এ এক মূর্তিমান বিস্ময়! ঝরনা মানেই প্রবাহিত পানির স্রোতোধারা, কিন্তু তা যদি হয় নান্দনিক স্থাপনা, মনোমুগ্ধকর ভাস্কর্য তাহলে নিশ্চয় তার সৌন্দর্য বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সত্যিই তাই, চঞ্চল জলস্রোতের মতোই যেন এই ঝরনাটি ভাস্কর্য ও প্রাসাদসহ সমগ্র উপস্থাপনার সঙ্গে মিশে গিয়ে করেছে প্রাণের সঞ্চার। ঝরনাটি মূলত ট্র্যাভারটিন পাথর দিয়ে বানানো হয়েছে। আবার পানিতে পাওয়া যায় একধরনের খনিজ, যাতে ক্যালসিয়াম কার্বনেট বিদ্যমান। এই ঝরনা নেপচুনকে ফুটিয়ে তুলেছে, সমুদ্রের দেবতা একটি ঝিনুকের খোলের আকৃতিবিশিষ্ট রথে আসীন, সেই রথকে টেনে নিচ্ছে দুটো ঘোড়া, প্রতিটা ঘোড়াকে পরিচালিত হচ্ছে ট্রাইটনে। একটি ঘোড়া শান্ত, অপরটি ছটফটে, যা সমুদ্রের নানা অবস্থাকে প্রতীকীভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এভাবেই শৈল্পিক হয়ে উঠেছে পুরো বিষয়টি। এটা এতটাই পর্যটনপ্রিয় যে দিনের আলোয় কিংবা রাতের উষ্ণ আলোয়, যে সময়ই হোক না কেন এই ঝরনা কখনো একাকী থাকে না!
ট্রেভি ফাউনটেইন (ইতালিয়ান ভাষায় ফন্টানা ডি ট্রেভি) ঝরনাটি ইতালির রোমের ট্রেভিতে অবস্থিত। ঝরনাটিকে সেই শহরের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্য বলা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ঝরনার নামটি এসেছে ট্রে ভি (তিন পথ) শব্দযুগল থেকে। কারণ, এই ঝরনা তিনটি রাস্তার সংযোগস্থল। ঝরনাটির ডিজাইন করেছেন স্থপতি নিকোলা স্যালভি। ঝরনার নির্মাণকাজ শেষ করেন গিসেপ্পি পানিনিসহ সঙ্গের আরও কয়েকজন। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ১৯ বছর আগে ঝরনাটির উৎপত্তি। অ্যাকুয়া ভারগো জলপ্রণালির শেষ প্রান্তে শুরু এই ঝরনার। রেনেসাঁর আমলে ঝরনার প্রাথমিক নির্মাণকাজ শেষ হয়। নির্মাণকাজ পরিচালনা করেন পোপ পঞ্চম নিকোলাস। ট্রেভি ফাউনটেইন পূর্ণ রূপ লাভ করে ১৭৬২ সালে। ২৬ দশমিক ৩ মিটার অর্থাৎ ৮৬ ফুট উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই ঝরনাটি। প্রস্থে ৪৯ দশমিক ১৫ মিটার অর্থাৎ ১৬১ দশমিক ৩ ফুট। এই ঝরনা প্রতিদিন ২৮ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ কিউবিক ফুট পানি নিঃসৃত করে!
ঝরনাটির ইতিহাস
তিন রাস্তার মোড়ের ঝরনাটি প্রাচীন রোমে পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত অন্যতম নালা অ্যাকুয়া ভার্গোর আধুনিক পুনরুজ্জীবিত সংস্করণ অ্যাকুয়া ভেরগ্রিনের কেন্দ্রবিন্দু রচনা করেছে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ১৯ বছর আগের ঘটনা। কথিত আছে, এক কুমারীর সহায়তায় কতিপয় রোমান প্রযুক্তিবিদ খাঁটি সুপেয় পানির উৎস খুঁজে পায় শহর থেকে তেরো কিলোমিটার দূরে। (দৃশ্যটি বর্তমান ঝরনার সামনে উপস্থাপন করা হয়) যদিও পানির উৎসের এই পরোক্ষ পথটির কারণে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ২২ কিলোমিটারে। এই অ্যাকুয়া ভারগো থেকে পানি চলে যায় বাথস অব অ্যাগ্রিপায়। রোম নগরী ৪০০ বছর ধরে এখানকার পানি ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছে।
নির্দেশনা, নির্মাণ এবং স্থাপত্যশৈলী
১৬২৯ সালের কথা। পোপ অষ্টম আরবানের কাছে আগের সেই ঝরনাকে একদমই চমকপ্রদ মনে হয়নি। তাই তিনি জিয়ান লরেনযো বার্নিনিকে স্কেচের মাধ্যমে সম্ভাব্য নবায়ন তুলে ধরতে বলেন। কিন্তু পোপ মারা যাওয়ার পর সেই প্রকল্প আর এগোয়নি। যদিও বার্নিনির সেই প্রকল্প আর কখনো আলোর মুখ দেখেনি কিন্তু বর্তমানের ঝরনায় বার্নিনির বেশ কিছু ছোঁয়া পাওয়া যায়। পিয়েত্রো দ্য কর্তোনার আগেকার একটি প্রভাবশালী মডেল ভিয়েনার আলবার্টিনায় সংরক্ষিত রয়েছে। সেই মডেলেও বার্নিনির প্রভাব লক্ষণীয়। যেমনটা আছে অষ্টাদশ শতাব্দীর বেশ কিছু স্কেচে। এগুলোর অধিকাংশই অস্বাক্ষরিত। তবে তিনটি প্রকল্পে তিনজনের নাম পাওয়া যায়। একজন নিকোলা মিচেটি, অপরজন ফারদিনান্দ ফুগা এবং এদমে বুশারডনের একটি ফ্রেঞ্চ ডিজাইন।
ব্যারুক যুগে একটি প্রতিযোগিতা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রতিযোগিতা মূলত দালান, ঝরনা আর স্প্যানিশ সিঁড়ির নকশা নির্মাণের সময় জনপ্রিয় হয়। ১৭৩০ সালে পোপ দ্বাদশ ক্লেমেন্ট এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। যেখানে নিকোলা স্যালভি শুরুতে আলেসান্দ্রো গ্যালিলেইয়ের কাছে হেরে যান। কিন্তু একজন ফ্লোরেন্সবাসী জিতে যাওয়ার কারণে রোমে হইচই পড়ে যায়। ফলে ঝরনা নির্মাণের কর্মভার স্যালভির হাতেই অর্পণ করা হয়। কাজ শুরু হয় ১৭৩২ সালে। স্যালভি কাজ অর্ধসমাপ্ত রেখে ১৭৫১ সালে মারা যান। কিন্তু বাইরের কেউ যেন কাজ ভণ্ডুল না করতে পারে তাই উনি সেটাকে লুকিয়ে রাখেন। রোমানরা বলে অ্যাসো ডি কুপ অর্থাৎ ‘এইস অব কাপস’। ট্যারট কার্ডের সঙ্গে মিল থাকায় এমন নাম। ঝরনার সাজসজ্জা শেষ করার জন্য চারজন ভাস্করকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পিয়েত্রো ব্রাচি (তাঁর স্ট্যাচু অব ওশেনাজ সেন্ট্রাল নিশেতে অবস্থিত), ফিলিপো ডেলা ভেল, জিওভান্নি গ্রসি এবং আন্দ্রে বারগনডি। গিসেপ্পি পানিনি নির্বাচিত হন স্থপতি হিসেবে। পরে ১৭৬২ সালে ট্রেভি ঝরনার কাজ শেষ হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে পোপ দ্বাদশ ক্লেমেন্ট ২২ মে ঝরনার উদ্বোধন করেন।
পুনঃপ্রতিষ্ঠা
১৯৮৮ সালে ঝরনাটিকে আবার নতুন রূপে সাজানো হয়। ধোঁয়া এবং কুয়াশার কারণে রং পাল্টে যাওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবার ১৯৯৮ সালে ঝরনায় থাকা পাথরের কাজগুলোয় ঘষামাজা করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় ফাটল সৃষ্টি হয় এবং ভেঙে যায়। সঙ্গে ক্ষয়ে যায় বেশ কিছু অংশ। যেগুলো পরে দক্ষ কারিগর দ্বারা মেরামত করা হয়। তখন ঝর্ণায় রিসার্কুলেটিং পাম্প বসানো হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ইটালিয়ান ফ্যাশন কোম্পানি ফেন্ডি ঝরনা নিয়ে নতুন এক ঘোষণা দেয়। এই কোম্পানি ২০ মাসব্যাপী ২ দশমিক ২ মিলিয়ন ইউরোর সংস্কারকাজ করবে এই ঝরনায়। এটি এখন পর্যন্ত এই ঝরনার ইতিহাসে আগাগোড়া সম্পূর্ণ সংস্কারকাজ। এই কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের জুনে এবং শেষ হয় ২০১৫ সালের নভেম্ব^রে। ঝরনাটিকে আবার নতুন করে উন্মুক্ত করা হয় এক জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। নতুন সংস্কারকাজের মধ্যে অন্যতম এক শর অধিক এলইডি লাইট স্থাপনা, যা রাতের বেলা ঝরনায় আলোকসজ্জার কাজ করে।
আইকনোগ্রাফি
ঝরনার পশ্চাৎপটে আছে প্যালাযো পোলি, নতুন সম্মুখভাগে আছে বিশাল এক অর্ডার অব করিনথিয়ান স্তম্ভ, যা দুটো মূল তলাকে সংযুক্ত করে। টেমিং অব দ্য ওয়াটারকে বিশাল এক নকশাচিত্রই বলা যায়, যা সামনের দিকে অগ্রসর। পানি আর পাথরের কারুকার্য এখানে এক হয়েছে, পানি দিয়ে ভর্তি করা হয়েছে ছোট্ট চৌবাচ্চাটি। মজবুত নির্মাণের এক বিজয়সূচক খিলান সম্মুখভাগের সঙ্গে সংযুক্ত। মূল কুলুঙ্গি কিংবা বৈঠকখানার আদলে তৈরি কক্ষে কিছু মুক্ত স্তম্ভ দণ্ডায়মান অবস্থায় আছে। এমনটি মূলত করা হয়েছে আলো এবং ছায়ার যথাযথ অনুপাত নিশ্চিত করার জন্য। এখানে রয়েছে ওশেনাসের একটি মূর্তি। অ্যাবানডেন্সের নিজস্ব পাত্র থেকে পানি বের হয়। স্যালাব্রিটি একটি কাপ ধরে রাখে, যা থেকে একটি সাপ পানি পান করে। এ ছাড়া রোমের উৎপত্তিগত বেশ কিছু ব্যাপার তুলে ধরা হয় বাস রিলিফসের মাধ্যমে। মূলত বাস রিলিফস ভাস্কর্যশিল্পের একটি কৌশল যেখানে ভাস্কর্যগুলো একই নিরেট পটভূমির সঙ্গে যুক্ত থাকে। ট্রাইটন এবং ঘোড়াগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ রয়েছে। যদিও ভাস্কর্যের আবহ আর ভঙ্গিতে যথাসম্ভব অসামঞ্জস্য বিদ্যমান।
কয়েন নিক্ষেপ
১৯৫৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র থ্রি কয়েনস ইন দ্য ফাউনটেইন এবং একই নামে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি গান থেকেই এর উৎপত্তি। এই চলচ্চিত্র অনুসারে-
- যদি আপনি একটি মুদ্রা নিক্ষেপ করেন, তাহলে রোমে ফিরে যাবেন
- যদি দুটো মুদ্রা নিক্ষেপ করেন, তাহলে এক আকর্ষণীয় ইটালিয়ানের প্রেমে পড়ে যাবেন
- আর যদি তিনটি কয়েন নিক্ষেপ করেন, তাহলে যার সঙ্গে দেখা হবে তার সঙ্গেই আপনার বিয়ে হবে।
সত্যিকার অর্থে কয়েন নিক্ষেপের নিয়মটা ছিল বাম কাঁধের ওপর দিয়ে ডান হাতের সাহায্যে নিক্ষেপ করা। আনুমানিক তিন হাজার ইউরোর কয়েন প্রতিদিন এই ঝরনায় নিক্ষেপ করা হয়। প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়ন সমমূল্যের কয়েন এই ঝরনা থেকে প্রতিবছর আহরণ করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে এই অর্থ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অবশ্য ঝরনা থেকে হরহামেশা কয়েন চুরির চেষ্টা করা হয়। যদিও তা আইন বিরুদ্ধ। এই ঝরনা বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম রোমান হলিডে, ফেডরিকো ফেলিনির লা ডোলস ভিটা, পূর্বে উল্লেখিত থ্রি কয়েনস ইন দ্য ফাউনটেইন, দ্য লিযি ম্যাগুয়ার মুভি এবং সাবরিনা গোজ টু রোম।
১৯৯৬ সালে ঝরনাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, ঢেকে দেওয়া হয় আগাগোড়া কালো পর্দা দিয়ে। মূলত অভিনেতা মার্সেলো মাস্ত্রয়ানির মৃত্যুর পর তার সম্মানে এটা করা হয়। তিনি লা ডোলস ভিটায় অভিনয় করেন। সেই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যটি চিত্রিত হয় ট্রেভি ঝরনায়, যার ফলে এই ঝরনার খ্যাতি আরও বেড়ে যায়। ২০০৭ সালে এই ঝরনা নতুন রঙে সজ্জিত হয়। মূলত এক দুষ্কৃতকারী এই ঝরনায় একধরনের তরল পদার্থ ঢেলে যায়, যার ফলে ঝরনার পানির রং লাল হয়ে যায়। এতে যে পানি বাইরে গিয়ে পড়বে তার রং ও লোহিত বর্ণ ধারণ করে। এর মূল কারণ ক্লোজড সার্কিট ওয়াটার সিস্টেম। যদিও আশঙ্কা ছিল সেই তরল অত্যধিক ক্ষতিসাধন করবে কিন্তু আক্রান্ত পানিটুকু দ্রুত বেরিয়ে যায় এবং পরে কোনো ক্ষতিও হয়নি। শুধু কিছু হতভম্ব^ পর্যটক ঝরনার সামনে ভিড় সৃষ্টি করেছিল।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।