েও তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া সাময়িকভাবে মাটিতে গর্ত করে তাতে পলিথিন শিট বিছিয়েও ট্যাংক তৈরি করা যেতে পারে।
  • প্রথমে সাইজ করা কাঠ বা বাঁশ ট্যাংকে স্থাপন করে ওপরে ভারী বস্তা দিয়ে চাপা দিন।
  • ট্যাংকে সংরক্ষণী দ্রবণ এমনভাবে ঢালুন যেন মিশ্রণের পরিমাণ সংরক্ষণী সামগ্রীর অন্তত তিন ইঞ্চি ওপরে থাকে।
  • আসবাবের বেলায় সাময়িকভাবে সংরক্ষণের জন্য বোরাক্স-বরিক অ্যাসিড দ্রবণ দ্বারা স্প্রে পদ্ধতির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

আসবাব ও ঘরে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন ১০ ভাগ ঘনত্বের বোরাক্স-বরিক অ্যাসিডের দ্রবণ। এই ঘনত্বেও ১০০ লিটার বোরাক্স-বরিক অ্যাসিডের সংরক্ষণী দ্রবণ তৈরিতে লাগবে-

উপকরণপরিমাণ
বোরাক্স (সোহাগা)৫ কেজি
বরিক অ্যাসিড৫ কেজি
পানি৯০ লিটার/কেজি
মোট১০০ কেজি

বাইরে ব্যবহৃত কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা ইত্যাদি সংরক্ষণে প্রয়োজন ১০ ভাগ ঘনত্বের সিসিবি দ্রবণ। এই ঘনত্বের ১০০ লিটার সিসিবি দ্রবণ প্রস্তুতিতে প্রয়োজন-

উপকরণপরিমাণ
কপার সালফেট (তুঁতে)৪ কেজি
সোডিয়াম ডাইক্রোমেট৪ কেজি
বরিক অ্যাসিড২ কেজি
পানি৯০ লিটার/কেজি
মোট১০০ কেজি

এ ছাড়া সহজভাবে বা অল্প দ্রবণ তৈরির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ বিবি বা সিসিবি দ্রবণের জন্য ১ কেজি রাসায়নিক দ্রব্য এবং ৯ কেজি পানি প্রয়োজন (অনুপাত ১ঃ৯)।

বাঁশের খুঁটি সংরক্ষণ পদ্ধতি

৮-১০ ফুট লম্বা খুঁটি সহজেই রস অপসারণ বা স্যাপ ডিসপ্লেসমেন্ট পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়। এ জন্য দরকার ২০ ভাগ ঘনত্বের সিসিবি দ্রবণ। ২০ ভাগ ঘনত্বের ১০০ লিটার সংরক্ষণী দ্রবণ প্রস্তুতে যা লাগবে-

উপকরণপরিমাণ
কপার সালফেট (তুঁতে)৮ কেজি
সোডিয়াম ডাইক্রোমেট৮ কেজি
বরিক অ্যাসিড৪ কেজি
পানি৮০ লিটার/কেজি
মোট১০০ কেজি

খুঁটি সংরক্ষণের জন্য সদ্যকাটা বাঁশের কঞ্চি ছেটে ৭-১০ ফুট লম্বা টুকরো করে নিন। এরপর একটি ড্রামে সংরক্ষণী দ্রবণে খুঁটিগুলোর এক প্রান্ত ডুবিয়ে দিন। ড্রামে সংরক্ষণীর গভীরতা কমপক্ষে দুই ফুট হতে হবে। সংরক্ষণ প্রক্রিয়া চলাকালীন দ্রবণের উচ্চতা দুই ফুট রাখার জন্য প্রয়োজনে নতুন দ্রবণ ঢালুন। এভাবে তিন-চার দিন রাখুন। এরপর খুঁটিগুলোর অপর প্রান্ত একটি দ্রবণে ডুবিয়ে আবার তিন-চার দিন রাখুন। তারপর দ্রবণ থেকে উঠিয়ে দুই-তিন দিন ছায়ায় শুকিয়ে নিন।

সংরক্ষণের সময়কাল

  • বিবি ও সিসিবি উভয় দ্রবণের ক্ষেত্রে এক ইঞ্চি পুরু তক্তা বা কঠি কমপক্ষে ছয়-সাত দিন দ্রবণে চুবিয়ে রাখতে হবে। আর দুই বা তিন ইঞ্চি কাঠের বেলায় সাত থেকে দশ দিন চুবিয়ে রাখতে হবে।
  • চেরাই বা ফালি বাঁশের জন্য ১০ ভাগ সিসিবি দ্রবণে দুই থেকে তিন দিন চুবাতে হবে। আর বাঁশের খুঁটির, আড়া, তীরের জন্য স্যাপ-ডিসপ্লেসমেন্ট পদ্ধতিতে ২০ ভাগ সিসিবি দ্রবণে সাত থেকে দশ দিন খাঁড়াভাবে রাখতে হবে।

মনে রাখবেন যা

  • সংরক্ষণী প্রয়োগের আগে তৈরি করা দ্রব্যসামগ্রী অবশ্যই ভালোভাবে পরিষ্কার, শুকানো এবং যাবতীয় কার্পেন্টারি কাজ করতে হবে।
  • সংরক্ষণী প্রয়োগের পর সামগ্রীগুলো ছায়ায় দুই-তিন দিন শুকাতে হবে।
  • কাজের সময় যদি কাঠ বা বাঁশ কোনোক্রমে কাটতেই হয় তবে কাটা স্থানে পুনরায় দ্রবণ লাগাতে হবে।

সতর্কতা

  • সংরক্ষণী প্রয়োগের সময় হাতে রাবারের দস্তানা ব্যবহার করুন।
  • সংরক্ষণী দ্রবণ গবাদিপশু ও শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, ২০১৬

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top