অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী মানুষ এখন আকাশচুম্বী ভবনে কাজ করছে, করছে বসবাসও। বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ উঁচু ভবন দুবাইয়ের ‘বুর্জ খলিফা’। ২৭১৭ ফুট উচ্চতার ২৫০ তলাবিশিষ্ট এই মাল্টিপারপাস আকাশচুম্বী ভবনটিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, বসবাসÑ সবকিছুই চলছে। হংকং আর সিঙ্গাপুরের সবকিছুই এখন বহুতল ভবনে। হংকংয়ে ১১০ তলা পর্যন্ত আবাসিক ভবন আছে। এভাবে বিশ্বের কোনো কোনো জায়গায় নির্মাণযোগ্য জমির স্বল্পতায়, আবার কোনো কোনো জায়গায় ধনবান অর্থনীতিতে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলমান। যেমন সৌদি আরবের জেদ্দায় রাজপরিবারের উদ্যোগে নির্মিত হতে যাচ্ছে তিন হাজার ২৮০ ফুট উচ্চতার ‘কিংডম টাওয়ার’। মক্কা-মদিনায় কাবা শরিফ ও মসজিদে নববির আশপাশে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের মানুষও বহুতল ভবনে বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। নগর এলাকার মানুষ এখন ২৫-৩০ তলা উঁচু ভবনে বসবাস করছে। কিছু ডেভেলপার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান চাইছে ঢাকায় আরও বহুতল (৫০-১০০ তলার) ভবন নির্মাণ করতে। কিন্তু রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরে ও সন্নিকটে বিমানবন্দরের অবস্থান তথা পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসের স্বল্পতায় চাইলেও নগরে এ মুহূর্তে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
প্রসঙ্গক্রমে রাজধানী ঢাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ নির্মিত অসংখ্য বহুতল ভবন অলস পড়ে আছে, যা শুধু বিদ্যুতের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে তেজগাঁওস্থ পরিত্যক্ত (?) বিমানবন্দরটি নিয়েও চলছে উচ্চতা নিয়ন্ত্র¿ণের বাড়াবাড়ি। আবার অনেক জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ (Key Place Indicator-KPI)বা ঐতিহ্যগত স্থাপনার (Architectural Heritages) কারণেও মহলবিশেষ থেকে নতুন ও উঁচু ভবন নির্মাণে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার মাটি বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য উপযুক্ত হলেও সেখানে প্রাক-ঐতিহাসিক কিছু স্থাপত্যের সংরক্ষণ ও অবকাঠামো সমস্যায় বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছে না। ফলে দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগকারীর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দেশে বহুতল ভবন নির্মাণে আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না। তথাপি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। অপর দিকে বিগত শতাব্দীতে (১৯৬০-৮০-এর দশকে) সরকারি-আধা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য চার-পাঁচ তলা উচ্চতায় যেসব বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছিল, সময়ের প্রেক্ষাপটে ও বাস্তবতার বিবেচনায় সেগুলোকে বহুতল ভবনে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সরকারি অনেক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ ধরনের কিছু ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি যৌথ (PPP) অর্থায়ন কিংবা উদ্যোগে কিছু প্রকল্প গৃহীত হতে শুরু করেছে।
পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে
মাটি-পরিবেশের সান্নিধ্যে বসবাসে অভ্যস্ত এ দেশের মানুষ আগে তিন-চার তলা উঁচু ইমারতে বাস করতে চাইত না। সরকারি আবাসিক ভবনগুলো নির্মিত হতো ‘Walk-up Flat’ হিসেবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পছন্দ থাকত নিচতলা বা দুই তলার বাসা, যাতে তাঁরা ভবনসংলগ্ন জমিতে শাকসবজি বা ফুলের বাগান করতে পারে। স্বাধীনতার আগে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে হাতে গোনা কিছু তিন-চার তলা বা ততোধিক উচ্চতার ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ছিল। পুরানা পল্টন, আজিমপুর, ইস্কাটন ও মতিঝিল এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য এ ধরনের কিছু কোয়ার্টার ছিল। তখন ওয়ারি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, গুলশান, বনানী, মিরপুর প্রভৃতি এলাকায় সরকারি বরাদ্দকৃত জমিতে দুই তলার বেশি ইমারত নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হতো না। তখনকার ঢাকার অন্যতম উঁচু ও সুন্দর স্থাপনা ‘ডিআইটি ভবন’ দেখার জন্য সারা দেশ থেকে মানুষ আসত ঢাকায়। জানামতে, অতঃপর ঢাকায় দ্বিতীয় উঁচু অফিস ভবন ছিল মতিঝিলের ‘ওয়াপদা ভবন’। নগরজুড়ে এ ধরনের কয়েকটা উঁচু অফিস ও হোটেল ভবন ছিল মাত্র। হাটখোলায় ‘ইলিশিয়াম টাওয়ার’, ‘শেরাটন হোটেল’ এর মধ্যে অন্যতম। মতিঝিল-দিলকুশা-কারওয়ান বাজারে বাণিজ্যিক প্লট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে তেমন আবেদনপত্র পাওয়া যেত না, তাই বিভিন্ন সরকারি-আধা সরকারি সংস্থাকে এসব (বেশির ভাগ) প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। অনুরূপ বনানী এবং গুলশান-১ ও ২ নং চত্বরে বেশির ভাগ বাণিজ্যিক প্লটগুলো ধনীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার কাঠাপ্রতি মূল্য এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ কোটি টাকারও বেশি!
স্বাধীনতার আগপর্যন্ত ধানমন্ডি-লালমাটিয়া-মোহাম্মদপুর, গুলশান-বনানী আবাসিক এলাকায় প্রথমে কাঠাপ্রতি মূল্য ছিল মাত্র ৫০০-৭৫০ টাকা। কিন্তু তখন ওই মূল্যের প্লট বরাদ্দের জন্য আবেদনকারী পাওয়া যেত না, আর এখন সেখানে প্লট বরাদ্দের জন্য হাজার-লাখ আবেদনকারী। ধানমন্ডি ও গুলশান অ্যাভিনিউতে নামমাত্র মূল্যে বরাদ্দকৃত সেসব আবাসিক প্লটের বাজারদর এখন অনেক ক্ষেত্রে কাঠাপ্রতি ৮-১০ কোটি টাকারও ওপরে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে সময় ওই মূল্যে বাঙালিদের প্লট বরাদ্দ নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাই তখন ওসব এলাকায় বেশির ভাগ বড় প্লটের মালিকানা পান অবাঙালিরা। তখন বাংলাদেশে লাখো-কোটি টাকার মালিক ছিলেন হাতে গোনা কজন, আর এখন হাজার হাজার কোটিপতি। এসব কোটিপতি ইদানীং নগরের আশপাশে বা গ্রামগঞ্জে বাগানবাড়ি বানালেও তাঁদের বেশির ভাগ নগরে ফ্ল্যাটবাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টে কিংবা ডুপ্লেক্স বাড়ি বানিয়েছেন কমই। নিরাপত্তাজনিত কারণ তথা রক্ষণাবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকেও ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট-জীবন এখন সবার পছন্দ। মোট কথা, এখন বিভিন্ন কারণে কেউ আর ইনডিপেনডেন্ট বাড়িতে বাস করতে চায় না। ফলে স্থান-পরিবেশের বিবেচনায় কিছু জায়গায় বিশেষ করে বারিধারা-গুলশানে প্রতি বর্গফুট ২০-৩০ হাজার টাকায়ও ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হচ্ছে। তবে সার্বিকভাবে নগরের অভ্যন্তরে এখনো স্থান বিবেচনায় বর্গফুট প্রতি ৫-১০ হাজার টাকার মধ্যে ভালো ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। তবে সরকারি পর্যায়ে নির্মিত (জমির কম মূল্যের কারণে) ফ্ল্যাটের মূল্য এখনো বেসরকারি ফ্ল্যাটের তুলনায় কম।
অন্যদিকে, আগে দেশে বহুতল ইমারত বিদেশি স্থপতি ও প্রকৌশলীদের ডিজাইন এবং তত্ত্বাবধানে নির্মিত হতো এবং স্বাধীনতা-উত্তরকালে আশির দশক পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। তবে অনেকে বলেন, আগে বাংলাদেশি স্থপতি-প্রকৌশলীদের বহুতল ইমারত ডিজাইন ও নির্মাণ করার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু এ কথাটি ঠিক নয়। বাস্তবে গঙ্গা অববাহিকায় নদী-নালাবিধৌত ঢাকার পলিমাটির ওপর বহুতল ভবন নির্মাণ উপযুক্ত নয় মর্মেও একধরনের ভ্রান্ত ধারণা ছিল। আসলে এসব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি তথা ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর অপপ্রচার। অনেকে নগর বা শহরের অভ্যন্তরে বিমানবন্দর স্থাপন, ক্যান্টনমেন্ট, বিডিআর সদর দপ্তর ইত্যাদি স্থাপনা গড়ে তোলার পেছনেও তাদের একটা প্রচ্ছন্ন ষড়যন্ত্র ছিল বলে মনে করেন, যাতে নগরের ঊর্ধ্বমুখী উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়! অথচ অনেক আগ থেকেই বিশ্বের অনেক দেশে বাঙালি স্থপতি-প্রকৌশলীরাই বহুতল ভবন নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী ড. এফ আর খানের ডিজাইন ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে বিশ্বের প্রথম (১৯৬৯-৭৪ সালে ‘সিয়ার্স টাওয়ার’ ১০৫ তলাবিশিষ্ট) ও অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ায় (Tubelar & Shear Wall পদ্ধতিতে) বহুতল ভবন নির্মিত হয়। এতেই প্রতীয়মান হয় যে বাঙালির বহুতল স্থাপনা নির্মাণের অভিজ্ঞতা জন্মলগ্ন বা আদিকাল থেকেই ছিল। সনাতনী বিদ্যায় শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে শত বছর আগে থেকে এখানে মানুষ ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে ১০০-১৫০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত মন্দির, মিনার, চিমনি, মঠ, স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে, সে ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে হয়তো বিশ্বের অন্যতম বহুতল ভবনের শহরে পরিণত হতে পারত বৈকি! দেশের আনাচকানাচে এখনো শত-হাজার বছরের এ রকম অসংখ্য উঁচু কাঠামো চোখে পড়ে। দুঃখের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসনামলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের দেশের সেই গৌরবময় স্থাপত্য-প্রকৌশলজ্ঞান এবং মেধা পাচারের ষড়যন্ত্রে অর্থাৎ ‘ব্রেন ড্রেন’ শুরু হয়, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান।
সরকারি উদ্যোগে ‘আর প্লট নয়, ফ্ল্যাট’
নগর এলাকায় নির্মাণযোগ্য জমির স্বল্পতা ও চড়া মূল্যের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান পরিবারের আবাসনের চাহিদায় দিনে দিনে মানুষের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে বসবাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বা ঝুঁকে পড়ছেও বলা যায়। এতে স্বাভাবিকভাবে সরকারের নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। এত দিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা জমি অধিগ্রহণ করে নতুন শহর বা স্যাটেলাইট টাউন তৈরি করে সেখানে বিভিন্ন সাইজের প্লট বরাদ্দ করত। কিন্তু বর্তমানে জমির চড়া দাম, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বাধা কিংবা আপত্তির কারণে দেশের কোনো জায়গায় এখন আর নতুন করে বড় আকারের কোনো আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অধিগ্রহণকৃত জমির দখলও বুঝে পাওয়া যাচ্ছে না, সময়মতো বরাদ্দকৃত প্লটের উন্নয়ন সম্পন্ন ও দখল হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। এমনকি কোনো কোনো জায়গায় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপর দিকে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের ঠকবাজির কারণে টাকাপয়সা দিয়েও জমি বা ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়া যায় না, জমি বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে না পারলে প্রদেয় টাকাও ফেরত দেয় না। এ জন্য রাজউক বা কোনো সরকারি সংস্থা প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিলে মানুষ একখণ্ড জমি বা একটি ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের (বিবিএস) পরিসংখ্যান মতে, রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রতিবছর গড়ে এক লাখ বাসস্থানের প্রয়োজন।
কিন্তু উল্লেখিত বিভিন্ন কারণে সরকারের পক্ষে এ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই সার্বিক বিবেচনায় সরকার অধিকসংখ্যক মানুষের আবাসনের ব্যবস্থাকরণের লক্ষ্যে এখন প্লট বরাদ্দের পরিবর্তে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে ‘ভবিষ্যতে আর প্লট নয়, ফ্ল্যাট বরাদ্দ করা হবে’। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে রাজউকের সম্প্রসারিত উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) প্রকল্পের ১৮ নম্বর সেক্টরে প্রস্তাবিত ঢাকা মেট্রোরেল ট্রেনের স্টার্টিং পয়েন্টের পাশে ২১৪ দশমিক ৪৪ একর জমির ওপর একটি অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প গৃহীত হয়। অনুরূপ রাজউকের ঝিলমিল এবং পূর্বাচল প্রকল্পেও অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে। পাশাপাশি ইতিপূর্বে আজিমপুর, মতিঝিলের মতো এলাকায় স্বাধীনতার আগে যেসব ‘Walk-up Flat’ নির্মাণ করা হয়েছিল, সরকারের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে সেখানে বহুতল আবাসন প্রকল্প গৃহীত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিতে অর্থাৎ ‘ঋধং’Fast Track’ পদ্ধতিতে এসব বহুতল আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে মাত্র ৮-১০ দিনের ব্যবধানে প্রতি তলার ছাদ ঢালাই করা যাবে। তা ছাড়া নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে আরও নানা আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব থাকবে। এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পে বড় ধরনের উন্নতি ও পরিবর্তন আসবে।
‘বহুতল’ বিতর্ক!
শুরুতেই বলেছি, দেশের অনেক নগরে বহুতল ভবনের উচ্চতা নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন- রাজধানী ঢাকার কোথাও বিমানবন্দরের ফানেলের কারণে, কোথাও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কারণে, আবার কোথাও ঐতিহ্যগত স্থাপনার কারণে উঁচু ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছে না। মহাপরিকল্পনা অনুসারে রাজধানী ঢাকা উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। তন্মধ্যে আবার উত্তরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মাঝখানে ক্যান্টনমেন্ট ও তেজগাঁও বিমানবন্দর; দক্ষিণে সচিবালয়-বঙ্গভবন-জেলখানা-আহছান মঞ্জিল ইত্যাদির কারণেও কেউ চাইলেও এসবের আশপাশ ও প্রভাবিত এলাকায় উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয় না। অথচ ভূ-বিজ্ঞানী ও জিউ টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, পুরান ঢাকাসহ নগরের এসব স্থানই অধিকতর উচ্চতায় বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য সার্বিকভাবে উপযুক্ত। তা ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বা সুবিধাদির স্বল্পতাও রয়েছে। যেমন- ফায়ার সার্ভিসের কাছে উঁচু ভবনে অগ্নিনির্বাপণের যন্ত্রপাতি নেই বিধায় তারা বহুতল ভবন নির্মাণে ছাড়পত্র দিতে চায় না। প্রায় একই জবাব ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। এতদভিন্ন নগরের অভ্যন্তরে সড়কের অপর্যাপ্ত প্রশস্ততা, অপরিকল্পিত এলাকার মতো সমস্যাও রয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোডে ২২ মিটার বা ছয় তলার ঊর্ধ্বে ভবনকে বহুতল ভবন বলা হয়েছে।
কিন্তু দেশের স্থপতি ও প্রকৌশলী তথা ডেভেলপারদের দৃষ্টিতে এই আধুনিক যুগে বহুতল ভবনের এই সংজ্ঞা গ্রহণযোগ্য নয়। পার্শ্ববর্তী ভারতসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে ৯-১০ তলার ঊর্ধ্ব ভবনকে বহুতল ভবন বলা হয়। আর অনেক উন্নত দেশে তো ২০-২৫ তলার নিচু ভবনকেও সাধারণ ভবন মনে করা হয়। বাংলাদেশে ছয় তলার ঊর্ধ্ব ভবনকে বহুতল ভবন বলা নিয়ে শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মধ্যে বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি বিল্ডিং কোডের সংশোধনকালে এই বিষয়টির ওপর অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়, কিন্তু জাতীয় বিল্ডিং প্রণয়নের ২০ বছর পরও উল্লেখিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারণে এতে বহুতল ভবনের সংজ্ঞা অপরিবর্তিত থেকে যায়! এতে বিল্ডিং কোডের যথাযথ অনুসরণ ও প্রতিপালন নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। আর এই তর্ক-বিতর্ক বা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে কিছু প্রভাবশালী মহল ও ডেভেলপাররা অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। যে প্রক্রিয়ায় নগরজীবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়াসহ পরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ সমস্যাসংকুল হয়ে পড়েছে।
পরিশেষে
অল্প কিছু জায়গায় (৫৬ হাজার বর্গমাইল) এত বিশাল জনসংখ্যা (১৬ কোটি) এবং এই বিশাল জনসংখ্যার যদি সবাই নিজের বাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে চায়, তাহলে এত মানুষের অন্নসংস্থান হবে কীভাবে? দেশটিও বা চলবে কীভাবে? তার মধ্যে সবকিছু আবার হয়ে আছে নগরমুখী। রাজধানী ঢাকায় তো মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে অচলায়তনের সৃষ্টি হয়েছে। এ সুবাধে কিছু ভূমিদস্যু নগরের আশপাশের নিচু জমি ভরাট করে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে বসেছে। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, সর্বত্র বসতি স্থাপন আর ইমারত নির্মাণ করতে দেওয়া যায় না। দেশকে অবশ্যই পরিবেশগত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। নগর থেকে অনেক কিছু বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তেজগাঁও বিমানবন্দর, ক্যান্টনমেন্ট, বিজিবি, জেলখানার মতো প্রতিষ্ঠানকে বর্তমানে রাজধানীর অভ্যন্তরে থাকার বা রাখার কোনো ধরনের যৌক্তিকতা আছে কি? সচিবালয়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, ডিপ্লোম্যাটিক এরিয়াকেও শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত। সব বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকায় হলে দেশের ছাত্ররা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে কীভাবে? নগর অভ্যন্তর ও আশপাশ থেকে গার্মেন্টসশিল্পগুলো তার উপযুক্ত স্থানে সরিয়ে নেওয়া বিশেষভাবে দরকার।
সবাই যদি সবকিছু রাজধানীতে স্থাপন বা নির্মাণ করতে চায়, তবে দেশটির উন্নতি হবে কীভাবে? গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বেগুনবাড়ী খালের ওপর তাঁদের অফিস ভবন নির্মাণ করে বসেছেন। অনুরূপ নগরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বা প্রস্তাবিত সড়কের মুখে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভবন নির্মাণ করে আছেন, যাতে ওসব সড়ক ও সড়ক মোড় চওড়া করা যাচ্ছে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ‘বিজেএমই ভবন হাতির ঝিল প্রকল্পের ওপর একটা বিষফোঁড়া’। কথা হলো, সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে চাইলে এসব বিষফোঁড়া অপসারণ কোনো বিষয় নয়। গায়ের জোরে নির্মিত ‘র্যাংগস ভবন’ এখন আছে কি? রাজধানী ঢাকা তথা দেশের অন্যান্য স্থানে এ ধরনের আরও যেসব অসামঞ্জস্য ইমারত কিংবা স্থাপনা রয়েছে এবং সরকারি জমি বিভিন্নভাবে বেদখল হয়ে আছে বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলো উদ্ধার করে যথাযথ ব্যবহারে আনা প্রয়োজন। তেজগাঁও বিমানবন্দরসহ অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ নগর অভ্যন্তর থেকে অপসারণ বা পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নগরের নির্মাণযোগ্য জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
তা ছাড়া বহু আগে পরিকল্পিত এলাকাসমূহকেও Re-Planning/Development-এর আওতায় আনাও জরুরি হয়ে পড়েছে এবং এসব জায়গায় পর্যায়ক্রমে আধুনিক প্রযুক্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে। তেজগাঁও শিল্প এলাকা, পরিত্যক্ত বিমানবন্দর ও করাইল বস্তির ভূমি ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের কথা হচ্ছে। অবশ্যই এসব জায়গার Re-Planning/Development করা উচিত এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে (PPP ভিত্তিতে) সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা যায়। সত্যিকার অর্থে, নগরের বর্তমান পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে এখন এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন হচ্ছে। এতে তাদের চাষাবাদের জমি নষ্ট হচ্ছে না, খাল-নদী, পাহাড়-পর্বতও থাকছে অক্ষত। অস্ট্রেলিয়ায় যেখানে প্রতি বর্গমাইলে মাত্র কয়েকজন লোক বাস করে, সেখানেও বহুতল ভবন নির্মাণ করে জায়গা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রামে-গঞ্জে বহুতল আবাসন নির্মাণ করে চাষাবাদের জায়গা অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। সম্প্রতি ভিয়েতনামও অনুরূপ অবস্থায় এসেছে। ওরা যদি পারে, তবে আমরা পারছি না কেন? হ্যাঁ, আমাদেরও অবশ্যই পারতে হবে, করতে হবে। আমাদের নেতৃত্বকে সম্মুখমুখী হতে হবে, তাঁদের পশ্চাৎপদ রাজনীতি পরিহার করে দেশের সমন্বিত উন্নয়নে আন্তরিক হতে হবে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে চাষাবাদের জমি ধ্বংসকরণ, শহর-গ্রামের সর্বত্র বহুতল আবাসন নির্মাণ, বহুতল ভবনের সংজ্ঞা পরিবর্তন, রাজধানী থেকে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয়ের ওপর একটি বিশেষ আইনও প্রণয়ন করা যেতে পারে। মোট কথা, বর্তমানে বাংলাদেশে ভূমির চাহিদা আর মানুষ যে হারে বাড়ছে তাতে সর্বত্র বহুতল ভবন নির্মাণের বিকল্প নেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫