দেয়াল সজ্জায় ওয়াল পেপার

সাদামাটা রঙের ব্যবহার থেকে বেরিয়ে একটা সময় শুরু হয় ঘরের দেয়াল নানা রঙে রাঙানোর চল। এরপর এল ওয়াল পেপার। বর্তমানে ওয়াল পেপারে এসেছে নানা বৈচিত্র্য। ফলে অন্দরসজ্জা এখন অনেকটাই চার দেয়ালের কাব্য হয়ে উঠেছে। অন্দরের দেয়ালসজ্জা আজকাল শুধু বাহারি রং কিংবা নকশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অন্দরের দেয়ালসজ্জায় ওয়াল পেপারের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। নানা রং আর ডিজাইনের ওয়াল পেপার দিয়ে রাঙিয়ে তুলুন আপনার স্বপ্নের অন্দরমহল। যেহেতু সাধ্যের মধ্যে অন্দরের দেয়াল সজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো মিলছে, তাই এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে আজকাল বেশ শৌখিনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ জন্য ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবে ওয়াল পেপারের জুড়ি নেই। আর তাই অন্দরের দেয়াল সাজানোর অনুষঙ্গ ওয়াল পেপার নিয়ে এ লেখায় রইল নানামাত্রিক পরামর্শ।

দেয়ালসজ্জার মধ্যে প্রথমেই যে বিষয়টি আসে, সেটি ডেকোরেটিভ ওয়াল কিংবা দেয়াল অলংকরণের ব্যাপারটি। অন্দরের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে বসার ঘরে, শোবার ঘরে কিংবা শিশুদের ঘরের দেয়ালের নান্দনিক রূপ দিতে ব্যবহার করতে পারেন ডেকোরেটিভ ওয়াল পেপার। আপনার রুচি ও পছন্দের প্রাধান্য দিয়েই নির্বাচন করুন ওয়াল পেপারের রং আর ডিজাইন। তবে ওয়াল পেপার নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি লক্ষ রাখা জরুরি সেটি হলো, কোন ঘর এবং কী উদ্দেশ্যে আপনি ওয়াল পেপার লাগাচ্ছেন, সেই দিকটি বিশেষভাবে খেয়াল করা। রুচি ও পছন্দমতো রঙের আগে নানা রকম পেইন্টিং, ছবি, শেলফ, নান্দনিক ঘড়ি ও শোপিস ব্যবহার করে দেয়ালে আনতে পারেন ভিন্ন আমেজ। কোথাও কোথাও ফলস সিলিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আলোর ব্যবহারে তৈরি করুন রহস্যময়তা। পারিবারিক ছবি, খুব পছন্দের কোনো শোপিস কিংবা বিখ্যাত কোনো শিল্পীর তুলির আঁচড়ে সাজিয়ে নিতে পারেন আপনার দেয়াল। আজকাল দেয়ালে কাঠ বা বোর্ডের তৈরি সুন্দর শেলফ কিংবা কাবিজের ব্যবহার লক্ষণীয়; এতে অন্দরে বাড়তি জায়গা সংকুলানের পাশাপাশি ফুটে ওঠে আভিজাত্যের ছোঁয়া।

শোবার ঘর

শোবার ঘর যেকোনো মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, এটাই স্বাভাবিক। নিজস্ব শোবার ঘরই হচ্ছে মানুষের স্বপ্নের নিবাস। সারা দিনের ক্লান্তি, বিষাদ, অবসাদ দূর করার জন্য প্রয়োজন বিশ্রামের। আর সেই বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাটি হওয়া চাই নিজের মনের মতো উষ্ণ, আরামদায়ক ও শান্তিপূর্ণ। আর সেই একান্ত আপন জায়গাটিতে যদি ওয়াল পেপার লাগাতে চান, সে ক্ষেত্রে আপনি হালকা রঙের ওয়াল পেপার নির্বাচন করুন। যেমন- সাদা, অফহোয়াইট, ব্রাউন, গোল্ডেন, স্কাইব্লু প্রভৃতি। শোবার ঘরের ওয়াল পেপার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশি উজ্জ্বল রং, যেমন- কমলা, লাল ইত্যাদি ব্যবহার না করাই ভালো। ওয়াল পেপারের মৌলিকত্ব নির্বাচন করুন ঘরের পর্দা, চাদর, কুশন কভার ইত্যাদির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। যেমন- পর্দা যদি ফ্লাওয়াল শোপিচের হয়, তবে ওয়াল পেপারের ক্ষেত্রে ফ্লাওয়াল শোপিস নির্বাচন করুন। এ ছাড়া আপনার পছন্দের যেকোনো শোপিসই আপনি বেছে নিতে পারেন। ঘরের বাকি জিনিসপত্র ঠিক রেখে শোবার ঘরের ওয়াল পেপার বিছানার মাথার দিকে রাখলে ভালো। খালি অন্য কোনো দেয়ালে লাগাতে চাইলে সে চেষ্টাও করতে পারেন। জানালার দেয়ালে না লাগানোই ভালো। আর যদি দেয়ালে লাগাতে চান তবে দক্ষ কোনো ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শ নিন। কারণ, জানালার পর্দা ও ওয়াল পেপার দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা বেশ কঠিন কাজ। শোবার ঘরের বিছানায় মাথার কাছের দেয়ালে লাগিয়ে নিতে পারেন আপনাদের বিশেষ মুহূর্তের কোনো ছবি। তবে লক্ষ রাখবেন, ছবির ফ্রেম ও সাবজেক্ট যেন আপনার ওয়াল পেপারকে ম্লান না করে। বাজারে আজকাল নানা ধরনের ডেকোরেটিভ লাইট পাওয়া যায়। চাইলে আপনি আপনার পছন্দের লাইট লাগিয়ে নিতে পারেন শোবার বেডের দেয়ালে।

বসার ঘর

বাড়ির লিভিং রুম কিংবা বসার ঘর যে নামেই ব্যবহার করুন না কেন, জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার আদর্শ জায়গা এটি। যেহেতু বসার ঘর বাড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই নান্দনিকতার পাশাপাশি অভিজাত ও আরামের বিষয়টা এখানে অত্যন্ত জরুরি। বসার ঘরটি যদি বড় হয়, সে ক্ষেত্রে এলসিডি টিভির দেয়ালে ওয়াল পেপার লাগিয়ে নিন। টিভির আশপাশে নানা ধরনের শেলফ করে তাতে বই, সিডি অথবা শোপিস রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন। আর ঘর যদি ছোট হয়, সে ক্ষেত্রে শুধু লো-হাইট টিভি ও ডিভিডি রাখার ইউনিট তৈরি করে নিন। যেহেতু আপনি দেয়ালে টিভি লাগাবেন, সেহেতু সেই দেয়ালের ওয়াল পেপার মাল্টি জিওম্যাট্রিক শেপের নির্বাচন করুন। যত হালকা ডিজাইন হবে, ততই আপনার টিভির সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। বেশি ঘন প্রিন্টের ওয়াল পেপার টিভি ও টিভি ইউনিটের সৌন্দর্যহানির কারণ হতে পারে। ওয়াল পেপারের সঙ্গে মিল রেখে সোফার রং নির্বাচন করুন। অথবা আপনি সোফার কভারের সঙ্গে ওয়াল পেপারের একটি কন্ট্রাক্ট লুকও দিতে পারেন।

শিশুর ঘর

শিশুর ঘরের ওয়াল পেপার নির্বাচন করার সময় উজ্জ¦ল রংকে প্রাধান্য দিন। বিভিন্ন কার্টুন চরিত্রের ওয়াল পেপার আপনার ছোট্ট সোনামণির ঘরকে করে তুলবে রূপকথার রাজ্য। শিশুকে পড়াশোনায় বেশি আগ্রহী করে তুলতে ইংরেজি নানা ধরনের অক্ষরের কম্পোজিশনের ওয়াল পেপার নির্বাচন করুন। আপনার সোনামণির যদি পছন্দের কোনো রং থেকে থাকে, তবে তার পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে ওয়াল পেপার নির্বাচন করুন। মেয়েদের ক্ষেত্রে ফুল কিংবা পুতুল, প্রজাপতির মতো মোটিফের ওয়াল পেপার বেছে নিন। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে বল, মাছ, মিউজিকের মোটিভ হলে ভালো। ছেলে ও মেয়ের ঘরকে পৃথক বোঝাতে রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। কারণ, রং মানুষের মনে প্রভাব ফেলে। মেয়েদের ক্ষেত্রে গোলাপি, বেগুনি, কমলা, লাল ইত্যাদি উজ্জ্বল রংকে প্রাধান্য দিন আর ছেলেদের ক্ষেত্রে আকাশি, সাদাকালো, সবুজ, নীল ইত্যাদি উষ্ণ রংকে প্রাধান্য দিন। শিশুর ঘরে যে দেয়ালে ওয়াল পেপার লাগাবেন, সেখানে বুকশেলফ তৈরি করতে চাইলে ইংরেজি বর্ণমালা কে (ক) গুরুত্ব দিন। চাইলে কার্টুন চরিত্রকেও বেছে নিয়ে বুকশেলফ তৈরি করতে পারেন।

ডাইনিং রুম বা খাবার ঘর

ক্ষুধা নিবারণের অনুষঙ্গ খাদ্যকে আধুনিক যুগের মানুষেরা নান্দনিকতার রূপ দিয়ে এটাকে শিল্পে পরিণত করেছে। খাবার ঘরে দামি ডাইনিং টেবিল শুধু আজকাল সেই ঘরের সৌন্দর্যের মূল অংশ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নান্দনিক দেয়ালের বাহারি ক্রোকারিজ, ডেকোরেটিভ ফুলদানি প্রভৃতি। খাবারকে সুন্দরভাবে পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে খাবার টেবিলকেও যে সুন্দর করে সাজানো যায়, এই ব্যাপারটিতে মানুষ ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে। তাই খাবার ঘরের একটি দেয়ালে ওয়াল পেপার লাগিয়ে ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে নিন বহুগুণ। খাবার ঘরের ওয়াল পেপার নির্বাচন করার সময় সবুজ, কমলা, হলুদ, লালের মতো উজ্জ্বল রঙের ওয়াল পেপারকে প্রাধান্য দিন। কারণ, এই রংগুলোর সঙ্গে খাবারের একটা সামঞ্জস্য রয়েছে।

ওয়াল পেপারের ব্যবহার শুধু অন্দরসজ্জাতেই নয়। আপনি অফিস, রিটেল আউটলেট অথবা রেস্টুরেন্ট ডিজাইনেও ফুটিয়ে তুলতে পারেন এর নান্দনিক রূপ।

অফিস

অফিসের ইন্টেরিয়রে ওয়াল পেপারের ব্যবহার ভিন্নমাত্রা যোগ করে। অফিসে সাধারণত রিসেপশন এরিয়া, এমডি রুম, কনফারেন্স রুমে ওয়াল পেপারের ব্যবহার বেশি। যেহেতু এটি অফিস, তাই করপোরেট লুকটাকে মাথায় রেখে ওয়াল পেপারের কালার ও ডিজাইন নির্বাচন করুন। রিসিপশন টেবিলের পেছনের দেয়াল অথবা এলসিডি টিভি ডিসপ্লের দেয়ালে ওয়াল পেপারের জন্য উপযুক্ত জায়গা বের করুন। অফিসের ওয়াল পেপার যতটা সম্ভব হালকা রং এবং জিওম্যাট্রিক ফর্মের হওয়া ভালো।

রেস্টুরেন্ট

রেস্টুরেন্ট হলো মানুষের বিনোদন ও রসনাবিলাসের অন্যতম জায়গা। যেহেতু মানুষ দীর্ঘ সময় রেস্টুরেন্টে সময় কাটায়, তাই সেখানকার ওয়াল পেপার নির্বাচনের সময় উজ্জ্বল রংকে প্রাধান্য দিন। খাবারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও আপনি ওয়াল পেপার বেছে নিতে পারেন। আপনার পছন্দসই কোনো চায়নিজ রেস্টুরেন্টে আপনি চায়নিজ থিম অনুযায়ী ওয়াল পেপার লাগাতে পারেন। আবার আইসক্রিম কর্নার বা আইসক্রিম পার্লারে আইসক্রিমের সঙ্গে যায় এ ধরনের ওয়াল পেপার নির্বাচন করুন। রেস্টুরেন্টের যে জায়গাতেই আপনি ওয়াল পেপার ব্যবহার করুন না কেন, মনে রাখবেন সেটা যেন রেস্টুরেন্টের আশপাশের পরিবেশ এবং আসবাবের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে। যদি আপনার নির্বাচন সঠিক না হয়, সে ক্ষেত্রে ক্রেতার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে, হতে পারে বিরক্তির কারণ। সুতরাং সঠিক পরিকল্পনা আপনার রেস্টুরেন্টের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ। আর তাই তো রেস্টুরেন্ট ওয়ালের কাব্য রচনায় ওয়াল পেপারের জুড়ি মেলাভার।

দরকারি টিপস

  • অনেক সময় দেখা যায় বহুতল ভবনের রুমের মাঝখানে অথবা বারান্দায় কলাম পড়ে যায়। সে ক্ষেত্রে কলামটাকে ওয়াল পেপার দিয়ে ঢেকে দিয়ে সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলুন।
  • অনেক সময় পুরোনো দেয়ালে ড্যাম দেখা দেয়। বারবার রং করার পরও সেই ড্যাম যায় না। ড্যামকে ঢেকে দিতে কাঠের ফ্রেম করে তাতে বোর্ড লাগিয়ে ওয়াল পেপার পেস্ট করুন।
  • বহুদিন আগে করা পুরোনো ফলস সিলিংয়ে চাইলে ওয়াল পেপার লাগিয়ে নিতে পারেন। রিটেল আউটলেটের ফলস সিলিংয়ে ওয়াল পেপারের ব্যবহার দেখতে লাগবে দারুণ নান্দনিক।
  • ওয়াল পেপার লাগানোর সময় দেয়ালটি ড্যামপ্রুফ করে নিন। তা না হলে দেয়াল থেকে পলেস্তারা উঠে ওয়াল পেপার নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫

ফারজানা গাজী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top