…..(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
৫. নকশা প্রণয়ন
একটি ইমারতের নকশা (ডিজাইন) প্রধানত দুই প্রকার। যথা: ক) স্থাপত্য নকশা (আর্কিটেকচারাল ডিজাইন) ও খ) কাঠামোগত নকশা (স্ট্রাকচারাল ডিজাইন)। স্থাপত্য নকশায় ইমারতের ব্যবহারিক উপযোগিতা এবং নান্দনিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। যেখানে বিভিন্ন রুমসহ অন্যান্য স্পেসের অবস্থান, রুমের মাপ, সেনিটারি ও ইলেকট্রিক্যাল ফিটিংস-ফিক্সারসের অবস্থান, আলো-বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা এবং বহির্দৃশ্যের নান্দনিকতাসহ আনুষঙ্গিক অন্য বিষয়াদি দেখানো হয়ে থাকে। স্থাপত্য নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি এবং বিধিবিধান আছে, যা মেনে চলা অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া নকশাটি চূড়ান্ত করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে অভিজ্ঞ একজন স্থপতি দ্বারা নকশাটি প্রণয়ন করা দরকার। আর এই অনুমোদিত স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী ইমারতের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করে প্রণয়ন করা হয় কাঠামোগত নকশা। যে নকশায় নির্মিতব্য ইমারতটির বিভিন্ন মেম্বারের (ফাউন্ডেশন, কলাম, বিম, ছাদ ইত্যাদি) প্রয়োজন অনুসারে রডের সাইজ ও পরিমাণ, কংক্রিটের অনুপাতসহ (সিমেন্ট : বালু : খোয়া) ব্যবহৃতব্য রড, সিমেন্ট, বালু ও খোয়ার স্পেসিফিকেশন (গুণাগুণ) উল্লেখ করা হয়। তাই কাঠামোগত নকশা তৈরি করতে বিএনবিসি ও এসিআই কোড অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে চলা জরুরি।
উল্লেখ্য, একটি ইমারতের কাঠামোগত নকশার প্রণয়নের যথার্থতা ও নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করে ওই ইমারতটির দৃঢ়তা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা শুধু একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর পক্ষেই নিশ্চিত করা সম্ভব। এত কিছু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সম্যক কোনো ধারণা না থাকায়, অভিজ্ঞ কোনো স্থপতি বা প্রকৌশলী দিয়ে ইমারতের নকশা করানোর বিষয়টি অনেক সময় কোনো গুরুত্ব পায় না। এ ছাড়া, একজন অভিজ্ঞ স্থপতি বা প্রকৌশলী দ্বারা নকশা প্রণয়ন করাতে তুলনামূলকভাবে একটু বেশি খরচ হয়। ফলে, অনেক বাড়ির মালিক এ খাতের খরচ সাশ্রয় করার লক্ষ্যে সেদিকে না গিয়ে অনভিজ্ঞ স্থপতি বা প্রকৌশলী কিংবা একজন ড্রাফটসম্যানের কাছ থেকে অল্প খরচে নকশা প্রণয়ন করান, এতে লাভের থেকে ক্ষতির ঝুঁকিই বেশি থেকে যায়, যা বিষদ বিশ্লেষণ না করলে বোঝা কঠিন। মনে রাখা দরকার, একটি ইমারতের নির্মাণব্যয়ের তুলনায় নকশা প্রণয়নের খরচ অতি নগণ্য। আর এই সামান্য কিছু টাকার সাশ্রয় কত বড় ক্ষতি কিংবা বিপদের ঝুঁকি বয়ে আনে, তা অনভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি চিন্তাও করতে পারে না। সুতরাং এ ব্যাপারে ইমারত নির্মাণকারী সংস্থা বা ব্যক্তির সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ভৌত নির্মাণ
১. ফাউন্ডেশন বা ভিত
ইমারতের ফাউন্ডেশন বা ভিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে ভিতের মাটি কাটা, ঢালাই করা, মাটি ভরাট করা ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করতে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করাসহ নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি মেনে চলা প্রয়োজন। বেশি গভীরতায় মাটি কাটা এবং মাটির অবস্থা খারাপ হলে পাশের মাটি যাতে ভেঙে না পড়ে সে জন্য কাজ শুরু করার আগেই শোর প্রটেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে আশপাশে বিদ্যমান স্থাপনাসমূহের সামগ্রিক অবস্থা, ভিতের গভীরতা, মাটির বহন ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক। শোর প্রটেকশনের জন্য অবস্থাভেদে বাঁশ, ড্রাম শিট, শাল বল্লা, আরসিসি পাইল কিংবা এমএস শিট পাইলের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। আরসিসি পাইল কিংবা এমএস শিট পাইল করার জন্য অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দ্বারা ডিজাইন করানো এবং অত্র কাজ বাস্তবায়নে সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের মাটি কাটার সময় ফাউন্ডেশন পিটে (গর্তে) পানি আসতে পারে, যাতে পাশের মাটির দেয়াল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই জমা পানি সেচে ফেলার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে একটি মাড পাম্প সাইটে রাখা অপরিহার্য।
প্রসঙ্গত, ফাউন্ডেশন বা ভিত কথাটার অর্থ সবাই বুঝলেও ভিতের প্রকারভেদ তথা কাঠামোগত ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের বোঝার বিষয় নয়। তাই আমরা অনেকে না বুঝেই ভালো ভেবে খারাপ করি নিজেদের ভবিষ্যৎ। জেনে রাখা প্রয়োজন, মাটির বহন ক্ষমতা ও ইমারতের ধরন বিবেচনা করে বিভিন্ন রকম ভিতের প্রস্তাব করা হয়, যেমন- ফাউন্ডেশন উইথ ইনডিভিজ্যুয়াল কলাম ফুটিং, পাইল ফাউন্ডেশন, র্যাফ্ট বা ম্যাট ফাউন্ডেশন ইত্যাদি। এত কিছু না জানার ফলে কোনো কোনো মানুষের ধারণা, প্রয়োজন থাক বা না-ই থাক ভিতে পাইল দেওয়া মানেই ভিত মজবুত হওয়া। আমার জানা মতে, অনেকে ইচ্ছা করেই ভিতে পাইল দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং কোনো কোনো প্রকৌশলী মালিককে খুশি করতে ফাউন্ডেশনে পাইল ডিজাইন করে দেন। কিন্তু পাইল যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে পাইল করে অহেতুক কাজের ঝুঁকি তথা খরচ বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
সাধারণত, ছয় তলা পর্যন্ত ইমারত নির্মাণ করতে মাটি ভালো হলে ফাউন্ডেশনে পাইল দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ইনডিভিজ্যুয়াল কলাম ফুটিং দিয়েই ভিত তৈরি করা যায় এবং নিয়মমাফিক করলে সেটাই অধিকতর মজবুত ভিত হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এ ছাড়া পাইলিং একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এই কাজটি করতে অনেকগুলো বিষয়ের সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যেমন- পাইলের সেন্টার ঠিক রাখা, প্রয়োজনমাফিক বোরিং করা, বোর হোলটি ঠিকমতো ওয়াশ করা, রডের খাঁচার ক্লিয়ার কভার ঠিক রাখা, কংক্রিট নিয়মমতো তৈরি করা এবং ঢালাই করা। সুতরাং, পাইলিং করার ক্ষেত্রে প্রথমত, পাইলের কেন্দ্রবিন্দু ঠিক রেখে নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত বোরিং করতে হবে এবং বোর হোলের ভেতর থেকে আলগা কাদামাটি বের করার জন্য ভালোমতো ওয়াশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রডের খাঁচার ক্লিয়ার কভার (র্৩র্ ) ঠিক রেখে খাঁচা তৈরি করতে হবে এবং খাঁচা নামানোর পর যাতে ক্লিয়ার কভার ঠিক থাকে এ জন্য প্রয়োজনমাফিক কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজাইন অনুযায়ী কংক্রিট মিক্সিংয়ের অনুপাত ও স্ল্য¬াম্প ঠিক রেখে কংক্রিট মিক্স করতে হবে এবং ট্রিমি পাইপের মাধ্যমে আস্তে আস্তে কংক্রিট ঢালতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন ট্রিমি পাইপ জমাকৃত কংক্রিটের ওপরে উঠে না আসে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। একটি পাইল ঢালাই শেষ করার পর কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টার আগে ১০ ফুট ব্যাসার্ধের মধ্যে দ্বিতীয় কোনো পাইল ঢালাই করা যাবে না।
সর্বশেষ, কংক্রিটের মিক্সিংয়ের অনুপাত অনুসারে ওই পাইলটি ঢালাই করতে কত ব্যাগ সিমেন্ট লাগার কথা ছিল, বাস্তবে কত ব্যাগ লাগল সেটিও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ, অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় অধিকতর কম সিমেন্টেই ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়ে যেতে পারে, যা বাঞ্ছনীয় নয়। এ ছাড়া এটা হওয়া মানেই কাজের ত্রুটি হওয়া। তা সে হতে পারে ঠিকমতো ওয়াশ করা হয়নি, কিংবা মাটি ভেঙে পড়েছে, নতুবা মাঝে ভয়েড সৃষ্টি হয়েছে ইত্যাদি। যা হোক, সম্পূর্ণ কাজটা যেহেতু অন্ধকারের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়, তাই উল্লে¬খিত বিষয়গুলো নজরদারি করা অপরিহার্য, নইলে ভিতটাই হয়ে যেতে পারে দুর্বল, ধসে পড়তে পারে ইমারতটি। তাই নিয়মানুযায়ী পাইল ঢালাইয়ের পর লোড টেস্ট করার কথা, যা প্রায় ক্ষেত্রেই করা হয় না। অতএব, ফাউন্ডেশনে পাইলিংয়ের কাজ করার জন্য যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন এবং উল্লেখিত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যথার্থ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য লোকবল নিয়োগ দেওয়া ও সার্বক্ষণিক তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
ইনডিভিজ্যুয়াল কলাম ফুটিং দিয়ে ভিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ কাজ। তবে নির্দিষ্ট গভীরতায় ভিতের মাটি কাটার পর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা সাইট পরিদর্শন করানো এবং মাটির বহন ক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। মাটির অবস্থা যাচাই করে সন্তোষজনক ফলাফল পেলেই শুধু ড্রয়িং ও ডিজাইন মোতাবেক রড বেঁধে এবং নির্দিষ্ট অনুপাতে কংক্রিট তৈরি করে কলাম ফুটিং ঢালাই করা যেতে পারে। অন্যথায় ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া ঢালাই করার সময় কোনো অবস্থাতেই অত্র স্থানে কাদা কিংবা পানি থাকা ঠিক নয়। প্রয়োজনে সার্বক্ষণিক পাম্পিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মরত মিস্ত্রিরা তাঁদের অজ্ঞতাবশত কিংবা কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য পানি ছাড়া মেশানো শুকনো কংক্রিট ফাউন্ডেশন পিটে (গর্তে) জমে থাকা পানির মধ্যে ঢেলে দেন এবং বোঝানোর চেষ্টা করেন এতে কোনো ক্ষতি নেই। সাবধান!
এই ভুল কখনো করা উচিত নয়। পিটে জমে থাকা পানি সম্পূর্ণরূপে সরানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তারপর নির্দিষ্ট স্লাম্প ঠিক রেখে নিয়মমাফিক মেশানো কংক্রিট পিটে ঢেলে ফিনিশিং দেওয়া এবং অত্র এলাকা কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা শুকনো রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে কংক্রিটের প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চারে বিঘ্ন ঘটবে এবং ভিত দুর্বল হয়ে যাবে। কংক্রিট ঢালার আগে ব্যবহৃত রডের ক্লিয়ার কভার অবশ্যই চেক করে নিতে হবে। সর্বশেষ, ঢালাইকৃত কংক্রিট জমাট বাঁধার পর অর্থাৎ ঢালাই শেষ করার ১০ ঘণ্টা পর থেকে পরবর্তী ৭ দিন (কমপক্ষে) কিউরিং নিশ্চিত করতে হবে, যা কংক্রিটের প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চারের প্রধান সহায়ক। পাইল ফাউন্ডেশনে কলামের বেইজ হিসেবে যে পাইল ক্যাপ তৈরি করা হয়, তাতে ইনডিভিজ্যুয়াল কলাম ফুটিংয়ে ঢালাইয়ের নিয়মগুলো একইভাবে মেনে চলা জরুরি।
চলবে…
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫