নির্মাণে বিস্ময় ন্যানো প্রযুক্তি

আজকের বিশ্বপ্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত।তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, চিকিৎসা, বিনোদন, ইলেকট্রনিকস,শিক্ষাসহপ্রতিটি ক্ষেত্রেইলেগেছে প্রযুক্তির জাদুকরি ছোঁয়া! সমসাময়িক প্রযুক্তির সর্বশেষ সংস্করণ ন্যানো। ন্যানোটেক নামেই যা পরিচিত। পদার্থকে আণবিক পর্যায়ে আনার মাধ্যমেই উদ্ভব ন্যানো উপকরণ আর প্রযুক্তির। ন্যানো প্রযুক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এনেছে উৎকর্ষতার বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সফলতার ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তিটি নির্মাণজগতেও বিছিয়েছে সুবিস্তৃত জাল। সিমেন্ট, কংক্রিট, স্টিল, কাচ, রংসহ প্রভৃতি নির্মাণ উপকরণের অ্যাড মিক্সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ন্যানো পার্টিকেলস বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এ উপকরণ। নতুন এ প্রযুক্তির উপযোগিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়িত্বে, শক্তির ব্যবহার কমাতে এর জুড়ি মেলাভার। নিজে থেকেই সারাবে স্থাপনার ফাটল, শোষণ করবে ক্ষতিকর গ্যাস ও ধোঁয়া, নিয়ন্ত্রণ করবে বাড়তি আলো ও তাপ, দূর করবে ব্যাকটেরিয়া, প্রতিরোধকরবে আগুন- এমনই নানাগুণেসমৃদ্ধ এ প্রযুক্তি যেন অনেকটাই জীবন্ত।সবচেয়ে বড় কথা, এই ন্যানো উপকরণসমূহ যেমন পালকের মতো হালকা, তেমনি ইস্পাতের চেয়েও দৃঢ়। নির্মাণজগতের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করে দীর্ঘদিনসগৌরবে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ নিতেই যত প্রস্তুতি ন্যানো প্রযুক্তির।

ন্যানো গ্রিক শব্দ, যা পরিমাপের একক। ন্যানোপার্টিকেলের ব্যাস ১ থেকে ১০০ ন্যানো মিটারের (mm) মধ্যে। অর্থাৎ ১ ন্যানো মিটার ১  x ১০ মিটার। ন্যানো মিটার এতটাই ক্ষুদ্র, যা ১ মিটারের ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ভাগের ১ ভাগ। ন্যানো পার্টিকেলস তৈরি হয় একধরনের সেমিকনডাক্টিং উপকরণ (সিলিকন) দিয়ে। মাইক্রো প্রযুক্তিতেও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও তা ন্যানোর মতো এত সূক্ষ¥ ও ক্ষমতাসম্পন্ন নয়। কেন ন্যানো এত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তা বুঝতে অণুর কাঠামো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যেমন- হীরা ও কয়লার মূল উপাদানই কার্বন। শুধু অণুর গঠনের পার্থক্যের কারণে হীরা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত ধাতু আবার পেনসিলে ব্যবহৃত কার্বন(গ্রাফাইট) খুবই নরম।

ন্যানো সময়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার হলেও আসলে তা প্রযুক্তির ক্রমোন্ন্নয়ন ও গবেষণার এখন অবধি শেষ ধাপ। আগে (প্রায় ১৭ শতকে) সূক্ষ¥ নির্মাণে অর্থাৎ সোনা,রুপা বা মূল্যবান শোপিস,শক্তপোক্ত তলোয়ার তৈরিতে কার্বন ও ন্যানোর কিছু উপকরণ ব্যবহার করা হতো। বিগত কয়েক বছরে এই প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে,প্রযুক্তির জগতে যা আনছে বিস্ময়কর পরিবর্তন। যেমন- টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, গাড়ি প্রভৃতি। কোন কোম্পানি কত ছোট সামগ্রী বাজারে আনতে পারে, তা নিয়েই যতপ্রতিযোগিতা। ভাবা যায়! যে কম্পিউটারের আয়তনছিল বিশাল এক ঘরজুড়ে, ন্যানো প্রযুক্তিরকল্যাণে আজ তা হাতের তালুতে; বিশাল সাইজের টিভি এখন ঝুলছে দেয়ালজুড়ে। এভাবে প্রতিবছরই আসছে প্রযুক্তির ক্ষুদ্রতর সংস্করণ। তৈরি হচ্ছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ন্যানোমিটার স্কেলের সার্কিট। সেই সার্কিট তৈরিতেই ব্যবহৃত হচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তি। এসব ন্যানো পার্টিকেলস দিয়েই গড়ে উঠছে সুবিশাল ও শক্তিশালী যতঅবকাঠামো।

ভূমির ব্যবহার কমাতে বিশ্বে তৈরি হচ্ছে বহুতল আকাশচুম্বী ভবন বা স্ক্যাইক্রেপারস,বিশাল বিশাল নদীতে তৈরি হচ্ছে সুদীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু, পানির নিচেও চলছে বিরাট নির্মাণযজ্ঞ। যদিও অতীতেও এগুলো তৈরি হতো কিন্তু তার স্থায়িত্বকাল ছিল তুলনামূলকভাবে কম, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ছিল প্রচুর ও ওজনে যা ছিল ঢের বেশি। ন্যানো প্রযুক্তি এসব ত্রুটি দূর করে নির্মাণকৌশল ও উপকরণে আনে ব্যাপক পরিবর্তন। বিশেষ করে স্থাপত্য উন্নয়ন, স্থায়িত্ব বৃদ্ধি, নিরাপদ, শক্তিশালী, হালকা ও পরিবেশবান্ধব কিন্তুআরামদায়ক অবকাঠামো নির্মাণে রাখে সবিশেষ ভূমিকা। ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সিডনির (UTS) একদলপ্রকৌশলী ও গবেষক অস্ট্রেলিয়াতে একটি ন্যানো বাড়ি তৈরিকরেছে ন্যানো উপকরণ ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে। এই বাড়িটিতেবসবাসের অনুভূতিই ভিন্নরকম। পরিবেশবান্ধব এ ধরনের বাড়ি ব্যাপক হারে তৈরির পরিকল্পনা তাদের। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্থাপনা নির্মাণে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে নানা ধরনের ন্যানো পার্টিকেলস ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং এ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন ধরনের ন্যানো পার্টিকেল থাকলেও নির্মাণজগতে যেগুলো বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

কার্বন ন্যানোটিউব

কার্বন ন্যানোটিউব কার্বনের একধরনের বিশেষ অবস্থা। এটা প্রথম আবিষ্কৃত হয় রাশিয়ায়, ১৯৫২ সালে। পরে পুনরাবিষ্কৃত হয় জাপানে ১৯৯০ সালে। ব্যয়বহুল গাড়ি, সিরামিকস, টেনিস ব্যাট, সাইকেল, কমান্ডো ছুরিসহ বিভিন্ন মজবুত উপকরণে এই টিউব ব্যবহৃত হয়।কার্বন ন্যানোটিউব বেশ ব্যয়বহুল। তবে তা নির্ভর করে গুণগতমানের ওপর। কার্বন ন্যানো টিউব দুই ধরনের হয়-

১.      সিঙ্গেল-ওয়ার্ল্ড ন্যানো টিউব

২.     মাল্টি-ওয়ার্ল্ড ন্যানো টিউব

গাড়িসহ অন্যান্য উপকরণে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে নানা উপযোগিতা পাওয়ার ধারাবাহিকতায় নির্মাণের নানা উপকরণেও শুরু হয়েছে এর ব্যবহার। স্থাপনার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য বা কাঠামো মনিটরিং, (NEMS/MEMS), কংক্রিটের চাপ ও প্রসারণজনিত শক্তিমাত্রা বৃদ্ধি, ফাটল রোধ, শীতল পরিবেশ বজায় রাখাসহ বিভিন্ন উৎকর্ষতায় এই উপকরণটি ব্যবহৃত হয়। সোলার সেলে ইলেকট্রন মেডিয়েশন বৃদ্ধিতেও ন্যানোটিউব বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

সিলিকন ডাই-অক্সাইড ন্যানো পার্টিকেল

এই ন্যানো পার্টিকেলব্যবহৃত হয় কংক্রিটের রি-ইনফোর্সড স্ট্রেন্থ বা শক্তিমাত্রা পেতে। এর রয়েছে দারুণ চাপ স্থানান্তরের ক্ষমতা।স্থাপনাকে শীতল রাখতে বিশেষ করে পারমাণবিক চুল্লিতে এই উপকরণের রয়েছে বহুল ব্যবহার।এ ছাড়াআগুন প্রতিরোধ ও কাচে আলোর প্রতিবিম্ব কমাতেও পার্টিকেলটি দারুণ কার্যকর।

টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডন্যানোপার্টিকেল

টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড (TiO2) বহুল ব্যবহৃত হয় হোয়াইট পিগমেন্ট হিসেবে। এটা থেকে অক্সিডাইজ অক্সিজেন ও অর্গানিক উপাদানও বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদন সম্ভব। রং, সিমেন্ট, কাচ, টাইলস ও অন্যান্য নির্মাণ উপকরণে পার্টিকেলটি কার্যকরী। উপাদানটি ক্রমেই হাইড্রোফিলিক উপকরণে পরিণত হয়, যা পানিতে বেশি কার্যকরী। এজন্য কংক্রিটে এই উপকরণ মেশানো হয় দ্রুত হাইড্রেশন, হাইড্রেশনের মাত্রা বৃদ্ধি ও সুপার হাইড্রোফিলিসিটি পেতে। সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি প্রতিহত করতেওএটি সহায়ক। স্বংয়ক্রিয় ময়লা পরিষ্কারক, কুয়াশারোধী কোটিং তৈরিতেও এই অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াসোলার সেলের সাহায্যে অধিক বিদ্যুৎ পেতেও এর জুড়ি মেলাভার।

আয়রন অক্সাইড ন্যানোপার্টিকেল

এই ন্যানোপার্টিকেল কংক্রিটের সক্ষমতা (Compressive Strength) বাড়ায়, বিশেষ করে পানি শোষণক্ষমতা কমায় ও ক্ষয়রোধে সাহায্য করে।

কপার ন্যানোপার্টিকেল

কপার ন্যানোপার্টিকেল বেশি ব্যবহৃত হয় স্টিলে। বিশেষ করে মরিচারোধে, স্টিলের দৃঢ়তা (formability) বাড়াতে এবং ঢালাই ও জোড়া (weldability) লাগার ক্ষমতা বাড়াতে।

সিলভার ন্যানোপার্টিকেল

রং ও কোটিংয়ে অধিক ব্যবহার করা হয় এই ন্যানো পার্টিকেল। সাধারণত এই উপাদানটি স্বংয়ক্রিয় ময়লা পরিষ্কারক ও কুয়াশারোধকধর্মী জৈবিক গুণাগুণ সৃষ্টি করে। এ ছাড়া সোলার সেলেও এর ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে চলছে গবেষণা।

কোয়ানটাম ডটস

কোয়ানটাম ডটস একধরনের সেমিকন্ডাক্টর, যা সোলার সেলের ইলেকট্রন মেডিয়েশন কার্যকর রাখে।

অন্যান্য ন্যানো পার্টিকেলস

ম্যাগনেশিয়াম সূক্ষ¥ ফাটল বন্ধে সিমেন্ট ও কোটিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। রং উজ্জ্বল করতে, কোটিং দীর্ঘস্থায়ীসহ নানা উপযোগে ব্যবহৃত হয়। ন্যানো সিলিকেট পার্টিকেল বা ন্যানো ক্লে প্লাস্টিকে মিশিয়ে অগ্নিরোধী ও তাপরোধী উপাদান পাওয়া যায়, যা তারের কাভার, ফিউজ/ফিউস বাক্স ওসকেট তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।এ ছাড়ান্যানো ফোম, ন্যানো ক্লে, ফুলারেন্স, আরোগেলস, অ্যালুমিনা, ক্যালসিয়াম নির্মাণসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণে নানা সুফল ও প্রযুক্তিগত উপযোগিতা পেতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রিসার্চগেট

নির্মাণে ন্যানো প্রযুক্তি ও উপকরণের ব্যবহার

সিমেন্ট, কংক্রিট, স্টিল, কাচ, রংসহ প্রভৃতি নির্মাণ উপকরণের অ্যাড মিক্সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ন্যানো পার্টিকেলস বা উপকরণ।এগুলো নির্মাণ উপকরণের নানা ত্রুটি দূর করে নানা ধরনের গুণগত পরিবর্তনে যেভাবেসাহায্য করছেÑ

সিমেন্ট ও কংক্রিটে ন্যানো প্রযুক্তি

কংক্রিট সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী। বিশ্বে প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন টনেরও বেশি কংক্রিট উৎপাদিত হয়। এটা উচ্চমাত্রার সংকোচনে পারদর্শী হলেওপ্রসারণ সহনশীলতায় খুবই নাজুক। ফলে কংক্রিটের তৈরি কাঠামোতে প্রায়ই ফাটল দেখা দেয়। আর এই ফাটলের কারণে কংক্রিটের স্থায়িত্ব ক্রমেই কমতে থাকে। কেননা ফাটলের ফাঁক দিয়ে তরল পদার্থ, গ্যাস ও নানা ক্ষতিকারক পদার্থ প্রবেশের সুযোগ পায়। যদি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফাটল তৈরি হয়ে তা কংক্রিটে অবস্থিত রড পর্যন্ত পৌঁছে স্টিলে মরিচারসৃষ্টি করে।

এ ছাড়াকংক্রিটের চাপ ও আঘাত সহনীয় ক্ষমতা কম। তাই কংক্রিটে ই¯পাত দিয়ে রি-ইনফোর্সড করা হয়। এই কংক্রিটের ফাটলের ধরন সাধারণত ধীর ও ক্রমশ। লোড চাপানো হলেই প্রথমে সূক্ষ্ম কিছু ফাটল সৃষ্টি হয়, যা মাইক্রো ক্র্যাক নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে তা একত্র হয়ে বড় আকারেরফাটল সৃষ্টি করে, যাদের ম্যাক্রো ক্র্যাক বলা হয়। এগুলো অবকাঠামোকে ক্রমেই দুর্বল করে ফেলায় অনেক সময় স্থাপনাটিধ্বসে যায়।মাইক্রো ক্র্যাক যেন না হয় এবং লোড প্রতিস্থাপন ক্ষমতা বাড়াতে কংক্রিটে কার্বন ন্যানো ফাইবার ও ন্যানো টিউব যোগ করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি কংক্রিটের ফাটল নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কংক্রিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ঘাতসহ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

কংক্রিটকে কী করে আরও শক্তিশালী ও কর্মক্ষম করা যায়, সে বিষয়ে চলছে নিরন্তর গবেষণা। গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন ন্যানো পার্টিকেলসমৃদ্ধ কংক্রিটের শক্তি সাধারণ কংক্রিটের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। এ ধরনের কংক্রিট ব্যবহার করে যেকোনো স্থাপনাকে করা যায় আরও নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী, যা ভূমিক¤েপরমতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও অবকাঠামোকে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম।কংক্রিটের নানা উপযোগ বাড়াতে প্রাথমিকভাবে সিমেন্টেই মেশানো হচ্ছে ন্যানো স্কেলের ন্যানো উপাদান। যদিও এই মিশ্রণ-প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। কারণ, ন্যানো পার্টিকেলস একে অন্যের সঙ্গে লেগে থাকে। এজন্য পোর্টল্যান্ড সিমেন্টে স্প্রের মাধ্যমে সমভাবে ন্যানো পাউডার মেশানো হয়। এই পাউডার মাইক্রো উপকরণের চেয়েও অনেক ক্ষুদ্র। এই সূক্ষ¥ ন্যানো উপাদান সিমেন্টের হাইড্রেশনপ্রক্রিয়াকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যারফলে কংক্রিট হয়ে ওঠে শক্তি ও স্থায়িত্বে অনন্য।

কংক্রিটেকার্বন ন্যানো পার্টিকেলস মেশানোর সুবিধা

  • কংক্রিটউচ্চক্ষমতাস¤পন্ন হয়
  • কংক্রিটের দুর্বল প্রসারণজনিত শক্তি (Tensile Strength) বৃদ্ধি পায়
  • কংক্রিটের প্রবাহক্ষমতা (Flowability) ও কর্ম উপযোগিতা (Workability) বাড়ে
  • কংক্রিট প্রতিস্থাপনে ভাইব্রেশন মেশিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে করতে হয়, যা খরচ ও সময় বাঁচিয়ে স্থাপনাকে দৃঢ় করে
  • কংক্রিট অবকাঠামোর ভারবহনক্ষমতা (Fatigue Loading Capacity) বাড়িয়ে স্থাপনার দীর্ঘকাল টিকে থাকা নিশ্চিত করে
  • নমনীয় ক্ষমতা বাড়ায় বহুলাংশে।

স্টিলে ন্যানো পার্টিকেলস

ন্যানো টেকনোলজি স্টিলের ফিজিক্যাল বা ভৌত গুণাগুণ বাড়ায়। এই মিশ্রণ স্টিলকে দেয় উচ্চমাত্রার শক্তি।স্যান্ডভিক ন্যানোফেক্স স্টিলে যোগ করে উচ্চমানসম্পন্ন ইয়াং মডিউলস। এটা দেয় হাই স্ট্রেন্থ,যামরিচারোধে কাজ করে।স্টিলের ক্ষেত্রে ফ্যাটিগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাইক্লিক লোড বেশি হলেস্থাপনা ধ্বসে যেতে পারে। স্টিলে কপার ন্যানো পার্টিকেল মিশ্রণের মাধ্যমে নানা ধরনের স্ট্রেস কমানো সম্ভব। এই উপকরণটি মরিচারোধে ও স্টিলে মসৃণতা আনতে সহায়তা করে। স্টিল ছাড়াও স্টিলের তৈরিতারে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। স্টিলের তার ব্যবহার করা হয় প্রচুর ওজন ধরে রাখতে। যেমন, বিশাল আকারের ঝুলন্ত সেতু। প্রচুর সাইক্লিক লোডেও যেন সেতুগুলো ভেঙে না পড়ে এবং তার প্রসারণক্ষমতা বাড়াতে স্টিরের তারে ন্যানোর নানা উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে।

বহুতল ভবনের বিভিন্ন জয়েন্ট জোড়া দিতে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্টিল বোল্ট প্রয়োজন। আর তা তৈরিতেইব্যবহৃতহচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তি। অতিরিক্ত তাপ, চাপ এবং ঠান্ডায় এই বোল্টগুলো যেন অক্ষত থাকে, সে কারণেও ন্যানো উপকরণ স্টিলে মেশানো হয়। এ ছাড়া স্টিলে ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়াম মিশিয়ে তৈরি করাহচ্ছে হিট এফেক্টেড জোন (HAZ);যাতে ওয়েল্ডিং করা হলেও মূল স্টিল পাতের মতোইশক্ত থাকে।

কাঠেন্যানো পার্টিকেলস

কাঠশিল্পেও ভূমিকা রাখছে ন্যানো প্রযুক্তি। ন্যানো প্রযুক্তিতে কাঠে ন্যানো ফিবরিলস বা লাইগ্নোসেলুলোজ নামক একধরনের টিস্যু ব্যবহার করা হয়। এতে কাঠ হয়ে ওঠে স্টিলের মতোই শক্ত। গবেষকেরা এই প্রযুক্তিকে কীভাবে জৈবিক গুণসম্পন্ন করে ব্যবহারের আওতায় আনা যায় সে চেষ্টাই করছে। এই ন্যানো ফিবরিলস কাঠশিল্পের উন্নয়নে নবতর সংযোজন। এ ছাড়া কাঠে উচ্চমানের পানিরোধক কোটিং দেওয়া হচ্ছে, যা কাজ করে জলপদ্মের পাতারমতো। বিশেষ এই কোটিংয়েব্যবহার করা হয়েছে সিলিকা ও অ্যালুমিনিয়া ন্যানো পার্টিকেলস এবং হাইড্রোফোবিক পলিমার। বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাতকৃত এই কাঠ গতানুগতিক কাঠের থেকে আর্দ্রতা সহায়ক এবং তাপ, পানি ও ফাঙ্গাসরোধী গুণসম্পন্ন।

কাচেন্যানো পার্টিকেলস

সাধারণ কাচ ব্যবহৃত হয় ভবনেআবরণ দিতে ও জানালায়। কাচ আলো প্রবেশে সহায়ক, এতে শক্তির অপচয় কমে।কিন্তু কাচ ভবনের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া বছর বছর পরিষ্কার করার ঝামেলাও রয়েছে। ন্যানো প্রযুক্তির সাহায্যে এই ত্রুটিসমূহ মুক্ত করে কাচে আনা হচ্ছেব্যাপক পরিবর্তন। কাচে কোটিং হিসেবে লাগানো হচ্ছে টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড। এই ন্যানো পার্টিকেল প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে সহায়তা করে এবং ভেঙে পড়া রোধ করে। তাছাড়া এই কোটিং স্বংয়ক্রিয়ভাবে নিজেকে পরিষ্কার করতে পারে। অর্থাৎ এই কাচে ধুলা-ময়লার আবরণ জমতে পারে না। নিজ থেকেই তা পড়ে যায়। ফলে পরিষ্কার খরচ বাবদ বছরে মোটা অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হয়।

তবে ন্যানোর আবেদন এখানেই শেষ নয়। অধিক স্বচ্ছ, হালকা শক্ত, তাপসহনীয় ও আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি প্রতিরোধী করতে কাচের একধরনের সূক্ষ¥ স্যান্ডুইস লেয়ারবিশিষ্টস্তরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে ফিউমড সিলিকা (SiO2)। এ ছাড়া কাচকে অগ্নিরোধক গুণসম্পন্ন করতেও যোগ করা হচ্ছে নানা ধরনের ন্যানো পার্টিকেল।

রং ও কোটিংয়েন্যানোপার্টিকেলস

ন্যানোপ্রযুক্তি রং ও কোটিং জগতে বিস্ময়কর এক উপযোগ সৃষ্টি করেছে, এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নিত্যগবেষণায় এ দুটি উপাদানে যত ন্যানো সেল, পোরস ও পার্টিকেলসমৃৃদ্ধ হচ্ছে রং ও কোটিং ততই যেন বর্ণিল ও কার্যকরী হয়ে উঠছে। রঙে ও কোটিংয়েটাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড, অ্যালুমিনা, জিংক অক্সাইডব্যবহারে সারফেসে কোনোধুলা-ময়লা আর দূষিত উপকরণ জমতে পারে না। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে বিভিন্ন অণুজীবকে ধ্বংস করে এই প্রযুক্তি। আবার বৃষ্টির পানি বা বাতাসে তা ধুয়ে বা উড়ে যায়। ফলে স্থাপনা থাকে ফাঙ্গাস, ছত্রাক এমনকি দুর্গন্ধ থেকে সুরক্ষিত।

সারফেস ট্রিটমেন্টেও ব্যবহার করা হচ্ছে ন্যানো পার্টিকেলস। যেমন- টেফলন ও পলিসিলাজেন কোটিং। এই পার্টিকেলগুলোব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধ করে স্বাস্থ্যকর এক বলয় তৈরি করে।টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডের কোটিংয়েস্বয়ংক্রিয় পরিষ্কারকও মরিচারোধী গুণাগুণ বিদ্যমান। এই কোটিংয়ে হাইড্রোফোবিক থাকায় ধাতব পাইপে লোনা পানির আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।

অতি ক্ষুদ্র অ্যালুমিনা কোটিং বা পেইন্টে মেশানো হয়সারফেস প্রলেপ, যাতেস্ক্র্যাচ বা আঁচড় না পড়ে। দামি গাড়ির প্রলেপেও এই পার্টিকেলস ব্যবহার করা হয়।২০০৩ সালে ইতালিররোমে নির্মাণ করা হয় জুবিলি গির্জা। প্রলেপ হিসেবেগির্জার দেয়ালে ফটোক্যাটালিটিক সেলফ ক্লিনিং কংক্রিটের সঙ্গে এই কোটিং ব্যবহার করা হয়। এতবছর পরেও গির্জাটিতে কোনো দাগের লেশমাত্রও পাওয়া যায়নি।

ন্যানো প্রযুক্তির উপযোগিতা

ন্যানোপ্রযুক্তির উপযোগিতা এককথায় বলা সম্ভব না। আপাতদৃষ্টিতে বা গবেষণার ভিত্তিতে প্রাপ্ত নানা সুবিধা ও উপকারী দিক ছাড়াও অনাবিষ্কৃত নানা বিষয় এখনো মানুষের জানার বাইরে রয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্মেচিত হচ্ছে নানা অজানা রহস্য। এনার্জি সাশ্রয়ে এই প্রযুক্তি রাখছে ব্যাপক ভূমিকা। যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটির পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে,যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ শতাংশ এনার্জি ব্যবহৃত হয় আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে। গবেষক দল মনে করে,ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই হার ব্যাপক হারে কমানো সম্ভব। কংক্রিটে ন্যানোর নানা উপজাত মিশিয়ে ধোঁয়াশা শোষক, স্বয়ংক্রিয় ফাটল মেরামতকরণ (Self Heiling), তাপ, অতিরিক্ত আলো,সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি ও ইনফ্রারেড রেডিয়েশন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সাধারণত মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন অক্সাইড উৎপন্ন হয়। বাতাসে সীসাও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানেরপরিমাণও বেশি থাকে, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অতিরিক্ত ও তীব্র শব্দদূষণ তো আছেই। বিভিন্ন ন্যানো উপকরণ স্থাপনায় এ ধরনের দূষণেবাধা সৃষ্টি করে। এ ছাড়াপানিতে ও ভবনের অভ্যন্তরে সৃষ্ট নানা ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু-বর্জ্য সঞ্চালন পাইপের সাহায্যে সহজেই দূর করা যায়।

নির্মাণে ন্যানো প্রযুক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ন্যানো সেন্সর। স্থাপনা ও মানুষের নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য বিবেচনায় ন্যানো সেন্সর প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। সেন্সরগুলোঅবকাঠামোর ঝুঁকি, পরিবেশ ও সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করতে সক্ষম।এ ছাড়াতাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের দূষিত উপাদানওশনাক্ত করতে পারে। ভবনে এই সেন্সর প্রযুক্তি সক্রিয় থাকে যুগের পর যুগ।এ ছাড়া দীর্ঘদিনের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত চাইলে সংরক্ষণও করা যায় সহজেই।

ন্যানো প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

ন্যানোপ্রযুক্তির অবিশ্বাস্য উপযোগিতা থাকলেও এর রয়েছেকিছু সীমাবদ্ধতাও। বেশ কিছু উপকরণের মূল্য এতটাই চড়া যে নির্মাণপণ্যে মেশানো বেশ ব্যয়বহুল। প্রযুক্তিগত জটিলতাও কম নয়। পার্টিকেলগুলো বিভিন্ন উপাদানে মেশাতে প্রয়োজন হয় আলট্রাসনিক ওয়েভ। তাই এখনো গবেষণাগারের গণ্ডি পেরোতে পারেনি অনেক ন্যানো প্রযুক্তি। তবে আশার কথা, দিন দিন কমছে ন্যানো উপকরণের দাম।এ ছাড়া অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ন্যানোর বিভিন্ন উপকরণ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারি ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও না ধ্বংস করে ফেলে।

পরিশেষে

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায়এগিয়ে চলেছে বিশ্ব। ন্যানো এমনই এক প্রযুক্তি, যা কল্পনাকেও হার মানায়। ন্যানো প্রযুক্তি সম্ভাবনার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করছে। বিশ্বের বহু দেশ ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে অর্জন করছেব্যাপক সাফল্য। প্রযুক্তিটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে উন্নত দেশগুলোর সরকার ন্যানোর গবেষণায় ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ন্যানোকে কীভাবে আরও কাজে লাগানো যায়, সে চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। আমাদের দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে থাকলেও ন্যানো-বিষয়ক গবেষণা, উৎপাদন ও ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার এখনই সময়। নানা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দেশে ন্যানো রিসার্স সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ছাড়াবিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ন্যানো-বিষয়ক আলাদা গবেষণাগার ও সেল গঠন করা উচিত। এই প্রযুক্তিই আমাদের শিল্পখাতের উন্নয়নে, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণেও প্রযুক্তিসমৃৃদ্ধ এক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভবিষ্যতেসহায়ক হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৫

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top