….পূর্ব প্রকাশের পর
সিটু মোজাইক
নির্মাণে এই কাজটি বিভিন্ন ধাপে করা হয়ে থাকে, যার পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো-
- আগের ঢালাইকৃত আরসিসি ফ্লোর ভালোমতো চিপিং করা, আলগা ময়লা-মাটি পরিষ্কার করা এবং পানি দিয়ে ওয়াশ করা
- ফিনিশিং লেভেল নির্ধারণ করে নকশা মোতাবেক গ্য¬াস স্ট্রিপ বসানো
- মোজাইক টপিংয়ের জায়গা খালি রেখে প্যাটেন্ট স্টোন (সিমেন্ট, বালু ও ৩/৮ ইঞ্চি ডাউন গ্রেডেড ব্রিক/স্টোন চিপস ব্যবহারে ১ঃ২ঃ৪ অনুপাতে ১ ইঞ্চি পুরু সিসি) ঢালাইকরণ
- কিউরিং করা
- মোজাইক টপিং (১ঃ১ অনুপাতে মার্বেল চিপস ও সিমেন্ট) ঢালাই করা
- কমপক্ষে ২১ দিন কিউরিং করা
- মোজাইক কাটিং মেশিন দিয়ে টপ সারফেস কেটে লেভেল করা
- মোজাইক কাটিং পাথর ও সিরীশ কাগজ দিয়ে হাতে কেটে ফিনিশিং করা
- অ্যাসিড ও মোমপলিশ করা।
সবকাজই সুদক্ষ কারিগর ও সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে করানো প্রয়োজন। এ ছাড়া মোজাইকের কাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল এবং কাজের গুণাগুণ ভালো হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ পুরো কাজের মান ও স্থায়িত্ব নির্ভর করে ব্যবহৃতব্য মালামাল ও কাজের গুণগতমানের ওপর।
উল্লে¬খিত কাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল, যেমন- মার্বেল চিপস, সিমেন্ট, মোজাইক কাটার পাথর, সিরীশ কাগজ, অ্যাসিড, মোমÑ সবকিছুরই গুণাগুণ ও মানের তারতম্য অনেক। ফলে ব্যবহারকারীকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনটা ব্যবহার করবেন। কেননা এসব মালামালের গুণাগুণই কাজের গুণগতমান নির্ধারণ করে থাকে। এরপর কাজের পদ্ধতির ব্যাপারে অভিজ্ঞ মিস্ত্রির বিকল্প নেই। তদ্সঙ্গে সুষ্ঠু তদারকি। প্রথমত, প্যাটেন্ট স্টোন ঢালাইয়ের কাজটি নিয়ম অনুযায়ী করা দরকার। এরপর মোজাইক টপিং কাজের জন্য মার্বেল চিপস চালনিতে চেলে ডাস্ট ফ্রি করতে হবে, অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা থাকলে পরিষ্কার করে পরিষ্কার পানি দিয়ে ওয়াশ করে নিতে হবে। মোজাইকের নির্বাচিত কালার অনুসারে চিপসের অনুপাত ঠিক করে মিশিয়ে নিতে হবে, তারপর সিমেন্ট ও চিপস ১ঃ১ অনুপাতে শুকনা অবস্থায় ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে অল্প অল্প করে পানি দিয়ে ঢালাইয়ের মালামাল মিলিয়ে কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। ঢালাই মেলানোর সময় পানির পরিমাণটা অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। মিস্ত্রিরা সাধারণত কাজের তাৎক্ষণিক সুবিধার্থে অধিক পানি ব্যবহার করে, যা কাজের মান রক্ষায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয়।
মোজাইক ঢালাইয়ের ১০ ঘণ্টা পর অত্র এলাকায় পানি আটকিয়ে কমপক্ষে ২১ দিন পর্যন্ত কিউরিং করতে হবে। কিউরিং শেষে মোজাইক কাটা মেশিনে বিভিন্ন সাইজের পাথর ব্যবহার করে সারফেস ফিনিশিং দিতে হবে। মেশিনে কাটা শেষ হলে পুনরায় পাথর ও সিরীশ কাগজ ব্যবহার করে হাতে কেটে ফিনিশিং দিতে হবে। সবশেষে, অ্যাসিড ও মোমপলিশ করে ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে। মোজাইক ফ্লোরের চারদিকের দেয়ালে ৬ ইঞ্চি উচ্চতা পর্যন্ত মোজাইক করা হয়, যাকে স্কার্টিং বলে। এ ছাড়া টয়লেট ও বাথরুমের দেয়ালে মোজাইক করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লে-খ্য যে খাড়া দেয়ালের মোজাইক কাটার জন্য মেশিন ব্যবহার করা যায় না, এ ক্ষেত্রে পাথর ও সিরীশ কাগজ দিয়ে হাতে কেটে ফিনিশিং দেওয়া হয়।
টাইলস
বর্তমানে ফ্লোর ফিনিশ হিসেবে সিরামিক টাইলসই প্রাধান্য পাচ্ছে। মোজাইকের কাজের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা এবং টাইলসের সহজলভ্যতায় কাজের সুবিধাই এর প্রধান কারণ। টাইলস বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, যেমন- গ্রানাইট, মার্বেল, মোজাইক ও সিরামিক টাইলস প্রভৃতি। এর মধ্যে সিরামিক টাইলস ব্যবহারের প্রচলনই বেশি। কারণ হিসেবে কম দামের বিষয়টিই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সিরামিক টাইলস ফ্লোরের নির্মাণব্যয় যেমন কম, তেমন স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কম। স্থায়িত্ব ও গুণাগুণের দিক দিয়ে উচ্চ মূল্যের ক্রমানুসারে- গ্রানাইট, মার্বেল, মোজাইক ও সিরামিক টাইলসকে সাজানো যেতে পারে। তবে কিছু কিছু বিদেশি সিরামিক টাইলস আছে, যার দাম আনুপতিক হারে অনেক বেশি এবং সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বও বেশি।
টাইলস ব্যবহারের কর্মপদ্ধতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সিটু মোজাইকের তুলনায় অনেক সহজ।
কর্মপদ্ধতি
আরসিসি ঢালাইকৃত ফ্লোরের ওপর ১ঃ৩ অনুপাতে সিমেন্ট ও বালুর মসলা তুলনামূলকভাবে শুকনা অবস্থায় বিছিয়ে তার ওপর সিমেন্ট গ্রাউট দিয়ে টালি বসানো হয়। এই কাজটি করার আগে আরসিসি ফ্লোর ভালোভাবে চিপিং ও পরিষ্কার করে পানি দিয়ে ওয়াশ করা জরুরি। টালি বসানোর ১০ ঘণ্টা পর থেকে কমপক্ষে ৭ দিন কিউরিং করে জয়েন্টগুলো শুধু সাদা সিমেন্ট কিংবা সিমেন্টের সঙ্গে টালির রং অনুযায়ী রং মিশিয়ে পয়েন্টিং করে ব্যবহারের উপযোগী করতে হয়। অত্র কাজগুলো মোজাইকের কাজের তুলনায় অনেক কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব। টাইলস ফ্লোর তুলনামূলকভাবে একটু পিচ্ছিল হয়, ফলে চলাফেরায় সাবধান হওয়া জরুরি। এই ফ্লোর পরিষ্কার করার জন্য বাজারে নানা রকম ডিটারজেন্ট পাওয়া যায়, যাতে সহজেই টাইলস ফ্লোর পরিষ্কার করা সম্ভব।
এমএস/এসএস ওয়ার্কস
এমএস (মাইল্ড স্টিল) ওয়ার্কস বলতে জানালা ও বারান্দার গ্রিল, সিঁড়ির রেলিং, গেট ইত্যাদি কাজগুলোকে বোঝানো হয়, যা সাধারণত ইমারত নির্মাণের সময় ফাঁকা রাখা জায়গার মাপ অনুযায়ী অর্ডার নিয়ে ওয়ার্কস শপ থেকে তৈরি করে নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে এমএসের পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেমন- বারান্দার গ্রিল, সিঁড়ির রেলিং, গেট ইত্যাদি তৈরি করতে এসএস (স্টেইনলেস স্টিল) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল, তবে দৃষ্টিনন্দন। এমএস/এসএস যা-ই হোক না কেন, মালামালের কোয়ালিটি এবং কাজের গুণাগুণ অবশ্যই লক্ষণীয়। বাজারে নানা কোয়ালিটির স্টিল বিদ্যমান, এ কাজে বিভিন্ন মানের ওয়ার্কারস যা কোনো সাধারণ লোকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ফলে, অত্র কাজের জন্য ড্রয়িং, মালামালের স্পেসিফিকেশন থাকা এবং অভিজ্ঞ লোক দিয়ে তদারকি করানো অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে মালামালের সাইজ, ওয়েল্ডিংয়ের ধরন ও ফিনিশিং এবং ফিটিং-ফিক্সিং করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস
অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের মাধ্যমে গ্লাসের জানালা এবং স্লাইডিং/ফিক্সড পার্টিশন ওয়ালের কাজ করা হয়। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন কোয়ালিটির গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম সেকশনসহ এতদ্সংক্রান্ত অন্যান্য মালামাল পাওয়া যায়। গ্লাসের জানালা এবং স্লাইডিং/ফিক্সড পার্টিশন ওয়াল ছাড়াও কোনো কোনো ক্ষেত্রে করুগেটেড অ্যালুমিনিয়াম শিটের ওয়াল এবং বাতাস চলাচলের জন্য অ্যালুমিনিয়াম ল্যুভার ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মালামাল ও কাজের কোয়ালিটির বিষয়টি লক্ষণীয়, যেখানে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।
কাঠের কাজ
একসময় ঘরের জানালা, দরজা, আসবাবপত্র সবই দেশীয় গাছ কেটে সাইজমতো কাঠ চেরাই করে তৈরি করা হতো। অত্র কাজে ব্যবহৃতব্য কাঠ সঠিকভাবে সিজনড করা একটি বিশেষ বিষয় ছিল, যার কমতি হলে জানালা, দরজা, আসবাবপত্র সবই অকালে নষ্ট হয়ে যেত। এ ছাড়া অসার (অপুষ্ট) গাছের কাঠ ব্যবহার করার ফলে দ্রুত পোকা লেগে নষ্ট হয়ে যায়। এখন দেশীয় গাছের চেরাই কাঠের ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছে। প্রথমত, প্রয়োজনের তুলনায় গাছের স্বল্পতা, দ্বিতীয়ত, বিদেশ থেকে আমদানি করা সাইজড কাঠ এবং দেশি-বিদেশি নানা ধরনের বোর্ডের ব্যবহার বাড়ায়। বিশেষ করে জানালা তৈরির কাজে কাঠের ব্যবহার নেই বললেই চলে। শহরে গ্রামে সর্বত্রই অ্যালুমিনিয়াম কিংবা স্টিলের ফ্রেম দিয়ে কাচের জানালাই বহুল প্রচলিত। যা হোক, এত কিছুর পরও কাঠের ব্যবহারে অবশ্যই সর্তকতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। দেশি-বিদেশি যে কাঠই হোক না কেন তা সারি (পুষ্ট) এবং সঠিকভাবে সিজনড হওয়া জরুরি। কাঠের নানা প্রকারভেদ আছে, প্রকারভেদে এর গুণাগুণের তারতম্য অনেক। সুতরাং কাঠ কেনার সময় অভিজ্ঞ লোক থাকা দরকার।
চলবে…
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫