প্রতিটি মানুষের চাওয়া নিরাপদ আবাস। তা সে যেমনই হোক না কেন, সেখানে যেন সে স্থায়ীভাবে বাস করতে পারে। কেননা গৃহই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নিশ্চয়তা, অনুভূতি ও বন্ধনের জায়গা। ঘরের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে পরিবারের সুখ-দুঃখ, আবেগ, স্মৃতিগাথা ও আনন্দ-বেদনার কাব্য। বেঁচে থাকার প্রয়োজন আর জীবিকার তাগিদে এক স্থানের মানুষ পাড়ি দেয় অন্যত্র, বিশেষত নগরে। ভাড়া বাসায় শুরু হয় বসবাস। বছর বছর ভাড়া বৃদ্ধি; মালিকের অনুশাসনসহ নানা কারণে ভাড়াটেরা সব সময় একধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগে। এমন সব শঙ্কায় মনের মণিকোঠায় সব সময় তাড়া করে ফেরে নিজস্ব একটি বাড়ির স্বপ্ন। যেখানে থাকবে না ছেড়ে যাওয়ার ভয়; স্বপ্নীল রঙে সেজে উঠবে আপন নীড়টি। রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ নগরবাসীর যাপিত জীবন আর স্বপ্নগুলো এভাবেই একই সুতোয় গাঁথা। আবাসনের মতো অন্যতম মৌলিক একটি চাহিদা বরাবরই ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে নগরের নিম্ন, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের।
জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়তই গ্রাম থেকে মানুষ ভিড় করছে শহরে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের ৭ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ এখন নগরে বাস করে। ঢাকাতেই বাস দেড় কোটিরও বেশি মানুষের। এ নগরের সবচেয়ে দুর্লভ বস্তু বাসস্থান। এখানে জমির মূল্য এতটাই বেশি যে উচ্চ আয়ের মানুষেরাও জমি কিনে বাড়ি করতে হিমশিম খান। জমির এমন উচ্চমূল্যের কারণেই মানুষ বাধ্য হয়েই একটি ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টে খুঁজে নেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরা নিজেদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারলেও পারছেন না স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষেরা। নিম্ন আয়ের মানুষ বস্তিতে কোনো রকমে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জরিপ মতে, রাজধানীর প্রায় ২৫ লাখ পরিবারের ৮৩ শতাংশ অর্থাৎ ২০ লাখ ৭৫ হাজার পরিবারেরই বসবাসের নিজস্ব কোনো আবাসনব্যবস্থা নেই। বিপুলসংখ্যক মানুষকে তাই ভাড়া বাসার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে বিগত ২০ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩২৫ শতাংশ। সাধারণ মানুষের আয়ের ৬০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় বাড়িভাড়ার পেছনে। অথচ একজন নাগরিকের আবাসন বাবদ আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ব্যয় করা উচিত। অবশিষ্ট যা থাকে তা খাদ্য, বস্ত্র, পরিবহন ও চিকিৎসা, সন্তানের লেখাপড়াসহ আনুষঙ্গিক নানা প্রয়োজনে ব্যয় হয়। সব প্রয়োজন মেটানোর পর একটি ফ্ল্যাট কিনতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা সারা জীবনেও জোগাড় করা সম্ভব হয় না স্বল্প আয়ের এসব মানুষের। আর তাই আপন নীড়ের স্বপ্ন দূর কল্পনাতেই রয়ে যায় তাঁদের।
বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের আবাসন খাতটি গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। আবাসন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজারো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক। এর মধ্যে রিহ্যাবের সদস্য প্রায় ১ হাজার ২০০টি আবাসন প্রতিষ্ঠান। বিএলডিএ ও রিহ্যাব সূত্রমতে, বর্তমানে আবাসন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্প খাতে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৭৫ হাজার কোটি টাকা। বিগত বেশ কয়েক বছর যাবৎ খাতটিতে মন্দাভাব বিরাজ করছে। ২০১৩ সাল নগদ ফ্ল্যাট বিক্রির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। সম্ভাবনাময় এ খাতটি আজ হুমকির মুখে। এ খাতে সেবাদানরত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেমন নেই কোনো সমন¦য়, তেমনি নেই সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। যে দেশের অধিকাংশ মানুষই স্বল্প ও নিম্ন আয়ের, তাঁদের কথা চিন্তা না করে মাত্র কয়েক শতাংশ ধনী ও উচ্চবিত্তের আবাসন নির্মাণে ব্যস্ত আবাসন কোম্পানিগুলো। চাহিদা তেমন না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণ করছে আলিশান সব ফ্ল্যাট। একটা সময় পর্যন্ত এগুলো বিক্রি হলেও বর্তমানে চিত্রটা অনেকটাই স্থবির। আবাসন কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পের প্রায় লক্ষাধিক ফ্ল্যাট অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মধ্যবিত্তরা কোনোভাবেই তা কিনতে পারছেন না। ঢাকায় বর্তমান বাজারমতে মানসম্মত একটি ফ্ল্যাটের দাম প্রায় এক কোটি টাকা। অবস্থানভেদে এগুলোর কোনোটা আবার দুই কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত। উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য এমন দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে হলেও মধ্যবিত্তদের কাছে তা অনেকটাই আকাশছোঁয়া। যদিও রাজধানীর কিছু এলাকায় ২৫-৪০ লাখ টাকার মধ্যে সাধারণ মানের বা নিম্ন মানের ফ্ল্যাট কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু তা কিছুতেই স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নয়। তা ছাড়া ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের নেই দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি-সুবিধা। এ ছাড়া অপ্রতুল ব্যাংকঋণ বা ঋণ পাওয়া গেলেও তার সুদের হার মাত্রাতিরিক্ত (১৫-২০ শতাংশ) হওয়াই অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছে আবাসনপ্রাপ্তির সুবিধা থেকে।
আবাসন সমস্যা বিশ্বজনীন সমস্যা। গ্রামে মানুষ স্থানীয় সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে বাড়ি তৈরি করতে পারলেও নগরে ভূমির স্বল্পতা ও উচ্চমূল্য এবং নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমমূল্যের আধিক্যের কারণে ব্যক্তিগত আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা বেশ কঠিন। তবে উন্নত দেশগুলো নাগরিকদের চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আবাসনসুবিধা নিশ্চিত করতে নিচ্ছে কার্যকরী নানা পদক্ষেপ। যেমন সহজ শর্তে গৃহঋণ, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি-সুবিধা, বিমা সহায়তা প্রভৃতি। আমেরিকা দেশটির নিম্ন, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের নাগরিকদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আবাসন সেবা দিয়ে থাকে। একেবারেই নিম্ন আয়ের নাগরিকদের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের কমিউনিটি আবাসন প্রোগ্রামের আওতায় অনুদান দেয়। ১৯৭৮ সাল থেকে চীন দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে আবাসন ক্রয়ে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। যাঁদের একেবারেই ক্রয়ক্ষমতা নেই, তাঁদের কম মূল্যে গৃহ ভাড়া দেওয়া হয়। ২০১০ সালে দেশটি ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন ইউনিট আবাসন ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়। আরও ৩৬ মিলিয়ন ইউনিট নির্মাণ অচিরেই সম্পন্ন হবে। মালেশিয়ায় সরকারি সহায়তায় গোল্ডহিল গ্রুপ ছেমবং, রেমবাও-এ গড়ে তুলেছে ৫৬০ বর্গফুটের ৩০১ ইউনিটের স্বল্পব্যয়ের আবাসন প্রকল্প। পাকিস্তান পাবালিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে কম আয়ের মানুষের জন্য স্কিমের ভিত্তিতে নির্মাণ করেছে পাঁচ লাখ ইউনিট আবাসন প্রকল্প। ভারতে ৭ থেকে ২০ হাজার রুপি আয়ের মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আবাসন প্রকল্প। এর মধ্যে জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউয়াল মিশন ৬৫টি নগরে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলছে, যার তদারকিতে রয়েছে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আরব আমিরাতে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনের নির্মাতা এমার প্রপার্টিজ স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাড়ি নির্মাণ করে বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অস্ট্রেলিয়াতে মধ্যম আয়ের পরিবার, যাঁরা প্রথমবারের মতো একটি বাড়ি কেনেন তাঁদের সরকারি অনুদান প্রদান করা হয়।
নানা ধরনের জটিলতায় যখন স্বল্প আয়ের মানুষেরা নিজস্ব আবাসন-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তখন ভাড়া বাসাই একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বাসাভাড়া বাবদ যে পরিমাণ অর্থ দিতে হয়, তাতে একজন মানুষের আয়ের সিংহভাগই চলে যায়। তা ছাড়া অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার ব্যয়ভার সামলাতে না পেরে আশ্রয় নিচ্ছে অস্বাস্থ্যকর টিনশেড বাড়ি, যেখানে বাবা, মা, ভাই, বোনসহ পরিবারের সব সদস্যকে একটি মাত্র ঘরেই থাকতে হয়। এমনকি আত্মীয়-পরিজন এলেও একই ঘরে গাদাগাদি করে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। এতে সন্তানের পড়ালেখাসহ নানা রকম পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া রান্ন্াঘর, গোসলখানা ও শৌচাগার অনেকগুলো পরিবার যৌথভাবে ব্যবহার করায় ক্ষুণ্ন হয় নিজস্ব গোপনীয়তাও। এমন অনেক পরিবার আছে, যারা ব্যয়ভার মেটাতে না পেরে বস্তিতে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ক্রমেই বাড়ছে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বস্তিতে শুমারি ও ভাসমান লোক গণনা-২০১৪’ অনুযায়ী, দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লাখ, যেখানে ১৯৯৭ সালে ছিল সাত লাখের কিছু বেশি। দেশের নগরাঞ্চলে একের পর এক বস্তি গড়ে ওঠা সুষ্ঠু নগরায়ণের পথে বড় বাধা। এতে সুস্থ পরিবেশ না থাকায় সমাজে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা।
নগরে চাহিদা অনুযায়ী মানুষের আশ্রয়ণ নিশ্চিত করতে দেশে নেই কোনো নগর নীতিমালা বা আবাসন পলিসি। মানুষ যেভাবে নগরমূখী হচ্ছে তাতে আগামী ২৫ বছরে শহরগুলো আকারে বাড়বে দ্বিগুণ। শহরগুলোর জনসংখ্যায় তার ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে। ফলে দিনে দিনে শহর হারাবে বাসযোগ্যতা, জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ। এ জন্য প্রয়োজন আবাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। সে লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাড়াতে হবে ভূমির ব্যবহার। স্বল্প জায়গায় কীভাবে অধিক মানুষকে আশ্রয়সেবা দেওয়া যায় সে লক্ষ্যে নির্মাণকৌশলেও আনতে হবে পরিবর্তন। যেহেতু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা খুবই সীমিত, এ জন্য ছোট আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণে জোর দিতে হবে। এতে কমে আসবে ইউনিটভিত্তিক ফ্ল্যাট নির্মাণব্যয়। ফলে ফ্ল্যাটের দাম সহজেই মধ্যবিত্তেরই নাগালে চলে আসবে। এমনকি কিছু আবাসন ইউনিটে রান্ন্াঘর, গোসলখানা ও শৌচাগার কয়েকটি ইউনিটে যৌথ ব্যবহার হতে পারে। জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বল্প আয়তনের ফ্ল্যাটের পরিসর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবাসন ও আসবাবপত্রের সুব্যবস্থা করে থাকে। যেমন- ঘরগুলোতে দ্বিতল খাট, ভাঁজ করে রাখা যায় এমন বিছানা, সোফা, খাবার টেবিল, কেবিনেট প্রভৃতির ব্যবস্থা করে। এতে যেমন নির্মাণব্যয় অনেক কমে, তেমন সাশ্রয় হয় স্থানের আর স্বল্প পরিসরে অধিক পরিবারের আবাসন সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। বিশ্বের বড় শহরগুলোতে অপেক্ষাকৃত ছোট অ্যাপার্টমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। ক্রমেই ছোট হয়ে আসা পরিবার আর আর্থিক সংগতির কথা বিবেচনায় রেখে নগরগুলোতে ছোট পরিসরের অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবসা এখন জমজমাট। ব্যবসায়িক কৌশল এখন মধ্যবিত্তমুখী। এ ধরনের আবাসন প্রকল্প হাতে নিলে আবাসনপ্রত্যাশীরা যেমন উপকৃত হবে, তেমনি লাভবান হবে আবাসন ব্যবসায়ীরাও। দেশের আবাসন সমস্যাও অনেকাংশে দূর হবে।
নিম্ন আয়ের মানুষকে আবাসন-সুবিধা দিতে একটি মাত্র প্রকল্পের কথাই বলাবাহুল্য। আর তা হচ্ছে মিরপুরের ভাসানটেকে বস্তি উচ্ছেদ করে তাদের পুনর্বাসনের আওতায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পাঁচ একর জমির ওপর নির্মিত ভাসানটেক আবাসন প্রকল্প। এ প্রকল্পটির আওতায় নির্মাণ করা হয় বস্তিবাসীদের জন্য ২১৫ বর্গফুটের এক কক্ষের ফ্ল্যাট টাইপ ‘এ’ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৩৯৫ বর্গফুটের ‘বি’ টাইপের দুই কক্ষের ফ্ল্যাট। ওই সব ভবনে ‘এ’ টাইপের ৫৯৪টি এবং ‘বি’ টাইপের ৩৬০টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ টাইপের ফ্ল্যাটের দাম ছিল দুই লাখ, আর বি টাইপের জন্য ছিল তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা। তবে অনিয়মের কারণে ক্রেতাদের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি টাকা পরিশোধ করতে হয়। এমনকি বরাদ্দের পরও বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ বাবদ ফ্ল্যাটের মালিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়। বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় এ টাইপের ছয়টি ও বি টাইপের আটটি সুউচ্চ ভবনে আনুমানিক দুই হাজার পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত হয়েছে। এ প্রকল্পের অসম্পূর্ণ ১১১টি সুউচ্চ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে আরও কিছু পরিবার সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ পাবে। তবে তা কবে নাগাদ শেষ হবে তার কোনো সুস্পষ্ট মেয়াদ জানা নেই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া উত্তরায় রাজউক ‘মধ্যম ও স্বল্প’ আয়ের মানুষের জন্য যে ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে, তার দাম নির্ধারণ করেছে ৩৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর চার্জ। ফলে ফ্ল্যাটের দাম পড়বে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। তবে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে কোনো মধ্যবিত্ত মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে পারবে কি না তা সহজেই অনুমেয়। মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন সেবা নিশ্চিত করতে অবশ্যই তা হতে হবে তাদের সাধ্যের মধ্যে।
অভিজাত শ্রেণির পাশাপাশি আবাসনকে মধ্যবিত্তদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে ভবন নির্মাণকৌশল নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে বিস্তর গবেষণা। দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি-সুবিধা ও আর্থিক প্রণোদনা ছাড়াও নির্মাণসংশ্লিষ্ট গবেষকেরা চেষ্টা করছেন কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি, নির্মাণকৌশল ও দামে সস্তা নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করে ব্যয় সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণ করা যায়। সাধারণত দেশগুলোর বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন করছে নতুন প্রযুক্তিসম্পন্ন নির্মাণ উপকরণ ও কৌশল। যেমন- করোগেটেড শিট, হলো ব্রিক, প্রি-ফেব্রিকেটেড কংক্রিট, প্রি-স্ট্রেস কংক্রিট প্যানেল ইত্যাদি। এসব উপকরণ ব্যবহারে একদিকে যেমন নির্মাণপণ্যেও ব্যয় কমে, তেমনি সময়ও লাগে অনেক কম। ফেরোসিমেন্ট প্যানেল, পিলার, করোগেটেড শিট বোল্ট জুড়ে নিলেই অল্প সময়েই তৈরি হয়ে যায় ভবনের দেয়াল। ইট বা কংক্রিটের গাঁথুনির মতো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয় না বলে শ্রমিক খরচও কমে। বাংলাদেশের ভবন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট (HBRI) এমন ধরনের ব্যয়সাশ্রয়ী বেশ কিছু নির্মাণ উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ফেরোসিমেন্ট, ফেরোসিমেন্ট পানির ট্যাংক, ফেরোসিমেন্ট করোগেটেড শিট, হলো ব্রিক, ফেরোসিমেন্ট প্যানেল প্রভৃতি। এসব উপকরণ ভবন নির্মাণে সময় ও নির্মাণ ব্যয় উভয়ই কমাবে। তা ছাড়া এসব উপকরণ রয়েছে নানা সুবিধা যেমন- দীর্ঘস্থায়ী, কাঠের মতো পোকা বা ঘুণে ধরে না, মরিচারোধী, রং করারও প্রয়োজন হয় না, গরমে আরামদায়ক এবং সহজে স্থাপনযোগ্য।
নগরের আবাসন সমস্যা মানেই কিন্তু শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। সব শহরেই ক্রমেই গড়ে উঠছে অপরিকল্পিতভাবে। জমি, নির্মাণব্যয়, নির্মাণ উপকরণ ও শ্রমের মূল্য যে হারে বাড়ছে, তাতে ক্রমেই যেন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে আবাসনব্যবস্থা। সরকারি-বেসরকারি রাজধানীকেন্দ্রিক বিধায় অন্যান্য নগরের মানুষকে নিজেদের আবাসনব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হয়। এ জন্য নতুন উদ্ভাবিত এসব নির্মাণ উপকরণ ও কৌশলের সঙ্গে যদি পরিচয় থাকে, তবে তাঁরাও স্বল্প ব্যয়ে পেতে পারেন আবাসন সেবা। ব্যয়সাশ্রয়ী এমন ধরনের নির্মাণ উপকরণের মধ্যে রয়েছে-
দেশের নাগরিকদের যৌক্তিক মূল্যে এবং সরকারি সহায়তায় আবাসন সেবা দিতে দরকার একটি সুষ্ঠু নীতিমালার। নিম্ন্ন আয়ের মানুষের আবাসন-সমস্যা সমধানের জন্য সরকারের ইতিপূর্বে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি তেমন সফল হয়নি। তা ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে যেহেতু ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেশি, সে জন্য ক্রেতারা যেন স্বল্প সুদে ঋণ পায়, সে ব্যবস্থা করা উচিত।
আবাসনঋণে ব্যাংকগুলোর ঘোষিত সুদের হার ১২ থেকে সাড়ে ১৯ শতাংশ। কিন্তু বিভিন্ন চার্জ ও প্রসেসিং ফি মিলিয়ে এ হার বাস্তবে ১৬ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। জাপানে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে আবাসনঋণ পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ায় গৃহঋণের সুদের হার গড়ে ৬ শতাংশ। দেশটির বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৪ দশমিক ৩৯ থেকে ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ হার সুদে গ্রাহকদের গৃহঋণের প্রস্তাব করে। ভারতেও ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশ বা এর নিচে। বিশ্বে আবাসন খাতে সুদের হারের এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে উচ্চ সুদের হার এবং প্রকাশ্য ও গোপন নানা চার্জ ও প্রসেসিং ফির কারণে আবাসনঋণ মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্য সহনীয় নয়। এমন উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরাও। স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের এ সংকট কাটিয়ে শিল্প হিসেবে আবাসনশিল্পকে বিকশিত করতে এখনই করণীয় প্রস্তাবনায় রয়েছে-
- পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প গ্রহণ
- অধিক ইউনিটবিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন নির্মাণ
- ছোট আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণ
- দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি-সুবিধা প্রদান
- আয় বিবেচনায় কিস্তির হার ধার্যকরণ
- ব্যাংক ঋণের সহজ প্রাপ্যতা
- সুদের হার কমানো
- ঋণ পরিশোধের সময়কাল বাড়ানো
- রেজিস্ট্রেশনসহ আনুষঙ্গিক খরচ কমানো
- অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত চার্জ কমানো
- ভূমির বৈজ্ঞানিক ব্যবহার বাড়ানো
- নির্মাণকৌশল পরিবর্তন
- বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো
- নির্মাণসামগ্রীর দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা
- পরিবেশবান্ধব ক্ষুদে শহর (Compact Township) ও উপশহর গড়ে তোলা।
সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সেবা দিতে ফ্ল্যাট নির্মাণের দুটি প্রকল্প নিয়েছে। দৈনিক ২৫০ টাকা থেকে ২৭৫ টাকার কিস্তি ব্যাংকে জমা দিয়ে বস্তিবাসী ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা একটি ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবে। এ ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৩৫০ বর্গফুট থেকে ৪৬৫ বর্গফুট। ফ্ল্যাটে থাকবে দুটি বেডরুম, একটি ড্রয়িংরুম, রান্নাঘর ও একটি টয়লেট। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটা অত্যন্ত আশার খবর। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এসব প্রকল্প এক দশকেও শেষ হয় না। বিক্রয়মূল্য যা ধার্য করা হয়, বাস্তবে ক্রেতাকে দিতে হয় তারও দ্বিগুণ বা বেশি। এ ছাড়া নিম্নবিত্তের জন্য প্রকল্প করা হলেও আদতে তা পায় প্রভাবশালী ও বিশেষ কিছু মহলের লোকেরা। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এ দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আবাসন-সমস্যার সুরাহা করতে হবে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রয়াসে নানা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসনব্যবস্থা গড়তে পারে একটি সুন্দর ও সুস্থ জাতি। আর একটি সুন্দর ও সুস্থ জাতিই গড়তে পারে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ। তাই সবার আগে প্রয়োজন সবার জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাস।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫