একটি দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ আর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থি’রতা, পর্যাপ্ত অর্থের সংকুলান, পরিকল্পনা ও প্রকল্প প্রণয়নে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন ও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ বা বদল, সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পের অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়ে যাওয়া বা আগের সরকারের আমলে গৃহীত প্রকল্পের ভালো-মন্দ বিচার না করেই তা স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়া প্রভৃতি কারণে কোনো সরকারের আমলেই কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনারই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটেনি। এর মধ্যে চালু হয়েছে ‘বিভক্তির উন্নয়ন’ অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের সাংসদদের এলাকায় উন্নয়ন হয়, বিরোধী দলের সাংসদের এলাকায় উন্নয়ন হয় না। আবার যে এলাকা থেকে সরকারপ্রধান হন বা বড় বড় পদের মন্ত্রিত্ব মেলে, সে অঞ্চলের উন্নয়ন বেশি অগ্রাধিকার পায়। আর ক্ষমতাকে আঁকড়ে রাখার জন্য দেশের সবকিছুকে রাজধানীমুখী করে ফেলা হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবে রাজধানী ঢাকা এখন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের চাপে হাজারো সমস্যায় জর্জরিত একটি অচলপ্রায় নগর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় নগরের সর্বত্র সর্বক্ষণ যানজট। আগে যেখানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ১৫-২০ মিনিটে যাওয়া যেত, সেখানে এখন অনেক সময় দেড় থেকে দুই ঘণ্টাও লেগে যায়। অপর্যাপ্ত সড়ক ও গণপরিবহনব্যবস্থার অভাব, ফুটপাত বেদখল, পার্ক-খোলা জায়গার অভাব এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সেবারও খুবই দুরবস্থা। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় বিশ্বের বসবাসের অনুপযোগী ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে ১৩৯ নম্বরে। যুগে যুগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা মেগাসিটি ঢাকায় বর্তমানে কেউ জানে না আসলে কত জনসংখ্যা, ঘরবাড়ি, গাড়ি-ঘোড়া আছে। নগরের জনসংখ্যা ও ঘরবাড়ি নিয়ে একেকজনের একেক ধরনের পরিসংখ্যান। সিটি করপোরেশনের হিসাবে, ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ৮০ হাজার মাত্র, অথচ বাস্তবে রিকশার সংখ্যা ১০ লাখের কম নয়। কয়েক দফায় ঢাকার মহাপরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে, কিন্তু যা কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে তার বেশির ভাগ ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছে মোতাবেক। ফলে উদ্ভূত অবস্থায় বর্তমানে বহুল আলোচিত রাজধানী ঢাকার অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (DAP) ও কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (STP) অনুমোদন হয়ে পড়ে আছে, বাস্তবায়নে তেমন কারও কোনো গরজ নেই। আগে প্রণীত বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোরও অনেকটা একই অবস্থা। তার মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ ঢাকায় নগরপিতা (মেয়র) নেই। বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয় নেই। কোনো সংস্থারই কোনো উন্নয়নমূলক কাজ সময়মতো শেষ হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর পর ঝুলে থাকে। মোদ্দা কথা, ‘দেশের হার্ট’ বলে বিবেচিত রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে।
অন্যদিকে দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের উন্নয়নও খুবই দুরবস্থায়। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম থেকে কেউ সরকারপ্রধান না হওয়ায় সব সরকারের আমলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে একধরনের বিমাতাসুলভ আচরণ লক্ষ করা যায়, যদিও চট্টগ্রাম বাংলাদেশের গেটওয়ে এবং সেখানে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর অবস্থিত এবং চট্টগ্রামের মাধ্যমেই দেশের বেশির ভাগ রাজস্ব আসে। এ জন্য পাকিস্তান আমলে তৎকালীন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামে বেশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়, শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। আর তখন সংগতভাবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরগুলো সেখানে বেশি গড়ে উঠেছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে চট্টগ্রামকে বারবার দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে বিনির্মাণের জন্য ঘোষণা দিয়েও কোনো সরকার তাদের কথা রাখেনি। অন্যভাবে বলতে গেলে, নেতৃত্বের বৈষম্যমূলক আচরণ, দূরদর্শিতার অভাব ও চট্টগ্রামের প্রতি অবহেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগের চরম দুরবস্থায় দেশের আমদানি-রপ্তানি দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটির দুরবস্থায় প্রায় সময়ই সেখানে দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে। দেশের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির চার লেনে উন্নীতকরণের জন্য কার্যাদেশ দেওয়ার ছয়-সাত বছরে এখন অবধি মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ভাঙাচোরা ও বেহাল দশায় ২৩০ কিলোমিটারের এই পথটুকু এখন ১০-১২ ঘণ্টায়ও পৌঁছানো যায় না। একই অবস্থা দেশের অপরাপর মহাসড়কগুলোতে। ঢাকা-সাভার-আরিচা ও ঢাকা-গাজীপুর-ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল-বগুড়া মহাসড়কসহ আরও অনেক সড়ক নেটওয়ার্কের অবস্থাও বেশ করুণ।
এর সঙ্গে চলছে অবরোধ আর হরতালের রাজনীতি। গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কথায় কথায় হরতাল ডাকে। আর এখন তো চলছে টানা অবরোধ। এবং কখন যে এর যবনিকাপাত হবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত! পেট্রলবোমা ও ককটেল আক্রমণে অসহায় মানুষ জ্বলে-পুড়ে মরছে। আপামর মানুষ সর্বক্ষণ ভয়াতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, জরুরি প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হয় না। সড়ক-রেলপথে বাধা সৃষ্টির কারণে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন সমস্যাসংকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে দেশে কম-বেশি সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে স্থবিরতা বিরাজ করছে। অন্যদিকে উদ্ভূত সমস্যা ও অনিশ্চয়তায় বিভিন্ন দাতা সংস্থা কর্তৃক তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড়ের পিছুটানের কারণেও সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নকাজে ভাটা পড়েছে! দফায় দফায় সরকারকে বাজেট সংশোধন করতে হচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে, এখানে অনেকেই নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের বৈরী সম্পর্কের বিষয়টিও বলে থাকেন। কারণ, ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অপরাপর দাতা সংস্থাসমূহ বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলেও পরবর্র্তী সময়ে অজ্ঞাত কারণে (!) তাঁদের অনেকে চলমান বা প্রতিশ্রুত প্রকল্পের কিস্তির টাকা সময়মতো ছাড় করেননি। বিশেষ করে পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ঋণচুক্তি সম্পাদনের পরও বিশ্বব্যাংক কর্তৃক টাকা ছাড় করার বিষয়টি খুবই উল্লেখযোগ্য। এতে সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন শুরু করতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প ও কাজে। কাজেই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কোথায় যেন একটা বড় ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে বলেও অনেকের ধারণা!
এখানে উল্লেখ্য, বিগত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের উন্নয়নে অনেকটা ভালো গতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন একপর্যায়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৩০টি উদীয়মান দেশ (Emerging Country) হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। দেশে রাজনৈতিক স্থি’তিশীলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকলে এত দিন বাংলাদেশ হয়তো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত বৈকি। সময়ের প্রেক্ষাপটে একদিকে তখন দেশে যেমন নতুন নতুন উদ্যোক্তার সৃষ্টি হচ্ছিল, তেমনি কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণিরও সৃষ্টি হচ্ছিল, যাদের অনেকে মধ্যবর্তী ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে রাতারাতি প্রচুর ধন সম্পদের মালিকও বনে বসেছিল। তবে যেভাবেই হোক, এসব নব্য পুঁজিপতিরা তাঁদের বৈধ-অবৈধ আয় বা সম্পদ দেশের বাইরে পাচারের চেয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করছিলেন। সে থেকে রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানি থেকে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট, টেক্সটাইল, উইভিং ও কসমেটিক শিল্প স্থাপন, পোলট্রি ফার্মিং, ইলেকট্রনিক প্রোডাক্টস ইত্যাদি সেক্টরে বেশ অগ্রগতিও সাধিত হচ্ছিল। কিন্তু ১/১১-র সরকারের আমলে ক্ষমতালিপ্সু কিছু লোকের কারণে দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় প্রথমেই ঘটে বড় ছন্দপতন। দুর্নীতি দমন অভিযানের নামে অসংখ্য ব্যবসায়ী-শিল্পপতি-আমলা-রাজনৈতিক নেতা ও উদ্যোক্তাকে ‘শীর্ষ দুর্নীতিবাজ’ বানিয়ে সে সময় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও আটক-নির্যাতনে গোটা অর্থনীতি ও উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় স্থবিরতা নেমে আসে। বাস্তবে সে থেকেই অনেকে তাঁদের অর্জিত ধন-সম্পদ বিদেশে নিয়ে যেতে শুরু করেন। কেউ কেউ তো তাঁদের সবকিছু গুটিয়ে আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। অনেকে নিকটবর্তী মালয়েশিয়ায়ও ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়ে সেখানে চলে যান।
আগেই উল্লেখ করেছি, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন রোধে’ অনেকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও মনে করে থাকেন। কারণ, ওই সময় ‘লাইনচ্যুত ট্রেনকে লাইনে তোলা’র নামে ক্ষমতাগ্রহণকারী স্বার্থান্বেষী মহলটি কর্তৃক পূর্বেকার দুটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে নির্মিত ও নির্মাণাধীন গ্যাস ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সড়ক, ব্রিজ, ফ্লাইওভার ইত্যাদির অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ নিয়ে টানাটানিতে চলমান অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও বন্ধ করে দিয়ে সংশ্লি¬ষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গণধরপাকড় চালায়। কয়েকটি গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁদের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ সংশ্লি¬ষ্ট অনেক আমলা-প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে অভিযুক্ত করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। যখন কর্মরত সব আমলা-প্রকৌশলীর মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয় এবং দেশের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে সম্পূর্ণ স্থ’বিরতার সৃষ্টি হয়, প্রচণ্ড লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্র্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ‘যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে’ এমন বিবেচনায় দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও সৃষ্ট জটিলতার কারণে তার একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। যেসব প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়েছিল সেগুলোর মূল্যায়নকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা আতঙ্কাবস্থায় থেকে বিভিন্ন অজুুহাত ও সমস্যা দেখিয়ে অসহযোগিতার প্রেক্ষাপটে কিছু ক্ষেত্রে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত দরপত্র গ্রহণ করেও ঠিকাদার চূড়ান্ত করা যায়নি। এমনকি যথাযথভাবে দরপত্র গ্রহণোত্তর নানা অজুহাতে তা বাতিল করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।
তারপর অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। ১/১১-র সরকারের আমলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বড় রাজনৈতিক দল বা জোটের (নির্বাচনের আগে) প্রতিশ্রুতি ছিল- যে দল বা যারাই ক্ষমতায় যাক না কেন, তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করবে, দেশের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’-এ অনেক বড় আকারের উন্নয়নকাজের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দেখে দেশের সর্বস্তরের মানুষ খুবই আশান্বিত হয়। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলীতে ঝুলন্ত সেতু ও নিচ দিয়ে টানেল, এশিয়ান হাইওয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ককে চার লেনে উন্নীত করাসহ দ্বিতীয় এক্সপ্রেস সড়ক, সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন; রাজধানী ঢাকায় পাতালরেল, মনোরেল, মেট্রোরেল বা স্কাইট্রেন, সার্কুলার রেলপথ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফ্লাইওভার এবং এলিভেটেড রোড নির্মাণসহ বৃত্তাকার জলপথের উন্নয়ন; বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসনে ২০১১ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট, ২০১৩ সালের মধ্যে সাত হাজার মেগাওয়াট, ২০১৫ সালের মধ্যে আট হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২১ সালে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়গুলো উল্লে¬খযোগ্য। তা ছাড়া ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্ন দেশের তরুণসমাজকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে মহাজোট সরকার ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
নির্বাচনোত্তর সরকার প্রশাসনে ‘ই-গর্ভনেন্স’ চালু করাসহ সব ক্রয়-বিক্রয় (টেন্ডার, সাপ্লাই ইত্যাদিতে) পদ্ধতিতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা করে। সে সঙ্গে উল্লেখিত প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়নের পাশাপাশি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুু নির্মাণ, আন্তএশিয়া রেলপথের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য দেশের সমগ্র রেললাইনকে ‘মিটার গেজ’ থেকে ‘ব্রড গেজে’ রূপান্তর, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, ঢাকা চট্টগ্রামের মধ্যে এলিভেটেড সড়ক নির্মাণ, চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে ব্যাংকক-কুয়ালালামপুর এবং চীনের কুনমিং প্রদেশের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বা সেতুবন্ধন, রাজধানীর যানজট ও জনসংখ্যার চাপ কমাতে গাজীপুর বা টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ পথে এলিভেটেড রোড নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রামে খাওয়ার পানির সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পানি শোধনাগার স্থাপন, ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সব সংযোগ সড়কের চওড়াকরণ ও ‘কমিউটার ট্রেন’ চালু এবং আবাসনসমস্যা নিরসনে ১ লাখ ২৫ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ ও রাজধানীর চতুর্দিকে চারটি নতুন স্যাটেলাইট টাউন উন্নয়ন, ঢাকার বাইরে আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণসহ নতুন নতুন ঘোষণা আসতে থাকে। সে অনুসারে এসব অনেক প্রকল্প গ্রহণে পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হতে থাকে এবং অর্থসংস্থানের প্রচেষ্টা চলে। তন্মধ্যে বড় বড় প্রকল্প সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে (PPP) বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাও চলে।
কিন্তু তখন বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ আর্থিক মন্দায় বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, উন্নয়ন ব্যয়বৃদ্ধি ইত্যাদিতে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তথাপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তিনি উল্লেখিত অনেক প্রকল্পের সমীক্ষা, ডিজাইন ও প্রাথমিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি কিছু প্রকল্প G to G এ প্রক্রিয়ায়ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থাপিত হয় একটি বিশেষ সেল এবং পিপিপি অফিস। তা ছাড়া কিছু অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রম জরুরি বিবেচনায় ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় সম্পাদনের জন্যও ব্যবস্থা গৃহীত হয়। ওই প্রক্রিয়ায় স্বল্পতম সময়ে বিদ্যুৎ সেক্টরে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। ‘কুইক রেন্টাল’সহ অন্যান্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা গৃহীত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে আগে যেখানে নিত্যদিন (শীত-বর্ষাকালেও) লোডশেডিং হতো, সেখানে অবস্থার অনেক উন্নতি সাধিত হয়। অর্থাৎ ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে বসে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নবায়নযোগ্য শক্তি (Renewable Energy)-এর মাধ্যমেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা গৃহীত হয়, যাতে বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎবিহীন কোনো জায়গা নেই বলা যেতে পারে।
পাশাপাশি বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর ডিজাইন চূড়ান্তকরণসহ রাজধানী ঢাকায় বিএনপি জোট সরকারের আমলে গৃহীত যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজটির (যা ১/১১-র সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে বাতিল করা হয়) চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা হয় এবং ফ্লাইওভারটির পরিধি বৃদ্ধি করে পলাশী পর্যন্ত সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয় এবং ইতিমধ্যে যার উল্লেখযোগ্য অংশের নির্মাণ শেষে চালুও হয়ে যায়। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতুর অর্থছাড়ের আগে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা ও পরবর্তী সময়ে অর্থায়নে আপত্তি করায় বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটির কাজ চলছে। তা ছাড়া রাজধানী ঢাকায় জাপানি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় একটি মেট্রোরেল (MRT-6) লাইন এবং একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এলিভেটেড রোড নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। অনুরূপভাবে দেশব্যাপী সরকারের প্রতিশ্রুত আরও অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চলমান রয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসবের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ব মানচিত্রে দেশের চেহারা পাল্টে যাওয়ার একটা ভালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর বাংলাদেশের এই সম্ভাবনা দেখে হালে শিল্পোন্নত অনেক দেশের বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের দিকে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন। জানামতে, শুধু চীন থেকেই বর্তমানে কয়েক শ বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে তাঁদের অফিস খুলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অনুসন্ধানে নিয়োজিত রয়েছেন এবং চীন সরকার G to G এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থঋণ সহায়তা প্রদানে সম্মত হয়েছে। তন্মধ্যে ইতিমধ্যে সম্ভাব্য কিছু প্রকল্প চিহ্নিত করে MOU বা চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে। অনুরূপ, জাপান সরকারও বাংলাদেশে বিশাল বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। একইভাবে সাম্প্রতিককালে দীর্ঘদিন বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশিও দেশের বিভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
কিন্তু এর জন্য দরকার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ। সরকার ভালো করে জানে যে উন্নয়নের প্রাক্-শর্ত হচ্ছে স্থিতিশীলতা ও উপযুক্ত পরিবেশ। তথাপি জেদাজেদির রাজনীতিতে সবকিছুতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে, এই প্রচেষ্টা আরও এগিয়ে যেত, যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা যেত, সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় বসানো যেত। অনুরূপ উদ্যোক্তা মানুষটা আওয়ামী লীগের নাকি বিএনপির তা নিয়েও যদি বাড়াবাড়ি না হতো। ফলে অনেকে আমলা থেকে বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তা অনেকে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে না লাগিয়ে নির্জীব বসে আছেন বা অন্য বিনিয়োগে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে দুদক আতঙ্কেও অনেক সরকারি লোকজন তাঁদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন না, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। যার কারণে, বিশেষ করে যৌথ বিনিয়োগে অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণের কাজ বেশি মাত্রায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায়ই অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তাকে এখনো তাঁদের অতীত কাজের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে। তা ছাড়া আগেকার রাজনৈতিক সরকারের আমলে ঘনিষ্ঠতার কারণেও পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা নিঃসঙ্কোচে দায়িত্ব পালন করছেন না এবং অনেকে গোপন ‘ষড়যন্ত্রে’ও লিপ্ত বলে সংবাদে দেখা যায়। সত্যিকার অর্থে উল্লেখিত বিভিন্ন কারণে, সরকারের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়নে কাঙ্খিত অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে না বলা যায়।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা দাঁড়িয়েছে দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে। একদিকে যাঁরা ক্ষমতায় আসেন, তাঁরা আর ক্ষমতার মসনদ থেকে সরতে চান না; অন্যদিকে আরেক গ্রুপ যেকোনোভাবে সরকারকে প্রতিহত করে ক্ষমতায় যেতে চায়। যার কারণে বর্তমানে চলছে অনির্দিষ্টকালের টানা অবরোধ আর ধ্বংসযজ্ঞের খেলা। অবস্থা এমন যে আমাদের দেশের ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিবিদেরা আশপাশের দেশ থেকেও শিক্ষা নিতে চান না। যেমন- ভারত-শ্রীলঙ্কায় তো নির্বাচিত সরকার তাদের স্ব-স্ব দেশের ধারাবাহিক গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে জনগণের দাবি বা নিজেদের জনপ্রিয়তার পরীক্ষায় মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতার রদবদল মেনে নেয়। অথচ বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েমের কথা বলে, দম্ভোক্তি করে কেউ জনমুখী রাজনীতি করে না। যাতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন, উৎপাদন ও শিক্ষাব্যবস্থা। এক কথায় সবকিছু। কিন্তু দেশের আপামর বিনিয়োগকারী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ জনগণ আমাদের রাজনীতিবিদদের নেতিবাচক রাজনীতি পছন্দ করেন না। কিন্তু কে কার কথা শোনে? বোঝা যাচ্ছে না দেশটিই বা এর ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিবিদদের কারণে কোনদিকে যাচ্ছে? দেশের ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে তিক্ত-বিরক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেকে ইদানীং মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের মডেলে (অর্থাৎ সামরিক ব্যবস্থাপনায়) দেশের উন্নয়নের কথা বলা শুরু করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে, দেশে উপায়হীন অবস্থায় ইতিমধ্যে কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ (পদ্মা সেতু, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড়ের সংস্কার ইত্যাদি) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি চলছে। প্রকৃত অর্থে, একটি জনমুখী গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে উন্নয়ন হওয়ার কথা নয়।
আগেই উল্লেখ করেছি যে উল্লেখিত বিবিধ সমস্যার মধ্যেও বিগত মহাজোট সরকারের আমলে দেশে অনেক উন্নয়ন সাধন হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের মধ্যে যে অপরিণামদর্শী রাজনীতি চলছে, তা মোটেই কারও জন্য শুভ নয়। ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের উন্নয়নে স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে। GDP (Gross Domestic Product) সূচক নিচের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে। সবার কথা- আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ও বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। দলমত ভুলে গিয়ে উপযুক্ত ও দক্ষ লোকজনকে যথাস্থানে বসাতে হবে। অথর্ব মন্ত্রী, আমলা ও দলবাজ লোকজনকে সরিয়ে দিতে হবে। উদ্যোক্তা মানুষটি আওয়ামী লীগের সমর্থক নাকি বিএনপির সমর্থক, সেই বিবেচনা না করে প্রকৃত যোগ্য মানুষ বা উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ-সহায়তা প্রদান করতে হবে। প্রশাসনকে কৃত্যভিত্তিক ও জনমুখী করতে হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে অনেক কিছুকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। নগরের অভ্যন্তর থেকে অনেক স্থাপনা বাইরে সরিয়ে দিতে হবে। বিভাগীয়, জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর এসব কাজ না করে, শুধু রাজধানীর উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নতি হবে না।
এটা বাস্তব সত্য যে আমাদের মতো দেশে উন্নয়নকাজের বাস্তবায়নে বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে কিছু না কিছু হেরফের, অনিয়ম হবেই। এ জন্য সংশ্লি¬ষ্ট আইনকানুন ও বিধিবিধানকে সময়োপযোগী করে এবং সবাইকে দায়িত্ব দিয়ে ও নির্ভয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে উন্নয়নে স্থবিরতা রোধ করে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। এর জন্য স্বাভাবিকভাবে প্রয়োজন রাজনৈতিক মতৈক্য, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের দূরদর্শিতা। অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা না করে, আমাদের লাগোয়া একই কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের পার্শ্ববর্র্তী ভারতীয় প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেও তাদের উন্নয়নের মতৈক্য থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। মিয়ানমারে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সামরিক সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের সমঝোতা হয়েছে। তাদের নোবেল লরিয়েট অং সান সু চি দেশের উন্নয়নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আমরা কি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো মানুষগুলোকে শত্রু না ভেবে তাঁদের বুদ্ধি, মেধা, প্রজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দেশ ও সরকারের উপকার করতে পারি না? এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও নতুন প্রজন্ম দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসবে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ ইতিহাস এখন এক ক্রান্তিলগ্নের মাঝখান দিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিশাল জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে তরুণ, কর্মঠ ও প্রতিভাবান। বিগত দশকসমূহে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও এশিয়ার আরও অনেক দেশ তাদের এ ধরনের জনবল ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে স্ব-স্ব দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। কাজেই সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে আমরা কি পারি না, দেশের উন্নয়নে ব্রত হতে, দলমত-নির্বিশেষে আত্মনিয়োগ করতে।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫