বার্সেলোনার নগর হয়ে ওঠা

বিশ্ব মানচিত্রে স্বমহিমায় ভাস্কর প্রাচীন প্রসিদ্ধ এক নগর স্পেনের বার্সেলোনা। ৪০০ বছর আগে রোমে প্রচলিত গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির বীর হারকিউলিস এই নগরীর পত্তনকারী বলে প্রচলিত। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থান নগরটির। সমৃদ্ধশালী নগর হওয়ায় রোমান, মুর, ফ্রেঞ্চ, ব্রিটিশ ও অন্যান্য           জাতিগোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়েছে বারবার এ নগরটি; লুণ্ঠিত হয়েছে সম্পদ। তা সত্ত্বেও আজও ঐতিহ্য ও শৌর্য-বীর্য ধরে রেখেছে ঐতিহ্যবাহী এ নগর। নান্দনিক স্থাপনা, বর্ণিল সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খেলাধুলার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বার্সেলোনা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আপন মহিমায়।

বার্সেলোনার বিভিন্ন সীমানায় বেশ কটি অত্যাধুনিক গগনচুম্বী দুর্গ প্রায় সব যুগের ইতিহাসকে পরিবৃত্ত করেছে। প্রাচীনতম এই নগরীর অনেক অবকাঠামো এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে নগরীর কেন্দ্রে অবস্থিত মধ্যযুগে নির্মিত গোথিক কোয়ার্টার। এমনকি রোমানদের প্রথম উপনিবেশের সময়কালীন কিছু ভবনও রয়েছে এখানে, যা পরে পরিচিতি পায় ‘গোথিক কোর্য়াটার লা র‌্যামবেলা’ নামে।

বার্সেলোনা ভ্রমণে সবচেয়ে প্রাণবন্ত রাখে বার্সেলোনার রাজপথ, যাতে মন্ত্রমুগ্ধ সবাই। দুই পাশের সুসজ্জিত মার্কেট ও রেস্টুরেন্ট এর অন্যতম আকর্ষণ। প্রায় সব ভবনেই রয়েছে স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিক নিদর্শন। বিশেষ করে কলম্বাস থেকে ৬০ মিটার লম্বা প্রাচীন বাকুরিয়া মার্কেট, যা কাচ দ্বারা নির্মিত ও মোজাইকে সজ্জিত অতি আকর্ষণীয় স্থাপত্যবিদ্যার নিপুণ সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র, আমেরিকার আবিষ্কারক কলম্বাস প্রথম ভ্রমণে যে স্থানে অবতরণ করেছিলেন, ঠিক সেখানেই স্থাপিত এ স্থাপনাটি।

বিভিন্ন উচ্চতার অনেক পাহাড়-পর্বতে বেষ্টিত এ নগর। সবচেয়ে উঁ”ু পর্বত টিবিদাবোর কাছে বার্সেলোনার মনোমুগ্ধকর বাকুরিয়া মার্কেট। এই মার্কেট ফুটিয়ে তুলেছে টিবিদাবোর অনিন্দ্য সৌন্দর্য। টিবিদাবো শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ টিবিদাবো থেকে, যার অর্থ আমি তোমাকে দিই, ওপর থেকে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি শয়তানের প্রলোভন এটি।

দ্বিতীয় উচ্চতম স্থান মন্টজুইক পর্বত। ১৯২৯ সালে বার্সেলোনা এখানে ওয়াল ফেয়ার এবং ১৯৯২ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করেছিল। পর্বতের সামান্য একটু দূরেই রয়েছে বার্সেলোনার বিখ্যাত ঐতিহাসিক ভবন মন্টজুইক পার্ক ও অলিস্পিক এলাকা। ১৭ থেকে ১৮ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মিত। ব্রিটিশ ও নেপোলিয়ানের সেনাবাহিনী দ্বারা বিভিন্ন সময়ে দুর্গটি আক্রান্ত হয়েছে। এটি এখন একদল সেনার স্মৃতিস্তম্ভ।

এই পর্বতের পাদদেশে প্লাজা ডি স্পানা নগরীর সবচেয়ে উঁ”ু বর্গরাশির অবস্থান, যা ১৯২৯ সালে ওয়ার্ল্ড ফেয়ারের জন্য উৎসর্গিত। প্লাজা ডি স্পানা অতীতের গৌরব ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় শহরের প্রতীক। এটা অবশ্যই রাজোচিত প্রতীকও বটে। বিংশ শতাব্দীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন ক্যাটালান মিউজিক রাজপ্রাসাদ, যা আধুনিক স্থাপত্যের দুর্দান্ত নজির। প্রকৌশলী লুইস ডোমিনিক আই মনটেনার ছিলেন এই স্থাপনার আবিষ্কারক। ৩৮তলাবিশিষ্ট এই আকাশচুম্বী অ্যাগবার টাওয়ারটি আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন। টাওয়ারটি পানির ওপরে নির্মিত, দর্শনীয় মন্টসাররাত পর্বতের নিকটবর্তী, বার্সেলোনার সাগরাদা ফ্যামিলিয়ার ঘণ্টাযুক্ত সমগ্র অবকাঠামোটি ধাতু ও রঙিন কাচের প্যানেলে নির্মিত।

প্রকৌশলী অ্যান্টনি গাওডির নকশাকৃত প্রসিদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভগুলোই প্রকৃতপক্ষে বার্সেলোনার সীমানা, যা অলৌকিক দৃষ্টিনন্দন উজ্জ্বলতায় মহিমান্বিত, যাদের প্রতিটিই বিশেষভাবে স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে। বারোকিউ প্রস্রবণ, ভেনেটিয়ান টাওয়ার, আধুনিক অট্টালিকা আর প্রাচীন রোমানদের ধ্বংসকৃত উল্লেখযোগ্য অনেক নিদর্শনই বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। অতিরিক্ত কিছু বার্তা ছাড়া খুঁটিনাটি কিছু বিষয় সম্পর্কে জানা কঠিন হবে যদি কেউ সেপাইন ইতালি অথবা সিজেস রিপারলিক থিয়েটারে ছবি দেখে। যাই হোক গাওডির প্রতিটি স্থাপত্য শিল্পকর্মই বিশ্বের অন্য সব স্থাপত্য থেকে বৈশিষ্ট্য আলাদা। স্থপতির নির্মিত যেকোনো ভবন, বারান্দা কিংবা আবৃত দেখলেও যে কেউ তাৎক্ষণিকভাবে অন্য স্থাপত্যশিল্পীর ধরন চিহ্নিত করতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে গাওডির নকশাকৃত অসংখ্য স্থাপত্যশিল্পের অলৌকিক সব নিদর্শন।

বিস্ময়াভূত এই স্থপতিকে নিয়ে অসংখ্য পৃষ্ঠা লিখলেও তাঁর গুণগান শেষ হওয়ার নয়। তিনি যেন স্থাপত্যশিল্পে নান্দনিক উপস্থাপনার গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের প্রতীক হয়ে আছেন। আসলেই তা বর্ণনাতীত। গাওডির শৈশবকালের বেশির ভাগ সময় কেটেছে সমুদ্র পার্শ্ববর্তী এলাকায়। তাই তাঁর নির্মিত স্থাপনাগুলো বালুকাময় দুর্গসদৃশ। তিনি ভাবতেন যে আকাশ এবং সমুদ্র উৎকৃষ্ট অভ্যন্তরীণ গঠন এবং বন ও মেঘ হবে সম্পূর্ণ ভাস্কর্যময় কাঠামো। গাউডি অতি নিকটবর্তী সেই সঙ্গে সচরাচর আবদ্ধ নির্মিত স্থাপনাকে ঘৃণা করতেন, সোজাসুজি সারিবদ্ধ স্থাপনাকে এড়িয়ে যেতেন এবং এগুলোকে মনুষ্য তৈরি বলে বিবেচনা করতেন। তাঁর চিন্তাতে বৃত্ত উৎপত্তি ছিল সহজেই অনুমেয়। তাঁর স্থাপত্যশিল্পের অমর নিদর্শনগুলোর বর্ণনা করা দুঃসাধ্য ব্যাপারই বটে। পার্ক গুয়েল (১৯০০-১৯১৪), ক্যাসা মিলা (১৯০৬-১৯১০) আর সাগরাদা ফ্যামিলিয়া গাওডির অমরকীর্তি, যা গত ১৩০ বছর ধরে সমান জনপ্রিয়।

ক্যাটালোনিয়ার রাজধানীতে ডজনেরও বেশি অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে, সবই কিন্তু অট্টালিকা নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গুয়েল পার্কের কথা, যা ১৭ হেক্টরেরও বেশি জায়গাজুড়ে অবস্থিত, এ ছাড়া প্রখর কল্পনাপ্রবণ স্থপতি গাওডি নির্মাণ করেছেন বাড়ি, প্রস্রবণ, রাস্তা ও কলোনি।

আজকের দিনে সেপইন তাৎপর্যপূর্ণভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কিন্তু বার্সেলোনা শহরের স্থাপত্যগুলো সারা বিশ্বের রোল মডেল। বার্সেলোনা বিখ্যাত নগরী হওয়ার পেছনে যেসব প্রযুক্তি স্থাপত্যশিল্পে ব্যবহৃত হয়েছে, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বার্সেলোনার বিখ্যাত হওয়ার আসল রহস্য। ছয়টি ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে নগর বার্সেলোনা। এক নজরে ধারণা ছয়-

  1. Don’t think like a City Planner, Architect or Engineer. Think like a Citizen.

বার্সেলোনার প্রকৌশলীদের মতে, নগরীর ভবনগুলো জনগণের কর্মক্ষেত্র, এগুলোকে জনগণের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, যেটা তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে হবে মানানসই। ইডিফেনস সার্ডা একজন নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি এবং একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন। ছিলেন নগর নির্মাতাও। উত্তর আমেরিকায় একসময় খাদ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা সমগ্র নগরীর নিয়মানুবর্তিতা এবং সনাতন বিশেষত্বকে ভেঙে ফেলেছিলেন। নাগরিক হিসেবে সার্ডা যেভাবে বার্সেলোনাকে নিয়ে ভেবেছিলেন, তাতে যে কারোরই অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত।

2. Architects, Quit Complaining about rules

এটা সত্য যে প্রতিটি নগরীতে উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট কিছু নিয়মকানুন থাকে। প্রকৌশলীদের সব বাধাকে অতিক্রম করেই সামনে এগোতে হয়। সহজ উদাহরণ হচ্ছে গাওডির La Perera, যা একটি সাধারণ কর্নার বিল্ডিং। সার্ডার মূল্যবান ব্লক প্ল্যান আর গাওডির নকশাতে সাধারণ কোনো চিহ্ন নেই। সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা, অবদানÑ সবকিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে নগরীর গড়ন।

উন্নয়ন পরিকল্পনা

3. Making walking and biking irresistible

ইউরোপিয়ান দেশগুলোর মতো ট্রেন ও পাবলিক যান বার্সেলোনার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘ ভ্রমণপ্রক্রিয়াকে প্রসারিত করার জন্য রয়েছে যথার্থ কারণ। যেমন- অলিম্পিক। প্রশ্বস্ত রাজপথ যা দুই ধারে বৃক্ষশোভিত। নগরবিদ সার্ডার পরিকল্পনা ছিল এমনই। হাঁটার দীর্ঘ অগ্রগণ্যতা রয়েছে রাস্তায়। ‘La Rambla’ হচ্ছে বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট হাঁটার রাস্তা, জনগণের রাস্তা। সার্ডার পরিকল্পনা অনুযায়ী হাঁটাকে উপভোগ্য করে তোলার জন্য সব রাস্তার ৫০ শতাংশ জায়গা এবং বাকিটা অন্য কার্যক্রমের জন্য উৎসর্গিত।

বার্সেলোনা নগরীতে দ্রুত বাড়ছে বাইকিং, অশ্বারোহীদের চলতে হয় বাইক শেয়ার সিস্টেমে। বাইকিংকে নিরাপদ করতে আলাদা বাইক লেন ব্যবহার করা হয়। বার্সেলোনা এমন একটি শহর, যেখানে অনেক অপশন রয়েছে পছন্দ বাছাই করতে। হাঁটা, বাইকিং এবং ট্রানজিট সব হচ্ছে Viable option। সবকিছুর সঙ্গে শক্তির নিকটবর্তিতা সন্নিবিষ্ট করে একটি মাল্টি-মডেল শহরের সুযোগ-সুবিধায় রূপ দেওয়া হয়েছে।

4. Small tight streets work great and so do wide streets if designed right

গোথিক কোয়ার্টার দিয়ে হাঁটলে আমরা এর প্রশ্বস্ততা অনুমান করতে পারি। আঁটসাঁট ও সরু রাস্তা, পার্শ্বে উঁচু উঁচু আবদ্ধ অট্টালিকা রাস্তার দুই পাশকে আবৃত করে, সৃষ্টি করেছে একটি চমৎকার শহুরে শহর। রাস্তার দুই পাশে মনোমুগ্ধকর গাছপালা দর্শনার্থীদের আকর্ষিত করে। বার্সেলোনা আমাদের রাস্তার প্রশ্বস্ততা ও মূল্যবান সৌন্দর্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

5. Tall buildings aren’t evil but don’t put them just anywhere

উঁচু উঁচু দালান রয়েছে বার্সেলোনাতে কিন্তু সেগুলো সুনির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে। ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নয়। এটা বার্সেলোনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নান্দনিক এসব উঁচু উঁচু দালান বার্সেলোনার সৌন্দর্যকে বাড়িয়েছে বহুগুণ।

6. Even Barcelona can learn from Barcelona

শহরটি কোনো ভুল নকশা, পরিকল্পনা বা অসংগতি থেকে শিক্ষা নিয়ে তা শোধরানোর চেষ্টায়রত। এভাবেই বার্সেলোনা পরিণত হয়েছে আদর্শ এক শহরে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top