নির্মাণ শব্দটি ছোট্ট হলেও কাজটি কঠিন, যা এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবারই উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শুধু তা-ই নয়, একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলো সূক্ষ¥ভাবে চিন্তা করে সম্পাদন করা উচিত। নইলে পরে ইমারত ধসে পড়াসহ যেসব বিভ্রাট দেখা দিতে পারে, তার খেসারত দিতে সমূহ ভোগান্তি পোহাতে হয় সংশ্লিষ্ট সবাইকেই। এ ধরনের বেশ কিছু উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে বিগত বছরে। যার মধ্যে ফিনিক্স ভবন ও রানা প্লাজার মতো পূর্ণাঙ্গ ভবন ধসে পড়া, নির্মাণাধীন শিল্পকলা একাডেমী ও খুলনায় সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ছাদ ধসে পড়া এমনকি অতি সম্প্রতি কাওরান বাজারস্থ নির্মাণাধীন ন্যাশনাল ব্যাংক ভবনের শোর পাইল ধসে পড়া অন্যতম। ফলে, যেকোনো ইমারতের নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, এসিআই কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালাসহ সব ধরনের নিয়মনীতি মেনে ডিজাইন ও ড্রয়িং করা উচিত। এবং তদনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ সাপেক্ষে সুষ্ঠু তদারকি অত্যাবশ্যক।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ইমারত নির্মাণসংক্রান্ত নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি ও বিধিনিষেধ থাকলেও তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কেউ মানে না বা মেনে চলার জন্য কাউকে বাধ্য করা হয় না। তদারককারী সংস্থা কর্তৃক তদারকির অভাব তথা আইনের শৈথিল্য কিংবা জটিলতাই এর মূল কারণ। সবকিছুর আইন আছে, নেই তার যথার্থ প্রয়োগ। বরং ক্ষেত্র বিশেষে অপপ্রয়োগ আছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। মনে রাখা দরকার, যেকোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাই একটি প্রকল্প পরিচালনার জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই, আর এই জায়গাটিতেও যথেষ্ট নজরদারির অবকাশ আছে। এর সঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজের জবাবদিহিতা। অন্যথায় এর সব দায়ভার এসে পড়ে নিয়োগকারী বা তদারককারী সংস্থার ওপর। এ ছাড়া ইমারত নির্মাণকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সততা, কর্মনিষ্ঠা ও আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে কাজের গুণাগুণ ও স্থায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে নৈতিকতার এবং সেই নৈতিকতা মেনে চলা প্রতিটি মানুষেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য।
সুতরাং একটি পূর্ণাঙ্গ ইমারত নির্মাণকাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তদারকি নিশ্চিত করা এবং তদারককারীর জবাবদিহির বিষয়টি আমলে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ সংক্রান্ত নিয়মনীতি সম্পর্কে সম্যক কিছু ধারণা দেওয়া এবং তা মেনে চলার জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেই এ লেখা। একটি ইমারতের স্থায়িত্ব ও গুণগত মানের উৎকর্ষতা চারটি প্রধান বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল ১) ম্যান, ২) মেশিন, ৩) ম্যাটিরিয়্যাল ও ৪) মেথড। অত্র বিষয়গুলোর গুণাগুণ নিশ্চিত করতে না পারলে ইমারতের স্থায়িত্ব ও গুণগতমান নিশ্চিত করা দুরূহ। প্রথম তিনটির ব্যাপারে সবার মাঝেই কম-বেশি সচেতনতা থাকলেও চতুর্থটি অর্থাৎ মেথড বা পদ্ধতিগত ব্যাপারে অনেকেই ওয়াকিফহাল নন। সর্বোপরি, কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন, প্রয়োজন তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। তাই একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্প সম্পন্ন করতে পর্যায়ক্রমিক কাজের ধাপগুলো উল্লেখপূর্বক নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি ও কর্মপদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরছি।
পর্যায়ক্রমিক কাজের ধারা
- জমি নির্বাচন
- পারিপার্শ্বিক অবস্থা জরিপ
- জমির বহন ক্ষমতা পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) করা
- ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী স্থাপত্য নকশা (আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং) প্রণয়ন
- কাঁচামাল নির্বাচন ও স্থাপত্য নকশা অনুসারে কাঠামোগত নকশা (স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং) প্রণয়ন
- বিধিবিধান ও নিয়মনীতি প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের অনুমোদন নেওয়া
- নির্মাণকাজে ব্যবহৃত কাঁচামাল নিরীক্ষণ ও সংগ্রহ
- আনুমানিক নির্মাণব্যয় এবং নির্মাণকাল নির্ণয়
- অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ
- প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড়
- সার্বিক তদারকি নিশ্চিতকরণ।
উপরোল্লেখিত কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য আলাদা আলাদা কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং তদনুযায়ী সব কাজ বাস্তবায়নে নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতন হতে হবে।
কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন
খাতওয়ারি কাজগুলো সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারণকরত বিস্তারিত একটি ওয়ার্কস প্রোগ্রাম (কর্মপরিকল্পনা) প্রণয়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রকৌশলী নির্বাচন করা প্রধান ও প্রাথমিক কাজ। যিনি কিনা প্রকল্পে ব্যবহৃতব্য মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা, ডিজাইন ও নকশা তৈরি করার ব্যবস্থাসহ সার্বিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারেন।
প্রকল্প বাস্তবায়ন
১. পারিপার্শ্বিক অবস্থা জরিপ
একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে প্রাথমিক কাজ পারিপার্শ্বিক অবস্থা জরিপ করা। এই জরিপের মাধ্যমে আশপাশে অবস্থিত ভৌত অবকাঠামোসমূহের সার্বিক অবস্থাসহ পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো সবিস্তারে জেনে নিতে হবে। অতঃপর করণীয় ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করে শুরু করতে হবে নির্মাণকাজ। যাতে কাজ চলাকালে আশপাশের কারও কোনো কাজের বিঘ্ন না ঘটে কিংবা মালামালের ক্ষয়ক্ষতি না হয়।
২. মাটি পরীক্ষা
ইমারতের কাঠামোগত নকশা প্রণয়ন করার আগেই কাজটি করা জরুরি। মাটি পরীক্ষা ব্যতীত নকশা প্রণয়ন এবং তদনুযায়ী ইমারত নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে ভবন ধসে পড়ার মতো বিপর্যয় ছাড়াও নির্মাণব্যয় বেড়ে যাওয়ার একটি আশঙ্কা থেকে যায়। তাই এসব বিড়ম্বনা এড়াতে মাটি পরীক্ষার বিষয়টি মোটেই উপেক্ষা করা উচিত নয়, যা ব্যক্তিমালিকানায় নির্মিতব্য ইমারতের বেলায় প্রায়ই ঘটে থাকে। তাই বিশেষভাবে উল্লেখ্য, একটি ইমারত নির্মাণব্যয়ের তুলনায় মাটি পরীক্ষায় অতি নগণ্য একটি খরচ হয়, যা বাঁচানোর চিন্তা করা মূর্খামী ছাড়া অন্য কিছু নয়।
৩. নকশা প্রণয়ন
একজন অভিজ্ঞ স্থপতি বা প্রকৌশলী দিয়ে ইমারতের নকশা প্রণয়ন করার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। একটি ইমারতের ব্যবহার উপযোগিতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা অভিজ্ঞতারই ফসল। এ ছাড়া একটি ইমারতের নকশা তৈরির ব্যাপারেও নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি এবং বিধিনিষেধ আছে, যা মেনে চলা অত্যাবশ্যক। কিন্তু এই জায়গাটিতে আমরা অনেক সময় একজন অভিজ্ঞ স্থপতি কিংবা প্রকৌশলীর পারিশ্রমিকের অঙ্ক শুনে আঁতকে উঠি, যা আদৌ সমীচীন নয়। আপাতদৃষ্টিতে টাকার অঙ্ক অনেক বেশি (যদিও নির্মাণব্যয়ের তুলনায় যৎসামান্য) শোনা গেলেও বাস্তবে লাভ আরও অনেক বেশি। যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা একজন অভিজ্ঞ স্থপতি বা প্রকৌশলীই দিতে পারেন।
৪. কাঁচামাল নির্বাচন
আগেই বলা হয়েছে, একটি ইমারতের স্থায়িত্ব ও গুণগতমানের উৎকর্ষতা নিশ্চিতকরণে কাঁচামালের গুণাগুণ নিশ্চিত করা একটি মুখ্য বিষয়। কাদা দিয়ে যেমন সিমেন্টের কাজ হয় না, তদ্রƒপ খারাপ মালামাল দিয়েও ভালো কাজ আশা করা যায় না। অতএব, মালামাল নির্বাচনের ব্যাপারেও আমাদের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার, যা নিশ্চিতকরণে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।
চলবে…
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫