স্থাপনার কাঠামোর ওপর ক্রিয়ারত ফোর্স বা বলকেই বলা হয় লোড। ভবনের নিজস্ব ওজন, তার ওপর অবস্থানরত মানুষ, আসবাবপত্র, মালামাল, যন্ত্রপাতি থেকে উৎপন্ন ওজনের কারণে ভবনের ওপর লোডের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বায়ুচাপ ও ভূমিকম্পজনিত কারণেও ভবনে লোড সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণ অবস্থায় একটি সেতুর ওপর যে পরিমাণ লোড থাকে, যান চলাচলে সেই লোড বাড়ে অনেকাংশেই। সব ধরনের কাঠামোর ক্ষেত্রে লোড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগত লোডের ওপর ভিত্তি করেই ভবনের ভিত্তির ধরন, গভীরতা ও আকার, স্ট্রাকচারাল মেম্বারের (কলাম, বিম, স্ল্যাব ইত্যাদি) আকার-আকৃতি ডিজাইন করা হয়। লোডের ধরন ও মানের সঠিক নিরূপণের ওপর কাঠামোর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনেকটাই নির্ভর করে। প্রস্তাবিত কাঠামো নির্মাণ করার আগেই কাঠামোর ধরন ও ব্যবহার (আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প স্থাপন প্রভৃতি) অনুযায়ী লোডসমূহ বিবেচনা করা হয়।
আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় একই ভবন দোকান, ব্যাংক, আবাসিক হোটেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, হাসপাতাল, পার্টিসেন্টার, রেস্টুরেন্ট, অফিস ইত্যাদির কাজে ব্যবহৃত হয়। যার ফলে একই ভবনে বিভিন্ন রকমের লোড দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রকৌশলীকে ভবনের আগত লোডসমূহ সম্পর্কে আরও বেশি সচেষ্ট থাকতে হয়। এ ছাড়া প্রায়ই দেখা যায়, একটি ভবন যত তলা নির্মাণের জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়, বাস্তবে তার ওপর অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ভবনে অতিরিক্ত লোডের সৃষ্টি হয়। ফলে ঘটে ভবনধসের মতো বড় ধরনের বিপর্যয়। এ ক্ষেত্রে অনেকেই শুধু ইঞ্জিনিয়ারদের দায়ী করে, যেটা অনুচিত। কারণ, প্রায় ক্ষেত্রে ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের অজান্তেই এগুলো ঘটে থাকে। ভবন নির্মাণের আগেই ভবিষ্যতে ভবনের ওপর কী ধরনের লোড আসবে ও লোডের মান কেমন হবে, তা একজন প্রকৌশলীকেই নির্ণয় করতে হয়। এ জন্য স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারকে অবশ্যই অভিজ্ঞ হতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে দিয়ে ভবনের ডিজাইন করলে যেমন আর্থিক সাশ্রয় হয়, তেমনি ভবনটি হয় মজবুত ও নিরাপদ।
ভবনের ওপর ক্রিয়ারত প্রধান লোডসমূহ
- ডেড লোড (Dead Load)
- লাইভ লোড (Live Load)
- উইন্ড লোড (Wind Load)
- ভূমিকম্পজনিত লোড (Earthquake Load)
ডেড লোড
ডেড লোড হচ্ছে কাঠামোর স্থায়িত্বকাল পর্যন্ত যেসব লোডের মান ও অবস্থান পরিবর্তন হয় না। ভবনের নিজস্ব ওজন এবং ভবনের ওপর স্থাপিত স্থায়ী বস্তুর ওজন (ফ্লোর ফিনিশ, ওয়াল, প্লাস্টার, স্থায়ী বস্তু ও যন্ত্রপাতি ইত্যাদি) ডেড লোড হিসেবে বিবেচিত। তবে কাঠামোর নিজস্ব ওজনই ডেড লোডের প্রধান অংশ। যেকোনো কাঠামোর সাইজ ও বস্তুর একক ওজন দ্বারা ডেড লোড পরিমাপ করা হয়।
ভবনে ব্যবহৃত কতিপয় মালামালের একক ওজন দেওয়া হলো:
লাইভ লোড
লাইভ লোড কাঠামোর ওপর আরোপিত চলনশীল লোড। লাইভ লোডের অবস্থান অস্থায়ী। সময়ের সঙ্গে এই লোডের অবস্থানে পরিবর্তন ঘটে (যেমন- মানুষ, ফার্নিচার, অস্থায়ী পার্টিশন, মালামাল)। মানুষ বা ফার্নিচারের অবস্থান কোনো ফ্লোরে বা রুমে একই রকম হয় না। তাই লাইভ লোডের মান ও বণ্টন সব স্থানে একই রকম থাকে না। এ জন্য কাঠামোর স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের সময় বিল্ডিং কোডের সাহায্যে সমভাবে সর্বনিম্ন বিস্তৃত লাইভ লোড নির্ধারণ করা হয়। ভবনের ব্যবহার অনুযায়ী লাইভ লোডের মান হয় ভিন্ন ভিন্ন। শুধু আবাসিক ভবনের জন্য লাইভ লোডের পরিমাণ হলো:
উইন্ড লোড
বাতাসের ফলে কাঠামোর ওপর যে আনুভূমিক লোডের সৃষ্টি হয়, সেটাই উইন্ড লোড নামে পরিচিত। নিচু ভবনে উইন্ড লোডের প্রভাব কম হলেও বহুতল ভবনে এই লোডের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ভবনের আকার, উচ্চতা, বাতাসের বেগ, উইন্ড লোডের প্রধান ফ্যাক্টর, এ কারণেই বিল্ডিংয়ের আকার ও উচ্চতার সমন¦য় সাধন প্রয়োজন।
কাঠামোর ওপর ক্রিয়ারত বায়ুর চাপ F = 0.00256CsV2 (পাউন্ড/বর্গফুট)
এখানে, V = বায়ুর বেগ (মাইল/ঘণ্টা)
Cs = কাঠামোর স্পেস ফ্যাক্টর
বাংলাদেশের কতিপয় এলাকার বায়ুর গতি
ক্রমিক অঞ্চল গতি
ভূমিকম্পজনিত লোড
ভূমিকম্পের ফলে কাঠামোর ওপর সৃষ্টি হয় আনুভূমিক ফোর্স। বর্তমানে ভূমিকম্প ভবনের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের রয়েছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। যেগুলো মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প (রিখটার স্কেলে ৬.৫) হলেও ভেঙে পড়তে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন প্রচুর সম্পদ নষ্ট হবে অন্যদিকে ঘটবে ব্যাপক প্রাণহানি। এ জন্য ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের ক্ষেত্রে অর্থের কথা না ভেবে অবশ্যই অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারের শরণাপন্ন হতে হবে।
ভূমিকম্পের জন্য বাংলাদেশকে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। জোন ভেদে ভূমিকম্পের ফলে উৎপন্ন ফোর্স হবে ভিন্ন ভিন্ন। ভূমিকম্পজনিত লোড যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
- ভবনের উচ্চতা
- ভবনের অবস্থান
- মাটির প্রকৃতি
- ভবনের গুরুত্ব
- কাঠামোর ধরন
- ভূমিকম্পের ক্রিয়ারত সময়
- ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত মালামাল
- ভবনের টোটাল ডেড লোডের পরিমাণ।
এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃষ্টিপাতজনিত লোড, স্নো লোড, তাপমাত্রার পরিবর্তনজনিত উৎপন্ন ফোর্স, মাটির চাপ ইত্যাদি লোড বিবেচনা করে ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন। ভবনে উৎপন্ন লোডসমূহ সঠিকভাবে হিসাব করে ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করলে ভবন হবে ঝুঁকিমুক্ত ও সাশ্রয়ী।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫