বৈচিত্র্যময় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুগুলোর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক গভীর। শীতে প্রকৃতির শুষ্কতা আর গ্রীষ্মে সূর্যের প্রচণ্ড দাবদাহে অতিষ্ঠ প্রাণিকুল; রুক্ষ-রুদ্র, চৌচির মাঠ। এরপর কালবৈশাখীর ভয়ংকর ভাঙা-গড়ার খেলা। ক’দিন বাদেই ধূসর বরণ এলোকেশে হাজির হবে প্রতাপশালী বর্ষা। শুরু হবে প্রবল বর্ষণ। আষাঢ়ে ঢলে ভরে ওঠে মাঠ-ঘাট, খাল-বিল, নদী-নালা। অতিবর্ষণে শুরু হয় প্লাবন। দেশের প্লাবনভূমি ও নদীবিধৌত অঞ্চলে দেখা দেয় বন্যা। ডুবে যায় ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, বাজার, ঘরবাড়ি, জনপদ। পানিবন্দী হওয়ায় দুর্ভোগের সীমা থাকে না মানুষের। বন্যাকবলিত জনপদের এসব দুর্ভোগ অনাদিকালের। অসহায় মানুষেরা নিজেদের মতো করেই মোকাবিলা করছে এমন পরিস্থিতি। এ পর্যায়ে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নিত্যদুর্ভোগ হয়ে দাঁড়ায় তাদের আবাসন ও জীবন-জীবিকা। তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিরসনে নির্মাণ সম্ভব হয়নি বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহনীয় কোনো আবাসন প্রকল্প।
বাংলাদেশ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের একটি ব-দ্বীপ, যার প্রায় ৮০ শতাংশ পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, মেঘনা নদী এবং তাদের শাখা-প্রশাখা বাহিত পললে গঠিত। প্রতিবছর দেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গ কিমি এলাকা অর্থাৎ ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড বন্যাকবলিত হয়। ব্যাপক বন্যা হলে যা পৌঁছে মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫৫ শতাংশে। প্রতিবছর গড়ে দেশের তিনটি প্রধান নদীপথে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৮ লাখ ৪৪ হাজার মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয়। প্রবল বর্ষণে যা আরও বাড়ে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বার্ষিক সম্মিলিত বন্যার প্রবাহ একটি মাত্র প্রবাহে অর্থাৎ মেঘনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। ফলে পানির নিষ্কাষণক্ষমতা কমে যায়। প্রতিবন্ধকতার কারণে সৃষ্ট বন্যা দেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের উঁচুভূমি ও পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া হয় প্রায় সর্বত্রই। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কিছু প্লাবনভূমিগুলোকে রক্ষা করলেও কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা প্রতিবছরই বন্যায় প্লাবিত হয়।
বন্যার রকমফের
বাংলাদেশে হওয়া বন্যা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত-
১. মৌসুমি বন্যা (গড়হংড়ড়হ ঋষড়ড়ফ): এই বন্যা ঋতুগত; নদনদীর পানি ধীরে ধীরে ওঠানামা করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে;
২. আকস্মিক বন্যা (ঋষধংয ঋষড়ড়ফ): আকস্মিক পাহাড়ি ঢল অথবা স্বল্পসময়ে হওয়া প্রবল বৃষ্টিপাত থেকে কিংবা প্রাকৃতিক অথবা মানবসৃষ্ট বাঁধ ভেঙে এ বন্যা হয়;
৩. জোয়ারসৃষ্ট বন্যা (ঞরফধষ ঋষড়ড়ফ): স্বল্পকালীন এই বন্যার উচ্চতা সাধারণত ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত, এটি ভূ-ভাগের নিষ্কাশন প্রণালিকে আবদ্ধ করে ফেলে।
বন্যার যত কারণ
- সাধারণত নিম্ন উচ্চতাবিশিষ্ট ভূসংস্থান, যার ওপর দিয়ে প্রধান প্রধান নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীগুলো তাদের শাখা-প্রশাখা এবং উপনদীর সমন্বয়ে ঘন বিন্যস্ত নিষ্কাশন জালিকা গড়ে তোলায়;
- দেশের বাইরে নদনদীর উজান এলাকায় এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারী বৃষ্টিপাত;
- হিমালয় পর্বতে তুষার গলন এবং প্রাকৃতিকভাবে হিমবাহের স্থানান্তর সংঘটন;
- পলি জমার ফলে নদনদীর তলদেশ ভরাট বা নদীর পার্শ্বদেশ দখল কিংবা ভূমিধস;
- প্রধান প্রধান নদীসমূহে একসঙ্গে পানি বৃদ্ধি এবং এক নদীর ওপর অন্য নদীর প্রভাব বিস্তার;
- অপরিকল্পিত বাঁধ;
- প্রকৃতির ওপর অমানবীয় হস্তক্ষেপ;
- জোয়ারভাটা এবং বায়ুপ্রবাহের বিপরীতমুখী ক্রিয়ার ফলে নদনদীর সমুদ্রমুখী প্রবাহ ধীরগতিপ্রাপ্ত হওয়া (ইধপশ ডধঃবৎ ঊভভবপঃ);
- সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া;
- ভূ-গাঠনিক বিশৃঙ্খলা (ভূমিকম্প, নদীর প্রবাহ ও ভূরূপতত্ত্বে পরিবর্তন);
- নিচু এলাকা ও জলাশয় ভরাট
- সম্ভাব্য গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি।
চর, দ্বীপচর, নদীসংলগ্ন এলাকা, নিম্নাঞ্চল, উপকূলবর্তী ও হাওর অধ্যুষিত এসব জনপদে বন্যায় একমাত্র সমস্যা নয়। নদীভাঙন দুর্ভাগ্যের আরেক নাম। ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ে সর্বস্বান্ত। বন্যায় হয়ে পড়ে পানিবন্দী। বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ বর্ণনাতীত! পানিবন্দী মানুষ চরের উঁচু ভিটায় কিংবা ঘরের ভেতর মাচা করে আশ্রয় নেয়। ঘরে ঘরে দেখা দেয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানির সংকট। স্যানিটেশন-ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হয়। শুরু হয় পেটের পীড়া; অসুখ-বিসুখ। হাঁস-মুরগি, গবাদিপশুর আশ্রয় ও খাবার নিয়ে বিপাকে পড়ে গ্রামবাসী।
সাপ-পোকামাকড় এসে আশ্রয় নেয় বসতবাড়িতে। এ সময় সাপের কামড়ে, পানিতে ডুবে মারা যায় অনেকেই। এমনকি কেউ মারা গেলেও কবর দেওয়াও দায় হয়ে পড়ে। বন্যা পরিস্থিতি খারাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী হলে নিরুপায় মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেয় কোনো স্কুলে বা উঁচু কোনো রাস্তা বা বাঁধে। অনেক সময় আশ্রয়প্রার্থী বেশি হলে ঠাঁই মেলে না ওখানেও। তখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হয়। এ সময় থাকে না কোনো কাজ। কাজের খোঁজে বন্যাকবলিত এসব মানুষ ভিড় করে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে।
বন্যা বাংলার প্রকৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহাভারত, রামায়ণ ও অন্যান্য পুরোনো গ্রন্থে প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে। চন্দ্র, গুপ্ত, মৌর্য (৩২১-২৯৬ খ্রি. পূ.) আমলেও বন্যা হয়েছে বছর বছর। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের বন্যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, যার ফলে প্রায় ৮২ হাজার বর্গ কিমি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত (সমগ্র দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি) হয়; যার ব্যাপ্তি ছিল প্রায় দুই মাস। ২০০০ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাঁধ ভেঙে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সীমান্তবর্তী পাঁচটি জেলা বন্যায় আক্তান্ত হয়। গৃহহীন হয় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। বন্যা জনজীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করলেও নদীবাহিত পলি ফসলি জমিকে উর্বর করে উৎপাদনে উৎকর্ষতা আনে। তাই সেই অর্থে বন্যা কোনো অভিশাপ নয়। বরং প্রকৃতির অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। বিশ্বের নদীবিধৌত প্রায় সব দেশেই বন্যা হয়। চীন, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, ভারতসহ অনেকে দেশেই বন্যা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তবে উন্নত দেশগুলোর বন্যা ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত পরিকল্পিত। যেমন- আবাসন প্রকল্প, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নির্গমন বাঁধ, পোল্ডার, সড়ক, আশ্রয়কেন্দ্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি। অথচ বাংলাদেশের বন্যা ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত ত্রুটি লক্ষণীয়। সড়ক, মহাসড়ক, রেলপথ, বাঁধ, নগর, নদীর অবৈধ দখল, নিম্নভূমি ও জলাশয় ভরাট প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে বন্যা পরিস্থিতি হয়েছে আরও সঙ্গিন। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নির্গমন, আবাসন, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা প্রকল্পে প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগ সত্ত্বেও আসেনি কাঙ্খিত সাফল্য। এমনকি নদীভাঙনের শিকার বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পও প্রতিবছরই হচ্ছে বন্যাকবলিত এমনকি নদীভাঙনের শিকার।
বাংলাদেশের নগর, গ্রাম, উপশহর, সড়ক, বাঁধ, অবকাঠামো কোনো কিছুই পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে নাগরিক বিড়ম্বনার শেষ নেই। এই অবকাঠামোগুলো বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। বন্যা মোকাবিলায় ভুক্তভোগীরা স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ দিয়েছে, ভিটা উঁচু করেছে, এমনকি মাচার ওপর তৈরি করেছে ঘরবাড়ি। একসময় পদ্মাপারের ভাটি অঞ্চলের প্রায় সব বাড়িঘরই এভাবে বানানো হতো। পূর্বাঞ্চলের হাওরবিধৌত অঞ্চলগুলো বছরে প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধ থাকলেও সেখানকার আবহাওয়ার উপযোগী কোনো আবাস নির্মিত হয়নি আজ পর্যন্ত। বসতভিটার মাটি উঁচু করে কোনো রকমে বাস করছে তারা। বছর বছর এসব বসতি সংস্কারে তাদের প্রচুর অর্থও ব্যয় হয়। অথচ এসব জনপদের আবাস এলাকাকে আরও উঁচু করে আবাসনের ব্যবস্থা করলে একদিকে যেমন জলাভূমি নষ্ট হবে না, তেমনি আবাসনের ভূমিও হবে আরও শক্তিশালী। তবে এসব সনাতনি বাস্তুচিন্তা বদলে নতুন নির্মাণপদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে জলমগ্ন জনপদের এসব মানুষের জন্য।
ভাসমান গ্রাম প্রকল্প
সময়ের উৎকর্ষতায় স্থাপত্যবিদ্যায় যুক্ত হচ্ছে নানা মাত্রা। নির্মিত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব আবাস। বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে জলাভূমি। উন্নত দেশগুলো জলাভূমিকে ভরাট না করে অত্যন্ত সাধারণ নির্মাণকৌশলে গড়ে তুলছে ভাসমান নগর বা গ্রাম প্রকল্প। এগুলো বসবাসে দারুণ উপযোগী, যেখানে স্থাপত্যকৌশলে সব ধরনের নাগরিক অনুষঙ্গের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভাসমান বাড়ির ধারণা এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে এখন ভাসমান গ্রাম ও শহর গড়ার কথাও ভাবতে শুরু করেছে উন্নত দেশের নগর পরিকল্পনাবিদেরা। এমনকি চর্চাও শুরু হয়েছে অনেক দেশে। এ দেশের বন্যাকবলিত ও জলাবদ্ধ এলাকার আবাসনব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানে এবং জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের ভাসমান গ্রাম প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। ভাসমান গ্রাম প্রকল্পে আবাসনব্যবস্থা সারা বছরই বাসের উপযোগী। পানির স্তর যতই বাড়ুক না কেন; আশ্রয়ের খোঁজে এখন অন্যত্র যেতে হবে না। পানির স্তর বাড়লে বাড়িগুলোও ভাসবে এর সঙ্গে। প্রতিটি বাড়িই হবে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। থাকবে স্বাস্থ্যসম্মত শৌঁচাগার, খামার, হাঁস-মুরগি পালনের সুব্যবস্থা, ভাসমান সবজিক্ষেত, পানীয় জলের জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সুব্যবস্থা, গবাদিপশুর জন্য দুই স্তরের মাচাবিশিষ্ট গোয়াল ঘর, সৌর ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট প্রভৃতি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাসমান গ্রাম বা বাড়ি প্রকল্পের যেসব মডেল করা হয়েছে তা মূলত ওই দেশের আবহাওয়া, পরিবেশ এবং জলাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে। যেমন- কোনো প্রকল্প হয়তো সারা বছরই জলমগ্ন থাকে, কোথাও প্রকল্প হয়েছে নদী, লেক বা সাগরকে ঘিরে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্মিত প্রকল্পের ডিজাইন হবে বন্যার স্থায়িত্বকাল, পানির উচ্চতা, পানির গতি প্রবাহের ধরন, গ্রামের অবস্থান, নদীভাঙনের ঝুঁকি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি বিবেচনায়। যেহেতু জলাবদ্ধতা কয়েক দিন বা মাসের জন্য, তাই আবাসন প্রকল্পকে এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে, যেন বন্যার সময়ে ভাসে এবং অন্য সময়ে তা স্বাভাবিকভাবে মাটিতে নেমে আসে। এ জন্য ডিজাইন মডিউলে কিছু বাড়তি কাঠামো রাখতে হবে। যেগুলো বন্যাকালীন মূল কাঠামোর সঙ্গে অন্যান্য মডিউলকে জুড়ে দেওয়া যাবে। যেমন- উঁচু মাচাবিশিষ্ট গোয়াল ও গৃহপালিত পশুর ঘর। যে গুলোকে স্বাভাবিক সময়ে স্টোর বা গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বা দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে এগুলো ভাঁজ করে সংরক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া ফসল বা অন্যান্য উপাদান সংরক্ষণের জন্য আরও কিছু মডিউল জোড়া দিয়ে কাঠামোটি বড় করা যাবে।
প্রকল্প নির্মাণের উপকরণ ও স্থাপত্যকৌশল
ভাসমান বাড়ি নির্মাণকৌশল ও প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত সাদামাটা। স্থানীয় সহজলভ্য নির্মাণ উপকরণ, প্রযুক্তি এমনকি স্বেচ্ছাশ্রমেই নির্মাণ করা যাবে এ ধরনের আবাস। বাঁশ, কাঠ, টিন, বোর্ড, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ড্রাম ও বোতল প্রভৃতি ভাসমান বাড়ি নির্মাণে আদর্শ। প্রতিটি উপকরণই দামে সস্তা, যার ব্যয়ভার সহজেই বহন করতে পারে দরিদ্র মানুষ। প্রকল্পটির প্রধান নির্মাণ উপকরণ বাঁশ। টিনের চাল, বাঁশের চাটাই বা কাঠের তক্তার বেড়া। এ ছাড়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির কনটেইনার ও পলিথিন শিট কাঠামোটিকে ভাসিয়ে রাখবে। কনটেইনাগুলো ব্যবহার করা হয়, যাতে করে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠামোটি ওপরে উঠতে থাকে। ব্যবহৃত বাঁশগুলোকে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করে আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয় বিধায় তা ঘুণ ধরে না এবং দীর্ঘকাল পানির নিচে থাকলেও পচে না। ফলে কাঠামোর দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হয়, যার স্থায়িত্ব ২০ থেকে ৩০ বছর। ছাদ বা চাল নির্মাণে ব্যবহৃত হবে আবহাওয়ার উপযোগী ঢেউটিন। অনেক বাড়ি একসঙ্গে করলে নির্মাণব্যয় কমবে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য আদর্শ বাসস্থান হবে এটি।
ভাসমান লিফট হাউস বা দ্বিতল বাড়ি
সম্প্রতি ভাসমান বাড়ির ক্ষেত্রে লিফট হাউস প্রকল্প পাচ্ছে দারুণ জনপ্রিয়তা। এটা একধরনের দোতলা উভচর বাড়ি। বাঁশ-কাঠেই নির্মিত। যদিও এই কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। এ দেশের বৃহত্তর বরিশালে বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে অনেক আগে থেকেই দোতলা বাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। বছরের অন্যান্য সময় সাধারণত নিচেই পরিবারগুলো বাস করে। দোতলা ব্যবহৃত হয় ফসল রাখার গোলা হিসেবে। কিন্তু বন্যার সময় বাসিন্দারা ওপরের তলায় উঠে আসে বন্যার কবল থেকে বাঁচতে। ডাবল ইউনিটের এই বাড়িগুলো আধুনিক ডুপেক্স সিস্টেমে নির্মিত। বাড়ির ভেতরেই থাকে ওঠানামার সিঁড়ি। তা ছাড়া এই বাড়ির ভিটা ও ভীত বেশ উঁচু ও সুদৃঢ়। তবে লিফট হাউসের সুবিধা হচ্ছে বাড়ির দুই পাশে বাঁশ-কাঠের বাড়তি অংশ থাকবে, যা পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠবে এবং পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নামবে। আর মূল অংশটি রড, ইট সিমেন্ট দিয়ে তৈরি, যা ভাসবে না। পেছনের অংশে থাকবে রান্নাঘর, বাথরুম, টয়লেট ও বারান্দা। বন্যার পানি যদি ১০ ফুট পর্যন্ত বাড়ে তাহলে নিচের ঘরটি ভেসে কংক্রিটের তৈরি অংশের লেবেলে চলে আসবে। লিফট হাউসটি এমন একটি বাসস্থান যা বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাসবে এবং পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাবস্থায় আবার মাটিতে ফিরবে। স্থাপনাটির ভাসমান ব্যবস্থা দুইভাবে করা যায়। প্লাস্টিক বোতল বা ড্রাম ও ফাঁপা ফেরোসিমেন্ট ব্যবহার করে।
বাংলাদেশ হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইবিআরআই) কয়েক বছর যাবৎ হাওর অধ্যুষিত জনপদের আবাসন সমস্যা বিবেচনায় ফেরো সিমেন্ট ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের ভাসমান বাড়ি নির্মাণ করছে। যদিও প্রকল্পটি এখনো গবেষণাধীন। এটা যুগোপযোগী ও সাধারণ মানুষের সাধ্যসীমায় আনতে কাজ অব্যাহত রয়েছে। ফেরোসিমেন্টের এ ধরনের ভাসমান বাড়ি একধরনের রি-ইনফোর্সমেন্ট কংক্রিট, তারজালি আর সিমেন্টে তৈরি। ওজনে হালকা ও নির্মাণ সময় কম লাগায় প্রকল্পটি নিয়ে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। ফেরোসিমেন্টের সুবিধা এটা রড ও তার ছাড়াও বাঁশ বা অন্য কোন শক্ত উপকরণ দিয়ে কাঠামো নির্মাণ করা যায়। তা ছাড়া কংক্রিটের বদলে এখানে সিমেন্ট মর্টারও ব্যবহার করা যায়। কিন্তু প্রকল্পটিকে সফল করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোই এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বানভাসি ও হাওরাঞ্চলে আবাসন ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন অত্যন্ত অবহেলিত। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ও জলাবদ্ধতায় যেতে না পারায় শিক্ষার্থীরা এ সময়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে তারা শিক্ষা থেকে পিছিয়ে। এ ছাড়া সেখানকার স্যানিটেশনব্যবস্থা খুবই নাজুক। ফলে মানুষ যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করে, যা সৃষ্টি করে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রোগব্যাধির। তাই এসব এলাকায় বর্ষায় ভাসমান স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ভাসমান গ্রাম প্রকল্প ডিজাইনে এ বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে রাখা উচিত।
জীবনমানের উন্নয়নে
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাক্ষণবাড়িয়া প্রভৃতি হাওর এলাকা বছরের প্রায় ছয মাস পানিতে ডুবে থাকে। বর্ষাকালে হাওর এলাকার মানুষ জলবন্দী হয়ে পড়ে। এলাকার অনেকেই বছরের এ সময়টাতে থাকে বেকার। বিশেষ করে যারা কৃষিকাজ করে, তারা অন্য কাজে তেমন পারদর্শী নয়। কেউ কেউ মাছ ধরলেও তাতে তেমন সমৃদ্ধি আসেনি জীবনমানের। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শহরে পাড়ি জমাতে হয় হাওরবাসীকে। অথচ বিশাল হাওর একদিকে যেমন মিঠা পানির বিশাল ভান্ডার, তেমনি প্রচুর মৎস্য সম্পদে ভরপুর। হাজারো জীববৈচিত্র্যের পাখি, জলজ উদ্ভিদ এবং মুক্তাসহ ঝিনুক রয়েছে হাওরের সর্বত্র। এগুলোকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান করা গেলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনা সম্ভব। সে লক্ষ্যে ভাসমান কৃষি ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-
ভাসমান চাষাবাদ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বন্যা আর জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের কৃষির একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যার কারণে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতিতে ও খাদ্য সংকটে পড়ে। এ সমস্যাগুলোর সমাধানে ভাসমান চাষাবাদ বা ভাসমান বেডে সবজি চাষ জনপ্রিয় করা যেতে পারে। জলজ উদ্ভিদ, কচুরিপানা, শেওলা ইত্যাদি দিয়ে বাঁশের মাচা করে পানির ওপর দুই ফুট পুরু স্তূপ করে তৈরীকৃত জৈব-জমিতে বা ভাসমান বেডে উদ্ভিদ জন্মানো যেতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন ঘটেছে। কৃষিজমির বিকল্প হিসেবে জলাশয়ে চাষের এ পদ্ধতি কয়েক বছর ধরেই দেশের গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও বরিশালে সাফল্যের সঙ্গে চলে আসছে।
এমনকি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এএফও) কর্তৃক ‘কৃষি ঐতিহ্য অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাসমান পদ্ধতির সবজি চাষ। এরই মধ্যে এ পদ্ধতিতে সবজি আবাদকে সম্ভাবনাময় ‘গ্লোবালি ইমপোর্ট্যান্ট এগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম (জিআইএএইচএস)’ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে সংস্থাটি। ভাসমান এ পদ্ধতিতে কৃষির উৎপাদনশীলতা কৃষিজমির মাটির তুলনায় ১০ গুণ বেশি। এ ছাড়া সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন হওয়ায় কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয় না এতে। ফলে উৎপাদন খরচও কমে অর্ধেকে নেমে আসে। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন শাকসবজি যেমন লালশাক, পুঁইশাক, শসা, বরবটি, ঢ্যাঁড়স, মিষ্টিকুমড়া ও ঝিঙা উৎপাদন করা যায়। প্রতিবছর শতকরা ১ ভাগ হারে চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প স্থাপনের মাধ্যমেও জীবনমানের উন্নয়ন করা সম্ভব। অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখ্য-
- উঁচু মাচায় হাস, মুরগি, কবুতরসহ গৃহপালিত পশুপালন
- মুড়ি, চিঁড়া, খৈ তৈরি ও বাজারজাতকরণ
- বর্ষার সময়ে ধরা পড়া অতিরিক্ত মাছ শুঁটকি তৈরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
- হস্ত ও কুটিরশিল্প খাতে নারীদের নিয়োজিত করা
- উন্মুক্ত উঁচু স্থানে এমন গাছ লাগানো যেতে পারে, যেসব গাছ পানিতে বেঁচে থাকে এবং বাড়ে
- মুক্ত জলাশয়ে বা নদীতে খাঁচা ও ঘের পদ্ধতিতে মাছ চাষ
- জলাশয়ে মাছ-মুক্তা চাষ
- বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি প্রভৃতি।
বন্যা ও জলাবদ্ধতায় টিকতে সক্ষম অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও সামাজিক, অর্থনৈতিক, কারিগরি ও পরিবেশগত বিষয়গুলো চিহ্নিত করা ও সামগ্রিক কতিপয় পরিকল্পনা বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসবের মধ্যে-
- গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ
- বাঁধ সংস্কার
- ভঙ্গুরপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নদীর পাড় এলাকায় পলিকরণ বা সেডিমেন্টেশন
- বাঁধ এবং চিহ্নিত এলাকায় বনায়ন
- সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার সংস্কার
- সাইক্লোন শেল্টার কাম প্রাইমারি স্কুল নির্মাণ
- ভূমি ব্যবস্থাপনা, দুর্বল অবকাঠামো, বাঁধ, বনায়ন প্রভৃতি
- মানুষ যেন দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে সে লক্ষ্যে বন্যার পানির উচ্চতা বৃদ্ধির আগেই জনগণের কাছে বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে জোরদার করা
- নদনদীর উপচে পড়া পানি হ্রাসের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা সাধন। এ উদ্দেশ্যে বনায়ন এবং পুনর্বনায়নের সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ ও তার যথাযথ সংরক্ষণ, যাতে পরিশোষণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যার পানির উচ্চতা হ্রাস ঘটতে পারে
- ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন এবং বিল্ডিং কোডের যথাযথ প্রয়োগ
- বন্যা সহনীয় শস্য চিহ্নিতকরণ ও রোপণ
- পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ
- প্লাবনভূমিসমূহকে বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভূমি ব্যবহার জোন তৈরি করা ইত্যাদি।
বছর বছর বন্যা; জলাবদ্ধতা একদিকে যেমন বিরাট সমস্যা, অন্যদিকে বিপুল সম্ভাবনা। বন্যার পানি যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে কৃষি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, মৎস্য চাষ, পশুপালনসহ নানাভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেগুলো নিশ্চিত করতে প্রয়োজন মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। সমস্যাটির সমাধানে ভাসমান গ্রাম প্রকল্প অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। বন্যার কারণে বছর বছর সম্পদের যে ক্ষতি হয়, তা শুধু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীরই নয়, বরং রাষ্ট্রেরও। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে যদি এ ধরনের প্রকল্প দাঁড় করানো যায়, তাহলে এর উপযোগিতা উপলব্ধি করে বানভাসি জনপদের মানুষেরাই তা নির্মাণ করতে পারবে। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই), স্থাপত্য অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন এনজিওকে উদ্যোগ নিতে হবে এ ধরনের প্রকল্প ডিজাইন, নির্মাণ, বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সম্পদের ক্ষতি হ্রাস পাবে। নিশ্চিত হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।
‘স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কম খরচে কীভাবে গ্রামের মানুষের জন্য ভাসমান বাড়ি তৈরি করা যায়, এ বিষয়ে গবেষণা হতে পারে’
লাবিব হোসেন
প্রভাষক, স্থাপত্য বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
বন্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন চিন্তাভাবনা গ্রামাঞ্চলে আগে থেকেই বিদ্যমান, যেমন ভিটাবাড়িটা উঁচু করে বানানো। এ ক্ষেত্রে মাটির স্তম্ভটা (Plinth) যত উঁচু হবে, তত এটি বন্যা মোকাবিলায় কাজ করবে। তারপরও বেড বন্যার ক্ষেত্রে পানি মাঝে মাঝে এর ওপরে উঠে যায়। এ ক্ষেত্রে আবাসনের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন করে দুর্ভোগ কমানো যেতে পারে। অনেক গ্রামের বাসাতেই চালার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ঘরের উচ্চতা একটু বাড়লে, ব্যাপক বন্যার (Excessive Flood) সময় এই চালাটি ব্যবহার করা যেতে পারে, যা অন্য সময়ে গুদামঘর (Store) হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া বসতবাড়ির উঠানের সঙ্গে বাঁশের তৈরি ভাসমান মাচা থাকতে হবে, যা পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠবে। এ রকম একটি ভাসমান মাচার ডিজাইন পাওয়া যায়। উবিষষরহম Dwelling in Delta Competition-এ আর্কিটেক্ট খন্দকার আবদাল হোসেনের ডিজাইন প্রপোজালে, যা ওই প্রতিযোগিতার প্রথম স্থান অধিকার করে।
বন্যার সময় গ্রামাঞ্চলে যে সমস্যাটি প্রকট আকারে দেখা যায়, তা হলো বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং এর ফলে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। বর্তমানে কিছু কিছু গ্রামে তারা নিজেরাই বন্যার সময় বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে রাখে। কিন্তু এটাকে ডিজাইন করে কোনোভাবে যদি বাসার একটি অংশে এমনভাবে স্থাপন করা হয়, যাতে তা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করতে পারবে পরবর্তী ব্যবহারে জন্য। এ ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (Rain Water Harvesting) কনসেপ্টে এলাকাভিত্তিক চিন্তা করতে হবে। ডিজাইন নির্ভর করবে এলাকার বৃষ্টির মাত্রা, স্থায়িত্ব ইত্যাদির ওপর। বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান (Natural Element) যেমন নুড়িপাথর, বালু ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে পানি বিশুদ্ধকরণের কাজে।
ভাসমান বাসার কনসেপ্ট আমাদের কনটেক্সে (Context) এখনো তেমন একটা লক্ষ করা যায় না। তবে ইউরোপীয় কনটেক্সে এর প্রয়োগ লক্ষ করার মতো। আমাদের দেশেও স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কম খরচে কীভাবে গ্রামের মানুষের জন্য ভাসমান বাড়ি তৈরি করা যায়; এ বিষয়ে গবেষণা হতে পারে। নৌকা থেকে শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু গ্রামের কনটেক্সে সবকিছুই হতে হবে স্থানীয় পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রাকে মাথায় রেখে। গবাদিপশু ও পাখির ব্যাপারটাও চিন্তায় রাখতে হবে। বন্যার পানি বাড়লে তাদের কোথায় নেওয়া হবে, থাকতে হবে সেই চিন্তাও।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫