চারপাশে নীল জলরাশির পাহারায় ঘেরা ছোট সবুজ দ্বীপ শ্রীলঙ্কা। সমুদ্রের বিশালত্ব আর উদারতা ছুঁয়ে গেছে দ্বীপটির সব অধিবাসী আর তাদের সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে। স্থাপত্যচর্চায় একটু আধুনিকতা আর নতুনত্বের দিকে যখন সবার ঝোঁক, এই সাগরপারের জনপদে স্থাপত্যের ভিন্নধর্মী চেহারা তখনো দৃশ্যমান। শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী শ্রী জয়াবর্ধনেপুরা শহরের পুরোনো লেক ‘দাইওনা ওয়া’র বুকে চুপচাপ বসে আরেকটি ছোট দ্বীপ। মূল ভূখণ্ড থেকে একটি সংযোগ সড়ক উত্তর-দক্ষিণ বরাবর সরলরেখার মতো দ্বীপটিকে ছেদ করে উল্টো দিকে গিয়ে আবার মিশেছে ভূখণ্ডের সঙ্গে। কৃত্রিমভাবে তৈরি দ্বীপটি খুবই সাধারণ কিন্তু একই সঙ্গে অসাধারণ। নিজস্ব অবয়বের বিভিন্ন উচ্চতার ছোট-বড় কয়েকটি ভবন, চারদিকের পানি আর দ্বীপের সবুজ মিলে একটি প্রাকৃতিক কম্পোজিশন তৈরি করেছে। নান্দনিক এ দ্বীপটি আসলে শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স।
খুব বেশি দিন আগের নয়, সময়টা ১৯৭৭ সাল। শ্রীলঙ্কান পার্লামেন্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল যে তাদের একটি নতুন পার্লামেন্ট ভবন দরকার। পুরোনো ভবনটি এখন আর কাজ চালানোর উপযোগী নয়। তবে এ জন্য এমন একজন স্থপতিকে নিতে হবে, যিনি হবেন স্বদেশি কিন্তু অবশ্যই স্বনামধন্য। এক বাক্যেই চলে আসে স্থপতি জেফরি বাওয়ার নাম। জেফরি বাওয়া শুধু শ্রীলঙ্কার নন, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একজন বরেণ্য স্থপতি। বয়সের তুলনায় একটু দেরিতেই তাঁর স্থাপত্যচর্চার সূচনা। তবে তত দিনে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন তাঁর নিজস্বতা দিয়ে। আধুনিকতাকে লালন করেন কিন্তু একে নিজের মতো করে রূপান্তর করেছেন রিজিওনাল মডার্নিজমে। মডার্নিজম সব ধরনের বাহুল্যবর্জিত সরল স্থাপত্যের দিক নির্দেশ করে। বাওয়া এই সরলতার মধ্য দিয়েই নিজের কথাগুলো তুলে আনেন। হারিয়ে যেতে দেন না শিকড়ের সংযোগকে। নিজের দেশকে তিনি পরিচিত করতে চান নিজের রঙেই। শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট ভবন তাঁর এই চিন্তাধারার সার্থক উদাহরণ।
পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স প্রতিসম ধরনের বেশ গোছানো একটি মাস্টারপ্ল্যান, যেখানে একেবারেই স্থানীয় ধাঁচের ভবন, সবুজ লন, পরিচ্ছন্ন পথের সমন্বয়ে সাজানো। ভবন, পানি আর দ্বীপের সবুজ মিলে একটি অসাধারণ প্রাকৃতিক কম্পোজিশন তৈরি করেছে। এ যেন মানুষের তৈরি উপাদানের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় একাত্মতা। ‘সেরিমোনিয়াল ড্রাইভ’ নামে সংযোগ সড়ক সংযুক্ত হয়েছে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে। পেছন দিকে আছে আরেকটি সংযোগ সড়ক, যেটি আসলে জরুরি বহির্গমন এবং ক্ষমতাধর অতিথিদের সরাসরি প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেরিমোনিয়াল ড্রাইভ ভবনের কাছাকাছি গিয়ে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একভাগে সদস্যদের প্রবেশপথ, আরেক ভাগ পশ্চিমে অফিস স্টাফদের জন্য নির্ধারিত।
পুরো কমপ্লেক্সের ঠিক মাঝখানেই মূল অ্যাসেমব্লি হল। অ্যাসেমব্লি হলটি খুব সাধারণ আয়তাকার তিন তলার সমান উচ্চতার ভবন। তাকে ঘিরে ছোট ছোট পাঁচটি কম উচ্চতার ভবন। এই পাঁচটি হল আলাদা আলাদা কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন- সেক্রেটারিয়েট হল, কনফারেন্স হল, পার্লামেন্টের অফিস কক্ষ। টেলিফোন বুথ, বিনোদন কক্ষ, রেকর্ডিং কক্ষসমৃদ্ধ প্রায় ১০০ আসনের আটটি মিটিং রুম রয়েছে। সম্মুখ দিকে বাম পাশ লাগোয়া ছোট ভবনটি পার্লামেন্ট লাইব্রেরি। এটি মূলত সাংসদদের জন্য। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র, আইন, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানের রেফারেন্স ম্যাটেরিয়ালস সংরক্ষিত আছে এখানে। এ ছাড়া সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন সময়কার সংসদীয় বিতর্কের রেকর্ড, আইনি ব্যাখ্যা, বিভিন্ন বিল ও অধ্যাদেশ, সরকারি গেজেটসমূহ, সেশন পেপারস এবং বার্ষিক রিপোর্টগুলো। এর ডিজিটালাইজড ভার্সন ইচ্ছে করলে অনলাইনের মাধ্যমে সদস্যরা যেকোনো জায়গা থেকেও ব্যবহার করতে পারবেন। অ্যাসেমব্লি হল এবং লাইব্রেরি ভবনের সংযোগস্থল থেকে দক্ষিণমুখী প্রশস্ত সিঁড়ি নেমে গেছে প্রশান্ত জলধারার কোলে।
ডান পাশের ছোট বুথটি নিরাপত্তা বুথ। পেছনে তিনটি ভবন হচ্ছে মিনি পার্লামেন্ট, প্রশাসনিক দপ্তর এবং ইউটিলিটি সার্ভিস। ছোট-বড় ভবনগুলো নিচের তলায় পুরোটাই বলা যায় সংযুক্ত। চলাচলের করিডোর, বিভিন্ন অফিস কক্ষ, স্টোরেজ এবং কমন সার্ভিসের জন্য ব্যবহৃত, যা দ্বিতীয় তলা থেকে আলাদা হয়ে গেছে। মূল ভবনের উঁচু ছাদের বিশালত্বকে একটু নমনীয় করে আনার জন্য বিক্ষিপ্ত করে গ্যালারিগুলো অপ্রতিসম সজ্জায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলাদা আলাদা ছাদ হলেও সবগুলো মিলে তৈরি করেছে একটি ঊর্ধ্বমুখী ছাদের ছন্দ।
পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স হচ্ছে একটি জনতান্ত্রিক সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। নীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্র হলেও একই সঙ্গে দেশের ইমেজ তৈরি করে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর আপামর মানুষের স্বপ্ন ও ইচ্ছাকে চিত্রিত করে গড়ে ওঠে এর অবয়ব। স্থান নির্বাচন থেকেই এই স্পর্শকাতরতা নিয়ে কাজ করেছেন স্থপতি বাওয়া।
কলম্বো শহরের ১০ মাইল পশ্চিমে শ্রী জয়াবর্ধনে শহরটি। কলম্বো থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে হলেও শহরের সুবিধা এবং ধরন আগে থেকেই বিদ্যমান। উপরন্ত শহরটি আসলে অনেক পুরোনো ও ঐতিহ্যমণ্ডিত। প্রথম শতাব্দীতে তৎকালীন রাজন্যবর্গের রাজধানী হিসেবে জয়াবর্ধনে শহরের নাম লিপিবদ্ধ আছে। প্রি-কলোনিয়াল যুগে এখানে ছিল বেশ সমৃদ্ধ বিল্ডিং স্ট্রাকচার। নতুন পার্লামেন্ট ভবনের স্থান নির্বাচনে এই ঐতিহ্যবাহী যোগসূত্রকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পুরোনো দুর্গসমৃদ্ধ শহরের নির্বাচন, প্রাকৃতিক মৃত জলাশয়কে পুনরুজ্জীবন দিয়ে আসলে ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়কে পুনঃপাঠ করা হয়েছে।
স্থপতি জেফরি বাওয়া কিছু আধুনিক স্থাপত্য উপকরণ পছন্দ করেন নির্মাণের শুরুতেই। আমরা যেটা রাস্তা হিসেবে চিন্তা করি, বাওয়া আসলে সেটিকে একটি শক্তিশালী একটি অক্ষ হিসেবে চিন্তা করেছেন। যা কি না পার্লামেন্ট ভবনের শক্তি ও দৃঢ়তার প্রতীক। দ্বীপের নির্মল জলরাশি, সবুজ গাছপালা আর প্রকৃতির নির্জনতা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার নিজস্ব সম্পদ। শক্ত অক্ষের সাহায্যে এই ছড়িয়ে থাকা অনুভূতিগুলোকে তিনি এক সুতোয় বেঁধেছেন। প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি করেন ভবন, তবে সে ভবনের বহিঃপ্রকাশ শ্রীলঙ্কান ভার্নাকুলার আর্কিটেকচারকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে এনেছে।
স্থপতি বাওয়ার চিন্তাই ছিল পুরোনোকে নতুনত্বের মধ্য দিয়ে সাজিয়ে তোলা। তাই আপাত দৃশ্যমান সাদামাটা ভবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া সময়ের গভীর ভাবনাগুলো। সারি সারি কলাম, করিডোরের দেয়াল, অলংকৃত দরজা, ছাদের অভ্যন্তরভাগ এবং বিভিন্ন দৃশ্যমান কর্নারগুলোতে খোদাই হয়েছে এর পুরোনো দিনের কথামালা। বাইরে থেকে যতটা সাদাসিধে, ভেতরে ততটাই বর্ণিল। নানা মত আর নানা পথের মিলনমেলা যেন বাঙ্ময় হয়ে ওঠে আলো-ঝলমলে রঙিন অ্যাসেমব্লি হলে। কাঠের ডেকোরেশন এবং কংক্রিটের কলামের মধ্যে পুরোনো মন্দির এবং প্যালেসের সূক্ষ¥ কারুকাজ মিশে আছে। পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ঢালু ছাদ। এই ঢালু ছাদ আসলে শ্রীলঙ্কান স্থাপত্যের একটি বিশেষ পরিচয় বহন করে এবং স্থপতি বাওয়া অবলীলায় তা ব্যবহার করেছেন। কপারের ছাদ ব্যবহার করার কারণে এটি ঝকঝকে, খুব পাতলা এবং ওজনে হালকা মনে হয় এবং তৈরি করে তাঁবুর অনুভূতি। শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যের একটি অপরিহার্য অংশ হচ্ছে অনুরাধাপুরা মন্দির। অনুরাধাপুরার সারি সারি কলাম এবং পিতলের ছাদের সঙ্গে পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সের সামঞ্জস্য রাখা হয়েছে।
প্রায় ১২ একর আয়তনের পার্লামেন্ট দ্বীপ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ ফুট লম্বা এবং ৬ ফুট প্রশস্ত রিটেইনিং দেয়ালের সাহায্যে। দেয়ালের ভিত্তিতে এর প্রস্থ ৬ ফুট হলেও একটু বাঁকা হয়ে ওঠার কারণে ওপরে এসে এর প্রস্থ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৪ ফুট। এর উচ্চতা পানির লেভেল থেকে ৬ ফুট। দ্বীপের মোট আয়তন ৪৮ হাজার বর্গফুট। জাপানিজ দুটো মিতসুই কোম্পানির কনসোর্টিয়াম ২৫.৪ মিলিয়ন ইউএস ডলারে এ কাজটি সম্পন্ন করে। ২৬ মাসের নির্ধারিত সময়ে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় এবং ২৯ এপ্রিল ১৯৮২ সালে আনুষ্ঠানিক এটির উদ্বোধন করা হয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫