চার হাজার পাথুরে পুরাকীর্তির স্থাপনা আল-হিজর

আল-হিজর (Al-Hijr) বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এক পাথুরে নগর। ইতিহাসের প্রথম ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হয়ে আজও টিকে রয়েছে প্রাচীন এ স্থাপনাটি। মাদা’য়েন সালেহ (Madain Salih) এ নগরের আরেক নাম হলেও আগে হেগ্রা নামেই সবাই জানত। জর্ডানের দক্ষিণ পেত্রায় নাবাতায়েন সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত স্থান হিসেবেই এ জনপদটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। সৌদি আরবের উত্তপ্ত মরুভূমিতে পাথুরে পাহাড় কেটে আবাসন নির্মাণ এবং তপ্ত আবহাওয়ায় শীতল পরিবেশে বসবাস মানুষের প্রকৃতি জয়ের এক অনবদ্য সৃষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ। আদিম মানুষের এই বুদ্ধিদীপ্ত স্থাপত্য সৃষ্টির কৌশলকে সম্মান জানাতেই ২০০৮ সালে ইউনেসকো মাদা’য়েন সালেহকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। এমনকি সৌদি আরবের প্রথম ঐতিহ্যবাহী স্থান এটি।

মাদা’য়েন সালেহ একটি প্রাক-ইসলামিক যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা, যা মদিনা শহরের আল-উলা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হিজাজ পর্বতের পাদদেশের সমতল মালভূমিতে এর অবস্থান। এই স্থানটি মরুভূমির সৌন্দর্য এবং বিভিন্ন আকার ও উচ্চতায় খোদাইকৃত পাথরের নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত। জর্ডানের পেত্রা নগরের পর এটি ছিল তৎকালীন সর্ববৃহৎ শহর। দীর্ঘ ইতিহাস এখানে বহুজাতিক সাংস্কৃতিক চিহ্ন বহন করছে। প্রাচীনকাল থেকে এখনো সুরক্ষিত রয়েছে এ নগর। বিশেষত নগরের ১৩১টি শিলার সুসজ্জিত অট্টালিকা।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে তৎকালীন অধিবাসীরা পাথর কেটে বসবাসের জন্য যে আবাস নগর গড়ে তোলে, তা একটি সাজানো-গোছানো অট্টালিকার সম্মুখভাগ। পূর্ব নাবাতায়েন এর যুগে স্থানটি রূপায়িত হয় ৫০টি উৎকীর্ণ লিপিসমূহ এবং কিছু অঙ্কিত গুহা দ্বারা। এর ১১১টি স্মারক স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে ৯৪টি ছিল সজ্জিত। সুদৃশ্য সমাধিস্তম্ভসমূহ এবং স্মারকলিপির সমন্বয়ে গঠিত আল-হিজরের স্থাপত্য এবং সজ্জা ছিল বেলেপাথরের তৈরি। আর ছিল পানির কূপ, যা মরুভূমির মাঝে এনেছিল স্বস্তির পরশ। মরুভূমিতে পানীয় জলের অভাব পূরণে এই কূপগুলো এবং প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যে পাথর কেটে তৈরি করা ঠান্ডা আবাসস্থল সেখানকার অধিবাসীদের সুযোগ করে দেয় বসবাসের। অবাক ব্যাপার হলো, দুই হাজার বছর আগে তৈরি এ কূপগুলো আজও ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো নাবাতায়েন সভ্যতার অধিবাসীদের স্থাপত্যশিল্প এবং জলপ্রবাহবিষয়ক দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। আর এভাবেই আল-হিজর নাবাতায়েন সভ্যতার একক সাক্ষ্য বহন করছে। কতিপয় প্রাচীন ভাষার উদ্ধৃতি, সিরিয়ান, মিসরীয়, ফিনিশীয় ও হেলেনিস্টিক সভ্যতার সাজসজ্জা এবং লিথিনাইট, গ্রিক, ল্যাটিন সভ্যতার স্থাপত্যের প্রভাবসমূহের সাক্ষ্য বহন করে আল-হিজর।

প্রাচীনকাল থেকেই হেগ্রা শহরটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বতন্ত্র ধারা বহন করে আসছে। আরবিয়ান পেনিনসুলা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মধ্যে অবস্থিত এ স্থানটি ছিল সে সময়ের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এটা সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রথা, স্থাপত্যশিল্প, সাজসজ্জা, ভাষার ব্যবহার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে সাক্ষ্য বহন করে। যদিও প্রাক-ইসলামের যুগে নাবাতায়েন শহরটি পরিত্যক্ত হয়েছিল তথাপি বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মরুবাসীদের এবং পরে তীর্থস্থান মক্কার জন্য আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন করে আসছে। এ ছাড়া বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে এর আধুনিকীকরণ করা হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী এবং খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীতে আল-হিজরের প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক অবস্থানের অধিকাংশ স্মৃতিস্তম্ভ এবং উৎকীর্ণলিপি তৈরি করা হয়। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় অথবা দ্বিতীয় শতাব্দীর কিছু আগে লিহ্যানিট হস্তলিপির উৎকীর্ণলিপি এবং সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্ন মানবজাতির উপনিবেশ স্থাপনের সাক্ষ্য বহন করে। ০-৭৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সমাধিস্তম্ভগুলোর এক-তৃতীয়াংশ (যেগুলো সবচেয়ে বড়) গঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে নাবাতিয়ান রাজ্য সারা দক্ষিণ সিরিয়া, নেজেভ এবং হেজ্জাজজুড়ে বিস্তৃত হয়। পশ্চিমে তা রোমান বিশ্বের বিরুদ্ধে আসতে থাকে। প্রচুর অনুর্বর এবং স্বল্প অনুর্বর বিস্তৃত অঞ্চল তৎকালীন শাসকেরা নিয়ন্ত্রণ করত। এ সম্পদ থেকে মরূদ্যানের কৃষিতে এবং মরুযাত্রী দলের উন্নয়ন অঙ্কিত হয়। প্রাচীনকালে এবং প্রাক-ইসলামি যুগে ধুনা মসলা এবং মসলাযুক্ত গাছের বাণিজ্যের উন্নয়নে এ অঞ্চলের ভূমিকা অপরিসীম। তারপর তারা ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে সড়ক তৈরি করে। যাতায়াতব্যবস্থা সহজ করতে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার; এক অনবদ্য অবদান। বিশেষ করে লোহিত সাগরে হেগ্রা ছিল মূলত উত্তর-দক্ষিণ মরুযাত্রীদের একটি প্রধান প্রদর্শনী রুট। গ্রিক ভাষার উৎস অনুযায়ী অপ্রধান রুট ছিল এজরাকোম বন্দরে। সাম্প্রতিক দ্বিতীয় আবি®কৃত লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী বন্দরের অবস্থানও নাবাতিয়ানে। ১০৬ খ্রিষ্টাব্দে হেজ্জাজ অঞ্চলটি রোমান সাম্রাজ্যকে আরবীয়দের সঙ্গে একত্র করেছিল। ১৭৫-১৭৭ খ্রিষ্টাব্দে আল-হিজরের একটি স্মারক রোমান উৎকীর্ণলিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল।

যমযম

চৌদ্দ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা আল-হিজরের নাবাতিয়ানের লাল পাথরের খোদাই করা সমাধিস্তম্ভগুলোর প্রশংসা বর্ণনা করেছিলেন। অবশ্য তখন তিনি কোনো মনুষ্য কার্যক্রমের কথা বর্ণনা করেননি। ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৭ সালে চার্লস ডাওটি আরবীয় মরুভূমি ভ্রমণ করে বই রচনা করেছিলেন। তাতে লিখেছেন মরূদ্যানে প্রাচীন কৃষিকাজের জমিতে কূপের ব্যবহার সম্পর্কে। বিংশ শতাব্দীতেও বৃক্ষ রোপণের চিহ্ন এবং কূপের পূর্ণ ব্যবহার লক্ষণীয়। রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিবর্তন ঘটে। বিশেষভাবে এর কারণে জাবাল আল-মাজহারের উত্তর দিক এবং কোয়াসার আল-সানির দক্ষিণ দিকের কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং কিছু বেলেপাথরের আকৃতি পাথরখাদে পরিবর্র্তিত হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে কিছু ইউরোপিয়ান ভ্রমণকারীদের মধ্যে চার্লস ডাওটি এবং পরবর্তী সময়ে ১৯০৭, ১৯০৯ এবং ১৯১০ সালে A. Jaussen এবং R Savignac প্রথম উৎপত্তিগত অধ্যয়ন অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তারপর উত্তর-পশ্চিম আরবিয়ান পেনিনসুলা বিশেষ করে মাদা’য়েন সালেহ তাদের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও উৎকীর্ণলিপির বর্ণনা সরবরাহ করে। তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান এখনো আরবের মানসম্মত কাজের বিষয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৬০-এর মধ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় এবং ঐতিহাসিক কারণে পশ্চিমাদের দ্বারা কতিপয় ভ্রমণ এর অবস্থান এবং দৃশ্যগুলোর বর্ণনা করে। সেই সময় থেকে সৌদি আরবের প্রাচীনকালের ধ্বংসাবশেষ গহ্বর এবং সংরক্ষণ অভিযান তত্ত্বাবধান বিভাগ বহন করেছে। ১৯৬০ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৭০ সালের প্রথমদিকে ‘মাদা‘য়েন সালেহ’ অঞ্চলের বেদুঈন জাতিদের উৎসাহের জন্য একটি কর্মসূচি সংগঠিত হয়েছিল। এই পদক্ষেপে প্রাচীন কূপগুলো পুনরায় ব্যবহৃত হয়েছিল আধুনিক সেচপদ্ধতিতে, যা প্রাচীন অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই কর্মসূচি চাষাবাদভিত্তিক অঞ্চলে পূর্ণরূপে ব্যবহৃত হয়। যা হোক ১৯৭২ সালে ‘মাদা‘য়েন সালেহ’ প্রত্নতাত্ত্বিক অবস্থানের অফিশিয়াল পরিচিতি, কৃষিকাজের স্থানচ্যুতির ও অবস্থানের বাইরে সংঘটিত হয়।

১৯৮০ সালে খননকৃত সামরিক অভিযানসমূহ পরিষ্কার অভিযান চালু করে সমাধিস্তম্ভের ভেতর এবং সমাধিস্তম্ভের দৃশ্যসমূহ দূরীভূতকরণের জন্য। বর্তমানে আল-হিজরের নিজস্ব রাজ্যে এ রকম দৃশ্য খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। ১৯৭২ সাল থেকে এই অঞ্চলটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা শুরু হয় দর্শনার্থীদের জন্য। ২০০১ সাল থেকে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের মধ্যে আল-হিজরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আবিষ্কারে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা একটা অবিনাশ পদ্ধতি: কাল্পনিক আলোক চিত্রগ্রহণ পদ্ধতি, গঠনগত বিশ্লেষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যয়ন, পদ্ধতিগত আবিষ্কার ইত্যাদিতে সাহায্য করে। ২০০৬ সালে এই চুক্তিটি নবায়ন করা হয়।

ইতিহাসের পাতায়

লিহ্যান একটি পুরোনো আরব রাজ্য, যার অবস্থান ছিল মাদা‘য়েন সালেহ‘তে। প্রাচীন ষষ্ঠ-চতুর্থ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে খোদাইকৃত উত্তর অ্যারাবিয়ান লিপির জন্য ছিল এর পরিচিত। রাজধানী ছিল ডিডান, যা এখন আল উলা মরূদ্দ্যান নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে লিহ্যানাইটসের সঙ্গে জোট হয়ে যা ন্যাবাতিয়ান নামে পরিচিতি লাভ করে।

আরবে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে ইসলামের বিকাশ পর্যন্ত হেগ্রার ইতিহাস অজানা। যদিও কিছু পর্যটক ও মণীষীদের লেখা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে এর কিছু ইতিহাস পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্যমতে, প্রাচীনকাল হতে হেগ্রা ধর্মীয় কাজে তথা হাজিদের পানি সরবরাহ কাজে ব্যবহৃত হতো। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে অটোম্যান শাসনামলে আল-হিজরে মক্কাগামী হাজিদের নিরাপত্তার জন্য একটি দূর্গ নির্মিত হয়।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় স্থানটি

পবিত্র কোরআন অনুসারে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মাদা’য়েন সালেহতে ছামুদ জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল। বলা হয়ে থাকে, তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর পুজা করত। সালেহ (আ.) ছিল এই জনপদের নবী। তাঁর নামানুুসারে এই জনগোষ্ঠীর নামকরণ করা হলো মাদা‘য়েন সালেহ। ছামুদ জাতি বিভিন্ন ব্যাপারে নবী সালেহর সতর্কবাণী অস্বীকার ও তাকে উপেক্ষা করেছিল। তাকে পর্বত থেকে একটি উট আসার আহ্বান করতে বলা হয়েছিল। আল্লাহর পক্ষ হতে পর্বত থেকে একটি গর্ভবতী উট লোকজনের কাছে পাঠানো হলো সালেহ (আ.)-এর স্বর্গীয় আবাসস্থানের প্রমাণস্বরূপ। অল্প কিছু লোক তাঁর আহ্বানে বিশ্বাস স্থাপন করল। অবিশ্বাসীরা পবিত্র উটকে হত্যা করল যদিও তারা এটাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিজ্ঞা করেছিল এবং বলেছিল শাবক সেই পর্বতে ফিরে গেছে, যেখান থেকে সে এসেছিল। চূড়ান্ত শাস্তি আসার আগে ছামুদ জাতিকে তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল সতর্কবাণীরূপে। তা সত্ত্বেও তারা অবিশ্বাস করতে থাকে এবং সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করল না। নবী সালেহ ও তাঁর অনুসারীরা শহর ত্যাগ করল আর ছামুদ জাতি আল্লাহর শাস্তি প্রাপ্ত হলো। প্রবল ভূমিকম্প ও বজ্রপাতে তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। এভাবে ছামুদ জাতির বর্ণনা পবিত্র কোরআন শরিফে লিপিবদ্ধ রয়েছে, যার চিহ্ন এখনো পাওয়া যায়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে আল-হিজরে এখনো বর্তমান কূপগুলো এবং মরুভূমির কৃষিকাজ ধারাবাহিকভাবে উপনিবেশকারীদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইহা চলতে থাকে যখন হেজাজ রেলপথ এই স্থানটি অতিক্রম করল, যা নির্মিত হয়েছিল সুলতান আবদুল হামিদের নির্দেশে দামেস্কো এবং জেরুজালেমকে সংযুক্ত করে উত্তর-পশ্চিমে মদিনা এবং মক্কার সঙ্গে। এক স্থান থেকে অন্যত্র সঞ্চারী অফিস এবং রেলপথের কর্মচারীদের জন্য আল-হিজরের উত্তরে একটি স্টেশন নির্মিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যা ধ্বংস হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব রাজ্যের অবস্থান বিষয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে এবং কতিপয় প্রত্নতাত্ত্বিকবিষয়ক অনুসন্ধানকার্য চালানো হয়। রেলস্টেশনটি পুনরায় নির্মাণ করা হয় এবং যেখানে ১৬টি ভবন এবং কতিপয় ঘূর্ণায়মান থাম রয়েছে।

১৯৬০ সালের শেষের দিকে সৌদি সরকার একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে যেখানে দিনের অধিকাংশ সময় বসে থাকতে অভ্যস্ত নেমেডিক বেদুঈন উপজাতিদের বসতি স্থাপনের জন্য। সরকার কর্তৃক প্রস্তাব ছিল যে তারা আল-হিজরে বসতি স্থাপন করবে, পুনরায় ব্যবহার করবে বিস্তৃত কূপগুলো এবং কৃষিকাজে ব্যবহার করবে স্থানটি। ১৯৭২ সালে এই প্রস্তাবটি স্বীকৃতি লাভ করে এবং বেদুঈনরা উত্তরে ওই স্থানটির চারপাশে পুনরায় বসতি স্থাপন করে।

মোস্ট বিউটিফুল স্পটস

বর্তমান উন্নয়ন

যদিও ১৯৭০ সালের শুরু হতে আল-হিজরকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করা হয় এবং সে লক্ষ্যে কিছু অনুসন্ধানকার্যও পরিচালিত হয়। বিভিন্ন জিনিসের ধর্মীয় অনুশাসন বিদ্যমান থাকায় স্থানটির স্বীকৃতি পেতে বিলম্ব ঘটে। অবশেষে সৌদি সরকার কর্তৃক বিশেষ নিরাপত্তাপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে ২০০০ সালের শুরুতে ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ দল স্থানটি পরিদর্শনে আসে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান অভিযান শুরু করে। অবশেষে ২০০৮ সালে ইউনেসকো এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে।

প্রথম খ্রিষ্টপূর্বাব্দে হেগ্রার নাবাতায়ন অঞ্চল আবাসিক এলাকা হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বেলেপাথর খোদাই করে এলাকাবাসীর জন্য ১৩.৪ কিলোমিটারজুড়ে বিস্মৃত ১৩১টি স্মারক সমাধিস্তম্ভ নির্মিত হয়, যেগুলো এখনো টিকে আছে স্বমহিমায়।

নাবাতায়নের উৎকীর্ণলিপির সারসংক্ষেপ- 

সমাধিস্তম্ভ (গোরস্থান)অবস্থাননির্মাণের সময়কালউল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
জাবাল আল-মাহজারউত্তরেনির্দিষ্ট  সময়কাল নেই।পূর্ব এবং পশ্চিমভাগের সমাধিস্তম্ভসমূহ চারটি সমান্তরাল শিলপাথর খোদিত ছিল। সম্মুখভাগের সাজ আকারে ছোট।
কোয়াসর আল-ওয়ালাদনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব০-৫৪ খ্রিষ্টাব্দ৩১টি সমাধিস্তম্ভ শৈল্পিক খোদাই লিপিতে তৈরি। যেমন- পাখি মানুষের মুখ এবং কাল্পনিক নানা উপাদান। পাথরে খোদাইকৃত অধিকাংশ স্তম্ভ সুবিশাল সম্মুখভাগ ১৬ মিটার উঁচু।
এরিয়া সিদক্ষিণ-পূর্ব১৬-৬১ খিষ্টাব্দ১৯টি খোদাইকৃত সমাধিস্তম্ভ একাকীত্ব নির্জনভূমি। সম্মুখভাগে কোনো ডিজাইন খোদিত নেই।
জাবাল আল- খুরইমতদক্ষিণ-পশ্চিম৭-৭৩ খ্রিষ্টাব্দচারটির মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভিন্ন ধরনের পাথরে গঠিত। বালুময় অঞ্চল থেকে আলাদা যদিও মাত্র আটটি সমাধিস্তম্ভ খোদিত করা হয়েছে। সংখ্যায় সর্বমোট ৪৮টি। অল্পসংখ্যক বেলেপাথর এবং সম্মুখভাগে বিদ্যমান নিম্নমানের সংরক্ষণ।

আল-হিজর প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাটি শুষ্ক আবহাওয়া অঞ্চলে অবস্থিত। পরে স্থানটি পরিত্যক্ত হয়েছিল পুনরায় বসতি স্থাপনের অভাবে। স্থানীয় বিশ্বাস বিদ্যমান থাকায় আল-হিজর সংরক্ষিতভাবে পরিচালিত, নাবাতায়নের জীবনধারণের একটি বিস্মৃত ছবি সরবরাহ করে। আল-হিজরের মরুভূমিতে অধিবাসীরা কৃষিকাজ এবং বিস্মৃত কূপগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য পাহাড় মধ্যকার ঘরগুলো থাকত আলোকময়, অথচ আলোর উৎস ছিল অজানা। এটা নাবাতায়নের রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম আবাসভূমি গড়ে তোলে, যা জর্ডানের বিখ্যাত পেত্রা নগরের চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। এসব কারণেই আরবের চার হাজার পাথুরে পুরাকীর্তির স্থাপনার রাজধানী হিসেবে অলিখিতভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে এটি। 

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top