নগর ঢাকার নগরায়ণ ও পরিবেশ

মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে জীবিকার চাহিদা। কর্মসংস্থান ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় মানুষ ভিড় করছে রাজধানী ও আশপাশের শহরগুলোতে। সংগত কারণেই আবাসনের জোগান হয়ে পড়ছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা যেমন সম্প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি এর চারদিকে যত্রতত্র গড়ে উঠছে নতুন নতুন শহর, জনবসতি, শিল্পকারখানা, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও প্লটভিত্তিক আবাসন পল্লি। অথচ অপরিকল্পিত এই নগরায়ণ রোধে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ও স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। ড্যাপে ঢাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ ও সাভার। আর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জÑ এ পাঁচটি জেলাকে ঘিরে যোগাযোগ উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়েছে এসটিপিতে। পরে নরসিংদী জেলার কিছু অংশকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বৃহত্তর ঢাকা বলে উল্লেখিত এ মহাপরিকল্পনা যেমন বাস্তবায়ন হয়নি, তেমনি নেই উভয়ের মধ্যে যথাযথ সমন¦য়। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো নিয়ে আলাদা কোনো মহাপরিকল্পনা না থাকা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখভালের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর মতো কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় ঘটছে অপরিকল্পিত ও এলোমেলো নগর উন্নয়ন। ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি ঢাকা পরিণত হচ্ছে নাগরিক বিড়ম্বনাময় রুগ্ণ এক নগরে।

নগর সম্প্রসারণের সুবিধা ও অসুবিধা দুই-ই আছে। বড় নগরের আশপাশে নতুন নতুন শহর গড়ে উঠলে একদিকে যেমন আবাসন সমস্যার সমাধান হয়, তেমনি মূল শহরের ওপর চাপ কমে। এটা একধরনের বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখা। অন্যদিকে জলাভূমি ভরাট করে বা নিম্নাঞ্চল ও বালুচরে নতুন শহর গড়ে ওঠায় তা নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংসও হতে পারে। এমনকি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পেও। দেখা দিতে পারে অনাকাক্সিক্ষত বন্যা। সাধারণত নিচু এলাকা বালু ভরাট করে উঁচু করা হলে প্রাকৃতিক জলাভূমির ওপর সৃষ্টি হয় বাড়তি চাপ। এতে শুধু জলাভূমিরই ক্ষতি হয় না বরং পরিবেশ বাস্তুসংস্থানের ওপর পড়ে বিরূপ প্রভাব। নষ্ট হয় জীববৈচিত্র্য। জলের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হওয়ায় প্রভাব পড়ে নদীনালা, খালবিলের ওপর। আর এভাবেই বিলুপ্ত হচ্ছে জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল জলজ প্রাণী। তদুপরি বর্ষাকালে টানা বর্ষণে খুব সহজেই এসব নিম্নাঞ্চলের নগরে সৃষ্টি হয় প্লাবনের। যে আশা নিয়ে মানুষ জীবনের আশ্রয় পাতে, এ নগরে তাদের সে আশা দুরাশার মেঘ হয়ে ভাসে। সামাজিক ও নাগরিক জীবন হয় নির্বাসিত। কেননা প্রকৃতিকে কঠোর হাতে শাসন করলে এর ফল কখনোই সুখকর হয় না।

বসতির জন্য মানুষ সাধারণত উঁচু জমি নির্বাচন করে। ভূমির ভবিষ্যৎ বিবেচনা না করে বসতি নির্মাণের সময় সাময়িক চলাফেরার রাস্তা ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধার কথা কেউই ভাবে না। ফলে যখন যে বা যারাই তাগাদা অনুভব করছে, তারাই আবাসনব্যবস্থা সম্পন্ন করছে। চূড়ান্ত হিসাবনিকাশে সীমিত জায়গায় অনেক বেশি কিছু করার চেষ্টা করছে। এ কারণেই আবাসনব্যবস্থা রূপ নিয়েছে খণ্ডচিত্রে। ফলে ভূমির ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ। রাজধানীর আশপাশে যেসব শহর-উপশহর গড়ে উঠছে, এগুলোর বেশির ভাগই জলাভূমি ভরাট করে। এ কারণে নষ্ট হচ্ছে ভূমির প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা। আর তাই সামাজিক ও নাগরিক জীবন থেকে জাতীয় জীবনেও নেমে আসছে বড় ধরনের বিপর্যয়।

প্রাকৃতিক ভূপৃষ্ঠে একের পর এক আবাসন, শিল্পকারখানা, সড়ক, ড্রেন ইত্যাদি নির্মাণে কংক্রিট ও বিটুমিনের কঠিন আবরণে মাটির উপরিভাগ আবৃত করায় কমছে উন্মুক্ত ভূমি। স্থাপত্যের ভাষায় মাটির উপরিভাগের এ রকম ইট-পাথরের প্রলেপকে বলা হয় হার্ড সারফেস (Hard Surface) অর্থাৎ কঠিন পৃষ্ঠতল। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে মাটির সঙ্গে পানির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তা ছাড়া প্রকৃতির রয়েছে সুনির্দিষ্ট জীবনচক্র, যা স্বভাবতই একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। পানির জীবনচক্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মাটি। বাষ্পীভূত ঘন মেঘ বৃষ্টি হয়ে মাটিতে পড়লে মাটির মধ্য দিয়ে ফিল্টারিং হয়ে ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রে অবস্থান করে মাটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। নদী, খাল, বিলের পানির মধ্যে এভাবেই রক্ষিত হয় ভারসাম্য। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে অনেক দ্রবীভূত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা প্রাণী ও জীবকুলের জন্য, জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি প্রাণবিনাশী। মাটির বিভিন্ন স্তরে ফিল্টারিং বিভিন্ন উৎসে পানি ছড়িয়ে পড়লে দ্রবীভূত রাসায়নিকের মাত্রা কম থাকায় কিছুটা হলেও তা জীব ও প্রাণীর জন্য স্বস্তিদায়ক। কিন্তু দিন দিন পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা শহরগুলোর প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছেন বলে মনে হয় না। অপরিকল্পিত এসব শহরে কঠিন পৃষ্ঠতল যে হারে বাড়ছে, তাতে বৃষ্টির পানি শোষণ করার মতো মাটি ক্রমেই কমছে। বৃষ্টির পানি সরাসরি প্রাকৃতিক জলাভূমিতে দ্রবীভূত হওয়ার ফলে জলজ প্রাণীর একমাত্র অভয়াশ্রম প্রাকৃতিক জলাভূমি জলজ প্রাণীর বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া যে বিশুদ্ধ পানি খাবার পানি হিসেবে আজ বিবেচনা করা হয়, সেই খাবার পানিও বিষাক্ত হতে আর বেশি বাকি নেই। কঠিন ভূপৃষ্ঠতলের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের এ ব্যবস্থাকে স্থাপত্যকৌশলের ভাষায় বলা হয়, রানঅফ। অন্যদিকে কঠিন পৃষ্ঠতলের অধিকতর আবর্জনাযুক্ত পানি প্রাকৃতিক জলাধারে পতিত হওয়ায় পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে; বিনষ্ট হচ্ছে জলজ বাস্তুসংস্থান। বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী।

কঠিন পৃষ্ঠতল সারা দিন সূর্যের তাপ গ্রহণ করায় কংক্রিট কিংবা পিচঢালা পথ বেশি উত্তপ্ত হওয়ায় তা ক্রমাগত তাপ বিকিরণ করতে থাকে। ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ে ধীরে ধীরে। এসব এলাকায় ব্যাপক হারে জলাধার, বনাঞ্চল, উন্মুক্ত ভূমি কমায় এবং মাটির পৃষ্ঠদেশ কঠিনে পরিণত হওয়ার ক্রমেই বাড়ছে তাপমাত্রা। অনেকেই আবার ভবনকে বিলাসবহুল করতে ব্যবহার করছে কাচ। এ বৃদ্ধির হার স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ। যার ফলে এসব শহরে বিদ্যুতের খরচ বাড়ছেই। উত্তপ্ত আবহাওয়ার এ জ্বালাময়ী যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পেতে বাড়ছে এয়ার কন্ডিশনার, কুলার, ফ্রিজের ব্যবহার। ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসি)-এর চতুর্থ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ২৫ শতাংশ, নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ ১৯ শতাংশ এবং মিথেন গ্যাসের পরিমাণ ১০০ শতাংশ বেড়েছে। নিম্নাঞ্চলে এভাবে অপরিকল্পিতভাবে শহরের প্রসার ঘটলে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনে ক্ষতির পাল্লায় প্রথমেই থাকবে বাংলাদেশ এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলায় ডুবে যাবে এখানকার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল।

নিম্নাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভূপৃষ্ঠতল যে হারে কঠিন পৃষ্ঠতলে বাড়ছে, এর ফলে অকাল ও অনাকাক্সিক্ষত বন্যা কিংবা জলাবদ্ধতা হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক। অন্যদিকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা উপযুক্ত না হওয়ায় জলাবদ্ধতা থাকছে দীর্ঘদিন। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা (Dranage System) যদি প্রাকৃতিক হয়, তবে বাড়ে ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ। কিন্তু নতুন শহর নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী কেউই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করায় প্রাকৃতিক খালের পরিবর্তে পাকা ড্রেন কিংবা ড্রেনের ওপর রাস্তা নির্মাণ করার ফলে অল্প বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তাঘাট নিমজ্জিত হয় পানিতে। জলজটে জনজীবনে শুরু হয় চরম ভোগান্তি। ময়লার ডাস্টবিন কিংবা রাস্তার সব ময়লা, আবর্জনা, পলিথিন এই কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। এসব আবর্জনা পাকা ও ঢাকা ড্রেনে আটকে গেলে দেখা দেয় স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। বেড়ে যায় মশা-মাছির উপদ্রব। বিভিন্ন রোগবালাই হয় মানুষের নিত্যসঙ্গী। তা ছাড়া মানুষের নিত্য আবর্জনা ও পয়োনিষ্কাশনও যদি একই পানি নিষ্কাশনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ে ব্যাপক হারে। নিম্নাঞ্চলের নতুন শহরগুলোয় কঠিন ভূপৃষ্ঠতলের সমস্যা কম হলে শহরকে এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না। একবার গতানুগতি ধারায় যুক্ত হয়ে গেলে তা পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব নয়। কঠিন ভূপৃষ্ঠতলের কারণে প্রাকৃতিক বৃষ্টির পানির রানঅফ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন লাইনের পানি, নির্মিত ভবনের পাইপলাইনের পানি, ওয়াশিং প্লান্টের পানি মিলেমিশে একাকার হওয়ায় দূষিত হবে শহরের নিকট ও দূরবর্তী জলাধার তথা নদী, খাল-বিল।

অপরিকল্পিত শহরের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠছে হাজার হাজার শিল্পকারখানা। অধিকাংশ শিল্পকারখানাতেই নেই বর্জ্য শোধনাগার। তাই এসব অঞ্চলের পরিবেশ অনেকটাই বিপন্ন। নদী, খাল, জলাধার, কৃষিভূমি কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না দূষণের ভয়াবহতা থেকে। ঢাকার আশপাশের প্রধান চারটি নদীÑ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা মনুষ্যসৃষ্ট ও শিল্পবর্জ্যে মৃতপ্রায়। প্রতিদিন লাখ লাখ টন শিল্পবর্জ্য কোনো রকম শোধন ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ছে। দূষিত হচ্ছে পানি, মরে যাচ্ছে মাছ, বিষাক্ত হচ্ছে জমির ফসল। এ ছাড়া দূষণে মানুষ শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক স্থানে আবাদি জমিতে ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, মিলছে না গবাদিপশুর খাবারও। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এসব এলাকায় উৎপাদিত ধানে ক্যানসারের উপাদান পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় দেখা দেবে সুপেয় পানির তীব্র সংকট।

ঢাকায় স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণে অনুমতি নিতে হয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। কিন্তু রাজধানীর বাইরের শহরগুলো দেখভালে পৌরসভা ছাড়া তেমন কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে জলাভূমি, কৃষিজমি, নদী, খাল ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করে ক্ষমতাবানরা গড়ে তুলছে আবাসন পল্লি, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত প্লট এবং ফ্ল্যাট বিক্রির পথ খুঁজতেই অবলীলায় ভরাট করছে প্রাকৃতিক জলাভূমি। ছোট ছোট প্লট তৈরি করার পর প্রতিটি প্লটের সঙ্গে নির্মিতব্য ভবনের জন্য রাখা হচ্ছে ছয় থেকে আট ফুট করে রাস্তা এবং সেভাবেই একেকটি প্রকল্পে যতগুলো প্লটের সারি তৈরি করা হচ্ছে, তার চেয়ে বহুগুণে তৈরি হচ্ছে গলি (সরু রাস্তা)। এভাবে পরিকল্পনাহীন ভবন ও সরু সড়ক নির্মাণের ফলে বাড়ছে যানজট। অন্যান্য নাগরিক ভোগান্তিও ক্রমেই বাড়ছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ, গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ ইত্যাদি বিড়ম্বনার তো কমতি নেই। অবৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ নিতে বাধ্য হচ্ছে গ্রাহক। এমনকি সংযোগ নিতে কোনো নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। কোথাও-বা গাছের ওপর দিয়েও গ্যাসের পাইপ টানা হচ্ছে। নিম্নমানের ফিটিংস আর এক ইঞ্চি ও দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণভাবে দেওয়া হয়েছে হাজারও অবৈধ গ্যাস সংযোগ। এসব কারণে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ও জীবননাশের ঝুঁকিও। পাকা সড়ক কেটে গ্যাস সংযোগ নেওয়ায় সড়কের বিভিন্ন স্থান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক স্থানে প্রধান সড়কের পাশেই বসছে বাজার। জনসভাস্থল, গণশৌচাগারের জন্য আলাদা কোনো পরিসর রাখা হচ্ছে না। এমনি নানা অসংগতির কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে এ নগরের নাগরিকেরা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি, উন্নয়ন, নাগরিকের বিকাশ। নিম্নাঞ্চলের শহরগুলোর সমস্যা সমাধানে ও ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের জন্য কতিপয় পদক্ষেপ অবশ্যই হাতে নেওয়া জরুরি। যেমন-

  • ভূপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কঠিন পৃষ্ঠতলে রূপান্তর করা যাবে। প্রাকৃতিকভাবে মাটির ভূপৃষ্ঠ বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি ও পরিবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ উপাদানটি বাদ দিলে যেকোনো সময় বিরাট প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই রাস্তার পরিমাণ যথাসম্ভব কম ব্যবহার করতে হবে। প্রধান সড়কগুলো পাকা করে সংযোগ সড়কের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। কম সড়ক ব্যবহার করে যাতে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়, সেভাবেই নগর বা শহরের পরিকল্পনা করতে হবে। প্লটভিত্তিক পরিকল্পনা বাদ দিয়ে একসঙ্গে অনেক মানুষের আবাসিক ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে ডায়নামিক পরিকল্পনা (কমিউনিটি হাউসিং) করতে হবে। কালেকটিভ হাউসিং বা সমন্বিত আবাসনব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। আবাসন নির্মাতাদের অবশ্যই সমন্বিত বা সমষ্টিগত আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
  • বালু দিয়ে কোনো নিচু জমি ভরাট করা হলে সেখানে প্রয়োজনে খনন করে মূল মাটির স্তর পুনরুদ্ধার করতে হবে। তবুও যদি উঁচু করার দরকার হয়, তবে মাটি দিয়েই ভরাট করতে হবে। বালু দিয়ে ভরাট করা কোনো জমিতে ভবন নির্মাণ করা হলে তা ভূমিকম্প সহনীয় প্রযুক্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু প্রযুক্তির চেয়ে প্রকৃতি অনেক বেশি মূল্যবান, তাই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকলে প্রযুক্তি যথাসম্ভব কম ব্যবহার করাই ভালো। কেননা ভবন নির্মাণের জন্য প্রাকৃতিক ওয়েটল্যান্ডের কোনো বিকল্প নেই। তবে নিচু এলাকার ক্ষেত্রে মাটি ভরাট করে উঁচু করা যাবে, বালু ভরাট করে নয়। তবে যেকোনো সময় ভবনটি দেবে যেতে পারে কিংবা ধসে পড়তে পারে।
  • নিম্নাঞ্চলেও গতানুগতিক শহরের মতো রাস্তা কিংবা ফুটপাতের নিচে পয়োনিষ্কাশন লাইনের সংযোগ, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ কমানোর সহায়ক। বাংলাদেশে নিরাপদ পানির একমাত্র উৎস ভূগর্ভস্থ পানি। তাই শহর, নগর যা-ই নির্মাণ করা হোক না কেন, পাকা ড্রেনের ব্যবহার অবশ্যই পরিহার করতে হবে। পাকা ড্রেন থেকে পানি ভূগর্ভে পৌঁছাতে পারে না। প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হলে সহজেই পানি মাটির মাধ্যমে ফিল্টারিং হয়ে ভূগর্ভে পৌঁছাতে পারে। তাই নিম্নাঞ্চলের আবাসিক এলাকা নির্মাণের আগে নির্মাতাদের অবশ্যই প্রাকৃতিক ড্রেনেজ বা খালের চিন্তা করতে হবে।
  • নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান যেমন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ব্যবহারে আমাদের প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়া দরকার। মাটির গঠন ও মাটির স্বাভাবিক অস্তিত্ব বা ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ভূগর্ভে অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি থাকতে হবে। কিন্তু আমরা যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভস্থ থেকে উত্তোলন করে ব্যবহার করছি, সে পরিমাণ পানি আমরা ভূগর্ভে ফিরিয়ে দিতে পারছি না। ফলে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে। যেটুকু পানি আমরা ভূগর্ভে ফিরিয়ে দিতে পারছি, তা অতিমাত্রায় দূষিত। তাই বৃষ্টির পানি ব্যবহারে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। শহরের বাড়িতে রান্নার কাজে যে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও প্রাকৃতিক। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের পর্যাপ্ততা আছে বিধায় আমরা যথেচ্ছা ব্যবহার করছি। কিন্তু কোনো একসময় গ্যাসের মজুদ কমে এলে তা অবশ্যই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই এখনই সময় বায়োগ্যাসের ওপর নির্ভর করার। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ কমাতে সোলার ও বায়োগ্যাস-নির্ভরতা বাড়ানো উচিত।
  • পরিবেশ বাঁচাতে অবশ্যই প্রাকৃতিক বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও তাপ ধারণকারী অন্যান্য গ্যাসের পরিমাণ কমাতে প্রাকৃতিক বনায়ন এখন সময়ের দাবি। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে তা অব্যাহত থাকলে মেরু অঞ্চলে বরফ গলে নিম্নাঞ্চলই সবার আগে প্লাবিত হবে। এমন ঘোষণা বৈজ্ঞানিকেরা অনেক আগে থেকেই দিয়ে আসছেন। এই পরিণতি হলে নিম্নাঞ্চলের নতুন শহরের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে বাস্তব রূপ নেবে। তা ছাড়া প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রাকৃতিক জলাভূমি থাকাও একান্ত আবশ্যক। প্রয়োজনে পুকুর খনন করতে হবে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার জন্য খনন করতে হবে খাল।
  • যেহেতু এসব নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা ছয় মাসেরও বেশি সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে, এ জন্য মৌসুমি যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। অর্থাৎ বর্ষাকালের বাহন হিসেবে নৌকা এবং শুকনা মৌসুমে হেঁটে কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • স্যাটেলাইট টাউনের পরিকল্পনা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ঢাকাকে ঘিরে যেসব উপশহর বা স্যাটেলাইট টাউন করার পরিকল্পনা রয়েছে, তা দ্রুততার সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি)-এর আওতায় যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, অর্থাৎ এসটিপিতে বর্ণিত ৫০টি রাস্তা, বাইপাস, মেট্রোরেল-৪ ও সার্কুলার মেট্রোসহ বিআরটি-২ ও বিআরটি-১-এর কাজ দ্রুত শুরু করা। এ ছাড়া রেলপথের আধুনিকীকরণ, ঢাকার চারপাশের নদীপথ দ্রুত সম্প্রসারণ ও পরিবহন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন করাসহ এসটিপির ৭৮টি পলিসি ইস্যু বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • আবাসন, যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান, হাসপাতাল, বাজার, নিরবচ্ছিন্ন পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেবা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
  • প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন করা বাধ্যতামূলক। যেসব কারখানায় ইটিপি আছে, তা সার্বক্ষণিক চালু রাখার জন্য দরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

পরিকল্পিত ও পরিবেশগত আবাসনের চিন্তা না করলে জলাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো উপায় নেই। পরিবেশ ও জলাভূমিকে বাঁচিয়ে নগরায়ণ; এমন বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে আবাসন ও প্রকৃতির সহাবস্থান।

আবাসনের পরিকল্পনায় কিছু প্রস্তাবনা

আবাসন পরিকল্পনার প্রধান বিবেচ্য বিষয় নানামাত্রিক আবাসন প্রকল্পের মধ্য জলাভূমিকে যথাসম্ভব কানেকটিং করা। এতে করে ওই এলাকার জীববৈচিত্র্য টিকে থাকবে এবং আবাসন সমস্যার সমাধান হবে অনেকটাই প্রাকৃতিকভাবে।

  • যে জায়গায় আবাসনব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেখানকার উন্নয়নের আগে বন্যার পানি পৌঁছাতে পারবে না এমন জায়গা বেছে নিতে হবে। এতে করে আবাসন প্রকল্প এলাকা বন্যার কবল থেকে মুক্ত থাকবে।
  • আবাসন প্রকল্প এলাকাকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটি প্রাকৃতিক অঞ্চল, অপরটি মানবসৃষ্ট অঞ্চল। এ দুই ধরনের জায়গা নির্ধারণের মাধ্যমে আবাসন গড়ে তোলা গেলে জীববৈচিত্র্য ও অন্যান্য বিষয়ে প্রাকৃতিক সাহায্য পাওয়া অনেক সহজ হবে।
  • আবাসন প্রকল্পের মধ্যে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ প্রাকৃতিক পরিবেশ, খোলা মাঠ রাখতে হবে।
  • আবাসন প্রকল্পের সব জায়গায় হার্ড সারফেস ব্যবহার না করে সফট সারফেস বা মাটির রাস্তা ব্যবহার করা যেতে পারে। যেখানে ইটের বা পিচের রাস্তার বদলে মাটির রাস্তা বা শুধু হাঁটাপথ থাকবে।
  • আবাসন করতে গিয়ে যদি একেবারেই জমি ভরাট করতে হয়, তবে একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে আবাসনের যেখানে উঁচু জমি থাকবে, সেখানে আরও উঁচু করে আবাসনের ব্যবস্থা করা। তবে কোনোভাবেই জলাভূমি বা ওয়াটারল্যান্ডকে নষ্ট করা যাবে না। প্রয়োজন হলে নিচু জলাভূমি থেকে আরও বেশি মাটি খনন করে আবাসস্থলের উঁচু স্থানকে আরও উঁচু করতে হবে। এতে করে জলাভূমি যেমন নষ্ট হবে না, তেমনি আবাসনের ভূমি আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় হবে। এতে করে খুব বেশি দুর্যোগ বা বন্যা হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

বহুনাগরিকের মিলনকেন্দ্রই নগর। নগর মানেই ইট, কাঠ আর পাথরের যান্ত্রিক জীবন নয়। গড়ে ওঠা একটি নগর নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। অপরিকল্পিত উন্নয়নে মানুষের মধ্যে বাড়ে অপরাধপ্রবণতা। ঢাকার আশপাশে মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, চুরি, প্রতারণা, ধর্ষণ বিগত কয়েক বছরে বেড়েই চলেছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে এমন অপরাধ দমনে। একটি সুষ্ঠু-সুন্দর পরিকল্পিত নগর  দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সহায়ক। অপরিকল্পিত উন্নয়ন যদি চলতে থাকে তবে নগরগুলো বসবাসের অযোগ্য জঞ্জালে পরিণত হবে। আমাদের এখনই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত উন্নয়নের দিকে এগোতে হবে। প্রকৃতি, পরিবেশ ও নাগরিক অধিকারগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে বাসযোগ্য আদর্শ এক নগর।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

সারোয়ার আলম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top