স্থাপত্য বিভাগ বৃত্তান্ত
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

পরিবেশের বন্ধুরতা দূর করে বাসযোগ্য আবাস নির্মাণ করেন স্থপতি। নির্মাণ ছাড়াও পরিকল্পনা, নকশা ও ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয় তাঁকে। একদিকে পরিবেশ রক্ষা, অন্যদিকে নান্দনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত আরামদায়ক স্থাপনা তৈরি একজন স্থপতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও চর্চা। শক্তি ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, সঠিক পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ অপর্যাপ্ততা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সামনে রেখেই তাই দেশজুড়ে গড়ে উঠছে স্থপতি গড়ার কারখানা। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ চালু রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ।

শিক্ষাবর্ষ অনুসারে বিভাগটি পেরিয়েছে মাত্র এক বছর। ঢাকার বাইরের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগটি চালু আছে, তাদের সবার শুরুর গল্পগুলো প্রায় একই রকম। বাজেটস্বল্পতা, শিক্ষকসংকট, শিক্ষা সহায়ক উপকরণ ইত্যাদির যেমন অভাব, তেমনি রয়েছে স্থাপত্যবান্ধব কমিউনিটি গড়ার প্রতিকূলতা। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দক্ষ শিক্ষকের। নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাতারে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) একেবারেই নবীন। শিক্ষার্থীরাও বিভাগটিতে ভর্তি হয়েছেন এক রকম না বুঝেই। তাঁদের মধ্যে একজন স্থপতির দায়িত্ববোধ, চেতনা জাগ্রত করা তথা তাঁদের স্থাপত্য শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলাটাই ছিল শিক্ষকদের মূল কাজ। প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা এ ধারার শিক্ষার জন্য প্রথম শর্ত। তাই শুরুর শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রমের চেয়েও অনেক বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে নিজেদের এবং পারিপার্শ্বিক সম্পর্কোন্নয়নে।

ছোট্ট একটি ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী ৩০ জন। তাতে আবার বিদ্যুৎও নেই। প্রচণ্ড গরমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঘেমে-নেয়ে একাকার। আর সন্ধ্যা গড়ালে তো মোবাইল ফোনের আলোতেই বাকি কাজ সারা। স্থাপত্য শিক্ষার সহায়ক উপকরণ কিছুটা ব্যতিক্রম। শিক্ষার্থীদের শুধু বই কিনে ক্ষ্যান্ত দিলেই হয় না, জোগাড় করতে হয় ড্রয়িং ও মডেল তৈরির সরঞ্জাম। এগুলো কিছু নির্দিষ্ট দোকান ছাড়া পাওয়া যায় না। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো কিছু শহরে এমন বাজার গড়ে উঠলেও পাবনায় এ ধরনের সুবিধা নেই বললেই চলে। তাই এসব উপকরণ জোগাড় করাও ছিল বেশ ঝামেলার। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শুরুর গল্পটা এমনই। শুরুটা কষ্টকর হলেও শিক্ষকেরা এই সমস্যাটা অনেকাংশেই কমিয়েছেন উপকরণের প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্রজেক্ট দিয়ে।

তবুও বিষয় এই যে অনুপ্রাণিত এই ছেলেমেয়েরা তাঁদের শিক্ষকদের ছত্রচ্ছায়ায় প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন ভালো ভালো কাজ। তাঁদের নিষ্ঠা ও আগ্রহ হার মানিয়েছে পুরোনো ট্রান্সক্রিপ্টগুলোকে। জীবনের যেকোনো মুহূর্ত থেকেই যে জীবনকে নুতন করে শুরু করা সম্ভব, তারই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন হবু এসব স্থপতি।

দেশের স্থাপত্যশিক্ষার সরব উচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। শিক্ষকদের পরপরই ছাত্রছাত্রীদের জন্য সেখানে রয়েছে জ্যেষ্ঠ ছাত্রছাত্রীরা। যাঁরা তাঁদের শিক্ষার সবটুকুই বিলিয়ে দেন নুতন শিক্ষার্থীদের মাঝে। ভালো মানের মডেল তৈরি, প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি তাঁরা শিখছেন Lateral Learning-এর মাধ্যমে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ তাদের শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে বুয়েট শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছর আয়োজন করছে ভিজ্যুয়ালাইজেশন ওয়ার্কশপ। যেখানে হচ্ছে অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান, বাড়ছে যোগাযোগ।

লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভাগটিতে চালু রয়েছে পাঁচটি ক্লাব। পারফর্মিং আর্ট সোসাইটি, ফটোগ্রাফি সোসাইটি, ফিল্ম সোসাইটি, আর্ট সোসাইটি ও স্পোর্টস ক্লাব, যেগুলো প্রাথমিকভাবে পরিচালিত হয় বিভাগটির ছাত্র সংগঠন ASAP (Architecture Students Association Pabna)-এর মাধ্যমে। ক্লাসের ফাঁকে তাই এই ছেলেমেয়েদের দেখা যায় গিটার, ক্যামেরা কিংবা ক্রিকেট ব্যাট হাতে ক্যাম্পাসে। ইতিমধ্যে স্থাপত্য বিভাগ তাদের প্রজেক্ট প্রদর্শনী, পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ করেছে নুতন মাত্রা। সাড়া জাগিয়েছে পুরো পাবনা শহরে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, পুরো পাবনাবাসীর আকাঙ্খা এই হবু স্থপতিদের হাতেই নান্দনিক একটি নগর হয়ে উঠবে তাঁদের ঐতিহ্যের শহরটি। নগরবাসীর এই স্বপ্ন পূরণে বিভাগটি কাজ শুরু করেছে শুরু থেকেই। বিভিন্ন সাবজেক্টের অধীনে করে চলেছে শহরটির বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সার্ভে ও ডকুমেন্টেশন।

আইরিন জামান কবিতা (১৪১২২৫)

স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, একটা ভালো স্নাতক ডিগ্রি নেব। বন্ধুদের অনেকেই নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ভালো বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। আমার হয়েছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে। বেশ হতাশ ছিলাম, স্থাপত্য বিষয়টিকে ঠিকমতো বুঝি না পর্যন্ত। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণে ভর্তি হয়েছি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে কী করব তা ছিল এক কথায় ধোঁয়াশা। তবে ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে সব হতাশা দূর হয়। চেয়ারম্যান স্যার প্রশ্ন করেছিলেন স্থাপত্য কী? যে যা পারল উত্তর দিল। তবে সবার উত্তর শুনে এই ভেবে আশস্ত হয়েছিলাম, ওরাও আমার মতো বেশি কিছু জানে না; বোঝেও না। চেয়ারম্যান স্যার বলেছিলেন, ‘স্থাপত্য বিষয়ে পড়ার সুযোগকে তোমরা অনেকে হয়তো দুর্ভাগ্য মনে করছ, আসলে এটা তোমাদের পরম সৌভাগ্য, তোমরা স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হতে পেরেছ। এটা তোমাদের কতটা সৌভাগ্য তা ভবিষ্যতে বুঝবে।’ তাঁর কথার মানে তখন না বুঝলেও এখন কিছুটা হলেও বুঝি। অপরিচিত কিছু মুখ; শিক্ষক-সহপাঠী, যারা দূরের ছিল, আজ তারাই আমার সবচেয়ে আপন।

প্রাকটিক্যালধর্মী বিষয় হওয়ায় সারাটা দিন স্টুডিওতে কাটিয়ে পুরো রাত কাজ করতে করতে কেন জানি সবাই নিশাচর প্রাণী হয়ে গেছি। তবে আড্ডাবাজি যে কম হয় তা কিন্তু নয়। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই ব্যস আর কোনো কথা নেই। স্টুডিও, প্রজেক্ট, এক্সিবিশন, ওয়ার্কশপ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যত্ন ও আন্তরিকতা আর সহপাঠীদের ভালোবাসা- এসব নিয়ে আমাদের স্থাপত্য পরিবার গড়ে উঠেছে। এ পরিবারের একজন সদস্য হতে পেরে আমি গর্বিত। জীবন যে কত বৈচিত্র্যময় এবং এখানে কী করার আছে তা হয়তো স্থাপত্যের শিক্ষার্থী না হলে বুঝতামই না। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করে নিয়ে যাব। আর এটাই আমাকে আমার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে।

তানভির বিন মোর্তাজা

স্কুলে পড়াকালীন স্থাপত্য বিষয়কে কেমন যেন স্বপ্নের মতো মনে হতো। যদি শুনতাম যে কেউ একজন স্থপতি, তখন ভ্রƒজোড়া এমনিতেই ওপরে উঠে যেত। কিন্তু তখনো স্থাপত্যের কিছুই বুঝি না। এতটুকুই বুঝতাম যে নামের আগে স্থপতি উপাধিটি যোগ করা খুবই ভাবের। আর জানতাম স্থপতিরা ভবন ডিজাইন করেন। ছোটবেলায় যখন ব্যাটারির সঙ্গে তার লাগিয়ে ডিস্কের মধ্যে লিড বাল্ব সেট করে একটা টেবিল ল্যাম্প বানাই; নষ্ট ভিডিও গেমসের যন্ত্রটি খুলে সারিয়ে ফেলি তখন আব্বু-আম্মু বলতেন আমি নাকি বড় হয়ে নামকরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হব। যেদিন কম্পিউটারের উইন্ডোজ নিজে নিজেই সেটআপ দিলাম, সেদিন বলেছিলেন হব কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। তবে কোনো দিন ভবন ডিজাইন বা এ সম্পর্কিত কিছুই করিনি। তাহলে হয়তো শুনতে পারতাম বড় হয়ে একজন স্থপতি হব। তবে এসবের কিছু হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও আমি এখন একজন স্থাপত্যের ছাত্র।

স্থাপত্য বিষয়ে যে আমার অন্তর্নিহিত একটা দুর্বলতা ছিল তা বুঝলাম সেদিন, যেদিন পছন্দের বিষয় তালিকায় EEE, CSE, ICE, ETE, CE এসব আকর্ষণীয় বিষয় রেখে প্রথমেই বেছে নিলাম অৎপযরঃবপঃঁৎব। তারপর শুরু হলো সমালোচনার ঝড়। এ বিষয়ে পড়তে অনেক খরচ, ভবিষ্যৎ ভালো না, প্রচুর কাজ করা লাগে, সারা রাত কাজ করতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

স্থাপত্যে আমার প্রচুর আগ্রহ থাকলেও ইচ্ছে ছিল না পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে হয়তো জীবনের সেরা সময় ও প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতাম। পেয়েছি অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা। পরীক্ষার খাতায় হয়তো পছন্দের শিক্ষক নিয়ে লিখেছি অনেকবার কিন্তু তাঁদের পেয়ে নতুন করে লিখতে ইচ্ছে করে ‘My Favourite Teacher’ রচনাটি। একটি কথা হলফ করে বলতে পারি, কেউ যদি কোনো অচেনা শহরের তথ্য সন্ধান করে, তাহলে একজন স্থাপত্যের শিক্ষার্থী যতটা সাহায্য করতে পারবে, অন্য কোনো বিভাগের শিক্ষার্থীদের কেউ হয়তো ততটা করতে পারবে না। বই-খাতার পাইকারি দোকান থেকে শুরু করে ওয়ার্কশপ পর্যন্ত সব দোকানে স্থাপত্যের শিক্ষার্থীর থাকে সরব পদচারণ। প্রকল্প জমার আগে নির্ঘুম রাত, আড্ডা, সহায়ক উপকরণের খোঁজে ছুটে চলাÑ এসবই যেন শুধু নিজের ক্যারিয়ারের জন্য নয়, বরং এক স্বপ্নের পথে চলা।

সকাল সাড়ে আটটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্টুডিওতে থাকা, তারপর বাসায় ফেরার পথে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা, ইত্যাদি সবকিছু করে রাত আটটা-নয়টার আগে খুব কম দিনেই বাসায় পৌঁছানো যায়। ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলেও কাজ করা। সব শেষে যখন প্রকল্প জমা দিই, সেটার দিকে তাকালেই সব কষ্ট যেন নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। সব থেকে বেশি ভালো লাগে যখন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের কাছ থেকে আমাদের কাজের প্রশংসা শুনি। জীবনের অর্থটা বোধ হয় বুঝতে শুরু করেছি, অনুভব করছি এবং সর্বোপরি উপভোগ করছি এই স্থাপত্যে সংস্পর্শে। 

তানজিমা তাবাচ্ছুম মৌ

স্থাপত্যবিদ্যা এমন একটি বিষয়, যেখানে সৌন্দর্যতত্ত্ব, সৃজনশীলতা এবং বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আবাসনের পরিকল্পনা করা হয়। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল এমন কোনো বিষয়ের ওপর পড়া, যা প্রত্যক্ষভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত এবং মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। আমার কাছে মনে হয়েছে স্থাপত্যবিদ্যা এমনই একটি বিষয়, যেখানে প্রতিটি মানুষের চাহিদার সঙ্গে সৌন্দর্যতত্ত্বের মিশ্রণ ঘটিয়ে সুন্দর স্থাপনার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব। সেই চিন্তা বোধ থেকেই আমার স্থাপত্য বিষয়টিতে পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি এবং ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল ভর্তি হওয়া।

আমরা যারা স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম, তাদের প্রায় সবার কাছেই স্থাপত্য বিভাগে পড়ার বিষয়টি ছিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মতো। কারণ, আমরা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই স্থাপত্যবিদ্যা কী সেটাই জানতাম না। অপর দিকে লোকমুখে প্রচলিত স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ার প্রথম এবং পূর্বশর্ত যে ড্রয়িং, সেটা আমরা প্রায় কেউই পারতাম না। তাই এই বিষয়ে আগ্রহ ও ইচ্ছা থাকলেও নিজেদের ভেতরে শঙ্কাও ছিল প্রচুর। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের ভাইয়া ও আপুদের কাছে শুনেছিলাম স্থাপত্য নবীন বিভাগ, তাই তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাওয়া যাবে না। তাই আগের শঙ্কাগুলোর সঙ্গে এই ভয়টাও ভীষণভাবে কাজ করছিল।

অবশেষে যখন ক্লাস শুরু হয়, নতুন বিভাগ, তখনো আমাদের ক্লাসরুম তৈরি হয়নি। ক্লাস হয়েছিল পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একটি ক্লাসরুমে। ইলেকট্রিসিটি থেকে শুরু করে প্রায় কোনো সুবিধাই ছিল না। জ্বরাজীর্ণ সেই ক্লাস রুমে আমরা অনেক আশা, ইচ্ছা আর ভয় নিয়ে শিক্ষকদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। অতঃপর আমাদের শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান স্যার বিজয় দাস গুপ্ত এবং ম্যাডাম জান্নাত আরা ফেরদৌসী ও অদিতি বিশ্বাস ক্লাসে এলেন। অতঃপর আমাদের শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান স্যার প্রথম দিনে যা বলেছিলেন তা আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। স্যারের সেই কথাগুলো কিছুটা এমন ছিলÑ ‘কোনো কিছুতে ভালো করতে হলে যে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো ইচ্ছা আর প্রবল আগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বিভাগ হিসেবে হয়তো আমাদের কিছুই নেই, কিন্তু আমাদের আছে ইচ্ছাশক্তি আর আগ্রহ। সুতরাং আমরা পারব।’ স্যারের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ম্যাডামরাও অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। প্রথম দিনেই চেয়ারম্যান স্যারের কথাগুলো আমাদের সব ভয়, শঙ্কা দূর করে দিল। আমরা অনেক আগ্রহ আর উৎসাহ নিয়ে পড়া শুরু করে দিলাম এবং স্যার-ম্যাডামরা আমাদের নতুন নতুন প্রজেক্ট দিতে লাগলেন। এভাবে ১-১-এ আমরা প্রায় ১৪টা প্রজেক্ট করি। এর মধ্যে Lettering, Metamorphoses, Pixel, Diffeent shape with traching, Harmony of shapes প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ১-১-এর যে দিকটি আমাদের কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় তা হলো ওয়ার্কশপ। আমাদের পূর্ববর্তী কোনো ব্যাচ না থাকার কারণে 3D Model এবং বিভিন্ন স্থাপত্য উপকরণ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। ওয়ার্কশপ করাতে বুয়েট থেকে তিনজন বড় ভাইয়া আসেন। তাঁর মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন স্থাপত্য উপকরণ সম্পর্কে জানতে পারি এবং স্যার লি-করবুসিয়ারের সুদান হাউসের 3D Model বানানো শিখি। ওয়ার্কশপ শুরুর আগে আমরা দুই দিন কাজ করে আমাদের স্টুডিও সাজাই। এভাবেই আমরা ১-১ শেষ করি এবং কিছু ভালো প্রজেক্ট জমা দিই। পরিশেষে, আমাদের স্যার-মাড্যামদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধৈর্য এবং আমাদের ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে স্থাপত্য বিষয়টিকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি। আমরা অনেক সৌভাগ্যবান এমন তিনজন গুণী শিক্ষক-শিক্ষিকা পেয়ে। আমাদের সবার একটাই চাওয়া, আমরা সব শিক্ষার্থী যেন স্যার-ম্যাডামদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আর তাঁদের চেষ্টার প্রতিফলন ঘটাতে পারি; ভালো কাজের মাধ্যমে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top