কনস্ট্রাকশন ওয়ার্ক শিডিউল

প্রতিটি কনস্ট্রাকশন কাজের জন্য নির্মাণ শিডিউল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সব ধরনের সফল নির্মাণ বা যেকোনো কাজই একটি নির্দিষ্ট দিনে শুরু হয় এবং একটি নির্দিষ্ট দিনে শেষও হয়। তার জন্য প্রয়োজন সুনিদিষ্ট লক্ষ্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কাজটি কি আরও কম সময়ে শেষ করা যেত না? বা নির্মাণকাজটি কি কোনো রকম বিরতি ছাড়া সব কাজ একে অন্যের সঙ্গে সমন্বয় করে করা যেত না? নির্মাণে সমন্বয় সাধন (অর্থাৎ একটি অ্যাকটিভিটির সঙ্গে অন্য একটি অ্যাকটিভিটির যে সম্পর্ক) খুবই অপরিহার্য একটি বিষয়। কারণ, একটি অ্যাকটিভিটি শেষ না হলে অন্য একটি অ্যাকটিভিটি শুরু করা যায় না। যেমন-

  • মাটি কাটার পর ফাউন্ডেশনের কাজ করতে হয়
  • ফ্রেম স্ট্রাকচার না করে ব্রিকস ওয়ার্ক করা যায় না
  • ব্রিকস ওয়ার্ক শেষে লিন্টেল ও ফলস স্লাব না করে চৌকাঠ বা গ্রিল লাগানো যায় না
  • ওয়ালে ইলেকট্রিক কনসিলিং না করে প্লাস্টার করা যায় না
  • সব ইউটিলিটি লাইনের কাজ শেষ করে বাইরে প্লাস্টার বা টাইলসের কাজ শুরু করতে হয়।

ওয়ার্ক শিডিউলে সাধারণত প্রকল্পের মেয়াদ এক বছরের কম হলে পূর্ণ সময়কে কতগুলো সপ্তাহে বিভক্ত করা হয়। আবার প্রকল্পের মেয়াদ বছরের বেশি হলে পূর্ণ সময়কে কতগুলো মাসে বিভক্ত করা হয়। নির্মাণ শিডিউলে প্রকল্পের অপারেশন বা অ্যাকটিভিটিসমূহ, তাদের পরিমাণ, নির্মাণকাজের অগ্রগতির হার, পরিমাণসহ প্রতিটি অপারেশন শুরুর এবং শেষের তারিখ উল্লেখ থাকে। যাতে নির্ধারিত তারিখে সম্পাদিত কাজের পরিমাণ উল্লেখ থাকে। শিডিউল অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি হচ্ছে কি না তা নির্মাণ শিডিউল থেকে সহজেই বোঝা যায়। শিডিউল অনুযায়ী কাজের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ পরিচালনা করতে হয়, যাতে শিডিউল মোতাবেক নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। সে ক্ষেত্রে প্রজেক্টে মালামালের পর্যাপ্ততা থাকতে হবে এবং শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির যথোপযুক্ত ব্যবহার এবং উপস্থিত নিশ্চিত করতে হয়।

শিডিউল তৈরিতে লক্ষণীয়-

১. বিভিন্ন অ্যাকটিভিটিতে সময় বণ্টন

২. কখন কোনটি করতে হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত

৩. অ্যাকটিভিটির অগ্রগতির রেকর্ড।

লক্ষ রাখতে হবে যেন কোনো কারণে অর্থাৎ শ্রমিকের অনুপস্থিতি, যন্ত্রপাতির বৈকল্য বা প্রতিকূল আবহাওয়া ইত্যাদি কাজের লক্ষ্যমাত্রাকে বিঘ্নিত না করতে পারে। প্রকল্পের জন্য যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও শ্রমিকের সংখ্যা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হয়, যাতে প্রতিটি অপারেশনের সর্বাধিক আর্থিক সাশ্রয় নিশ্চিত করা যায়। শিডিউলে প্রতিটি অ্যাকটিভিটির শুরু ও শেষ হওয়ার তারিখ উল্লেখ থাকে সর্বোপরি কনস্ট্রাকশন শিডিউল প্রস্তুত শেষে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না অথবা কোনো অ্যাকটিভিটির সময় কমিয়ে অন্য কোনো টাইট অ্যাকটিভিটির সময় বাড়ানো যায় কি না তা পুনরায় পরীক্ষা করে দেখতে হয়। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কিছুটা পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে বাস্তবসম্মত একটি নির্মাণ শিডিউল প্রস্তুত করতে হয়।

সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে নির্মাণ শিডিউল প্রস্তুত করতে হয়। যথা-

১. বারচার্ট (Bar Chart)

২. ক্রিটিক্যাল পাথ মেথড (Critical Path Method) সংক্ষেপে CMP.

বারচার্ট

বারচার্ট আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয় শিডিউল নির্মাণপদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্রথমে প্রকল্পকে কতগুলো ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা হয়, যাকে অপারেশন বলে। প্রতিটি অপারেশনে মোট কাজের পরিমাণ এবং কার্য সম্পাদনের জন্য সময় নির্ধারিত থাকে।

ওপরে একটি ইটের তৈরি একতলা বাড়ির কনস্ট্রাকশন শিডিউল প্রস্তুত প্রণালি দেখানো হলো। দলটি অ্যাকটিভিটির সমন্বয়ে শিডিউলটি তৈরি। প্রতিটি অ্যাকটিভিটির জন্য সময় নির্ধারিত। সময়কে মাসে দেখানো হলো-

A-Excavation of foundation                Jan 15

B-Cement concrete in foundation     Feb 15

C-Masonary in foundation                 Mar 15

D-Masonary in Super Structre           Apr-Jul 15

E-Roofing                                           Aug 15

F-Plastering                                        Sep-Oct 15

G-Wood Work                                    Nov 15

H-Flooring                                          Oct-Nov 15

I-Painting                                           Nov 15

J-Fixing Service & Completion           Dec 15

শিডিউলে সুস্পষ্টভাবে সময় উল্লেখ থাকবে। বার শিডিউলে উপরিভাগে প্রকল্পের নাম ও অবস্থান থাকবে। শেষে শিডিউল প্রণয়নকারী এবং শিডিউল অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর থাকবে। সর্বোপরি শিডিউল সহজে বোঝার জন্য সাহায্যকারী নির্দেশিকা থাকবে।

কনস্ট্রাকশন বার শিডিউল প্রস্তুুতি

শিডিউল তৈরির জন্য সর্বপ্রথমে মোটা কাগজে আনুপাতিক মাপে একটি আয়তক্ষেত্র আঁকতে হয়। তার বাঁ দিকের বাহুতে খাড়াভাবে ক্রমিক নম্বরসহ সব অপারেশনের নাম লিপিবদ্ধ করতে হয়। অপারেশনের নামের পাশে তাদের পরিমাণ এবং সমাপ্তির সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করতে হয়। প্রতিটি অপারেশনের নিচে আনুভূমিক সরলরেখা টেনে তাদের পৃথক করতে হয়। এবার আয়তক্ষেত্রের ওপরের সমান্তরাল বাহুতে সুবিধামতো জায়গা নিয়ে কাজে সম্পাদনের সময়কাল (মাস, সপ্তাহ) হিসেবে দেখাতে হয়। প্রতিটি মাসকে সপ্তাহে বা প্রতিটি বছরকে মাসে খাড়া রেখা টেনে আলাদা কলাম করতে হয়। সম্ভব হলে মাসের মধ্যে আলাদা আলাদা সপ্তাহের ঘর এবং সপ্তাহের কলামের মধ্যে আলাদা আলাদা দিনের জন্য ঘর বা কলাম তৈরি করা যেতে পারে।

প্রতিটি অপারেশন কোন তারিখে শুরু এবং কখন শেষ হবে তা সময়ের ঘরে আনুভূমিকভাবে মোটা দাগের সাহায্যে আনুভূমিকভাবে বা এঁকে দেখাতে হয়। মাসের এক একটি অপারেশনের কতটুকু কাজ সমাপ্ত হয়েছে তা আগে অঙ্কিত মোটা দাগের নিচে হ্যাচ (Hatch) লাইন দিয়ে বার আঁকতে হবে। এ ছাড়া শিডিউলে বাঁ দিকে প্রকল্পের নাম, সংস্কার নাম, অবস্থান, আরম্ভের ও সমাপ্তের তারিখ লিপিবদ্ধ থাকবে। ওপরের ডান দিকে বা নিচে সুবিধাজনক স্থানে ‘Estimated Progress & Actual Progress’ প্রতীক নির্দেশ করতে হবে। তা ছাড়া সাহায্যকারী নির্দেশিকা, প্রণয়নকারী ও সংস্কার কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর, কাজের বর্ণনা নির্দিষ্ট স্থানে সব তথ্য সংবেদিত নির্ভুলভাবে বারচার্ট শিডিউলে পাওয়া যাবে। বর্তমানে কম্পিউটারে ডেটাবেইস সফটওয়্যারে সহজে ও দ্রুত বারচার্ট শিডিউল প্রস্তুুতি দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সেই সঙ্গে একেক ধরনের অ্যাকটিভিটি ও সময়কে একেক রঙে দেখানোর জন্য বারচার্টে শিডিউল প্রস্তুত প্রণালি পাচ্ছে ভিন্ন এক নতুনত্ব।

ক্রিটিক্যাল পাথ মেথড (CPM)

সিপিএম নির্মাণ শিডিউল প্রস্তুতের আরেকটা পদ্ধতি, যেখানে নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে প্রতিরূপ জাতীয় প্রকল্পের (Repetitive Type Project) প্ল্যানিং শিডিউলিং এবং কন্ট্রোলিংয়ের কাজের জন্য CPM নের্টওয়াক প্রকল্পের সমুদয় কাজকে অপারেশন বা অ্যাকটিভিটিতে বিভক্ত করা হয়। এটি একটি অ্যাকটিভিটি-ভিত্তিক নেটওয়ার্ক তীর চিহ্ন দিয়ে অ্যাকটিভিটি এবং বৃত্ত দিয়ে ইভেন্ট বোঝানো হয়। সর্বপ্রথম ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Mongar E. Walker এবং James Kelley এই পদ্ধতির প্রচলন করে। প্রথম দিকে নতুন কেমিক্যাল প্ল্যান্ট নির্মাণকাজের প্ল্যানিং এবং শিডিউলিংয়ের জন্য এটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এরপরে এটা নির্মাণকাজের শিডিউল প্রস্তুতিতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি জব বা অ্যাকটিভিটি সম্পাদন করতে যে সময়ের প্রয়োজন তা সঠিকভাবে হিসাব করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রকল্পের প্রারম্ভ থেকে সমাপ্তিতে পৌঁছার জন্য একাধিক রুট বা পাথ (Path) থাকে। এর মধ্যে দীর্ঘতম (সময়ের হিসাবে) পাথকে ক্রিটিক্যাল পাথ বলা হয়।

কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টের শিডিউলিংয়ের জন্য CPM পদ্ধতিতে বিবেচ্য বিষয়সমূহ

১. প্রকল্পের অন্তর্গত অ্যাকটিভিটিগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুতকরণ

২. পর্যাপ্ত মালামালের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি অ্যাকটিভিটির জন্য সময় নির্ধারণ

৩. সরাসরি সম্পর্কযুক্ত বা অন্য অ্যাকটিভিটিকে অনুসরণ করে এ রকম অ্যাকটিভিটির তালিকা প্রস্তুতকরণ

৪. অধিক যুক্তির সঙ্গে অ্যাকটিভিটিগুলোর মধ্যে আন্তসম্পর্ক দেখিয়ে নেটওয়ার্ক প্রস্তুতকরণ

৫. ইভেন্টের সংখ্যাকে ধারাবাহিকভাবে ১.২.৩.৪.. এবং অ্যাকটিভিটিকে A.B.C.D… ইত্যাদি বড় হাতের অক্ষর দিয়ে নির্দেশ করা

৬. প্রকল্পের সমাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় সময় হিসাব করা

৭. প্রতিটি অ্যাকটিভিটির জন্য স্বল্প সময়ের শুরু এবং সমাপ্তি দেরিতে শুরু এবং সমাপ্তি হিসাব করা হয়

৮. অ্যাকটিভিটিগুলোর মধ্যে ফ্লিট (Fleet) অ্যাকটিভিটির হিসাব রাখা হয়।

যেকোনো প্রকল্পের ওয়ার্ক শিডিউল আগেই নির্ধারিত থাকলে কাজটি শেষ করার জন্য সবারই একটা ব্যস্ততা থাকে। তাই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যার যার যে অ্যাকটিভিটি থাকে, সবাই তা সঠিক সময়ে শেষ করতে পারে। কেউ যদি একটু পিছিয়ে থাকে কিন্তু ওয়ার্ক শিডিউলে তার অ্যাকটিভিটির সময়সীমার জন্য প্রয়োজনে সে অতিরিক্ত শ্রমিক ও মালামালের সুব্যবস্থা করে আবার নির্ধারিত শিডিউলে চলে আসে। আর এভাবেই নিরবচ্ছিন্ন কাজ আর নিরলস পরিশ্রমে অনেক বৃহৎ থেকে বৃহত্তর প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত ওয়ার্ক শিডিউল অনুযায়ীই সুসম্পন্ন করা যায়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top