হোয়াইট হাউস: গর্ব ও ক্ষমতার অনন্য স্মারক

মানুষের মন স্বভাবতই কৌতূহলী। অজানা ও অদেখার প্রতি তার আগ্রহ অসীম। ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব আর তারকাদের জীবন কিংবা তাদের আবাসস্থল সম্পর্কে মানুষের আগ্রহের কমতি ছিল না কখনোই। আর সেটি যদি হয় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির নিবাস, তবে তো কথাই নেই। বলছি, মার্কিন মুল্লুকের অধিপতির সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউসের কথা। কী আছে সেখানে, ভবনটি দেখতে কেমন, কেমনই বা ওই ভবনের বাসিন্দাদের জীবনযাপনÑ এ সবকিছুই সব সময় মানুষের আগ্রহের খোরাক জুগিয়েছে যুগে যুগে। কি স্থাপত্য কৌশলে, কি গোপনীয়তায়, কি সৌন্দর্যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই হোয়াইট হাউস যেন নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী; এক কথায় অদ্বিতীয়। চলুন তাহলে ঘুরে আসি হোয়াইট হাউসের অন্দরমহল থেকে। জেনে নিই স্থাপনাটির আদ্যোপান্ত।

ওয়াশিংটন ডিসির উত্তর-পশ্চিমের ১৬০০ পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ভবন এটি। প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামসের সময় (১৮০০ সাল) থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও একই সঙ্গে প্রধান দাপ্তরিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইরিশ বংশোদ্ভূত জেমস হোবান স্থাপনাটির স্থপতি। তাঁর নকশায় নব্য ধ্রুপদি নির্মাণশৈলী লক্ষণীয়। ২২২ বছর আগে অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর ১৭৯২ সালে শুরু হয় হোয়াইট হাউসের নির্মাণকাজ। শেষ হয় ১৮০০ সালের ১ নভেম্বর। সম্পূর্ণ ভবনটিতে রয়েছে সাদা রঙের অ্যাকুয়া ক্রিক বেলেপাথরের পলেস্তারা। ন্যাশনাল পার্কের মালিকানাধীন এ প্রাসাদটি আমেরিকার ন্যাশনাল হেরিটেজ। ২০০৭ সালে আমেরিকার স্থাপত্যের তালিকায় দ্বিতীয় সেরা ‘আমেরিকার প্রিয় স্থাপনার’ স্বীকৃতি অর্জন করেছে এটি।

১৮০১ সালে প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের অভিপ্রায়ে স্থপতি বেঞ্জামিন লাট্রবিকে সঙ্গে নিয়ে ভবনটির আস্তাবল ও স্টোরেজকে সরাতে দুটি স্তম্ভ তৈরি করেন। সময়টা ১৮১২ সালের যুদ্ধকালীন; ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে ভেতর ও বাইরের অনেকটা অংশ পুড়ে গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে পুনর্গঠিত ভবন যেটি এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্স নামে খ্যাত। প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো সেখানে বাসস্থান স্থানান্তর করেন। প্রাসাদের দক্ষিণ ও উত্তর উইং নির্মাণকালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কর্তৃক ভবনের অধিকাংশ জিনিসপত্র ছিন্নভিন্ন করলে সেখানকার কর্মচারী কর্তৃক শুধু প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনের একটি পেইন্টিং আর একটি জুয়েলারির বক্স উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

১৯০১ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট পশ্চিম উইংয়ে অফিসের কাজ স্থানান্তর করলে এবং আট বছর পরে বর্ধিত পশ্চিম উইংয়ে প্রথম সম্পূর্ণ ডিম্বাকৃতি রাষ্ট্রপতির ডেস্কের (রেজোলিউট ডেস্ক) পেছনে দক্ষিণমুখী তিনটি বিশালাকৃতি জানালা, উত্তরের শেষ মাথায় একটি ফায়ারপ্লেস, চারটি দরজার পূর্ব দিকেরটি গোলাপ ফুলের বাগান, পশ্চিমটি ব্যক্তিগত স্টাডি ও খাবার ঘরমুখী ওভাল অফিস নির্মিত হয়, যা আজ অবধি রাষ্ট্রপতির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেখানে আরও রয়েছে এক জোড়া সোফা, সংযুক্ত চেয়ার ও টেবিল। রয়েছে একটি গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি, প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের আমল থেকে চলে আসা প্রেসিডেন্টের সিল-সংবলিত কার্পেট, প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতি। কখনো সোনালি বা রুপালি বা লাল এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন রঙে বা ডিজাইনে প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের নিজস্ব রুচি আর পছন্দের সমন্বয়ে ওভাল অফিসের সজ্জা নিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। মজার বিষয় হচ্ছে, ৮১৬ দশমিক ২ বর্গফুট জায়গার এ অফিসেই প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কখনো কখনো তার সঙ্গীদের নিয়ে গলফও খেলেন।

এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্স, পূর্ব ও পশ্চিম উইং, আইসেন হাওয়ার এক্সিকিউটিভ অফিস বিল্ডিং ও ব্লেয়ার হাউস অতিথিশালা নিয়ে বর্তমান হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্সটি গঠিত। দুইতলা বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোর, স্টেট ফ্লোর, সেকেন্ড ফ্লোর ও থার্ড ফ্লোর এই ছয়তলার সমন্বয়ে এক্সিকিউটিভ রেসিডেন্স (প্রেসিডেন্টের বাসভবন) গঠিত। ১৩২টি কক্ষ আর ৩২টি বাথরুম, ৪১২টি দরজা আর ১৪৭টি জানালা নিয়ে ছয়তলার ৫৫ হাজার বর্গফুটের বিশাল এ ভবনটিতে রয়েছে ২৮টি ফায়ারপ্লেস, আটটি স্টেয়ারকেস ও তিনটি এলিভেটর। পাঁচজন ফুলটাইম শেফ, একটি টেনিস কোর্ট, হ্যারি এস ট্রুমান নামের একটি বোলিং অ্যালে, একটি মুভি থিয়েটার, ব্যায়াম ট্রাক, সুইমিংপুল আর বাগানসংবলিত হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্স প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০ হাজার দর্শনার্থীকে আপ্যায়ন করে।

এবার চলুন ঘুরে আসা যাক ইতিহাস থেকে। ১৭৮৯ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন জর্জ ওয়াশিংটন। প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ হিসেবে দখল করলেন নিউইয়র্ক সিটির স্যামুয়েল অসগড হাউস ও পরে আলেকজান্ডার ম্যাকম্ব হাউস। তৃতীয় প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ হিসেবে জন অ্যাডামস ব্যবহার করেন প্রেসিডেন্টস হাউস। এরপরেই স্থায়ীভাবে নির্মিত হয় আজকের হোয়াইট হাউস, যা তৎকালীন গর্ভমেন্ট হাউস নামে পরিচিত ছিল। যেখানে সর্বপ্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবাস গড়েন প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস। আর তাঁর ব্যবহৃত আলেকজান্ডার ম্যাকম্ব হাউসকে ইউনিভার্সিটি অব পেনিনসিলভানিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

হোয়াইট হাউসের নকশার জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতায় পাওয়া যায় নয়টি নকশা। এর মধ্যে জেমস হোবানের বেনামে প্রেরিত নকশাও ছিল। দৈবক্রমে প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন ১৭৯১ সালের মে মাসে তাঁর সাউদার্ন ভ্রমণের সময় নির্মাণাধীন জেমস হোবানের নকশাকৃত সাউথ ক্যারোলিনা রাজ্যের চার্লসটন কাউন্টি কোর্টহাউসের প্রশংসা করেন। তিনি সেখানে জেমস হোবানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পরবর্তী বছরেই তাঁকে ফিলাডেলফিয়ায় ডেকে পাঠান। ১৬ জুলাই, ১৭৯২ প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন শহরের কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নকশা প্রতিযোগিতার ফলাফল জানতে এবং জেমস হোবানের নকশাটি চূড়ান্ত করেন। কিছুটা ছোট হওয়ায় এবং অলংকারিক ও সৌধের আকৃতি না থাকায় পুরো নকশাটির ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে মূল নকশার তিনতলার পরিবর্তে দুইতলা ও নয়টি স্তম্ভের পরিবর্তে ১১টি স্তম্ভের নকশা চূড়ান্ত করা হয়। নকশা যেমনই হোক মূল হোয়াইট হাউসের স্থাপত্যে রোমান ও ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যকলার অনুপ্রেরণা বিদ্যমান।

কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ১৩ অক্টোবর ১৭৯২ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল আবাসস্থল ও ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়েছিল ক্রীতদাস এবং মুক্ত আফ্রিকার-আমেরিকান শ্রমিক ও কিছু ইউরোপিয়ান কর্মী। এ ছাড়া আমেরিকার নাগরিক নয়, এমন অভিবাসী কর্তৃক অন্যান্য কাজের বেশির ভাগ সম্পন্ন হয়েছিল। বেলেপাথরের দেয়াল তৈরিতে জেমস হোবান কর্তৃক নিযুক্ত ছিল স্কটিশ অভিবাসী। তখনকার দিনে ২ লাখ ৩২ হাজার ৩৭১ ডলার (বর্তমান ৩২ লাখ ২৯ হাজার ৫৭ ডলার) ব্যয়ে আট বছরে ভবন নির্মাণ কিছুটা অসমাপ্ত থাকলেও ভোগদখলের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল ১ নভেম্বর, ১৮০০ সালে। এটা অবশ্যই অস্বাভাবিক নয় যে বিখ্যাত এই ভবনটির আরও অনেক রেপ্লিকা নির্মিত হয়েছে। উত্তরমুখী হোয়াইট হাউসের মূল চত্বর তিনটি মেঝে ও ১১টি স্তম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঢালু প্রাচীর দ্বারা গ্রাউন্ড ফ্লোরটি  লুকানো থাকে। ফলে মনে হয় মেঝে যেন দুটি। 

১৮১১ সালে সর্বপ্রথম হোয়াইট হাউস নামটি উদ্ভবের আগে প্রেসিডেন্ট ম্যানশন, প্রেসিডেন্ট হাউস, প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস নামে বিভিন্ন সময়ে এটি আখ্যায়িত হয়ে এসেছে। জনশ্র“তি আছে, পুড়ে যাওয়া হোয়াইট হাউসের পোড়া ক্ষত ঢাকতে সাদা রঙের ব্যবহার দালানটিকে ‘সাদা রঙের মিতা’ বলে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯০১ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট কর্তৃক অফিশিয়ালি হোয়াইট হাউস নামটি খোদাইকরণের আগে এর এক্সিকিউটিভ ম্যানসন নামটি প্রচলিত ছিল আর বর্তমানে খোদাইকৃত ‘ওয়াশিংটন’ মনোগ্রামের ওপরে ‘দি হোয়াইট হাউস’ লেখার প্রশাসনিক প্রচলন ঘটে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট কর্তৃক। ১ ডিসেম্বর, ১৮০০ শনিবারে প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস উঠলেন হোয়াইট হাউসে। প্রেসিডেন্ট ভবনে তাঁর দ্বিতীয় দিন; চিঠি লিখলেন প্রিয়তম স্ত্রী ‘অ্যাবিগলিকে’। স্ত্রীকে লেখা স্বামীর হুবহু চিঠিটি পাঠকদের জন্য-

I pray Heaven to bestow the best of blessing on this House, and all that shall hereafter inhabit it. May none but honest and wise men ever rule under this roof.

অর্থ করলে যা দাঁড়ায়, ‘আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে এই বাড়ির পরম আশীর্বাদ ও বসবাসকারীদের জন্য প্রার্থনা করছি। এই ছাদের নিচ থেকে যেন কেবল সৎ ও জ্ঞানী ব্যক্তিরাই শাসন করতে পারে।’  পরে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট অ্যাডামসের এই চিঠিটি খাবারঘরের কাঠের তাকে লিপিবদ্ধ করেন।

সুরক্ষার বেড়াজালে হোয়াইট হাউস

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারবর্গের সরকারি বাসভবন ও অফিসের জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা। সর্বদা অতন্ত্র প্রহরী হয়ে ক্ষমতাশালী ইউনাইটেড স্টেটস সিক্রেট সার্ভিস ও ইউনাইটেট স্টেটস পার্ক পুলিশ হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্টের অভিষেককালীন ওয়াশিংটন ডিসিতে আকাশ থেকে নিরাপত্তা প্রদানে নরওয়েজিয়ান অ্যাডভান্সড সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম (নাসামস) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তখন থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তায় এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সব ধরনের উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে মিসাইল পর্যন্ত অকেজো করা সম্ভব। আর সব সময়ের জন্যই হোয়াইট হাউসের নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচল একদম নিষিদ্ধ। এ তো গেল আকাশসীমার কথা। এমনকি হোয়াইট হাউসের সামনের পেনিনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউয়ে সামরিক ও সরকারি যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ।

‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন’ এ শব্দের পরিবর্তে সাধারণত ব্যবহার করা হয় হোয়াইট হাউস এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের আদেশ, নিষেধ, প্রস্তাব, বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি/অনাপত্তি, সার্কুলারসহ সব নির্বাহী কার্যক্রমের কেন্দ্র এই হোয়াইট হাউস। কি ঐতিহ্যে, কি সুরক্ষায়, কি গৌরবে, কি দাম্ভিকতায় বিশেষণের প্রতিটি শব্দই যেন হোয়াইট হাউসের পরিপূরক। চিরদিনই বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটির বাসভবন হিসেবে হোয়াইট হাউস পেয়ে এসেছে স্বতন্ত্র মর্যাদা; হয়ে উঠেছে আভিজাত্যের প্রতীক। হোয়াইট হাউস যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব আর ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রতীকী প্রতিচ্ছবি।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top