নিশ্চিত করুন মানসম্মত পণ্য

বাংলার প্রকৃতিতে এখন শীত। আরিচা অভিমুখে ঢাকার গণ্ডি কিছুটা পেরোতেই চোখে পড়ল হলুদ উপত্যকা; দিগন্ত বিস্তৃত সরিষার খেত। মৃদু বাতাসের দোলায় ছড়িয়েছে সরিষা ফুলের সুবাস। পদ্মা পেরিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছালাম মাদারীপুর। বাসস্ট্যান্ডগুলোতে চলছে খেজুর গুড়ের পাটালির বিকিকিনি। মধুখ নামেই এলাকায় যাঁর পরিচিতি। এ সময়ে কারও বাড়িতে বেড়াতে গেলে উপহারস্বরূপ মধুখ নেওয়া চা-ই চাই। যদিও এ ঐতিহ্য দিনে দিনে হারাতে বসেছে। তবে জনপদজুড়েই লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। এতে ভূমিকা রাখছেন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ীরাও। এমনই একজন স্বনামধ্যন্য ব্যবসায়ী হাজি মো. জাহাঙ্গীর আলম। জেলা শহরের তরমুগরিয়া এলাকার মেসার্স আলম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামানের সহযোগিতায় বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার  সফল এ ব্যবসায়ীর জীবনের কথকতা।

ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের জন্ম ১৯৬৭ সালের ৫ জুন মাদারীপুর জেলার ছিলারচরে। বাবা আলহাজ মো. আলীম উদ্দীন পাহলান আর মা মরহুমা হাজেরা বেগম। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে সবার বড়। রঘুরামপুর এন্তাজ উদ্দীন খান পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক পাসের পর জড়িয়ে যান ব্যবসায়। ছিলারচর বাজারে শুরু করেন পাট ও সারের ব্যবসা। ছিলেন এলাকার বিসিআইসির সারের ডিলার। ব্যবসায়িক পরিবার। বাবা ঢাকার সদরঘাটে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। প্রায় দুই বছর ব্যবসা করার পর ভাগ্যোন্নয়নে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। সেখানে প্রায় চার বছর অবস্থানের পর দেশে ফেরেন। আগের ব্যবসাতেই আবার নিজেকে নিয়োজিত করেন। পাশাপাশি শুরু করেন পরিবহনের (বাস) ব্যবসা। কয়েক বছর পর যান ইংল্যান্ডে। সেখানে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করতেন। দীর্ঘ নয় বছর পর দেশে ফিরে আসেন। এসেই শুরু করেন নির্মাণপণ্যের ব্যবসা।

রড ও সিমেন্টের মাধ্যমেই নির্মাণপণ্য ব্যবসায় আত্মপ্রকাশ। একজন সুদক্ষ ব্যবসায়ী হওয়ায় খুব দ্রুতই ব্যবসার নানা কৌশল আয়ত্ব করেন। ক্রমেই বাড়তে থাকে পণ্য বিক্রি। ক্রেতা চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে একে একে যোগ করেন টাইলস, হার্ডওয়্যার ও সেনেটারিসামগ্রী। অধিক পণ্য বিক্রি ও ব্যবসায়িক পরিসর সম্প্রসারণের ফলে দ্রুতই বিভিন্ন নির্মাণপণ্য প্রতিষ্ঠানের সুনজরে পড়েন। ব্যবসায়িক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ আকিজ সিরামিকস কোম্পানিসহ তিনটি স্টিল কোম্পানির পরিবেশক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এলাকায় তিনি আকিজ সিমেন্টের প্রাইম সেলার। বর্তমানে শহরে রয়েছে তাঁর ছয়টি শোরুম ও একটি গোডাউন। অধিক পণ্য বিক্রির সুবাদে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে পেয়েছেন ফ্রিজ, টেলিভিশন, স্বর্ণালংকার, মাইক্রোওভেন, ট্যাবলেট পিসি, নগদ টাকাসহ নানা উপহার। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুযোগ পেলেও সময়ের অভাবে যেতে পারেননি।

নির্মাণপণ্যের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবসায়ও রয়েছে তাঁর সমান পদচারণ। তিনি এমনই সুদক্ষ ব্যবসায়ী, যে ব্যবসা করেছেন তাতেই পেয়েছেন সফলতা। আর এ সফলতার অংশীদার তাঁর ছোট ভাই মো. হানিফও। ব্যাংকিং, পণ্য ক্রয়-বিক্রয়সহ সব ধরনের কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন বড় ভাইকে। পরিবহন ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ছোট ভাই হানিফই। ব্যবসা ছাড়াও স্থানীয় পরিবহন মালিক সমিতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ছিলেন শরিয়তপুর পরিবহন মালিক কার্যকরী কমিটির সদস্য। বর্তমানে মাদারীপুর সার্বিক পরিবহনের সহকারী পরিচালক। সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী হিসেবে সুনাম ছড়িয়েছে এলাকাময়।

ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বিয়ে করেন ১৯৯৬ সালে। স্ত্রী রেখা আলম। সুখী এ দম্পত্তির এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে নূর-ই-আলম হৃদয় উত্তরা কমার্স কলেজে এবং ছোট মেয়ে জাফরিন সুলতানা মাইশা মাদারীপুর পৌর মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। মাদারীপুর বাস ও ট্রাক মালিক সমিতির সদস্য। এসব ব্যবসায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০ জন মানুষের। সামাজিক ও ধর্মীয়ও কাজেও রয়েছে তাঁর সমান তৎপরতা। ছিলারচর বাজার মসজিদের সভাপতি ও স্কুলের দাতা, মাদারীপুর জাকের পার্টির পৌর সেক্রেটারি। লেখাপড়া, বিয়ে, চিকিৎসাসহ এলাকার দুস্থদের সাধ্যমতো সহায়তার চেষ্টা করেন।

চাকরিতে নেই স্বাধীনতা! এ ভাবনা থেকেই কেউ যদি ব্যবসা করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই হতে হবে সৎ, অর্জন করতে হবে ক্রেতার আস্থা। পাশাপাশি ব্যবসার পরিসর বিবেচনায় অনুযায়ী পর্যাপ্ত মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে। অনেকে না বুঝে ব্যবসা করতে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রেতা পেতে প্রচলিত বাজার দাম থেকেও অনেকে কমে পণ্য বিক্রি করে। এতে ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হয়। তাই যথাযথভাবে ব্যবসা শিখে ব্যবসা করতে হবে। তিনি নিজেও লন্ডন থাকাকালীন কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে, মুনাফার কৌশল, ক্রেতা সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জন বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। দেশে যুব উন্নয়ন কেন্দ্র থেকেও নিয়েছেন একটি প্রশিক্ষণ। ঘুরেছেন প্রায় ২০টি দেশ। এসব ব্যাপারগুলো না জানলে ব্যবসায় সাফল্য পাওয়া কঠিন।

ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম আর তাঁর প্রতিষ্ঠান নির্মাণপণ্য ব্যবসায় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক পরিচিত। ক্রেতারা যেন মানসম্মত নির্মাণপণ্য ন্যায্য দামে একই প্রতিষ্ঠানে পান তা নিশ্চিত করতে চান তিনি। ব্যবসাকে ঘিরে এটাই তাঁর বাসনা। সে লক্ষ্যেই নিজস্ব এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন সফল এ ব্যবসায়ী।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫ 

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top