প্রচণ্ড গরমে যখন সারা দেশ হাঁসফাঁস করছে, তখন এক বোতল ঠান্ডা পানি আমরা আশা করতেই পারি। অনেক সময় গাড়িতে বা রিকশায় বসে পানি পান শেষ করেই বোতলটা ছুড়ে ফেলি রাস্তায়। আমরা কি কখনো ভেবেছি কী হয় ফেলে দেওয়া এসব বোতলে? বাসায় বা অফিসে দু-চারটা বোতল হয়তো ব্যবহার হয় কিন্তু বাকিগুলো?
বাংলাদেশ পিইটি (PET-Polyethylene Terephthalate) ফ্লেক্স ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্লাস্টিক বোতল উৎপাদনকারী কারখানার সংখ্যা ৮০০-র মতো। সারা দেশে ওষুধ, পানীয় বোতল ও খাদ্যদ্রব্যের বাক্স থেকে বর্তমানে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টনেরও বেশি পিইটি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। আর এই বর্জ্যরে বিরাট একটা অংশই আমাদের ফেলে দেওয়া দৈনন্দিন ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পানীয় বোতল।
পানীয় বোতলের নানামুখী বিকল্প ব্যবহার আমরা অনেকেই করে থাকি। যেমন, বোতলে শো-পিস তৈরি, বোতলে গাছ লাগানো প্রভৃতি। অনেকে আবার বেশ কিছু বোতল জমিয়ে বিক্রিও করে থাকেন। কিন্তু বোতল দিয়ে বাড়ি বানানোর কথা চিন্তা করেছি আমরা কয়জন?
আমরা চিন্তা করি বা না করি, অনেকে কিন্তু ইতিমধ্যে বাড়ি বানিয়েই ফেলেছেন। বাংলাদেশে এ রকম কোনো বাড়ি আছে কি না তা জানা না থাকলেও পাশের দেশ ভারতে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ ইটের বিকল্প হিসেবে শুরু করেছে প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার। বোতলের এ ধরনের ব্যবহারে একদিকে যেমন পরিবেশদূষণ কমাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ি বানানোর খরচও কমে আসছে। ফলে বিষয়টি একটু অদ্ভুত হলেও বেশ আশাব্যঞ্জক।
যতটুকু জানা যায়, বোতলের এ ধরনের ব্যবহারের ধারণাটা আসে জার্মান নাগরিক আন্দ্রেয়াস ফ্র্যোজের মাথায়। যেহেতু প্লাস্টিক সহজে ধ্বংস হয় না বলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে, তাই তিনি একে অন্যভাবে ব্যবহারের চিন্তা করেন। বোতলের ভেতর আবর্জনা বা বালু ভর্তি করে তা দিয়ে বাড়ি বানানো শুরু করেন। এতে যেমন পরিবেশ রক্ষা হলো, তেমন বাড়ি বানানোর খরচও কমে এল।
আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে ২০০১ সালের দিকে আন্দ্রেয়াস ফ্র্যোজে হন্ডুরাসে ইকো-টেক নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ৫০টির মতো বাড়ি তাঁরই নব-উদ্ভাবিত বোতল-ইটের সাহায্যে বানিয়ে ফেলেন। এগুলো বোতলের তৈরি হলেও বেশ মজবুত, টেকসই এমনকি ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয়। কিন্তু আন্দ্রেয়াস যখন প্রথম এই প্রকল্পের কথা বলেন, তখন কেউ খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে উৎসাহের বদলে সংশয়ই ছিল বেশি। কিন্তু যেহেতু এমন বাড়ির ধারণা গতানুগতিক নয়, সে কারণেই বিষয়টি আকর্ষণীয়। কৌতূহল মেটাতে অনেক মানুষ নির্মাণকাজ দেখতে আসেন। তখন আমরা তাঁদের দেখাতে পারি, কীভাবে কাজ করছি আমরা। তাঁরাও বুঝতে পারেন যে সাধারণ ইটের চেয়ে প্লাস্টিকের বোতল অনেক বেশি টেকসই। উপাদান হিসেবে বোতল আরও শক্ত এবং বেশি ধাক্কা সামলাতে সক্ষম।’
এসব দিক বিবেচনা করে নাইজেরিয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর রিনিউয়েবল এনার্জি (DARE) ও ভারতের ‘সমর্পণ ফাউন্ডেশন’ নামক দুটি এনজিও নিম্নবিত্তদের জন্য শুরু করেছে প্লাস্টিক বোতলে বাড়ি নির্মাণ। এ ধরনের বাড়ি নির্মাণের বড় সুবিধা হচ্ছে ইটের পরিবর্তে বালুভর্তি বোতল ব্যবহার করায় খরচ অনেক কম হয়। যেখানে মানভেদে এক হাজার ইটের দাম আট থেকে বারো হাজার টাকা, সেখানে এক হাজার পুরান বোতলের দাম সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা।
DARE ও Eco-Tec-এর বিশেষজ্ঞ মতে, সাধারণ ইট তৈরি করতে প্রচুর শ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি কাঠ, কয়লা বা গ্যাস পোড়ানো হয় এবং কার্বণ নিঃসরণ করে, যা পরিবেশের জন্য বিরাট হুমকি। এদিক থেকে ব্যবহৃত বোতল-ইট সাধারণ ইটের বিকল্প হিসেবে অনেক জ্বালানি ও শ্রমসাশ্রয়ী। এ পদ্ধতিতে মাত্র ৫ শতাংশ সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, যাতে সিমেন্ট কারখানারও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি কম তাপ উৎপন্ন করে। অন্যদিকে PET বোতল ৩০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে আর এর ভেতর যেভাবে বালু ভর্তি করা হয় তা জমে গিয়ে ইটের চেয়ে অন্তত ২০ গুণ শক্তিশালী হয়। এমনকি ইট, কংক্রিটের একতলা বাড়ির খরচ দিয়ে প্লাস্টিক বোতল দিয়ে তিনতলা বাড়ি বানানো সম্ভব।
কীভাবে তৈরি হয় এ বাড়ি? প্রথমে হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাস বা লঞ্চ থেকে বিভিন্ন পানীয়ের বোতল সংগ্রহ করা হয়। এরপর এসব বোতলে বালু বা এ ধরনের আবর্জনা দিয়ে ভর্তি করা হয়। তারপর ইটের মতো করে একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে মাটি বা সিমেন্ট দিয়ে বোতলগুলোকে জুড়ে দিয়ে দেয়াল তৈরি করে এর ওপর টিন বা এ ধরনের কিছু দিয়ে ছাদ দেওয়া হয়। আর পুরো কাঠামোটা ঠিক রাখতে বোতলের মুখগুলোকে নাইলনের দড়ি দিয়ে একটির সঙ্গে আরেকটি বেঁধে রাখা হয়। সাধারণ মাটি বা ইটের তৈরি বাড়ির মতোই এসব বাড়িতে দরজা জানালার ব্যবস্থা থাকে, ফলে বায়ু চলাচলে কোনো অসুবিধা হয় না।
প্লাস্টিক এমন একটা পদার্থ, যা সহজে নষ্ট হয় না বা মাটির সঙ্গে মেশে না। তাই এটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেকোনো ধরনের প্লাস্টিক দ্রব্য মাটির সঙ্গে মিশে মাটির উর্বরতাসহ অন্যান্য গুণাগুণ নষ্ট করে। ঢাকার পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হচ্ছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল ও প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন পণ্য। একই ভাবে নদী ও সমুদ্রে এসব প্লাস্টিক বর্জ্যরে ব্যাপক উপস্থিতি বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন প্রাণী এসব বর্জ্য খেয়ে মারা যাচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পড়ছে হুমকির মুখে। বাড়ি নির্মাণে প্লাস্টিক বোতলের এ রকম বিকল্প ব্যবহার একদিকে যেমন সাশ্রয়ী আবাসের জোগান দিতে পারে, তেমনি রক্ষা করতে পারে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫