বিশ্বের বৃহৎ ছাদ-বাগান

ছাদের খোলা জায়গায় বাগান করার শখ অনেকেরই। বাণিজ্যিকভাবেও অনেকে শাকসবজি উৎপাদন করছেন বাসার ছাদে। তবে ছাদের অধিকাংশ বাগানই হয় ছোট আকৃতির। বাণিজ্যিক বাগানগুলোর আকার হয় সাধারণত হাজার খানেক বর্গফুট। এর মানে এই নয় যে ছাদে বড় বাগান করা অসম্ভব। ৭৫ হাজার বর্গফুট বা প্রায় দুই একর আয়তনের ছাদ-বাগানটি প্রমাণ করে দিয়েছে ছাদে বাগান করতে আয়তন এখন আর কোনো ব্যাপারই নয়। আমেরিকার শিকাগো শহরের উত্তরে অবস্থিত ‘গোথাম গ্রিন’ কোম্পানির এ বাগানটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছাদ-বাগান।

গোথাম গ্রিনের বাগানটি মূলত একটি গ্রিন হাউস। শিকাগো শহরের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয় বাগানটির। এখান থেকে কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই বছরে প্রায় এক হাজার টন রাসায়নিক ও কীটনাশকবিহীন উন্নতমানের খাদ্য উৎপাদিত হয়। আমেরিকায় প্রথম বাণিজ্যিক ছাদ-বাগানকেন্দ্রিক গ্রিন হাউসটি তৈরি হয় ২০১১ সালে। ১৫ হাজার বর্গফুটের এই বাগানের উৎপাদনক্ষমতা বছরে এক লাখ পাউন্ড। বাগানটি পরিচালিত হয় গোথাম গ্রিন কোম্পানির তত্ত্বাবধানে।

শিকাগো শহরের নতুন এই রুফ-টপ বাগানটি যে শুধু তার আয়তনের জন্য বিখ্যাত তা কিন্তু নয়। এর আরও এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এটাকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। যেমন, উন্নত চাষ পদ্ধতি, সীমিত পানি ও ভূমির ব্যবহার, কম বিদ্যুৎ খরচ, কম ফুড-মাইলের মতো বিষয় উল্লেখযোগ্য।

হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে উন্নত চাষ

সারা বছর সবজি উৎপাদনের জন্য নিয়ন্ত্রিত উপায়ে হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় এই ছাদ-বাগানে। হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতি এমন একটি পদ্ধতি, যাতে গাছের পুষ্টিসমূহ দ্রবণের সাহায্যে গাছে সরাসরি সরবরাহ করা হয়। হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে পুষ্টি মিশ্রিত পানি সব সময় চক্রাকারে প্রবাহিত হতে থাকে গাছের পুষ্টি সরবরাহে, ফলে কোনো ধরনের পানির অপচয় হয় না।

পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় কোনো প্রকার ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। উপকারি কীট-পতঙ্গ ব্যবহার করে বা জৈব নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করা হয়। এ পদ্ধতিতে উদ্ভিদ উৎপাদনের জন্য কোনো প্রকার মাটি ব্যবহার করা হয় না। মাটিবিহীন চাষ হওয়ার কারণে মাটি থেকে উদ্ভিদের মাধ্যমে মানবদেহে বিস্তৃতি লাভ করে এমন ধরনের বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু (যেমন: ই-কোলি বা সালমোনেলা) থেকে মুক্ত এখানকার উৎপাদিত খাদ্যসমূহ।

একইভাবে কৃত্রিম উপায়ে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পুষ্টি সরবরাহের ফলে উদ্ভিদের গুণগতমানও থাকে অক্ষুণ্ন। সবজি উৎপাদনের সব ধরনের উপাদান যেমন- আলো, তাপ, কার্বন ডাই-অক্সাইড, গাছের পুষ্টিসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে সবজির গুণগতমান সারা বছর একই রকম থাকে। এভাবে উৎপাদিত খাদ্য সম্পূর্ণ বদ্ধ ও রোগ-জীবাণুমুক্ত হওয়ায় কীটপতঙ্গের আক্রমণ ও রোগ-বালাইয়ের ঝুঁকি থেকে থাকে সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রচণ্ড শীত ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়ও এর উৎপাদন ব্যাহত হয় না।

সীমিত ভূমির ব্যবহার

যখন সারা বিশ্ব আবাদি ভূমির অভাবে ভুগছে, তখন উন্নত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করে ছাদেই এমনভাবে সাধারণ জমির তুলনায় অন্তত ২০-৩০ গুণ বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। গোথাম গ্রিনের ৭৫ হাজার বর্গফুটের বাগানটিতে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয়, তা প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদন করতে ১০০ একরের বেশি জমির প্রয়োজন হতো। এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য খাদ্য উৎপাদনে গিয়ে জমির কোনো রকম ক্ষতিসাধন না করা।

গথেম গ্রিনস

ফসল উৎপাদনের জন্য জমি চাষ হওয়ায় হচ্ছে ভূমিক্ষয়। হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে চাষ করার ফলে কোনো রকমের ভূমি ক্ষয় হয় না। যেহেতু মাটি থেকে গাছ কোনো পুষ্টি সংগ্রহ করে না, সেহেতু মাটিতে রক্ষিত মূল্যবান প্রাকৃতিক পুষ্টি থাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

জমির প্রকৃতি ও জীবন বৈচিত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ‘স্বল্প জায়গায় অধিক উৎপাদন’ এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলা হয়েছে উৎপাদন পরিকল্পনাটি। আর ‘স্বল্প জায়গায় অধিক উৎপাদন’-এর লক্ষ্যে জিনগতভাবে পরিবর্তিত (Genetically modified) কোনো বীজ বা চারা এখানে ব্যবহৃত হয়নি।

সীমিত পানির ব্যবহার

পানি যে অমূল্য সম্পদ এ বিষয়ে দ্বিমত নেই কারোরই। আর কৃষি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুপেয় পানি ব্যবহারের মূল খাত। এখানে যেমন প্রচুর পানি ব্যবহৃত হয়, তেমনি অপচয় হয় প্রচুর পানির। সাধারণত জমিতে সেচ দেওয়ার সময় জমি প্রচুর পানি শুষে নেয়। তা ছাড়া গাছের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পানির চেয়ে অনেক বেশি পানি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে, ফলে অপচয় হয় পানির।

বর্তমানে হাইড্রোপনিক চাষ পদ্ধতি সবচেয়ে কম পানি ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের চাষপদ্ধ তি। এ পদ্ধতিতে সাধারণ চাষাবাদের চেয়ে অন্তত ১০ ভাগ কম পানি ব্যবহার করা হয়। ফলে চাষের জায়গা থেকে পানি অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়ে না বা ভূমিতে শোষিত হয় না। সেচকাজে পানি পুনর্ব্যবহার করার ফলে ভূ-গর্ভস্থ বা সমতলের পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব হয় খুব সহজেই। উল্লেখ্য, পানিদূষণের অন্যতম বড় কারণ কৃষিজমিতে ব্যবহৃত পানি বিভিন্নভাবে নদী ও ভূ-গর্ভসহ অন্যান্য পানির উৎসের সঙ্গে মিশে যাওয়া।

সূর্যের আলোর কার্যকর ব্যবহার

গোথাম গ্রিনের গ্রিন হাউসটি আলোর জন্য সূর্যের আলোকে বেশি ব্যবহার করে। পুরো হাউসের ৬০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হয় সোলার প্যানেল ব্যবহার করে। এলইডি লাইট, উন্নতমানের উজ্জ¦ল উপরিতল, তাপরোধক পর্দা ও নিয়ন্ত্রিত বায়ু চলাচল বিদ্যুতের চাহিদাকে আরও কমিয়ে দেয়।

এই গ্রিন হাউসগুলো উদ্যানতত্ত্ব ও প্রকৌশলের এক অপূর্ব সমন্বয়। তারা এত দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করে থাকে যে সাধারণ গ্রিন হাউসের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে পারে। প্রতি পাউন্ড খাদ্য উৎপাদনে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, তারচেয়ে ২৫ শতাংশ কম শক্তি ব্যয়িত হয় এখানে।

গোথাম গ্রিন কর্তৃপক্ষ এমনভাবে ডিজাইনটি করেছে, যাতে সারা বছর খাদ্য উৎপাদনে সবচেয়ে কম শক্তি ব্যয়িত হয়। সম্পূর্ণ কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ভেতরের আলো, তাপ ও অন্যান্য প্রভাবক নিয়ন্ত্রণ করে এবং সব সময় ন্যূনতম শক্তি খরচ নিশ্চিত করে। এখানে সৌরশক্তির কার্যকরী ব্যবহার খনিজ তেলের ব্যবহারকে কমিয়ে দিয়েছে। সে কারণে এখানে খাদ্য উৎপাদনে জলবায়ু উত্তপ্ত হয় কম। এটি বিদ্যুৎ ও সূর্যশক্তির উপযুক্ত ব্যবহারের এখন পর্যন্ত সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।

রিনিউ-অ্যাবল এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বছরে প্রায় এক হাজার টন উন্নতমানের কীটনাশকবিহীন সবুজ শাক ও ঔষধি জাতীয় গাছ উৎপাদন করছে তারা। ফলে সারা বছর উন্নতমানের সবজি সরবরাহ করা সহজেই সম্ভব হচ্ছে এ বাগান থেকে।

কম ফুড-মাইল

শহরে বাগান করার আরও একটি উদ্দেশ্য রয়েছে গোথাম গ্রিনের। আর তা হলো ফুড-মাইলেজ কমিয়ে আনা। ফুড-মাইল হলো খাদ্য উৎপাদনের জায়গা থেকে ভোক্তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর অতিক্রান্ত দূরত্ব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফুড-মাইল খুব বেশি গুরুত্ব না পেলেও আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার মতো দেশে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যেখানে খাদ্যের একটি বাক্স পৌঁছাতে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। তাতে হিমায়িত অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকার ফলে যেমন খাদ্যের গুণগতমান ও স্বাদ পরিবর্তন হয়, তেমনি পরিবহনের জন্য যে জ্বালানি খরচ হয় তা পরিবেশ ও আর্থিক উভয় দিকের জন্যই ক্ষতিকর।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, সারা বিশ্বে অধিকাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বাস করে। যেখানে ১৯৫০ সালে শতকরা মাত্র ৩০ জন মানুষ শহরে বাস করত, সেখানে ২০১৪ সালে এসে দেখা যায় শতকরা ৫৪ জন মানুষ শহরে এবং শতকরা ৪৬ জন মানুষ গ্রামে বাস করে। আর ২০৫০ সালে শতকরা ৬৬ জন মানুষ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি শহরবাসী উত্তর আমেরিকায়। এখানে শতকরা ৮২ জন মানুষ শহরে আর শতকরা ১৮ জন মানুষ গ্রামে বাস করে।

গথেম গ্রিনস

অন্যদিকে সেন্টার ফর এনভারমেন্টাল স্টাডিজের এক গবেষণায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া শহরে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের স্থান থেকে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সড়কপথে পাড়ি দিতে হয় ২১ হাজার ৭৩ কিলোমিটার পথ, সেই সঙ্গে প্রায় একই দূরত্ব (২৫ হাজার ৭৬০ কিলোমিটার) পাড়ি দিতে হয় সমুদ্রপথে। সর্বমোট ফুড-মাইল হলো ৭০ হাজার ৮০৩ কিলোমিটার। এটা আমাদের বসবাসরত গ্রহ পৃথিবীর পরিধির (৪০ হাজার ৭২ কিলোমিটার) প্রায় দ্বিগুণ। এসব খাদ্য পরিবহনের জন্য পরিবহন মাধ্যমগুলো যে পরিমাণ কার্বন বাতাসে যুক্ত করে, তার পরিমাণ ১৬ হাজার ৯৮৯ টন। ফলে ফুড-মাইল কমানোর জন্য শহরে বা শহরের আশপাশে খাদ্য উৎপাদন করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এসব বিবেচনায় গোথাম গ্রিনের এই রুফ-টপ বা ছাদ-বাগানটি শহরের মাঝে হওয়ায় এখান থেকে উৎপাদিত খাদ্য খুব সহজে অল্প সময়ে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে যা রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top