গোলার আঘাতে ঐতিহ্যের অপমৃত্যু

মানুষের সংস্কৃতি, আচার, কৃষ্টি আর জীবনবোধের কথা বলে স্থাপত্যশিল্প, যা ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে রয় যুগের পর যুগ। আফগানিস্তান, ইরাকের পর এবার যুদ্ধবিধ্বস্ত নগর সিরিয়া। দেশটির বিভিন্ন শহর আজ জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখায়। ধ্বংস ও লুট হচ্ছে প্রাচীন স্থাপনা, পুরাকীর্তি ও অমূল্য প্রত্নসম্পদ। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী, নীতিহীন রাজনৈতিক নেতা, ধর্মান্ধ, সেনাবাহিনী আর আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যরা ইতিমধ্যেই দেশটির অমূল্য প্রত্ন সম্পদ লুটে নিয়েছে। লুটেরা লুটপাট করেই ক্ষান্ত হয়নি, প্রাচীন নগর ও ঐতিহ্যের শ্রীহরণে ধ্বংসাত্মক তৎপরতাও চালাচ্ছে অবিরত। সিরিয়ার অন্যতম ইতিহাসসমৃদ্ধ নগর পালমিরা। শহরটিতে রয়েছে ইউনেসকো কর্তৃক ঘোষিত অসংখ্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এমনকি শহরটি স্বয়ং এই ঘোষণার আওতায়। পালমিরার বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা স্থাপনাগুলো ধ্বংসের শঙ্কায় ইউনেসকো, প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, ঐতিহ্যপ্রেমী এমনকি সিরিয়ার সাধারণ মানুষ।

পাশ্চাত্য দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন নগর পালমিরা। পালমিরার স্থাপত্যশিল্পের ভাঁজে ভাঁজে গ্রোথিত আছে সিরিয়ার ইতিহাসের নেপথ্য কথা। ‘পালমিরা’ গ্রিক শব্দ। আরামিক ভাষায় বলা হতো ‘তাদমোর’। শব্দটি তালগাছের প্রতিশব্দ। নগরটি অতীতের অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। পুরো শহরটি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করলেও প্রায় ৩৬ হাজার মানুষের বাস তাদমোরে। ১৯ শতকের যে ট্যাবলেট পাওয়া যায়, তাতেও উল্লেখ ছিল পালমিরা শহরের নাম। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে পালমিরা ছিল মেসোপটেমিয়া এবং উত্তর সিরিয়ার মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক রুটের অন্যতম শহর।

পালমিরার পথে-ঘাটে, সৌধের দেয়ালে কান পাতলে এখনো শোনা যায় ইতিহাসের সেই ফিসফিসানি। সিরিয়ার পালমিরা শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। সিরিয়ার প্রত্ন বিভাগের প্রধান মামুন আবদুল করিমের আক্ষেপ, জঙ্গিদের ধ্বংসলীলায় এবার হয়তো গুঁড়িয়ে যাবে দুই হাজার বছরের স্মৃতিভান্ডার! শুধু ধ্বংস নয়, প্রশাসনের আশঙ্কা, পাল্লা দিয়ে চলবে লুটতরাজও। প্রত্নসামগ্রী বিক্রি করে যে আয় ভালোই হয়, এত দিনে তা জেনে গিয়েছে আইএস (ইসলামিক স্টেট)। নিজেদের লাভের রাস্তা খোলার জন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন বিকোতে তারা দুবারও ভাববে না বলেই দাবি সরকারি কর্তাদের। চার বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় ইতিহাসের যত নিদর্শন গুঁড়িয়ে গেছে, উধাও হয়ে যাওয়া নিদর্শনের সংখ্যা তার চেয়ে কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুদিন ধরে প্রাচীন জিনিসপত্রের জোগান যেভাবে বেড়ে গেছে, তার সিংহভাগই আসছে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি। চোরাপথে ইতিহাসের সামগ্রী চড়া দামে বিক্রি করে নিজের রসদ সংগ্রহ করে থাকে আইএস। আবার দারিদ্র্য আর অরাজকতার আবহে কখনো অভাবের টানে সাধারণ মানুষ আবার কখনো সুযোগসন্ধানী গুপ্ত ব্যবসায়ীরাও লুটতরাজে নেমে পড়ছে। ইতিহাস খুন হচ্ছে গোলার বিধ্বসী আঘাতে।

ইতিহাস-নিধনের এই ধারা অবশ্য নতুন নয়। আফগানিস্তানে ১৭০০ বছরের পুরোনো বেলেপাথরের বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি উপড়ে ফেলতে না পেরে ডায়নামাইট বোঝাই লরি এনে গোটা কাঠামোটা উড়িয়ে দিয়েছিল তালেবানরা। আবার ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দামবিরোধী অভিযানের সময় ব্যাবিলনকে যেভাবে ফোঁপরা করে দিয়েছিল মার্কিন মিত্রসেনা, সেই স্মৃতিও ফিকে হয়নি আজও। ইতিহাসবিদদের আক্ষেপ, জমি দখলের লড়াইয়ে বরাবরই প্রথম বলি ইতিহাসসমৃদ্ধ স্থাপনা। আক্রমণকারী যে পক্ষেরই হোক না কেন! আপাতত পালমিরা বাঁচবে কি না, পরিষ্কার হয়ে যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই।

পালমিরা এমনি ঐতিহ্যসমৃদ্ধ যে বাইবেলে পর্যন্ত নগরটির বর্ণনা রয়েছে। বাইবেলে বলা হয়েছে, পালমিরা শহরটি বাদশাহ সোলায়মানের তৈরি (তাদমোর নামের শহরটিও বাদশাহ সোলায়মানের তৈরি বলে জানা যায়)। বিখ্যাত রোমান ইহুদি জোসেফাসের লেখায়ও পালমিরা শহরের নাম পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পালমিরা বা তাদমোর। কারণ, সে সময় প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বাণিজ্যিক রুট হিসেবে তাদমোরের ওপর দিয়ে একটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। মূলত প্রাচ্য ও পাশ্চত্যের মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই শহর। তবে খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে যখন সেলুসিডস সাম্রাজ্য সিরিয়া দখল করে নেয় তখন পালমিরা (তাদমোর) শহরটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পালমিরার অধিবাসীদের মুখের ভাষা ছিল ‘আরামিক’। তবে তাদের লেখ্যরীতি ছিল দুই ধরনের। বিভিন্ন স্থাপনাকে প্রমাণ মেনে এক রীতিতে লেখা হতো এবং দ্বিতীয়ত, তারা মোসোপটেমিয়ার রীতিতে লিখত। এর ফলে খুব সহজেই এই শহরে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের প্রভাব সম্পর্কে বোঝা যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে তৎকালীন অনেক নেতাদের স্থাপত্যকর্ম আছে। সেই স্থাপত্যগুলোয় প্রদর্শিত পোশাকের ফ্যাশন ইত্যাদি দেখলেও প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের প্রভাব সম্পর্কে সহজেই বোঝা যায়। ১৯২৪ সালে শহরটিতে খননকার্য শুরু হয় এবং ১৯৮০ সালে ইউনেসকো শহরটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দেয়। পালমিরার যেসব স্থাপনা ও ঐতিহাসিক স্থান ইতিমধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং যেগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে তাদেরই কয়েকটি-

মরুদ্যানের ধ্বংসাবশেষ

সিরিয়ার মরুভূমির ঠিক মধ্যাঞ্চলে পালমিরার ধ্বংসাবশেষ। এই সিল্ক রোড ধরেই উটের কাফেলা চলত। এ এলাকাটি ছিল সম্পদ ও বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। সুবর্ণ সময় চলে গেছে।  পুরো শহর এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৮০ সালে এলাকাটি বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। 

ক্যারাভানসরাই

কালাত আল মাদিকের ক্যারাভানসরাই, অবস্থান উত্তর সিরিয়ায়। ক্যারাভানসরাই ছিল পথিকদের বিশ্রামের জন্য রাস্তার পাশে থাকা আশ্রয়স্থল। ফারসি ভাষায় একে ‘খান’ নামেও ডাকা হয়। ক্যারাভানসরাইগুলো বাণিজ্য ও তথ্য আদান-প্রদানে সাহায্য করত। এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপজুড়ে বিশেষত সিল্ক রোডে খুবই গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে মধ্য যুগে প্রচুর ক্যারাভানসরাই গড়ে উঠেছিল।

ক্যারাভানসরাই নামটি ফারসি ক্যারাভান ও সারা (স্থল) থেকে এসেছে। এর সঙ্গে অনুসর্গ আই যুক্ত হয়েছে। ক্যারাভান বলতে বোঝায় দীর্ঘ যাত্রার উদ্দেশ্যে বের হওয়া একদল বণিক, তীর্থযাত্রী বা পর্যটক। পারস্যের ক্যারাভানসরাই শহরের বাইরে বৃহৎ স্টেশন হিসেবে নির্মিত হতো। শহরের ভেতর নির্মিত সরাইগুলো ছোট আকারের হতো। মধ্যপ্রাচ্যে পথের পাশের সরাই ও শহরের ভেতরের সরাই উভয়কে ‘খান’ বলা হতো। তুর্কি ভাষায় একে বলা হতো ‘হান’। আরবিতে একে ‘ফানদাক’ ও হিব্রুতে ‘পানদাক’ বলা হয়। ভেনিস ও জেনোয়াতে যথাক্রমে ফানদাকো ও ফনদাকো বলা হয়।

নিউ লাইন্স ম্যাগাজিন

আরব ভূগোলবিদ আল মুকাদ্দাসি ৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন সিরিয়ার অন্তর্গত ফিলিস্তিন প্রদেশের সরাই নিয়ে লিখেছেন, ‘সিরিয়ায় কর খুব বেশি না, কিন্তু যারা ক্যারাভানসরাইয়ে (ফানদাক) আসে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম; এখানে যা-ই হোক, কর খুব বেশি…’। এখানে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করা করের কথা বোঝানো হয়েছে। সঠিকভাবে কর পরিশোধ করা হয়েছে তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি ফটকে প্রহরী নিয়োজিত থাকত।

সাধারণত ক্যারাভানসরাই বর্গাকার বা আয়তাকার হতো। মাঝখানের উঠান থাকত প্রায় খোলা আকাশের নিচে। ভেতরের দেয়ালে বণিক ও তাদের পণ্য, কর্মচারী ও পশুদের জন্য বিভিন্ন দোকান, খালি স্থান থাকত। ক্যারাভানসরাইয়ে থাকত মানুষ ও পশুর জন্য খাওয়া, ধোয়া ও অজুর পানির ব্যবস্থা। কখনো কখনো গোসলের ব্যবস্থাও রাখা হতো। এ ছাড়া পশুখাদ্য ও বণিকদের সরবরাহ করার জন্য থাকত বিভিন্ন পণ্যের দোকান। পাশাপাশি দোকানদাররা বণিকদের কাছ থেকে তাদের পণ্য কিনতো।

বা’আল মন্দির

খ্রিষ্টের জন্মের পর প্রথম শতকে পালমিরার অধিবাসীরা বা’আল দেবতার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এরপর থেকে এটি পালমিরার মানুষের ধর্মীয় জীবনযাপনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে পালমিরা রোমান সাম্রাজ্যের আওতাভুক্ত হয়। বুলেটের আঘাতে মন্দিরের দেয়াল এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

হাদ্রিয়ানস আর্ক

দ্বিতীয় শতকে নির্মিত এই বারান্দাটির দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটারের বেশি। মসলা, সুগন্ধি, রত্ন এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ এদিক দিয়েই সরবরাহ করা হতো। রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ানের নামানুসারে এর নাম হাদ্রিয়ানস আর্ক বা হাদ্রিয়ানের ধনুক। 

রোমান মনুমেন্ট

দুই রাস্তার সংযোগস্থলে ‘টেট্রাপাইলন অব পালমিরা’ নামের স্তম্ভটি অবস্থিত। আসওয়ানের খনি থেকে লাল গ্রানাইট পাথর এনে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এর চার স্তম্ভের মধ্যে এখন একটি ছাড়া বাকিগুলো রেপ্লিকা বা নকল।

পবন দেবতা

বারসামিনকে বলা হয় পবন দেবতা। পালমিরার অধিবাসীদের কাছে অত্যন্ত পূজনীয় দেবতা তিনি। তবে মন্দিরটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল তা জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, ফিনিশিয়রা যখন এই এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল, সে সময় নির্মিত হয় এটি। 

প্রাচ্যের নাট্যমঞ্চ

গ্রিক-রোমান সভ্যতার অনেক নিদর্শন পাওয়া যায় পালমিরায়। আছে একটি বারান্দা, থার্মাল স্নানাগার এবং একটি অ্যাম্ফিথিয়েটার। এখানে প্রাচ্যের অনেক নাটক মঞ্চস্থ হতো। এ ছাড়া গ্ল্যাডিয়েটর এবং প্রাণীদের মধ্যে লড়াইও হতো এখানে। 

নিউ লাইন্স ম্যাগাজিন

সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ফোরাম

এখানে একসময় ২০০টি মূর্তি ছিল। সেই মূর্তি বা স্ট্যাচুগুলো তাদের, যারা একসময় দেশের সিটি কাউন্সিলের উচ্চপদে ছিলেন। এখানে সিটি কাউন্সিলের নিয়মিত বৈঠক হতো। 

অলংকৃত কবর

শহরের ফটকের ঠিক বাইরেই বেশ কয়েকটি কবরস্থান রয়েছে। কোথাও কোথাও একই বংশের কয়েক প্রজন্ম একই কবরস্থানে শায়িত আছে। সেই কবরস্থানগুলোর কয়েকটির ওপরে আছে লম্বা টাওয়ার। আবার কিছু কবর খুব সুন্দর করে সাজানো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো সভ্যতা ধ্বংস হয়। হতে পারে তা বিবর্তনেরই অংশ। কিন্তু যুদ্ধ মানেই তো ধ্বংসযজ্ঞ; প্রাণহানি। কেড়ে নেয় জীবন, গোলার আঘাতে ধ্বংস হয় ইতিহাস-ঐতিহ্য। যুদ্ধমুক্ত শান্তির পৃথিবীর কামনা ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক, গবেষক আর সাধারণের।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫

সারোয়ার আলম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top