দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনজনিত কারণে মানুষ ঈদের সময় শুধু কাপড় কেনাকাটা আর নিজেকে সাজাতেই ব্যস্ত রাখে না। ঈদের আমেজ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে এই উৎসবে ঘরের পরিবেশ রঙিন ও আনন্দময় করে তুলতে ঘর সাজাতে নিত্যনতুন অনুষঙ্গের প্রতিও ঝুঁকছে কমবেশি সবাই। উৎসবমুখর এই দিনে পুরো বাড়ি নতুন করে রং করে রাঙিয়ে তোলা থেকে শুরু করে আসবাবপত্রে নতুন বার্নিশের ছোঁয়া, পুরোনো শোপিস সরিয়ে নতুন শোপিস যুক্ত করা, ফুলের টবগুলোতে রং করা তথা ঈদের দিনটিতে পুরোনো সব জিনিসকে নতুন রূপ দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সবাই।
নতুনত্বের প্রত্যাশায় ঘরের পুনর্বিন্যাস করা হয় ঈদ উৎসবের বিশেষ এই দিনটিতে। তবে লক্ষ রাখতে হবে ভারসাম্য, ছন্দের প্রাধান্য, মিল, অনুপাত এই বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ রেখে তবেই করতে হবে ঘরের নান্দনিক পুনর্বিন্যাস। যদি আপনার একার পক্ষে এগুলো সামলানো সম্ভব না হয়, তবে অবশ্যই একজন দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ঘরের আসবাব গুছিয়ে রাখার সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন ঘরের চারপাশের সৌন্দর্য মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। রঙের উপস্থিতি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রঙের জাদুকরী উপস্থিতি আমাদের চারপাশের অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায় প্রতিক্ষণ। তাই শুধু রঙের সঠিক ব্যবহারে আপনি আপনার অন্দরমহলের চেহারা পাল্টে দিতে পারেন নিমেষেই। ঘর সাজাতে রঙের ব্যবহার হয় বিশ্বজুড়ে। তাই ঈদের উৎসবকে রঙিন করতে আপনি আপনার ঘরকে রাঙিয়ে তুলুন নানা রঙে। মানুষের কল্পনাপ্রবণ মনে ঘরের ভেতর এখন লাল, কমলা, নীল, সবুজের মতো উজ্জ্বল সব রং স্থান করে নিয়েছে। শুধু দেয়ালের রঙে নয়, বরং নতুন ফেব্রিক্স বাজারে আসছে চোখ ধাঁধানো রঙের বাহার নিয়ে। এ ছাড়া আসবাব থেকে শুরু করে ফলের টব, ক্রোকারিজ কিংবা ম্যাট সবকিছুতেই আজকাল রঙের ছড়াছড়ি। দেয়ালের রঙের জায়গায় স্থান পাচ্ছে ওয়াল পেপার ও নানা রঙের নানা ডিজাইনের দেয়াল টাইলস মেটারিয়ালস। আচ্ছা ঘরের নান্দনিক ইন্টেরিয়রে কোন রং ব্যবহার করবেন আর কোন রং করবেন না তা নিয়ে আসুন খানিকটা ভেবে দেখি।
রঙের ভাষা
ঘরের ভেতর রং ব্যবহারের আগে রঙের উত্তাপ সম্পর্কে জানা দরকার। হয়তো ভাবছেন রঙের আবার উত্তাপ কী? রঙেরও ভাষা আছে। কোনো কোনো রং দেখে মনে হয় এ যেন উত্তপ্ত তাপদাহ, কখনো বা তা ঠান্ডা শীতল স্পর্শ। আমাদের চারদিকে যে রং তার কোনোটা গরম আবার কোনোটা শীতল। যেমন লাল, কমলা, হলুদ রং গরম অনুভূতি দেয়। আর সবুজ ও নীল রং দেয় শীতল অনুভূতি। ঘরের ভেতর যদি শান্তিময় স্পর্শ ও উৎসব আমেজ দিতে চান, তবে এই রঙের বিন্যাস নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে খানিকটা।
লাল
লাল রঙের সঙ্গে মানুষের নৈকট্য সবচেয়ে বেশি। উদ্দীপক এই রং স্বভাবতই অত্যন্ত উত্তেজক। উদ্দীপনার এই মাত্রা নির্ভর করে কতখানি রং ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে লাল রং। আর তাই কোনো বস্তুর ওপর লাল রঙের সঠিক ব্যবহার তাৎক্ষণিকভাবে মনোযোগ কেড়ে নেয়। ভালোবাসা বা ঘৃণা বিপরীতধর্মী অনুভূতি একই সঙ্গে তৈরি করতে এই রঙের জুড়ি নেই। বিশ্বব্যাপী বিপদ বা জরুরি অবস্থা নির্দেশ করতেও ব্যবহৃত হয় লাল রং। কোনো কোনো সংস্কৃতিতে লাল হলো নিষ্পাপ, প্রফুল্ল আর আনুষ্ঠানিক।
কমলা
অন্য যেকোনো রঙের চেয়ে বেশি বিরোধপূর্ণ লালের নিকটাত্মীয় রং কমলা। ক্ষমতার রং হিসেবে কমলার প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। গবেষকদের মত, কমলা রং খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। কমলা একই সঙ্গে সহনশীল ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর। ধারণা করা হয়, কমলা রং যাদের পছন্দ, তারা সাধারণত চিন্তাশীল ও দায়িত্বসচেতন।
নীল
অধিকাংশ মানুষেরই পছন্দের রং নীল। বিশ্বাস, আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক নীল। সাগর ও আকাশ নীল বলে মানুষের জীবনে নীলকে দেখা হয় ধ্রুবক হিসেবে। নীল যেমন বেদনার রং তেমনি, রোমান্টিকতার পরিচয়বাহী। নীলের বিভিন্ন শেড আছে, যা প্রাণবন্ত, প্রেরণাদায়ী, শীতলতা ও উপেক্ষা প্রকাশ করে। এই রঙের প্রভাবে সময় খুব দ্রুত কেটে যায়, যা আরামদায়ক শিথিলতায় ঘুম এনে দেয়।
সবুজ
মানুষের সবচেয়ে প্রিয় রংগুলোর মধ্যে নীলের পরেই সবুজের অবস্থান। অন্য কোনো রঙের চেয়ে সবুজের বিস্তৃতি বেশি, কেননা প্রকৃতির মধ্যে সবুজের আধিক্য সবচেয়ে বেশি। প্রাকৃতিক সবুজ অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক ও সতেজ। এটি উষ্ণ ও শীতলতার মাঝামাঝি অবস্থান ধারণ করে। প্রকৃতির এই রং স্বাস্থ্য, বৃদ্ধি বা উন্নতি, নতুনত্ব ও পরিবেশ নির্দেশক। আর এ জন্যই গৃহসজ্জায় সবুজ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রং।
হলুদ
হলুদ রঙের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আশাবাদ, আলোময়তা আর আনন্দ। হলুদ হলো প্রজ্ঞার প্রতীক। রৌদ্রোজ্জ্বল কোনো দিনের মতোই হলুদ আনে বিশুদ্ধতা ও সচেতনতা। বিভিন্ন শেডের হলুদ রং বিভিন্ন প্রভাব তৈরি করে। যেমন- গাঢ় হলুদ বা সোনালি হলুদ উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা জাগায়। কমলা-হলুদ তৈরি করে প্রভাবশীলতার অনুভূতি, হালকা-হলুদ মনের জানালাগুলোকে খুলে দেয় আর করে তোলে সতর্ক ও সক্রিয়।
গোলাপি
গোলাপি বা পিঙ্ক হলো তারুণ্য, আনন্দ আর উত্তেজনার রং। ভালোবাসার চিরন্তন রং হলো গোলাপি। সাদার প্রভাবে গোলাপি হয় পূর্ণতার রং। গাঢ় শেডের গোলাপি বা মেজেন্টা বিশৃঙ্খলা আর সহিংসতাকে দূরে সরিয়ে রাখে।
কালো
কালো অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ, প্রভাবশালী এবং অনুভূতিকে সহজেই প্রভাবিত করতে সক্ষম একটি রং। কালো প্রকৃতপক্ষে কোনো রং নয়, বরং রঙের অনুপস্থিতি। এ জন্যই কালো হলো শূন্যতার প্রতীক। কালোর উপস্থিতি আলো শুষে নেয়। একদিকে কালোকে মনে করা হয় অশুভ বা অলৌকিক; অপর দিকে এটি আভিজাত্যের প্রকাশ। এর মধ্যে আছে রহস্যময়তা, যা সম্ভাবনার অনুভূতি জাগায়। সাদা এবং কালোর মিশ্রণ মুহূর্তেই আপনার চারপাশের পরিবেশকে বদলে দেয় রহস্যময়তায়।
সাদা
সাদার মধ্যে আছে বিশুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরপেক্ষতা। সাদার সঙ্গে যেকোনো রঙের ব্যবহার সব সময়ই গ্রহণযোগ্য। সাদা শুধু উজ্জ¦লতারই প্রতীক নয়, যেকোনো জায়গাকে দ্বিগুণ ও বড় দেখাতে সাদার জুড়ি নেই।
রঙের মেজাজ
ঘরে ঢুকেই যদি গিন্নির মেজাজ চড়া থাকে, তবে দেয়ালের রং কিংবা ফেব্রিকের মাঝে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। আবার বাইরের হাওয়ার শীতল পরশ যদি ঘরের রঙে মেলে, তবে যেকোনো উত্তপ্ত মস্তিষ্ক মুহূর্তেই ঠান্ডা হতে বাধ্য। আপনার ঘরের রং বাইরের মানুষকে আপনার মেজাজ ও রুচিবোধের জানান দেয়। যদি আপনার ঘরের ইন্টেরিয়রে উজ্জ্বল রং প্রাধান্য পায়, তবে ধরে নিতে হবে আপনি চলনে আধুনিক, বলনে আগ্রহী, বসনে স্টাইলিস্ট আর অতিথি আপ্যায়নে রঙিন একজন। মেজাজ তৈরি বা মেজাজ পরিবর্তনে রঙের যে একটা ভূমিকা আছে, তা গবেষণায়ও প্রমাণিত। তাই ঘরের ভেতর রং ব্যবহার করতে হলে আবেগের মূল্য দিয়ে তা যাচাই করে নিতে হবে। অন্দরসজ্জার সময় মনে রাখবেন হলুদ রং এবং হলুদের অধিকাংশ শেড নিয়ে আসে খুশির আমেজ। সোনালি রঙেও একই এফেক্ট পাওয়া যায়, একই সঙ্গে থাকে ঐশ্বর্যের ধারা। কমলা রং আনন্দ আনে, একই সঙ্গে আনে একটা গরম অনুভূতি। এসব রং খুশির অনুভূতির পাশাপাশি নিউটাল কালার হিসেবেও দারুণ কার্যকরী। কালো রঙের ব্যবহার রহস্যময়তা তৈরি করে। বুদ্ধির সঙ্গে কালো রং ব্যবহার করলে ঘরের পরিবেশে নাটকীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব। সাদা, অফ হোয়াইট, ক্রিম রঙের ব্যবহার ক্লাসিক, অভিজাত, বিলাসী ইত্যাদি নানা মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়।
রঙের বাহার
রং সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হওয়ার পর যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তা হচ্ছে রংকে ছড়িয়ে দেওয়া। ঘরের ভেতর রং ব্যবহার হয় এমন উপাদান অনেকগুলো, যেমন- ফ্লোরিং, জানালা, দরজা, পর্দা, দেয়াল, বেড কভার, কুশন কভার, কার্পেট, শতরঞ্জি, টেবিল ম্যাট, টেবিল রানার, ক্রোকারিজ, ফুলদানি, শোপিস, আসবাবÑ সবকিছুর জন্য রং হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্নের সন্ধানী। রং বাছাইয়ের আগে রং কতগুলো নেবেন তাই নিয়ে ভাবতে হবে। আপনার ঘর আপনারই, তবুও আপনার ঘরে অন্যের রুচির প্রভাব ফেলে। তাই উৎসবে আপনার অন্দরমহলকে রাঙাতে হলে একটি, দুটি কিংবা তিনটির বেশি রঙের উপাদান নিয়ে ভাববেন না। আপনার মুড, ঘরের আসবাবের ধরন, ঘরের সাইজ, টাইলস বা দেয়ালের ধরন ইত্যাদি আপনার রং সিলেকশনে ভূমিকা রাখবে।
আপনার আমার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে হাজারো রং। তাই নিজের পছন্দের রংটিকে বেছে নিয়ে কীভাবে উপস্থাপন করবেন, সেটি আপনার অভিরুচি। সঠিক জায়গায় সঠিক রঙের ব্যবহার যেমন আপনার চারপাশের পরিবেশকে করে তুলবে নান্দনিকতা, তেমনিই ভুল রঙের ব্যবহারে যা হয়ে উঠতে পারে অসহ্যময় ও বিবর্ণ।
দরকারি টিপস
- ঈদের সময় শুধু আসবাবের স্থান পরিবর্তন কিংবা পুনর্বিন্যাস করলেই চলবে না, পাশাপাশি ঘর পরিষ্কার করে রাখতে হবে, যেন ঈদের দিনে অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।
- ঈদের কয়েক দিন আগেই ঘরে নতুন রং করে ফেলতে হবে। যদি রং করার ঝামেলা এড়াতে চান তবে নতুনত্ব আনতে দেয়ালে ওয়াল পেপার লাগাতে পারেন।
- পুরোনো শোপিস সরিয়ে নতুন শোপিস যুক্ত করুন ভিন্নতা আনতে।
- ঘরের কার্পেট কিংবা শতরঞ্জির সঙ্গে মিল রেখে দেয়ালে পেইন্টিং নির্বাচন করুন।
- ঘরে সবুজের স্নিগ্ধ সতেজতা আনতে ইনডোরে প্লাটিং যুক্ত করুন।
- নতুন পর্দা বানানো সম্ভব না হলে ঘরের বিভিন্ন রুমের পর্দা অদল-বদল করে পাল্টে ফেলুন ঘরের চেহারা।
- খাবার টেবিলে উৎসবের আমেজ দিতে রঙিন ক্রোকারিজ ব্যবহার করুন। সঙ্গে নতুন টেবিল ম্যাট এবং টেবিল রানারের কথা ভুলবেন না কিন্তু।
- বিছানার চাদর, কুশন কভার, সোফার কভার, নির্বাচনে সতর্ক থাকুন। কন্ট্রাস্ট রঙের ব্যবহারে ঘর হয়ে উঠবে আরও বেশি আকর্ষণীয়।
- ঘরে মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দিতে ফুলদানিতে তাজা ফুল যুক্ত করুন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫