প্রতিটি দৃশ্যের পেছনেই থাকে কোনো না কোনো গল্প। সে গল্প কখনো সুখের, কখনো কান্নার কিংবা অবারিতভাবেই আনন্দের। সাগরবিধৌত জনপদ কক্সবাজারের উত্তাল তরঙ্গের কোল ঘেষেই গড়ে উঠেছে এক গল্পময় অনুপম স্থাপত্য। পরিবারের বাবা-মা-ভাই-বোন আর সেই সঙ্গে যখন যুক্ত হয় দাদা-দাদি বা নানা-নানির সংযোগ, তখন গল্পগুলো হয়ে ওঠে জীবনের অন্য গল্প। রিজিয়া বেগমের গল্পেরা তাঁর চারপাশ ঘিরে থাকে। তাঁকে সুখস্মৃতির সাগরে ভাসায়। আসিফ এম আহসানুল হক ‘রিজিয়া পরম্পরা’-এর স্থপতি।
কক্সবাজারকে পূর্ব-পশ্চিমে ছেদ করে যাওয়া সড়কটি মেইন রোড নামেই পরিচিত। রাস্তার দক্ষিণ পাশ সমুদ্রসৈকত, ফেনিল স্রোত এসে আছড়ে পড়ে বালুকাতটে। উত্তরে দাঁড়িয়ে আছে খাড়া সবুজ পাহাড়। শহরের মধ্যখানে বাজারঘাটা নামে ব্যস্ত এলাকা। মোহাজেরপাড়া সড়ক ধরে নেমে গেলেই স্টেডিয়ামের বিপরীতে একটি বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে ‘রিজিয়া পরম্পরা’।
‘রিজিয়া পরম্পরা’ পশ্চাতির গল্পের মধ্যে বেড়ে ওঠা তেমনই এক গল্পকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে। শহরের এক নিরিবিলি প্রান্তে শিকড় গেড়ে থাকা সময়ের আবর্তনে যখন রিজিয়া বেগমের আপন উঠোন প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হয়ে ওঠে কিংবা নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই শুরু এ গল্পের আরেকটি অধ্যায়ের। ছেলেমেয়েরা উদ্যোগী হয়। সার্বিক বিচারে আরেকটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়। বাজারঘাটার এই নতুন ঠিকানার প্রস্তুতি চলতে থাকে। কিন্তু এরই মধ্যে বেঁকে বসেন রিজিয়া বেগম। এই ছায়াঢাকা উঠোন, এই কুয়োর পাড়, এই কলতলা, এই পশ্চাতি তথা বারান্দা তিনি কীভাবে ছাড়বেন! আম, নারিকেল আর কাঠবাদামের ছায়ায় ঢাকা মুক্ত আঙিনার মায়া ত্যাগ মোটেই সহজ নয়। আবার পরামর্শ, আবার দুর্ভাবনা; অবশেষে বিষয়টা সমাধানের দায়িত্ব এসে পড়ে আসিফের কাঁধে।
স্থপতি আসিফ এম আহসানুল হক। রিজিয়া বেগমের ১১ সন্তানের শেষজন। স্থাপত্যচর্চায় নিজেকে বিকশিত করেছেন মেধা আর পরিশ্রমের সমন্বয়ে। সঙ্গে আছেন স্থপতি আরিফা আখতার। রিজিয়া পরম্পরার স্থাপত্য ভাবনার শুরু একটি কঠিন চ্যলেঞ্জ নিয়ে। রিজিয়া বেগমের সব চাওয়াকে ভাবনার কেন্দ্রে রেখে তিনি পরিকল্পনা সাজাতে থাকেন। সেই ছায়াঢাকা উঠোনকে তিনি নকশায় আনেন। পেছনের বারান্দা তথা পশ্চাতিকে তিনি স্তরে স্তরে সাজিয়ে তোলেন বহুতল ভবনের প্রতিটি তলায়। সবুজে মাখা ছাদ আর কয়েকটি উন্ম্ক্তু পরিসরে কলতলার আড্ডাকে জড়িয়ে নেন নিজের মতো করে।
কক্সবাজারের বাজারঘাটা এলাকায় প্রায় ৯ কাঠা জায়গাজুড়ে দৃষ্টিনন্দন এই ছয়তলা বাড়ির প্রতি তলায় সর্বোচ্চ আয়তন ৩ হাজার ২০০ বর্গফুট। প্রতি তলা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে দুটো আবাসন ইউনিটে। ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং পরিসর। না, চারদিকে আটকে রাখা হয়নি বরং উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে সবুজ পরিসরে। খোলা উঠোন, চলাচলের পথ আর গাড়ি রাখার জায়গা একাকার হয়ে গেছে; পূরণ করেছে বাচ্চাদের ছোটাছুটির প্রয়োজন। আর সে খেলার দেখার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে একটি মজার সিঁড়িঘর। মাঠের দিকেই খোলা, ওপরে উঠতে উঠতে কখনো ডানে, কখনো-বা বাঁয়ে ছোট ছোট পরিসরকে ধরে আছে। মন চায় তো বসে থাকে ভাব করে। খুব ছোট হলেও এর বাহ্যিক রূপ অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। লাল ইটের তৈরি দেয়াল, জানালায় কাঠের ফ্রেমে স্বচ্ছ কাচের পাল্লা, গ্রীষ্মের দুপুর তপ্ত রোদের হাত থেকে বাঁচতে জানালায় সামান্য বাঁকা করে কংক্রিটের খড়খড়ি বসানো। প্রতিটা জিনিসই প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি কিন্তু শিল্প ও সৌন্দর্যের সব নিয়মকে পূরণ করেই এর সংযোজন।
রিজিয়া পরম্পরার সীমানা দেয়ালসংলগ্ন উত্তরে ১৪৪ বছরের পুরোনো কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। সব সময়ের জন্য খোলামেলা প্রাকৃতিক আলোয় আলোকিত বাসযোগ্য পরিবেশ। প্রতিটা আবাসন ইউনিটে তিনটি করে শয়নকক্ষ। মেহমানখানা, খাবার ঘর থাকছে অন্যান্য অনুষঙ্গ সহযোগে। একাধিক প্রশস্ত বারান্দা সামনের বাগানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। একদম ওপরের ছাদকে সাজানো হয়েছে সবার ব্যবহারের উপযোগী করে। কিছু অংশ পুরোপুরি উন্মুক্ত রেখে বাকিটা প্রশস্ত পারিবারিক অঙ্গন। বসার জায়গা, গল্পের জায়গা, বাচ্চাদের হুটোপুটি, চারদিকে সবুজ বাগান ইত্যাদি নিয়ে যেন আরেক জগৎ। বাড়ি করার আগে থেকেই বেশ কিছু গাছগাছালির সমাহার ছিল এখানে। গৃহকর্তার ইচ্ছা যতটা সম্ভব সবুজকে বাঁচিয়ে কাজ করতে হবে। সে ইচ্ছা পূরণে যতটুকু ঘাটতি হয়েছে, সেটুকুই যেন পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে নিচের এবং ছাদের নতুন বাগান দিয়ে।
রিজিয়া পরম্পরার নকশার পাশাপাশি ভবনের নির্মাণ ব্যবস্থাপনাও স্থপতিদ্বয় নিজেরা তদারক করেছেন। বাড়ির স্বত্বাধিকারী হিসেবে সবকিছুকে যত্ন নিয়ে সাজিয়েছেন। নির্মাণ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কর্মী এবং সহজলভ্য নির্মাণ উপকরণের দিকে নজর দিয়েছেন। দৃশ্যমান অংশেও এই ইটকেই ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আলাদা আস্তর বা রঙের প্রয়োজন হয়নি। এমনকি ভবনের ভেতরের অনেক জায়গায় আস্তর ছাড়া ছাদ ব্যবহার করা হয়েছে। রিজিয়া পরম্পরার ভবনের নির্মাণকাজে স্থপতির স্থানীয় ধাঁচের পরিশীলিত এক রূপের ছাপ পাওয়া যায়। ভবনের বাহির এবং অন্দরের সার্বিক সজ্জায় একটা নিজস্বতা আপনাআপনি প্রকাশিত হতে থাকে।
স্থপতি আসিফ এম আহসানুল হক এবং স্থপতি আরিফা আখতারের নিজেদের কথায় তাঁরা মূলত তিনটি বিষয়কে ধারণ করতে চেয়েছেন।
প্রথমত, বিভিন্ন সময়, অনুভূতি আর গল্পের স্মারকযুক্তসহকারে তৈরি পরিসর। মুক্ত ছাদ ও বারান্দা বৃষ্টির পানিকে অনুমতি দিচ্ছে নিজের আঙিনায় আসার, ছায়াঢাকা অন্তর্মুখী বারান্দা গরমের সময়েও বাইরের সৌন্দর্যকে উপভোগ্য করে তুলছে।
দ্বিতীয়ত, ভবনের কাঠামো এবং কক্ষবিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যেন অন্তঃস্থ পরিসরে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক বাতাস আর আলোর খেলা জমে ওঠে। কৃত্রিম আলো বা বাতাসের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে। এভাবে আসলে এনার্জি খরচ বেঁচে যাবে উল্লেখযোগ্যহারে।
এর পাশাপাশি তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, ভবনের উলম্ব পরিসরকেও দৃশ্যমান এবং অনুভূতির সুতোয় বেঁধে বিস্তৃত সবুজের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা। সামনের ছেড়ে দেওয়া পরিসর আর খোলা জায়গা মিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হবে অনেক সুখকর স্মৃতির সাক্ষী। যে শৈশবকে তারা ফেলে এসেছে সময়ের পাল তুলে, তাকে যতটা সম্ভব তার মতো করেই আবার ছড়িয়ে দিতে চান আগামী প্রজন্মের স্বপ্নের অনুষঙ্গ করে।
মাত্রাহীন বাহুল্য নেই, আড়ম্বর কি অর্থহীন সংযোজন নেই, স্থপতিদ্বয়ের প্রধান ভাবনা হচ্ছে, যাঁরা থাকবেন, তাঁদের মন ও মননের চাহিদাকে শৈল্পিকভাবে পূরণ করে। আর সবকিছু থেকে যাক যেমন তেমনই। সাগরের কোল থেকে উঠে আসা পূর্ব-দক্ষিণের বাতাস সেভাবেই বয়ে যাবে, বাড়ির প্রতিটি কোন ঝকঝকে আলোয় প্লাবিত হবে, সবুজ ঘাসের ওপর নিত্যদিনের সূর্যের রোদছায়ার প্রতিযোগিতা চলতে থাকবে, খোলা আকাশ থাকবে দিগন্তের নীল আর সবুজের মিতালী উপভোগের জন্য।
স্থপতির সাতকাহন
মা-বাবার কনিষ্ঠ সন্তান আসিফ এম আহসানুল হক কক্সবাজারে জন্মেছেন; বেড়ে উঠেছেন। কলেজের আঙিনা পেরিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যে ভর্তি হন। স্থপতি স্ত্রী আরিফা আকতার কান্তার সঙ্গে মিলে গড়েছেন নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘ভেন্না আর্কিটেক্টস’। সময়ের সফল এ স্থপতি দম্পতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের স্থাপত্য উন্নয়নে তাঁদের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। উল্লেখ্য, রিজিয়া পরম্পরা প্রকল্পের জন্য ২০১৭ সালে তিনি ৮ম ‘বার্জার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন আর্কিটেক্চার’ পুরস্কার অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি আর্কএশিয়া ২০১৮ পুরস্কারেও ভূষিত হয়। আর্কএশিয়ার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এশিয়ার আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ মানবসভ্যতার মানোন্নয়নে অবদান রাখার স্বীকৃতি এই পুরস্কার। এর আগে ২০১৪ সালে তাঁর আরেকটি অবকাশ বাড়ি উইকেন্ড অ্যাড্রেস ফর হারুনস ফ্যামিলি প্রকল্পটি ‘সিঙ্গেল ফ্যামিলি রেসিডেন্স’ ক্যাটাগরিতে ‘ষষ্ঠ বার্জার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন আর্কিটেক্চার’ পুরস্কার পায়। বান্দরবানে ড. অং থা লোর ট্রিপ্লেক্স ভিলা এবং নোয়াখালীর কামরুল ইসলাম ডুপ্লেক্স ভবন তাঁর স্থাপত্যচর্চাও অন্যতম উদাহরণ। ওয়াটারপোলো নামক দ্বিতল রেস্টুরেন্ট ডিজাইনে ভিন্ন স্বাদ তৈরি করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশব্যাপী নির্মিতব্য শতাধিক কারিগরি বিদ্যালয়ের ডিজাইন বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থাপত্যাচার্য স্থপতি মাজহারুল ইসলামের দেশজ স্থাপত্য ভাবনার অনুসারী হয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, এর মধ্যে রয়েছেন স্থপতি উত্তম সাহা, স্থপতি নাহাস খলিল, স্থপতি রাজিউল হাসানদের ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্থপতি আসিফ-কান্তা দম্পতি। কংক্রিট কাঠামো আর সহজলভ্য ইটের ব্যবহার আসিফের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর সঙ্গে অন্তঃপরিসরে কখনো ধাতব, কখনো প্রাকৃতিক উপাদানের সংমিশ্রণ একে একটু ভিন্নতা এনে দিয়েছে। সবুজে স্নাত পারিপাশির্^ক পরিসর আর এর অবকাঠামো প্রতিটি অলিন্দে মাখামাখি করে থাকে। স্থপতি আসিফ একই সঙ্গে একজন দক্ষ সংগঠক। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের পরপর দুই মেয়াদে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং সমধর্মী আয়োজনে সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছেন সমানতালে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।