ঢাকা ৪০০ বছরের পুরোনো রাজধানী হলেও নগরবাসীর জীবনধারায় এখনো আবহমান বাংলার রূপ বহমান। গ্রামের মতো এখনো মানুষ এ নগরে বাজার করতে যায় হাটে। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো ঢাকার হাটবাজারও গড়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কালক্রমে ঘটেছে এর সম্প্রসারণ কিংবা সংকোচন, পরিবর্তন এসেছে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরনেও। তবে প্রতিষ্ঠার পর আজ অবধি বন্ধ বা অপসারিত হয়নি কোনো হাটবাজার। বস্তুত, বাজারের ব্যাগ হাতে হাটে গিয়ে দরাদরি করে তাজা শাকসবজি ও মাছ-মাংস কেনা বাঙালির জন্মগত ঐতিহ্য। হাটবাজারে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চললেও স্থানভেদে কিছু হাটবাজারে সপ্তাহের এক বা একাধিক দিনে ‘হাটবার’ বসে, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে কৃষক, পণ্য উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী, ব্যাপারীরা তাদের পণ্য নিয়ে হাজির হয়। বেচাকেনার পাশাপাশি চলে পরস্পরের কুশল ও ভাব বিনিময়। এ জন্য হাটবাজার এ দেশের মানুষের মিলনস্থল হিসেবেও সুপরিচিত।
দেশের বেশির ভাগ শহর-পৌর এলাকার অবস্থান নদ-নদীর ধারে, যেখানে হাটবাজার বা অনুরূপ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঘটেছে জনপদ ও নগরায়ণের ব্যুৎপত্তি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ নৌপথে এসব জায়গায় বিভিন্ন মালামাল আনে বিক্রির জন্য। যার ফলে গড়ে ওঠে জনবসতি। এভাবেই জন্ম ও বিস্তৃতি ঘটেছে এককালে বুড়িগঙ্গা নদীতীরের নগর ঢাকার। বিভিন্ন পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠীর নামানুসারে পরিচিতিও ঘটেছে এ জনপদের। যেমন- শ্যামবাজার, লক্ষ¥ীবাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, বাংলাবাজার, চকবাজার, বেগমবাজার, মৌলভীবাজার, নয়াবাজার, বখশীবাজার, হাটখোলা, মগবাজার, কারওয়ান বাজার প্রভৃতি। এ ছাড়া নদীর ধারঘেঁষে রয়েছে বিশেষায়িত আরও কিছু বাজার। যেমন- আলুবাজার, ডালবাজার। অনুরূপ, মগবাজার, কারওয়ান বাজারের মতো এলাকা রামপুরা খাল, হাতির ঝিল-বেগুনবাড়ি খালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এ জন্যই বুঝি ঢাকাকে বলা হতো ‘বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলির’ শহর। সমগ্র মোগল আমলে এভাবেই ঘটেছে ঢাকার বি¯ৃÍতি। ইতিহাস বলছে, ঢাকার এসব হাটবাজার থেকেই তখন নদীপথে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মালামাল রপ্তানি করা হতো, হতো আন্তদেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। ঢাকার মসলিন কাপড় ও বিভিন্ন হ্যান্ডিক্রাফটসের সুখ্যাতি ছিল বিশ্ববাজারে। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে ঢাকা থেকে রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরিত হওয়ার পাশাপাশি শতাব্দীজুড়ে ঢাকার প্রতি শাসকগোষ্ঠীর অবহেলা, উপর্যুপরি বন্যা, মহামারিতে পতিত হয়ে অব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব কমে ঢাকার হাটবাজারের। যখন নগরের খাল-নালা-নদীগুলো বিভিন্ন মহল কর্তৃক ভরাট ও বেদখল হতে থাকে। অতঃপর কালচক্রে ঢাকায় মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ব্যাপ্তিতে নগরের প্রায় খাল-নদী ও নিম্নাঞ্চল বিলুপ্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান প্রজন্মের বিশ্বাসই হয় না, একদা ঢাকার বুকে নিরবধি বয়ে যেত ৪০-৫০টি খাল।
ঢাকা যখন মার্কেট নগর
ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে কিছু উন্নয়ন হয় ঢাকায়, যখন ইউরোপীয় ঢংয়ে ঢাকায় মার্কেট সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হয়। বিলেতের Kitchen Market, Hay Market, Street/Sunday Market ও Corner Shop-এর আদলে পর্যায়ক্রমে ঢাকায় বিকাশ ঘটতে থাকে বিভিন্ন ধরনের মার্কেটের। প্রথম দিকে হাটবাজারের জায়গায় মার্কেট ভবন নির্মাণেই ছিল এর কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ। এই সময়ে সরকারের তরফ থেকে নির্মিত হয় এলাকাভিত্তিক পরিকল্পিত আকারে কিছু দোকানপাট ও মার্কেট। তন্মধ্যে নীলক্ষেত-আজিমপুর এলাকার ‘ঢাকা নিউমার্কেট’ অন্যতম। অতঃপর পাকিস্তান আমলে মহাপরিকল্পনার আলোকে এলাকাভিত্তিক কাঁচাবাজার, মার্কেট ভবন, টাউন হল নির্মিত হতে থাকে। গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, শাহবাগ, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কারওয়ান বাজার, মহাখালী ও গুলশান-বনানীতে চোখে পড়ে এসব মার্কেট স্থাপনা। তন্মধ্যে মোহাম্মদপুরে নির্মিত টাউন হলটি ঢাকার প্রধান কৃষিবাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এটির আদলে নগরের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয় ছোট-বড় আরও কিছু মার্কেট। যেমন- মহাখালী মার্কেট, তেজগাঁওয়ে কলমীলতা মার্কেট প্রভৃতি। পাশাপাশি সে সময় ঢাকার নগর পরিকল্পক সংস্থা ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (ডিআইটি)-এর পক্ষ থেকেও নগরবাসীর সুবিধার্থে পরিকিল্পিতভাবে নগরের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় কিছু মার্কেট।
এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে শুরু হয় জেনারেল স্টোর, সুপার মার্কেট, শপিং মল, প্লাজা নির্মাণের প্রতিযোগিতা। আর এখন তো দোকান আর মার্কেটে পুরো নগর ছেয়ে গেছে। সর্বত্র কিচেন মার্কেট (Kitchen Market) ও স্ট্রিট মার্কেট (Street Market)- ছড়াছড়ি, আর এতেই ফুটপাতের প্রায় পুরোটাই বেদখলে। অবস্থা এমন যে বর্তমানে রাজধানী ঢাকার অলিগলি ও সড়ক-রাস্তার ধারে খুব কম প্লট বা জমিই অবশিষ্ট আছে, যেখানে কোনো মার্কেট নেই। রেললাইনের ধারেও সারি সারি দোকান। একদা ইমারতের নিচতলায় যা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য সংরক্ষিত ছিল, তার বেশির ভাগই এখন দোকানপাটে পরিণত হয়েছে, কমপক্ষে একটা কর্নার শপ (Corner Shop) তো রয়েছেই। অনেকে তাদের পুরো আবাসিক ভবনকে সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক ব্যবহারে নিয়ে গেছে। যার সুবাদে সোনারগাঁও হোটেলের কাছাকাছি মাছের বাজার বা আড়ত ও কারওয়ান বাজারে কার পার্কিং ও শিশু পার্কের জায়গায় স্থাপিত হয়েছে পাইকারি কাঁচাবাজার। এই অবস্থা নগরের গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায়।
আশির দশকে এরশাদের শাসনামলে এক সামরিক আদেশের মাধ্যমে ডিআইটির অধীনে নির্মিত সব দোকানপাট, মার্কেট, পার্ক-খেলার মাঠ, কার পার্কিং লট ঢাকা সিটি করপোরেশন বরাবরে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশন কখনো তার ওপর অর্পিত এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। ফলে অব্যবস্থাপনায় ঢাকায় হাটবাজার-মার্কেটের বিস্তার ঘটে এলোপাতাড়িভাবে। তা ছাড়া বিভিন্ন নগরপিতার আমলে নিজেদের ও তদীয় হীনগোষ্ঠীর স্বার্থে যেখানে যা হওয়ার নয়, সেখানে তা হয়েছে। যত্রতত্র নিজেদের লোকদের দোকানপাট ও মার্কেট বানানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। রাজউক কর্তৃক ফার্মগেট ওভারব্রিজের গোড়ায় পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হলে তারা ওই জায়গায় একটি মার্কেট বানিয়ে নিজস্ব লোকদের বরাদ্দ দিয়েছে। যেভাবে কারওয়ান বাজার ও বনানী এলাকায় পার্কিং লটের জায়গায়ও মার্কেট বানানো হয়েছে। এই অবস্থা ঘটেছে নগরের বেশির ভাগ জায়গায়।
অনিয়ন্ত্রিত এই পরিস্থিতিতে নব্বইয়ের দশক থেকে রাজধানী ঢাকায় বাড়তে থাকে বেসরকারি পর্যায়ে বহুতল মার্কেট ভবন, শপিং সেন্টার ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নির্মাণের ব্যাপকতা। আর এখন তো ‘এসব লোকজন’ কারও কথাই শুনতে বা মানতে রাজি নয়। তারা নগরের অনেক জায়গায় সরকারি জমি বা প্লট দখল করে বিশাল মার্কেট বানিয়ে বসেছে। মিরপুরে সড়ক বিভাগের জমিতে মিজানুর রহমান তার নামে বিশাল এক মার্কেট কাম টাওয়ার নির্মাণ করে বসেছে। দিলকুশায় বঙ্গভবনের প্রায় ধারঘেঁষে সিটি করপোরেশনের জমিতে একই ব্যক্তি ‘সানমুন’ নামে আরেকটি বহুতল টাওয়ার বানিয়ে বঙ্গভবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। পুরান ঢাকায় ঐতিহাসিক ‘আহসান মঞ্জিল’ ঘেঁষে আরেকজন ‘মদিনা টাওয়ার’ বানিয়ে বসেছেন। এভাবে এখন নগরীর অলিগলিতেও বহুতল মার্কেট নির্মিত হচ্ছে। পাশাপাশি, কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এমনকি সেনাবাহিনী, বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি), পুলিশ বাহিনীও তাদের সড়কসংলগ্ন জমিতে বিভিন্ন ধরনের সুপার মার্কেট, শপিং মল, প্লাজা নির্মাণ শুরু করেছে। ঢাকায় ‘মার্কেট সংস্কৃতির’ এই ভয়াবহ আগ্রাসনে বর্তমানে নগরের পরিকল্পিত জায়গাগুলো (ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারা) তার আদি চরিত্র সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছে। মোট কথা, ঢাকা নগর এখন একটা বিশাল ‘মার্কেট নগর’-এ পরিণত হয়েছে।
মার্কেটের পটপরিবর্তন সময়ের বাস্তবতা
এত বিবর্তনের মধ্যেও ঢাকা তথা দেশের কোনো নগরে আবহমান বাংলার হাটবাজারের সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়নি, বরং যেখানে নতুন বসতি গড়ে উঠেছে, সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নতুন হাটবাজারের জন্ম হয়েছে। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত কিছু নগরবাসী জেনারেল স্টোর বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে তাদের দৈনন্দিন বাজার সারলেও বেশির ভাগ নগরবাসীই এখনো হাটবাজারের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন তাজা তরিতরকারি ও মাছ-মাংস কেনার জন্য নগরের অনেক কিচেন মার্কেটে উপচেপড়া ভিড় হয়। কিন্তু কোনো একটি মার্কেটেও নেই প্রয়োজনীয় গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। অনেক মার্কেটে তো কোনো পার্কিংই নেই। আবার কিছু মার্কেটে পার্কিংয়ের জন্য বেসমেন্ট ফ্লোর থাকলেও তার যথাযথ ব্যবহার হয় না। বরং কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের বেসমেন্ট বা কার পার্কিংকে অন্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। যেমন- উত্তরায় ‘বিশাল-কুশল’ সেন্টারের বেসমেন্ট ফ্লোরের কার পার্কিংয়ে কাঁচাবাজার স্থাপন করা হয়েছে। ফলে মার্কেটটির আশপাশে সর্বক্ষণ লেগে থাকে প্রচণ্ড যানজট। একই অবস্থা নগরের আরও অনেক মার্কেটের।
অন্যদিকে প্রায় প্রতিটি হাটবাজারেই রয়েছে পাইকারি ও খুচরা দুই ধরনের ব্যবসার পদ্ধতি। এ জন্য পাইকারি বাজারে বা সংলগ্ন জায়গায় মালামালের মজুদের জন্য রয়েছে আড়ত বা গুদামঘর। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালামালের মজুদের জন্য আড়ত বা গুদাম না থাকায় দোকান-মার্কেটের সামনের খোলা জায়গা, ফুটপাত ও রাস্তায় মালামাল রেখে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়। বাস্তবে এ ধরনের মার্কেট ও স্থাপনাগুলোর বেশির ভাগই নগর পরিকল্পনা মোতাবেক নির্মিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের বাজার-মার্কেটের বাইরে সংলগ্ন খোলা জায়গা বা ফুটপাত কিংবা পার্কিংয়ের জায়গায় মূল বাজারের চেয়েও বেশি ইনফরমাল মার্কেট বসে। বিশেষ করে সমগ্র কারওয়ান বাজার এলাকা তো পরিণত হয়েছে কাঁচাবাজার ও মাছ বাজারের হাটে। নগরের প্রতিটা প্রবেশমুখে তথা নদীর ধারে যেসব বাজার-মার্কেট রয়েছে, সেখানকার চিত্রও একই।
পাশাপাশি, ইদানীং অনেক জায়গায় চালু হয়েছে মোবাইল মার্কেট। ভ্যানগাড়ি ও অন্যান্য মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অনেকে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও করে। তা ছাড়া কর্নার শপ তো আছেই। এভাবে বর্তমানে ঢাকার নগরজীবন বাজার-মার্কেটে সয়লাব হয়ে গেছে। কিছু সড়ক ছাড়া সমগ্র নগরে ফুটপাত ও রাস্তাঘাটই একেকটা হাটবাজার! আর বিভিন্ন উৎসবের দিনে পুরো নগরই তো বিশাল এক হাটে পরিণত হয়। বিশেষ করে কোরবানির প্রাক্কালে নগরের সর্বত্র অর্থাৎ রাস্তা-ফুটপাত, খেলার মাঠ এমনকি পার্কের মধ্যেও গরু-ছাগলের হাট বসে। তা ছাড়া বছরজুড়ে স্থানে স্থানে বসে বিভিন্ন ধরনের মেলাÑ বাণিজ্য মেলা, বইমেলা, যেগুলোর বাস্তব আঙ্গিক অনেকটাই হাটবাজারের মতো। তা ছাড়া বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণের সংস্কৃতি’ তো রয়েছেই। ফলে আমাদের জীবনব্যবস্থা থেকে কখনো হাটবাজারের সংস্কৃতি বিলুপ্ত হবে না। কিন্তু সমস্যা হলো নগর এলাকায় জনসংখ্যার চাপে আবাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বি¯ৃÍতি তথা কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ও সুযোগ-সুবিধাদি স্থাপনের কারণে দিনে দিনে হাটবাজার ও খোলা জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ অবধি ঢাকার হাটবাজার পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্তৃপক্ষ নেই। নেই কোনো আইন ও কার্যকর বিধিমালাও। ওই অবস্থায় প্রথাগতভাবে (স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমের বিবেচনায়) ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওপর বিষয়টির দায়িত্ব অর্পিত থাকলেও নগরে বিদ্যমান এত বিশালসংখ্যক দোকানপাট ও মার্কেটের তদারকির জন্য তাদের অধীনে নেই পর্যাপ্ত জনবল। ফলে একদিকে যেমন সিটি করপোরেশন কোনো দোকানপাট বা মার্কেট থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় করতে পারছে না। আবার কোনো দোকানপাট ও মার্কেটের মালিকও সরকারকে যথাযথ ট্যাক্স দিচ্ছে না। নগরের কোনো একটি দোকানের প্রকৃত ভাড়া ও বিক্রির হিসাব নেই কারও কাছেই। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্বপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের অধীনে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির স্বল্পতা এবং দীর্ঘদিন যাবৎ নির্বাচিত মেয়র না থাকায় জবাবদিহির অভাবে নগরের হাটবাজার ও মার্কেটসমূহের বর্জ্যস্তূপ সময়মতো পরিষ্কার বা অপসারণ না হওয়ায় অনেক জায়গায় নগরজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
মাস্টারপ্ল্যান আর ড্যাপে ঢাকার মার্কেট
হাটবাজার-মার্কেট মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় স্থান হওয়ায় শহর-নগর-গ্রামে এর জন্য রয়েছে নির্ধারিত পরিমাণ স্থান। মানুষ হিসাবে কী পরিমাণ স্পেস দরকার তা পরিকল্পনাবিদেরা বলে দেন। ঢাকার মহাপরিকল্পনা, ড্যাপ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিধিমালায় জোন তথা এলাকাভিত্তিক কোথায় কত জনসংখ্যা হতে পারে এবং সে ভিত্তিতে কিচেন মার্কেট, কর্নার শপ, স্থায়ী মার্কেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের ব্যাপার বর্ণিত আছে। কিন্তু রাজধানী ঢাকা তথা দেশের পরিকল্পিত-অপরিকল্পিত কোনো এলাকায় জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তা কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকর করা যায়নি। সচরাচর যেকোনো নতুন জনপদের সৃষ্টির পর সেখানে Neighbourhood-এর প্রয়োজন মোতাবেক হাটবাজারও গড়ে ওঠে। ক্ষেত্রমতো পরিকল্পনাবিদেরা বাস্তবতা বিবেচনায় স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় তা Fit-In-ওহ করে নেন। লক্ষ করলে দেখা যায়, নগর ঢাকার প্রতিষ্ঠা থেকে বিভিন্ন এলাকায় Neighbourhood-এ যেসব হাটবাজার-মার্কেট গড়ে উঠেছে, নগরপরিকল্পনাবিদেরা তার কোনোটি বাদ দেননি। সে মোতাবেক কোনো স্থানে জায়গাগুলোর বিকাশ ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রে অধিকতর সম্প্রসারণও ঘটেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত ব্যবহারের পরিপ¤’ী ব্যবহার বা উন্নয়নও ঘটেছে। যেভাবে কারওয়ান বাজার এলাকায় শিশু পার্ক ও কার পার্কিং লটের জায়গায় পাইকারি কিচেন মার্কেট গড়ে উঠেছে।
আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনাবিদেরা যা সুপারিশ করেন, তার ওপর কোনো রকম আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন করে জায়গা অন্য ব্যবহারে চলে যায়। যেমন- উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) এলাকায় প্রস্তাবিত পাইকারি কিচেন মার্কেট নির্মাণের জন্য সংরক্ষিত জায়গাটি অনেকটা জোর করে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণের জন্য নেওয়া হয়েছে। অথচ এর জন্য নগর পরিকল্পনাকারী সংস্থা হিসেবে রাজউক ও তার পরিকল্পনাবিদদের দোষারোপের মুখে পড়তে হয়। অথচ লক্ষ করলে দেখা যাবে, ঢাকার মাস্টারপ্ল্যান তথা বিস্তারিত পরিকল্পনায় (ড্যাপে) নগরের কোন এলাকায় কী হবে ও কীভাবে হবে, তার বিশদ বর্ণনা করা আছে। কিন্তু উপরিউক্ত বর্ণনামতে খুব কম ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটেছে। আবার এটাও ঠিক যে অনেক জায়গায় নগর পরিকল্পনাবিদেরা বাস্তবতা বা ভবিষ্যতের বিবেচনায় স্থানীয় পরিকল্পনা (Neighbourhood) প্রণয়নে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, যেমনটা দেখা যায় ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায়। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় কাঁচাবাজার (Kitchen Market)-এর সংস্থান নেই, ফলে ধানমন্ডিবাসীকে তাদের নিত্যদিনের বাজারের জন্য নিউমার্কেটে আসতে হয়। উত্তরা (প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব) আবাসিক এলাকার নকশায়ও কোনো কিচেন মার্কেটের সংস্থান নেই, ফলে উত্তরাবাসীকে নিয়মিত বাজার করতে টঙ্গীতে যেতে হয়, যদিও হালে এসব এলাকায় অপরিকল্পিত বা অবৈধ বাজার স্থাপন এবং বেসরকারি মার্কেট, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নির্মাণের মাধ্যমে এলাকাবাসীর সমস্যা অনেকটাই লাঘব করা হয়েছে।
কিছু নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই গড়ে ওঠে একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা। অন্যান্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবার মতো বাজারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অনুষঙ্গ। হাতের নাগালে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি নিশ্চিত করতেই বাজার থাকা উচিত হাঁটা দূরত্বে। কিন্তু বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনা তেমন পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে রাজধানীতে। এ ছাড়া ঢাকা ও এর আশপাশে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলেও সেখানেও বাজারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন সড়কেই বসছে বাজার, অন্যদিকে বাড়ছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ওপর নির্ভরশীলতা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ থেকে ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর গ্রোথ সেন্টার নিয়ে আমরা কাজ করেছি। ঢাকায় গ্রোথ সেন্টারগুলোকে কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায় সে চেষ্টাও আমরা করছি। যদিও রাজধানীতে এতটাই অপরিকল্পিতভাবে বাজার বিস্তৃত হয়েছে যে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জটিল। নতুন যেসব এলাকা ও স্যাটেলাইট শহর হচ্ছে, সেই জায়গাগুলোতে আমরা বাজার ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারি। সে ক্ষেত্রে বাজারের একটি আদর্শ ও নির্দিষ্ট দূরত্ব নির্ধারণ জরুরি। মানুষ যেন স্বল্প সময়ে হেঁটেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারে। এমন নয় তা অনেক বড় হতে হবে। সেটা একটা উন্মুক্ত বাজারের মতো হতে পারে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য কেনাবেচা হবে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাটবাজারগুলো যত্রতত্র না করে একটি নির্দিষ্ট ব্লকে উন্মুক্তভাবে হতে পারে। সেখানে কী কী কেনাবেচা হবে এবং কতটুকু জায়গার ওপর বসবে তা নির্ধারণ করতে হবে। তবে জায়গা স্বল্পতার কারণে স্থায়ীভাবে বাজার স্থাপন সম্ভব না হলে সে ক্ষেত্রে গ্রামের হাটের মতো সপ্তাহে এক বা দুই দিন বসতে পারে। বাকি সময়ে অন্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার কাভার্ডভ্যান বা অন্য যানবাহন ব্যবহার করে ভ্রাম্যমাণ বাজারব্যবস্থা চালু করা যায়। হয়তো সকালের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই বাজার চালু থাকল। তবে যা-ই হোক না কেন তা অবশ্যই নিয়মের মধ্যে হতে হবে। যাতে জনজীবন ও পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়। এ জন্য থাকতে হবে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া কয়টি দোকান বসবে নির্ধারণ করে তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলো উন্মুক্ত স্থানকে কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটার আদলে আমরা এখানকার বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারি। এলাকায় একটা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে কী কী পণ্যদ্রব্য কোন কোন দিন বেচাকেনা হবে, কতজন দোকানি থাকবে ইত্যাদি জানানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা লিখিত নির্দেশনা না নিয়ে আসতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ মৌখিক নিয়ম মানতে চাইবে না। এবং এই নিয়ম যদি কেউ ভঙ্গ করে, তবে তাকে কী পরিমাণ অর্থ দণ্ড দিতে হবে, সেটাও নির্দেশনায় উল্লেখ করতে হবে।
আমরা গবেষণা ও কাজের আওতা হিসেবে ঢাকার উপশহরগুলোর (পেরিফেরি) বিভিন্ন ধরনের গ্রোথ সেন্টারকে চিহ্নিত করেছি। কীভাবে শহর ও গ্রামের বাজারগুলোর মধ্যে সহজ যোগসূত্র স্থাপন করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছি। অর্থাৎ গ্রামের পণ্যগুলো যেন দ্রুত শহরে আনা যায় সে জন্য বাজারগুলোর সঙ্গে গ্রোথ সেন্টারের সংযোগ স্থাপনসহ সড়ক, যানবাহন ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া ছাড়াও প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কিছুই বলা হয়নি যে কোথায় কোথায় গ্রোথ সেন্টার হবে। তবে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার Rural Infrastructure Strategy আইন পাস করেছিল এবং তার আওতায় দুই হাজার ১০০টি গ্রোথ সেন্টারকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতে দেশের কোথায় কোথায় গ্রোথ সেন্টার হবে তা ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল। তবে ঢাকার জন্য এ ধরনের কোনো ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
……….নায়লা শারমিন
সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
সংখ্যাতত্ত্বে ঢাকার মার্কেট
আগে যখন রাজধানী ঢাকার পরিধি ও জনসংখ্যা সীমিত ছিল, তখন ছিল সবকিছুর সঠিক পরিসংখ্যান ছিল। কেউ চাইলে সহজে যেখানে-সেখানে দোকানপাট বসাতে পারত না; কোনো বাড়িওয়ালা চাইলে তার বাড়ির নিচে দোকানপাটে পরিণত করতে পারত না: একটি ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে অন্য ব্যবহারে পরিবর্তন করতে পারত না। কিন্তু এখন সবকিছুই সম্ভব! কারও ওপর সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ নেই। রাজউক নকশা অনুমোদন করে কী নির্মিত হচ্ছে তা আর ফিরে দেখে না, আবার অনেক সময় চাইলেও পারে না (প্রভাবশালীদের বাঁধা, আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে)। একইভাবে যে যেখানে যা চায়, সিটি করপোরেশন সেখানে তাকে ট্রেড লাইসেন্স ও অনুমতি দিয়ে দেয়, অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে দিতে বাধ্য হয়। অনুরূপভাবে ওয়াশা-বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইনেও মালিকেরা যা চায়, সেভাবে হয়ে যায়। ফলে অস্বাভাবিক এক প্রক্রিয়ায় চলছে রাজধানী ঢাকার নিয়ন্ত্রণ, শাসন ও বিস্তার।
মাঝেমধ্যে এ ধরনের এখানে-ওখানে রাতারাতি ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বা নির্মাণাধীন কিছু মার্কেট ভবন ধসে বা ভেঙে পড়ছে। আবার অনেক জায়গায় কিছু প্রভাবশালী অনুমোদন ব্যতিরেকে বা তাদের যতটুকুর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় বাণিজ্যিক ভবন বানিয়ে বসেছে। কিন্তু বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ভবন বা স্থ’াপনার কোনটি বৈধভাবে নির্মিত তার কোনো সঠিক হিসাব কারও কাছেই নেই। ফলে কেউ জানে না নগরের সঠিক কোনো তথ্য!
এভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যেমন সমন্বয় নেই, তেমনি কোনো পর্যায়ে সুশাসনও নেই। অর্থাৎ সবকিছু চলছে ফ্রি-স্টাইলে। যার প্রধান কারণ, রাজধানী ঢাকায় নগর সরকার না থাকা। আর দীর্ঘদিন যাবৎ তো নির্বাচিত নগরপিতাও নেই। খণ্ডিত সিটি করপোরেশন চলছে নামকাওয়াস্তে! রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করা ও মশা-মাছির অত্যাচারে নগরজীবনের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কোনো ইমারতের বৈধ-অবৈধতার প্রশ্ন উঠলে রাজউকের বিবৃতিÑ জনবলস্বল্পতার কারণে তারা কীভাবে ইমারতটি নির্মিত হয়েছে, তা তদারক করতে পারেনি ও পারছে না। পানির লাইনে চাপ নেই বিধায় বাড়ির মালিকেরা বুস্টার পাম্প দিয়ে পানি টেনে নেয়, ফলে আশপাশের সাধারণ মানুষ বাসায় পানি পায় না। পয়ঃ ও স্যুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার নিয়ে কেউ কিছু বলে না, যা আগে স্থানীয় কমিশনাররা দেখভাল করতেন। নগর সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হওয়া তথা বর্তমানে অনির্বাচিত প্রশাসক (আমলা) দিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন পরিচালনার পরিপ্রেক্ষিতে জবাবদিহির অভাবে নগরের কোনো হাটবাজার-মার্কেটের ময়লা-আবর্জনা সময়মতো পরিষ্কার করা হয় না, ফলে স্বাভাবিকভাবে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে অতিমাত্রায়, ঘটছে পরিবেশদূষণ।
জীবনধারায় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর
বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন বাংলাদেশের মানুষও চলছে ‘হাইব্রিড লাইফস্টাইল’-এ। একদিকে শাকসবজির উৎপাদনে অতিমাত্রায় সার প্রয়োগ, ফার্ম/হ্যাচারির মাছ-মুরগি-গরু ও ফরমালিনের ব্যবহার, আর অন্যদিকে বাসি ও ভেজালের উৎপাত। তা ছাড়া হাটবাজারে ওজনে কারচুপি, ভালো ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র না থাকা ইত্যাদির কারণেও অনেকে এখন আর আগের মতো হাটবাজারে যেতে চায় না। তা ছাড়া এখন ঘরে ঘরে চালু হয়েছে ডিপফ্রিজের সংস্কৃতি। আর এখন তো অভিজাত এলাকার বাসিন্দাদের কাছে দামের বিষয়টি অনেকটা গৌণ, যাঁদের অনেকে আগে বিদেশ থেকেই তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসিপত্র কিনে আনত। দেশের অস্থিতিশীল রাজনীতি, সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে দূরত্ব, চাহিদা মোতাবেক পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতা ইত্যাদির কারণে এদের অনেকে একসঙ্গে তিন-ছয় মাসের বাজার করে ডিপফ্রিজে রেখে দেয়। মোট কথা, সব মিলিয়ে নগরবাসীর অনেকেই এখন ডিপফ্রিজ তথা ‘ডিপাটমেন্টাল’ স্টোরের ওপর নির্ভরশীল।
সমস্যা হলো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো ফ্রিজে সারি সারি মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করে তা বিক্রি করে দীর্ঘদিন ধরে। আর এসব বাসি জিনিসপত্র খেয়ে মানুষ নানা রোগ-ব্যাধিতে ভুগছে। নগরের নামীদামি কিছু ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেও মরা মুরগি ও মেয়াদোত্তীর্ণ দ্রব্যাদি বিক্রির খবর পত্রপত্রিকায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নগরে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অনেক ফাস্টফুডের দোকানেও মরা মুরগি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন রাঁধুনি সামগ্রী ও তরিতরকারির যথেচ্ছার ব্যবহার হয়। স্বাভাবিকভাবে এসব খাবারের কারণে নগরবাসীর মধ্যে হরেক রকম রোগ-বালাইয়ের বিস্তারসহ বিশেষত বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের শারীরিক স্থূলতা (Obesity) বাড়ছে অতিমাত্রায়।
শেষের আগে
রাজধানী ঢাকায় বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস। বর্তমানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, তাতে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ নগরের জনসংখ্যা দুই কোটি অতিক্রম করার সম্ভাবনা। বিশাল এই জনসংখ্যার প্রয়োজনে স্বাভাবিক নিয়মে নগরে বিস্তার ঘটবে হাটবাজার-মার্কেটের। ঢাকার মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় বর্তমানে রয়েছে চারটি সিটি করপোরেশন ও কয়েকটি পৌরসভা। এ ছাড়া রয়েছে তিন-চারটি ক্যান্টনমেন্ট ও অনেক ইউনিয়ন পরিষদ। কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট ব্যতীত অন্যান্য কোনো সংস্থার একে অপরের সঙ্গে নেই কোনো সমন্বয়। ফলে মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকায় রাজউক থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র গ্রহণ ও যেকোনো ধরনের ইমারতের নকশা অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা তা অনুসরণ করে না। আর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বাররা তো বিশাল বিশাল হাউজিং ও মার্কেটের নকশার অনুমোদন দিচ্ছে। কিন্তু এভাবে তো একটি নগর, তাও আবার দেশের রাজধানী চলতে পারে না। কাজেই মহানগর ঢাকার হাটবাজার ও মার্কেটগুলোর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন একটি আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের। প্রয়োজন বস্তি-অলিগলি ও বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে পরিকল্পিত-অপরিকল্পিত প্রতিটি হাটবাজার-মার্কেট-মল-প্লাজায় যত দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য, তার পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেইস তৈরি করা। সেই ভিত্তিতে একটি সময়োচিত আইন-বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে যথাযথভাবে বিষয়টির তদারক ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা। এরই মাধ্যমে সম্ভব ঢাকার হাটবাজার ও মার্কেট থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫