নগর ঢাকার যানজট ও জলজট

ঢাকায় এখন বৃষ্টি না হতেই জলজট ও যানজট। উভয়ই যেন একে অন্যের পরিপূরক। কিছু জায়গায় তো মানুষ সারা বছর জলাবদ্ধতার মধ্যেই দিনযাপন করছে। অবস্থা এমনই যে এখন হরতাল-অবরোধের মধ্যেও যানজট হয়। কোনো একটা দিন যদি রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে স্বাভাবিক দিন পাওয়া যায়, সেদিনও রাস্তাঘাটের অবস্থা থাকে পুরোটাই বেহাল। সব মিলে নগরীতে  গভীর রাত পর্যন্ত এখন যানজট লেগেই থাকে। ১০-১৫ মিনিটের পথ যেতে কখনো কখনো দুই-তিন ঘণ্টাও লাগে। মহাসড়কগুলোর অবস্থাও করুণ। প্রায়ই মাইলের পর মাইল যানজট লেগে থাকে। মূলত মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা-পুকুর-জলাশয় ভরাট করে যত্রতত্র বাড়িঘর নির্মাণ, সবুজ অঞ্চল কমে যাওয়া, ভাঙাচোরা সড়ক, সড়কের ওপর হাটবাজার, ফুটপাত বেদখল, যত্রতত্র পার্কিং, রাস্তার ধারণক্ষমতার চেয়ে গাড়ির সংখ্যাধিক্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির কারণে এখন কমবেশি দেশের সর্বত্র একই অবস্থা বিরাজ করছে। কিন্তু এসব নিয়ে সরকারের তথা সংশ্লিষ্ট কারও তেমন মাথাব্যথা নেই। প্রতিদিন ঢাকায় জলজট ও জলাবদ্ধতা, পানিবন্দী মানুষের কষ্ট এবং যানজটে মানুষের করুণ ভোগান্তির ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং যার অনেকটাই টক-শোর আলোচনায় সীমাবদ্ধতা থাকে। যানজটের কারণে প্রতিদিন কত যে মূল্যবান শ্রমঘণ্টা ও জ্বালানি নষ্ট হচ্ছে তার জন্যও কারও কোন ইয়ত্তা নেই, নেই কোন প্রতিক্রিয়াও। এক হিসাব মতে, রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কখনো এসব বিষয়ের ব্যর্থতার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেশের কোনো মন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার প্রধানের পদত্যাগ বা অপসারণের নজির নেই। আর আজকাল তো কিছু একটা হলেই আগের সরকার বা বিরোধী দলের ওপর ব্যর্থতার দায়ভার চাপিয়ে  দেওয়া হয়। অথচ বর্তমানে দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের ধারাবাহিক শাসন চলছে, তাই এই অভিযোগ ধোপে টেকার নয়। তথাপি এই অপরাজনীতিতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে, মানুষ ভেতরে ভেতরে হয়ে উঠছে ক্ষুব্ধ।

তবে বিভিন্ন সময়ে এই সমস্যা থেকে উত্তরণে কিছু পরিকল্পনা ও প্রকল্প যে গৃহীত হয়নি তা নয়। কিন্তু সুচিন্তিত ও সমন্বিতভাবে আজ অবধি কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না হওয়ায় দিনে দিনে সমস্যাটি ব্যাপকতা লাভ করছে। উদ্ভূত অবস্থায় ঢাকায় অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উত্তর ও দক্ষিণের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরা অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন, অঙ্গীকার করেন এবং সম্প্রতি তাঁরা প্রথম বাজেটও পেশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে হাজারো সমস্যায় জর্জরিত ও দ্বিখণ্ডিত সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত মেয়ররা কোনো সমস্যা নিরসনে কার্যত কিছুই করতে পারছেন না। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো নগরীর উন্নয়নের সঙ্গে অসংখ্য মন্ত্রণালয় এবং সংস্থার সম্পৃক্ততা। স্ব-স্ব ও ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনায় প্রকল্প গ্রহণ ও নিজস্ব ধ্যান-ধারণায় বাস্তবায়নের কারণে কোনো বিষয়ে কোনো সাফল্যই চোখে পড়ছে না। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রায়াঙ্গেলে ‘ডিএনডি’ এলাকাটি কার নিয়ন্ত্রণে তা আজও অস্পষ্ট। এমনকি একই মন্ত্রণালয়ের অধীনের সংস্থাগুলোর কাজেও নেই সমন্বয়। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার মধ্যে বরাবর দোষারোপ চলছে। অচিরে হয়তো-বা দ্বিখণ্ডিত করপোরেশনের মধ্যেও এ ধরনের আরেক বাক্যুদ্ধ শুরু হবে। একই অবস্থা বিরাজ করছে ঢাকার নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে। আবার যার যা ম্যান্ডেটেড নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাতে তারা জড়িয়ে সমস্যার আরও ব্যাপকতা সৃষ্টি করছে। সব মিলিয়ে ঢাকা এখন  কার্যত বসবাসের অযোগ্য ও অচল নগরে পরিণত হয়েছে।

খাল-নদী-ঝিলের শহর ঢাকা

বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা-বালু-টঙ্গী-তুরাগ নদী পরিবেষ্টিত ঢাকা অনেকটাই ‘অন্তর্দ্বীপ’-এর মতো। আগে এর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতো অনেকগুলো খাল ও উপনদী। কারও কারও মতে, যার সংখ্যা ৬০-৬৫টির কম নয়। ধোলাই খাল, বুড়িগঙ্গা নদী ও মতিঝিল-রামপুরা হয়ে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। আরামবাগ-সেগুনবাগিচা খাল রমনা ও পরিবাগ খাল দিয়ে ধানমন্ডি-কলাবাগান-তেজগাঁও খালের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, যার এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। যুগে যুগে ঢাকার প্রায় সব খাল ভরাট ও বেদখল হয়ে রাস্তা ও বাড়িঘরে পরিণত হয়েছে। অথচ একদা বিভিন্ন জীব-বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ এসব খাল-উপনদীই ছিল ঢাকার প্রধান পরিবহন পথ। তন্মধ্যে কিছু খাল-ঝিলের নামে তো স্থানীয় জায়গারও নাম হয়েছে। যেমন মতিঝিল, হাতিরঝিল ইত্যাদি। পুরান ঢাকায় ধোলাই খালের ওপর ‘লোহার পুল’ ও ‘কাঠের পুল’ বা তেজগাঁওয়ে কারওয়ান খালের ওপর ‘আম্বর সেতু’ তখন শহরবাসীর চিত্তবিনোদনের জায়গা ছিল। সে সময় বালু নদীর সঙ্গে রামপুরা-হাতিরঝিল-তেজগাঁও-বেগুনবাড়ী-কলাবাগান-ধানমন্ডি-ইব্রাহিমপুর-কল্যাণপুর খাল দিয়ে তুরাগ নদীর সংযোগ ছিল। প্রকাশ, ভাওয়াল রাজা মানসিংহ এই খাল-নদীপথ দিয়ে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতেন। পিলখানা ও হাতিরঝিলে তাঁর হাতিবহরের আস্তাবল ছিল। কথিত আছে, পর্তুগিজরাও নাকি ওই নৌপথ দিয়েই ঢাকায় প্রবেশ করে তেজগাঁওয়ে তাদের বসতি গড়েছিল। সেই সময় এই নৌপথটি যে কত চওড়া ছিল তা সাম্প্রতিককালে হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী খালের (সোনারগাঁও হোটেলের দক্ষিণে) পুনঃউন্নয়ন করা অংশ দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়।

বেনার নিউজ

ইতিহাসে দেখা যায়, হাতিরঝিল-তেজগাঁও-কলাবাগান-ধানমন্ডি এলাকায় তৎকালীন ঢাকা দ্বিখণ্ডিত ছিল। বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-বালু নদী থেকে বিভিন্ন গুচ্ছে অনেক খাল-নালা ও উপনদী প্রবাহিত হয়ে শহরের মধ্যখানে এই জায়গায় মিশে ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন ঢাকার উত্তর সীমানার নৌপথভিত্তিক তেজগাঁও শিল্প এলাকা, মোহাম্মদপুরে কৃষিপণ্যের বাজার, রায়েরবাজারে ট্যানারি শিল্প  গড়ে উঠেছিল। আর বুড়িগঙ্গার মতো এই খাল-নদীপথের দুই ধারেও গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন পেশার লোকজনের বসতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য। তন্মধ্যে মগবাজার, উলন, মালিবাগ, রামপুরা, দাসপাড়া, কামারপাড়া ইত্যাদি নামের জায়গাগুলো এখনো স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে, যদিও এসব জায়গায় এখন আর সেসব পেশাজীবী লোকের বসতবাটি নেই।

মোগল তথা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলেও ঢাকায় অনেক স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল এসব খাল-নদী ও জলাশয়ের সৌন্দর্যকে ভিত্তি করে। প্রায় প্রতিটা স্থাপনার আশপাশে ছিল বিভিন্ন ধরনের জলরাশি। ‘শহর ঢাকা’ খ্যাত জায়গায় ‘সাতগম্বুজ মসজিদ’টি নির্মিত হয়েছিল ধানমন্ডি-রায়েরবাজার এলাকার বিস্তীর্ণ জলরাশির ধারে। পাকিস্তান আমলে এর পশ্চিম ও আশপাশের ধানক্ষেত ও নিচুজমিতে ‘ধানমন্ডি’র পরিকল্পনা করা হয়। একইভাবে ভোলা খালের উপকণ্ঠে গুলশান-বনানী মডেল টাউন প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এসব খালের শাখা-প্রশাখায় গড়ে তোলা হয় রমনা, ধানমন্ডি ও গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকসমূহ। আগে এসব লেক আরও অনেক চওড়া ছিল, যা আজ আর নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে যদি তখন ঢাকার এসব খাল-নদী-ডোবা-লেকের ধারে সড়ক বা ফুটপাত এবং ব্রিজ বা সেতু নির্মাণ করে যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো, তাহলে আজ ঢাকা হয়তো কমবেশি প্রাচ্যের ‘ভেনিস’ শহরের মতো থাকত।

নগরীর সম্প্রসারণ

বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে ‘আদি ঢাকা’, টঙ্গী-তুরাগ নদীর ধারে টঙ্গী-মিরপুর-রায়েরবাজার, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর ধারে নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা-কাঁচপুর এবং উত্তর-পশ্চিমে বংশী নদীর পাশে সাভার-গাজীপুর এলাকা গড়ে ওঠে এবং পর্যায়ক্রমে তার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। পুরান ঢাকা-রমনা-তেজগাঁও-মিরপুর-সাভার-টঙ্গী-গাজীপুর ও উত্তর-পূর্বে মধুপুর ট্রাক্টের কিছু এলাকা ব্যতীত সমগ্র ঢাকা অঞ্চল ছিল সার্বিকভাবে একটা নিচু এলাকা এবং খাল-নালা ও বিভিন্ন ধরনের জলাশয় আর উপত্যকায় পরিপূর্ণ। এসব এলাকায় স্থানে স্থানে টিলা ও উঁচু জমিতে বিভিন্ন ধরনের পেশাভিত্তিক মানুষের সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নগরায়ণের বুৎপত্তি ঘটে। স্ব-স্ব মহিমায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন ধরনের গ্রাম-মহল্লা। আর বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের সমন্বয়ে পুরান ঢাকা গড়ে ওঠে আঁকাবাঁকা এবং সরু রাস্তা ও অলিগলির সংমিশ্রণে। এ জন্য ঢাকাকে ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির শহর’ বলা হয়, যে অবস্থা এখনো সম্প্রসারিত ঢাকার অনেক এলাকায়ও বিদ্যমান।

মোগল আমলে (১৬৭৮-৭৯ সালে) ঢাকায় প্রথম পাকা রাস্তা নির্মিত হয়। বস্তুতপক্ষে, তখনকার যুদ্ধবাজ শাসকদের শাসনামলে ঢাকা শহর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সমতল ও উঁচুভূমিতে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। ইসলাম খাঁ কর্তৃক বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপন করার পর তখন নদীর ওপারে জিঞ্জিরা-কেরানীগঞ্জ এলাকায়ও শহরের বিস্তৃতি ঘটেছিল। সেই সময় ঢাকার বিভিন্ন ধরনের তাঁত ও কারুশিল্প বিশ্ববাজারে ব্যাপক আলোড়িত ছিল এবং নদী-সমুদ্রপথে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক সমৃদ্ধিও ঘটেছিল। ওই সমৃদ্ধিতে আকৃষ্ট হয়ে তখন বিদেশি পর্যটক ও বণিকেরা দলে দলে ঢাকার দিকে ধাবিত হতে থাকে। এভাবে ইতিহাসের কালচক্রে ঢাকা একপর্যায়ে বিদেশি শাসকদের কবজায় চলে যায়। কিন্তু মোগলদের হটিয়ে দেওয়ার পর উপমহাদেশের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিন (প্রায় দেড় শ বছর) ঢাকায় কোনো ধরনের উন্নয়ন হয়নি, যখন ঢাকা একপর্যায়ে একটা সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ ও রুগ্ণ শহরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আর ওই সময় ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় নবাব-সরদার ও জমিদারদের দৌরাত্ম্য, যার অনেক নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষ রয়েছে এখনো সমগ্র মহানগরী জুড়ে।

ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দিকে দুটি বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেনাদের চলাচলের জন্য ঢাকায় কিছু নতুন রাস্তাঘাট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। নবাব পরিবারের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যবস্থা করা হয় সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দপ্তর ও আবাসনের। দিলকুশার নবাববাড়িতে পূর্ব বাংলার লর্ডসের দপ্তর কাম বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয় (যা আজকের বঙ্গভবন)। নগরীর প্রতিরক্ষাব্যূহ সুদৃঢ় করার জন্য পর্যায়ক্রমে রাজারবাগে পুলিশ লাইন, পিলখানায় রাইফেলস বাহিনী, তেজগাঁও বিমানবন্দর ও বিমানবাহিনী, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং উত্তরে কুর্মিটোলা এরোড্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি তখন কিছু পরিকল্পিত আবাসিক এলাকারও বিন্যাস ঘটে। এর মধ্যে ওয়ারী-স্বামীবাগ-গোপীবাগ, রমনা-পল্টন-ইস্কাটন ও মিন্টু-বেইলি রোড অন্যতম। তন্মধ্যে ওয়ারীই ছিল ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। এসব এলাকায় শহরের সামর্থ্যবান লোকজনদের প্ল¬ট বরাদ্দ করাসহ সেখানে পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন, প্রশাসনিক ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সার্ভে ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ইত্যাদি গড়ে তোলা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ তাণ্ডব, দুর্ভিক্ষ ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকার উন্নয়ন আবারও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। 

বন্যার সঙ্গে বাস!

আগেকার দিনে ঢাকার মানুষ সরাসরি শহরের পুকুর-নদী-ঝিল-ডোবার পানি পান ও তা গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করত। প্রতিবছর কমবেশি বন্যা হতো অর্থাৎ ‘বন্যার সঙ্গে বসবাস’(Live with Floods)-ই ছিল মানুষের জীবনদর্শন। Gravity Flow-তে শহরের বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন হতো। কিন্তু আগে উল্লেখিত বিভিন্ন ধরনের ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরে অপরিকল্পিতভাবে বসতবাটি ও স্থাপনা নির্মাণের আগ্রাসনের কারণে খাল-নালা-জলাধারগুলো ভরাট হয়ে ময়লা-আবর্জনায় স্তূপে পরিণত হতে শুরু করে। এতে দেখা দেয় নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়। তবে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিশেষ করে ঢাকার খাল-নদীর সংরক্ষণ ও পরিবেশগত উন্নয়নে অনেক আইন ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়নে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় এর কোনোটি থেকেই আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। Bengal Canal Act, Bengal Pond Act, ইমারত নির্মাণ আইন, নগর উন্নয়ন আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলাধার সংরক্ষণ আইন ইত্যাদির যথাযথ প্রয়োগ হলে নিশ্চয় ঢাকার আজকের এই অবস্থা হতো না।

বেনার নিউজ

১৯০০ শতাব্দীর প্রথমদিকে ঢাকাকে পুনরায় পূর্ব বাংলার রাজধানী করার পর ক্ষয়িষ্ণু শহরের সার্বিক পরিবেশগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশিষ্ট ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী ও পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গ্যাডেসকে নিয়োজিত করা হয়। ১৯১৭ সালে তাঁর রচিত প্রতিবেদনে ঢাকার ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষিত বিশ্লেষণপূর্বক শহরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, নতুন আবাসন ও শিল্পায়ন সম্ভাবনা এবং বিদ্যমান খাল-নালা ও উন্মুক্ত স্থানাদি সংরক্ষণ বিষয়ে অনেকগুলো সুপারিশ ছিল। কিন্তু রমনা এলাকার উন্নয়ন ব্যতীত এসব সুপারিশমালার আর কোনোটির তেমন বাস্তবায়ন হয়নি। এর পেছনে একটা অন্যতম কারণ ছিল সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব। প্রসঙ্গক্রমে তখন শহরের উন্নয়ন, রাস্তাঘাট ইত্যাদির নির্মাণ হতো কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকরণসহ ড্রেনেজের দায়িত্বে ছিল স্থানীয় পৌর কমিটি ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের ওপর। একইভাবে অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজেও কোনো ধরনের সমন্বয় ছিল না। আর ১৯৬২ সালে ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত শহরের খাল-নালা সংরক্ষণ বা সংস্কারের কাজের জন্য সুস্পষ্টভাবে কারও কোনো ধরনের দায়বদ্ধতাই ছিল না।

অবশ্য এর আগে ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫৯ সালে ডিআইটির অধীনে ঢাকার উন্নয়নের জন্য প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণীত হয়। ওই মহাপরিকল্পনাটির মুখ্য দর্শন ছিল Live with Floods এবং সে অনুসারে ঢাকার উভয় পাশে বিস্তীর্ণ নিচু জায়গার উন্নয়নের পরিবর্তে নগরীর উত্তর-দক্ষিণে যথাক্রমে টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জের দিকে সম্প্রসারণ ও নতুন শহর তৈরির জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু তখনকার দেশের অস্থিতিশীল রাজনীতিতে ডিআইটির পক্ষে ওই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বস্তুত, ডিআইটি বা আজকের রাজউককে কখনো সেভাবে গঠনও করা হযনি। অতঃপর স্বাধীনতার পরে জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের দাপটে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় খাল-নালা-জলাশয় দখলের মচ্ছব চলে এবং নগরীতে সবুজ জায়গা কমে গিয়ে চরম জলাবদ্ধতা মতন সমস্যার সৃষ্টি হয়। ওই অবস্থায় ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর নগরীর পয়োনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বিত দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা ওয়াসার ওপর, নদী ও Regulating Ponds সংরক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর আর নৌপথ ড্রেজিং ও পরিচালনার দায়িত্ব বিআডব্লি¬উটিএর ওপর। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানেই ওই দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ছিল না এবং ছিলেন না কোনো সমন্বয়কারীও। তা ছাড়া ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এখনো দেশের খাল-নদীর পাড় বা জলাশয় বন্দোবস্ত প্রদান করে আসছে জেলা প্রশাসন। সংগত কারণে এতগুলো সংস্থা ও মন্ত্রণালয় ঢাকার পরিকল্পনা ও উন্নয়নে জড়িত হওয়ায় আজকের এই দুরবস্থার সূত্রপাত হয়েছে।

চলবে…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top