দেয়াল সাজাতে দেয়াল রাঙাতে

চার দেয়ালে বন্দিজীবন- আজকাল কথাটা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাচ্ছে নিত্যনতুন ডিজাইন আর উপকরণের নানাবিধ ব্যবহারের কল্যাণে। আজকাল দেয়াল মানেই কেবল পাঁচ/ছয় ইঞ্চি পুরো সাদা রঙে ঢাকা ইটের নীরস দেয়াল নয়। তা হোক আপনার বাসা, অফিস কিংবা রেস্টুরেন্ট। আপনি খুব সহজেই আপনার কাঠখোট্টা দেয়ালটিকে করতে পারেন ঘরের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। একটা সময় হঠাৎ করেই অনেকেই ঘরের চার দেয়াল চার রঙে রাঙাতে শুরু করলেন। একটা দেয়াল লাল তো আরেকটা নীল, একটা হলুদ তো আরেকটা বেগুনি। এমন কটকটে রংগুলো প্রভাব ফেলল ঘরের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের যাপিত জীবনে। দেয়ালকে শুধু রঙে রঙিন করার দিন শেষ। হাত বাড়ালেই অসংখ্য অপশন এখন আপনার সামনে। চলুন দেখে নিই বৈচিত্র্যময় রংচঙা দেয়াল সাজাতে কী কী অনুষঙ্গ রয়েছে আপনার হাতের নাগালে।

ওয়াল পেপার

দেয়াল সাজাতে সবচেয়ে সহজ আর সাশ্রয়ী উপকরণ ওয়াল পেপার। একটা সময় ওয়াল পেপার মানেই ছিল ফুল-পাখি-লতা-পাতা। সেদিন প্রায় ফুরিয়েছে। এখনকার ওয়াল পেপারগুলো অনেক আধুনিক, যা বদলে দেবে আপনার ঘরের সনাতন আদল।

দেয়ালের পুরোটাজুড়ে ওয়াল পেপার না লাগিয়ে ঘরের যে দেয়ালটি বড়, জানালা নেই অথবা যে দেয়ালটি আপনার পেছনে থাকে, সেই দেয়ালটি নির্বাচন করুন ওয়াল পেপার লাগানোর জন্য। বাকি তিন দেয়ালের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ওয়াল পেপার নির্বাচন করুন। অথবা এর উল্টোটাও করতে পারেন- তিন দেয়ালে হালকা রং ব্যবহার করে ওয়াল পেপারটি হতে পারে গাঢ় রঙের।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যা

  • ওয়াল পেপার লাগাতে যে দেয়ালটি নির্বাচন করবেন, সেটির ইন্টেরিয়রের তথা ভেতরের দেয়াল হওয়া বাঞ্ছনীয়।
  • দেয়ালটি অবশ্যই শুকনো ও আর্দ্রতারোধী হতে হবে। বৃষ্টির পানি অথবা অন্য কোনো উপায়ে দেয়ালটিতে পানি আসার আশঙ্কা রয়েছে কিনা আগেই তা ভালোভাবে যাচাই করে নিন।
  • ওয়াল পেপার কখনো নিজে লাগাতে যাবেন না, নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি। সব সময় অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের সাহায্যে এটি লাগান।
  • পাতলা পেপার পরিহার করুন। কিছু টাকা বেশি দিয়ে হলেও মোটা পেপার নির্বাচন করুন।
  • ওয়াল পেপার পেস্ট করতে সবচেয়ে ভালো আঠা ব্যবহার করুন।

বাজারে চায়নিজ ও কোরিয়ান ওয়াল পেপারই বেশি পাওয়া যায়। এগুলো রোল হিসেবে বিক্রি হয়। একেকটি রোলে ৫৭.৫০ এসএফটি পেপার থাকে। কিছু রোলে বেশিও থাকে। সেগুলোর দামও একটু বেশি। ৫৭.৫০ এসএফটির একটি রোল থেকে গড়ে সর্বোচ্চ ৫০ এসএফটি দেয়াল আপনি সহজেই মুড়তে পারবেন। টেকনিশিয়ানের মজুরিসহ একটি রোলে আপনার খরচ পড়বে ২,৫০০-৫,০০০ টাকা। ঢাকাস্থ বনানীর চেয়ারম্যানবাড়িতে গেলেই পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দের ওয়াল পেপারটি।

থ্রি ডি ওয়াল

দেয়ালের জন্য সবচেয়ে আধুনিক যে উপকরণটি বাজারে এসেছে, নাম তার থ্রি ডি ওয়াল বা থ্রি ডাইমেনশনাল ওয়াল। উঁচু-নিচু বিভিন্ন ডিজাইনের খাঁজ কাটা থাকে এটিতে। বিভিন্ন সাইজের অসংখ্য ডিজাইনে পাওয়া যায়। একপ্রকার মোটা কাগজের তৈরি এ ওয়াল হয় সাদা রঙের। প্রথমে দেয়াল নির্বাচন করে সেই দেয়ালটিকে কোনো বোর্ড দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তার ওপর একপাশ থেকে একটা একটা করে আঠা বসিয়ে দিতে হবে। এরপর এর ওপর পছন্দসই রং স্প্রে করতে হবে।

টাইলস

এ ব্যাপারে বহুল ব্যবহৃত উপকরণটি হচ্ছে টাইলস। কারণে-অকারণে, বুঝে না-বুঝে অনেকেই বাড়ির যত্রতত্র টাইলস লাগিয়ে থাকেন। অনেকে তো বছর বছর রঙের খরচ বাঁচানোর জন্যও টাইলস লাগান, যা মোটেও উচিত নয়। এতে একদিকে যেমন হয় অর্থের অপচয়, অন্যদিকে ঘটে বাড়ির সৌন্দর্যহানি।

প্রয়োজনীয় জায়গাগুলো ব্যতীত টাইলস লাগানোর আগে একটু ভেবে নিন। কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন, সেটি অন্দরমহলে লাগানোর উপযোগী কি না। বাজারে দেশি টাইলস থেকে শুরু করে চায়নিজ, স্প্যানিশ, ইতালিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের টাইলস পাওয়া যায়। ডিজাইন, টেক্সচার, কালার আর সামর্থ্য মিলিয়ে বেছে নিতে পারেন আপনারটি। অনেকেরই দামের দিকে ঝোঁক লক্ষ করা যায়। দামি হলেই সেটি সব দিক থেকে সবচেয়ে সুন্দর হবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই।

ডেকোরেটিভ টাইলস লাগানোর জন্য আপনি বেছে নিতে পারেন আপনার লিভিং রুমের একটি দেয়াল অথবা টিভি ইউনিটের দেয়ালটি, ফ্যামিলি লিভিংয়ের পেছনের দেয়ালটি অথবা বেডরুমের বিছানার পেছনের দেয়ালটি।

ওয়াল পেনেলিং

দেয়াল নিয়ে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় কাজ করা যায় ওয়াল পেনেলিংয়ের মাধ্যমে। মূলত কাঠ আর বিভিন্ন ধরনের বোর্ডের সংমিশ্রণে করা যায় কাজটি। যেকোনো দেয়ালেই করা সম্ভব পেনেলিং।

গর্জন কাঠের ফ্রেম বানিয়ে তার ওপর সাদা পার্টিকেল বোর্ড, বার্মাটিক ভিনিয়ার বোর্ড অথবা বিভিন্ন টেক্সচারের প্লাইউড দিয়ে পছন্দসই যেকোনো ডিজাইন করে তার ওপর করতে পারেন রং, পলিশ অথবা ল্যাকার পেইন্ট। তদুপরি যেকোনো কাঠ দিয়েও সহজেই করা যায় কাজটি।

ডেকোরেটিভ প্লাস্টার

একসময় বন টাইলের প্রচলন বেশ লক্ষ করা যেত। দেয়ালে সাদামাটা রঙের পরিবর্তে এটি ব্যবহৃত হতো। বলা যায়, ডেকোরেটিভ প্লাস্টার বন টাইলেরই আধুনিক বা পরিবর্তিত রূপ। এতে আলাদাভাবে রং মেশানোর প্রয়োজন পড়ে না। বিভিন্ন আকর্ষণীয় রঙে পাওয়া যায় এই ডেকোরেটিভ প্লাস্টার। কোম্পানির কালার চার্ট দেখে অর্ডার করলে তারাই এসে দিয়ে যাবে।

সিমেন্টের মতো দেখতে প্যাকেট থেকে পাউডার নিয়ে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে তৈরি হয় মন্ড। বালু-সিমেন্টের মতো দেখতে এটি কনি দিয়ে দেয়ালে লাগিয়ে একটি বিশেষ কায়দায় টেনে দিলেই দেয়ালটি হয়ে যায় উলুপোকায় খাওয়া মাটির মতো। সম্ভব হলে দুই-তিন দিন পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন দেয়ালটি।

দেখার সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই উপকরণটির বিশেষ একটি গুণও আছে। আর তা হলো কোনো দেয়াল যদি কিছুটা ড্যাম্প অথবা নোনা ধরাও হয়, তবে এটি তা ঠিকঠাক করে দেয়। পরিমাণভেদে এর খরচ পড়ে প্রতি সিএফটি ৫০-৮০ টাকা।

সতর্কতা

নতুন দেয়ালে কিংবা রং করার আগে এটি ভালোভাবে লাগানো যায়। আর যদি ফিনিশড ওয়াল হয়, তবে দেয়ালটাকে একটু চিপিং করে নেওয়া ভালো। এতে রংটা দেয়ালের সঙ্গে ভালোভাবে আটকে থাকে।

টেক্সচার পেইন্ট

আজকাল কিছু কিছু রং কোম্পানি সাধারণ রঙের পাশাপাশি নতুন কিছু রং বাজারে নিয়ে এসেছে, যেগুলোকে টেক্সচার পেইন্ট বলে। অফুরন্ত ডিজাইনে সমৃদ্ধ এদের কালেকশন। পরিবেশ আর পারিপার্শ্বিকতা এমনকি বিশেষ উপলক্ষ হিসেবেও ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম এই টেক্সচার পেইন্ট। বাজারে এটি যে কোম্পানিগুলো নিয়ে এসেছে, বার্জার পেইন্ট তার মধ্যে অন্যতম। ডিজাইনভেদে এগুলোর খরচ পড়ে সিএফটিপ্রতি ৫০-১৫০ টাকা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬

আব্দুল্লাহ আল মিরাজ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top