পায়ে পায়ে মিলবে বিদ্যুৎ

সময়টা ১৮২০ ও ১৮৩০ সালের মাঝামাঝি। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে আবিষ্কার করলেন বিদ্যুৎ। পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটল যুগান্তকারী ঘটনা। শুরু হয়ে গেল বিদ্যুতের সঙ্গে যন্ত্রের সংযোগ। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন আর শিল্প উৎপাদনে লাগল বিদ্যুতের জাদুকরি স্পর্শ। ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ সংস্থান বিজ্ঞানীদের জন্য হয়ে উঠল দারুন চ্যালেঞ্জিং। নিরন্তর প্রচেষ্টায় উদ্ভাবিত হলো জলবিদ্যুৎ। কয়লা, ফার্নেস তেল ও গ্যাসভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ঊনবিংশ শতাব্দীতে চাহিদা যখন আরও বেড়ে গেলে, তখন শুরু হলো পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এসব পদ্ধতিতে উৎপাদনের হার বাড়ল ঠিকই কিন্তু তা যেমন ব্যয়বহুল তেমনই সময়সাপেক্ষ। এমনকি পরিবেশের জন্য বড় হুমকিও। তাই উদ্ভাবকেরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প পথের সন্ধানে নেমে পড়লেন। আবিষ্কার করলেন রিনিউয়েবল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎস। বাতাস ব্যবহার করে উইন্ডমিল বা বায়ুবিদ্যুৎ এবং সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি বা সৌরবিদ্যুৎ। কিন্তু এখানেও সীমাবদ্ধতা পিছু ছাড়ল না। সব সময় বাতাস না হওয়া আর রাতে সৌর আলোকের অভাব সমস্যাকে জটিল করে তুললো। তবে এখানেই গবেষণা থেমে থাকেনি। সর্বশেষে তাঁরা উদ্ভাবন করলেন পেভজেন প্রযুক্তির। এটা এমনই পরিবেশবান্ধব এক প্রযুক্তি, যার ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটলেই উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। 

প্রচলিত ও নবায়নযোগ্য শক্তির বাইরে নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে মানুষ। নতুন আঙ্গিকে বিদ্যুৎশক্তি সৃষ্টির এ উপায়টি বিশ্ববাসীর জন্য খুলে দিয়েছে অমিত সম্ভাবনার দ্বার। পেভজেন প্রযুক্তিতে রাস্তায় টালি বসিয়ে পায়ের চাপশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ফুটপাত, পার্ক, ওভারব্রিজ, সিঁড়িসহ প্রায় সবখানেই স্থাপনযোগ্য এই পেভজেন প্রযুক্তি। ফুটপাতে হাঁটা পথচারী, পার্কে দৌড়ানো মানুষ, মাঠে খেলাধুলারত খেলোয়াড়দের পায়ের চাপ; প্রতিটি পদক্ষেপেই উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। জ্বলবে লাইটপোস্টের আলো। তাক লাগানো এ প্রযুক্তি আবিষ্কার বদলে দিতে চলেছে সারা বিশ্বের চিরচেনা দৃশ্যপটকে।

ইংরেজ ভদ্রলোক লরেন্স কুকের মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণার ফসল এই পায়ে হাঁটা বিদ্যুৎ উৎপাদন। ২০০৯ সালে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এই পেভজেন সিস্টেম সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রজেক্টের সফল ব্যবহার চালিয়ে এসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পেভমেন্ট থেকে পেভ আর জেনারেটর থেকে জেন। দুটি মিলিয়ে হলো পেভজেন। যার অর্থ ফুটপাত জেনারেটর অর্থাৎ ফুটপাত থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ। সম্ভবত পেভজেন নামকরণের এটাই হলো ইতিহাস। ইংল্যান্ডের লন্ডন বেইজড পেভজেন সিস্টেম বিশেষ ধরনের টাইলসের ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। তারা বিবৃতিতে জানায় এ টাইলসগুলো মূলত সড়ক বাতির মতো কম ভোল্টেজের ক্ষেত্রে কার্যকরী। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে বৃহৎ পরিসরে বা বেশি ভলিউমের বিদ্যুৎ উৎপাদিত না হলেও নির্দিষ্ট জায়গার চাহিদা পূরণে এটি খুবই সহায়ক। যেমন: সড়ক বাতি, ফুটপাতের আলো, আন্ডারপাস, ফ্লাইওভার, ইনডোর স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন জায়গায় যে আলোর প্রয়োজন হয়, তা এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই পূরণ করা সম্ভব। 

চীনা বিজ্ঞানী তোয়ি হায়ামিজুর স্বপ্ন ছিল এমন একটি শহরের, যা নিজেই হবে একটি পাওয়ার স্টেশন। যেখানে আলাদা করে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র থাকবে না। শহরজুড়ে থাকবে না তারের জঞ্জাল। অথচ শহরের সব রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ফুটপাতে ও রাস্তায় চলাচল করা মানুষ ও গাড়ির মাধ্যমে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ। এমন ধারণা থেকেই তিনি ১ বর্গমিটার জায়গা প্রস্তুত করেন। নির্বাচন করেন পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত ট্রেন স্টেশনের ক্রসিং যেখানে প্রতিদিন নয় লাখ মানুষ চলাচল করে। জায়গাটিতে বসানো হলো বিশেষভাবে তৈরি করা টাইলস, যেখানে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। দেখা গেল ২০ দিনে সেখান থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলো তা দিয়ে ১ হাজার ৪২২টি টেলিভিশন অনায়াসে এক ঘণ্টা চালানো যায়। তিনি ভাবলেন প্রতিটি রাস্তা ও ফুটপাতে এমনটি করা গেলে রাস্তার লাইট জ্বালানোর জন্য আলাদা করে বিদ্যুতের দরকার হবে না।

প্রথম পেভজেন প্রকল্প    

সময়টা ৭ এপ্রিল ২০১৩। স্থান: ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস। চারপাশে উৎসবের আমেজ। ৩৭তম আন্তর্জাতিক ম্যারাথন দৌড়ে অংশগ্রহণকারী দৌড়বিদসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়। কেনিয়ার পিটারসাম ২.০৫.০৪ ঘণ্টায় দৌড় শেষ করে প্রথম হন। মাত্র ২৭ সেকেন্ডের জন্য ছুঁতে পারলেন না বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু তিনিসহ অন্য অংশগ্রহণকারীরা জানতেও পারলেন না অজান্তেই তাঁরা কত বড় এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকলেন। এই ম্যারাথন ট্রাকে বসানো হয়েছিল শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম বিশেষ ধরনের টাইলস। ম্যারাথনে অংশ নেওয়া প্রতিটি দৌড়বিদকে পার করতে হয়েছিল ২৫ মিটার চওড়া ১৭৬টি বিশেষ ধরনের টাইলস। আর সেখান থেকে পাওয়া গিয়েছিল ৪ দশমিক ৭ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ, যা একটি ল্যাপটপ কম্পিউটারকে একটানা দুই দিন চালিয়ে রাখতে সক্ষম অথবা একটি ৫ ওয়াটের এলইডি লাইটকে ৯৪০ ঘণ্টা বা ৪০ দিন এক নাগাড়ে জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম। প্রথাগত সিস্টেমের বাইরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শক্তির ব্যবহার কীভাবে মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে তা দেখানোই ছিল এ প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য।

প্রথম পেভজেন প্রযুক্তির স্টেডিয়াম

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো স্টেডিয়ামের পেভজেন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বানানো হয়েছে অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামটিতে ফুটবলাররা মাঠে পা রাখলেই জ্বলে উঠবে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট। ফুটবলাররা মাঠে নেমে চলাচল করলেই শক্তি উৎপন্ন হবে। খেলোয়াড়দের কাইনেটিক এনার্জি বা গতিশক্তি থেকে পাওয়া বিদ্যুতে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বলছে, যা ইতিমধ্যে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মেরো দা মিনেইরা বস্তিতে ব্রাজিলের প্রথম প্লেয়ার-পাওয়ার্ড ফুটবল মাঠের উদ্বোধন উপলক্ষে খোদ পেলে পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। সারা মাঠে বিশেষ ধরনের এক টালি বসানো হয়েছিল, যা খেলোয়াড়দের দৌড়াদৌড়িতে নিবদ্ধ গতিশক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম। পুরো মাঠ ঢাকতে ৮০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু দিয়ে তৈরি করা ২০০টি টালি লাগে। টালি বসানোর পর তা এক স্তর অ্যাস্ট্রো টার্ফ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। পেভজেন টালিগুলো মাঠের চারপাশে লাগানো সোলার প্যানেলগুলোর সঙ্গে যুক্ত। গতিশক্তি থেকে বিদ্যুৎ, ফুটবল ও বিজ্ঞানের এই অভাবনীয় উদ্ভাবন দেখে ফুটবল কিংবদন্তি পেলের চোখে আসে জল। তিনি বলেন, ‘খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বের পয়লা নম্বর বিজ্ঞানীরা ব্রাজিলিয়ান হবেন, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত’, চোখের জল মুছে হাসিমুখে বলেন সর্বকালের এ ফুটবলার।

মেকানিজম

কোয়ার্টাজের নাম আমরা অনেকেই হয়তো শুনে থাকব। এ এক বিশেষ ধরনের শিলা, যা প্রকৃতিতে যায় স্বচ্ছ স্ফটিকের আকারে। এটি সাধারণ টাইলস তৈরির মূল উপাদান। কোয়ার্টাজের ভেতর দিয়ে কোনো ধরনের চাপ প্রবাহিত করতে পারলে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। কপার, কয়েল ও চৌম্বকের ইনডাকশনের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত বিশেষ ধরনের টাইলসগুলো বসানো থাকবে ফুটপাতে অথবা পার্কে কিংবা জনবহুল এলাকায়। ‘পিজিও ইলেকট্রিক ইফেক্ট’ মেকানিজম ও হাইব্রিড ব্ল্যাকবক্স হচ্ছে সেই প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব। রিসাইকেলড তন্তু ও টায়ারের মাধ্যমে তৈরি করা বিশেষ ধরনের টাইলস বসানো রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে, যেখানে মানুষের আনাগোনা বেশি। প্রতিটি পদক্ষেপ যা কিনা টাইলসটিকে ৫ মিমি পর্যন্ত চাপ দিচ্ছে এবং যেখান থেকে ১ থেকে ৭ ওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সক্ষম। এটিকে কোনো ব্যাটারিতে মজুদ করে রাখা কিংবা সরাসরি ডিভাইসেও ব্যবহার করা সম্ভব। টাইলসগুলোয় দাঁত-লাগানো চাকার মতো ছোট ছোট কগ বসানো আছে। টাইলসের ওপর প্লেয়ারদের পায়ের চাপ পড়লে কগগুলো লাট্টুর মতো ঘুরতে থাকে, যা থেকে জেনারেটরের নীতিতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এই টাইলসগুলোর অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে এতে ব্যবহার করা হয়েছে এক বিশেষ ধরনের প্রযুক্তি, যার নাম Application programming Interface, যা ডেটা ধরে রাখবে, মনিটর করবে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক বা টুইটারে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের কোথায় কত লোক সমাগম হয় তাও জানা যাবে এরই মাধ্যমে।

জায়গা প্রস্তুতকরণ ও ইনস্টলেশন

টাইলস বসানোর জন্য প্রথমে ওই স্থানের মাটি সরাতে হবে। অতঃপর ভেতরের মাটি কংক্রিট দিয়ে সমান্তরাল করে নিতে হবে। এরপর টাইলসটি এমনভাবে স্থাপন করতে হবে যেন তা শক্তভাবে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। প্রতিটি টাইলস ইনস্টলেশনের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। প্রথমত, টাইলসের ওপরের আবরণ সরিয়ে নিতে হবে। শুধু টাইলসটি মাটির মধ্যে বসিয়ে ওপরের আবরণটি টাইলসের ওপরে পুনরায় স্থাপন করতে হবে। এভাবে টাইলসগুলোর জন্য জায়গা প্রস্তুতকরণ ও ইনস্টলেশনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এ কাজটি খুবই সহজসাধ্য এবং কম সময়ের মধ্যে করা সম্ভব।

টাইলসের বৈশিষ্ট্য

ওয়্যালেস ডেটা ট্রান্সমিট করার ক্ষমতাসম্পন্ন এ টাইলস-

  • যেকোনো তথ্যকে অ্যানালাইসিস করার ক্ষমতা রাখে।
  • প্রতিটি টাইলস ২০ মিলিয়ন তথা ২ কোটি ফুটস্টেপের চাপ গ্রহণ করার সক্ষমতা রাখে। এ ছাড়া এই টাইলসগুলো ১ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত পানির নিচে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখে, যা কি না আমাদের মতো বন্যাপ্রবণ দেশের জন্য দারুন উপযোগী।
  • সহজে স্থাপন ও পরিবর্তনযোগ্য।
  • উৎপন্ন শক্তিকে জমা রাখা ও ট্রান্সমিট করা যায় যা যেকোনো দুর্যোগকালীন সময়ে ব্যবহারযোগ্য।
  • টাইলসগুলো ১০০ শতাংশ রিসাইকেবল ট্রাকের টায়ার এর তন্তু দ্বারা প্রস্তুতকৃত।
  • প্রতিটি টাইলস ৪১৭ দশমিক ৭২ বর্গইঞ্চি, যা ১৭ দশমিক ৭ ইঞ্চি চওড়া ও ২৩ দশমিক ৬ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে আর উচ্চতা হয় ৬৮ মিমি। অর্থাৎ ২ দশমিক ৬৭ ইঞ্চি।
  • মানুষের চাহিদা ও স্থানভেদে টাইলসগুলো হতে পারে বিভিন্ন রঙের, যা একই সঙ্গে সৌন্দর্যবর্ধনেও সহায়ক।

বহুমুখী ব্যবহার

  • অ্যাডভারটাইজিং ডিসপ্লে: ইদানীং রাস্তাঘাটে বা ফুটপাতে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডভারটাইজিং ডিসপ্লে দেখা যায়। এই অ্যাডভারটাইজিং ডিসপ্লেগুলো অতি সহজেই পেভজেন প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এর সাহায্যে চালানো যায়।
  • চার্জের প্রয়োজনে: ফুপস্টেপ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি অফ গ্রিডের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রে ব্যবহার করা যায়। এমনকি ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সঞ্চয় করে রাখা যায়।
  • সড়ক বাতি ও ওয়ে ফাইন্ডিংয়ের কাজে: রাস্তায় ব্যবহৃত লো-ভোল্টেজের এলইডি লাইট ও ওয়ে ফাইন্ডিং অর্থাৎ ডানে বা বামে চলুন খোঁজার কাজে, বিভিন্ন হাসপাতাল, অফিস, বিমানবন্দর, বাসস্টপ, শপিংমল, স্টেডিয়াম, ইউনিভার্সিটি, জাদুঘরসহ অন্যান্য বিশেষ দিক নির্দেশের কাজে এটা ব্যবহার করা যায়।

পেভজেন প্রযুক্তির আরও কিছু ব্যবহার

  • আমরা বাচ্চাদের জুতায় আলো জ্বলতে দেখি। পেভজেন সিস্টেমের খুবই ক্ষুদ্র সংস্করণ এটি।
  • রাস্তায় হাঁটার পথে একটি ভিন্ন আকৃতির গাড়ি চলতে দেখি কখনো কখনো। নামটা খেয়াল করলে দেখা যায় Toyota Prius এ গাড়িটির বিশেষত্ব হলো এটাকে বলা হয় হাইব্রিড গাড়ি। গাড়িটিতে ব্যবহৃত বিশেষ এ প্রযুক্তির সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে আলোচিত  পেভজেন এ প্রযুক্তির। এ গাড়িগুলোতে যখন ব্রেক করা হয় বা ঢালু রাস্তায় চলে তখন জ্বালানি খুবই কম খরচ হয়। গাড়িটিতে উৎপাদিত শক্তি ব্যাটারিতে সঞ্চিত থাকে, যা গাড়ির স্পিড কম থাকা অবস্থায় গাড়িটিকে শক্তি প্রদান করে, ফলে জ্বালানি খরচ খুবই কম হয়।
  • শুধু পেভজেন একাই নয়, Human Kinetic Energy নামে কানাডার বায়োনিক শক্তি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হাঁটুতে পরিধানযোগ্য বেল্ট আবিষ্কার করেছে, যা পরিহিত অবস্থায় হাঁটার মাধ্যমে উৎপাদিত হয় বিদ্যুৎ। তাঁদের এ আবিষ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী। 
  • আমাদের জুতার সোলের মধ্যে বসানো যন্ত্র থেকে হাঁটার মাধ্যমে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে তা দিয়ে মোবাইল কিংবা ইউএসবি চার্জ দেওয়া যাবে অনায়াসেই। ২০১৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন গুগল কর্তৃক আয়োজিত উদ্ভাবনী প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণকারী এ প্রজেক্টটি মনোনীত হয় চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য। এ ছাড়া  Global Science Fair (GSF)-2014-এর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় প্রজেক্টটি প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ভবিষ্যতে এমন দিন আসবে, যখন পৃথিবী বিখ্যাত জুতার কোম্পানিগুলো এ আইডিয়া গ্রহণপূর্বক জুতা বাজারজাত করা শুরু করবে।

বিশ্বের যেখানে এই টাইলসগুলো স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে বিদ্যুৎ

  • রিও ডি জেনিরো, ব্রাজিল
  • হ্যারোডস, লন্ডন
  • হিথ্রো এয়ারপোর্ট, লন্ডন
  • সেইন্ট ওমের ট্রেনস্টেশন, ফ্রান্স
  • ওয়েবস্টার ইউনিভার্সিটি, মিশৌরি, যুক্তরাষ্ট্র
  • কিয়া মোটরস, দক্ষিণ কোরিয়া।

এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে আরও বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হয়েছে বিশেষ ধরনের এই টাইলস, যা ওই স্থানের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

বর্তমান বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনভাবে নতুন আঙ্গিকে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের এই প্রযুক্তি সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। সেই সঙ্গে পেয়েছে দারুন সব স্বীকৃতি। যার মধ্যে রয়েছে-

  • লন্ডন প্ল্যানিং অ্যাওয়ার্ডস, ২০১৫ (Best Conceptual Project Award)
  • ২ ডিগ্রিস অ্যাওয়ার্ডস, ২০১৪ (Energy and Carbon Management)
  • লন্ডন শেল স্প্রিং বোর্ড অ্যাওয়ার্ডস (innovation in low-carbon technology)
  • পিইএ অ্যাওয়ার্ডস চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০১৪ (Energy Saving Idea)
  • ওয়ার্ল্ড টেকনোলজি নেটওয়ার্ক অ্যাওয়ার্ডস ২০১২
  • ইউকে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অ্যাওয়ার্ডস ২০১২ (Exporting for Growth Prize)
  • ক্লাইমেট উইক অ্যাওয়ার্ডস ২০১২
  • ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অ্যাওয়ার্ডস ২০১১ (Sustainability Prize)
  • ইন্টান্যাশনাল গ্রিন অ্যাওয়ার্ডস ২০১১ (Best Green Technology Award)
ডিজেন

পেভজেন প্রযুক্তি: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের বড় সমস্যা বিদ্যুতের ঘাটতি। কেননা বাংলাদেশে বিদ্যুত ঘাটতি ২০০০ মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ আরও ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারলে বিদ্যুতের সমস্যা আপাতত মেটানো যাবে। কিন্তু বাস্তবতা পুরোটাই ভিন্ন। বাংলাদেশে মাত্র ৪০ শতাংশ (access to electricity) বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। বিদ্যুতের ঘাটতি হিসাবের সময় বাকি ৬০ শতাংশের হিসাব করা হয় না। অর্থাৎ, আগামী ১০ বছর ধরে পরিকল্পনা করে বিদ্যুৎ আমদানি করে ও উৎপাদন বাড়িয়েও বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়, যদি বিদ্যুতের কানেকটিভিটি বাড়ানো না হয়। ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে যদি আরও ১০ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুতের কানেকশন দেওয়া হয়, তাহলে অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে যায়।

মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। অথচ বিদ্যুতের উৎপাদনের মূল উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস ফুরিয়ে আসছে। প্রযুক্তির কোনো অভূতপূর্ব উন্নতি না হলে কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস আমদানি করতে হবে। একটা পথ হলো ভারত, নেপাল, ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করা। আরেকটা হলো, মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করা। আর বাকি থাকে অপ্রচলিত বা নবায়ণযোগ্য শক্তি। একমাত্র এই সম্ভাবনাই এখনো বিতর্কের ঊর্ধ্বে। সৌর-প্রযুক্তি ও বায়ুশক্তির পাশাপাশি যেকোনো নতুন শক্তির উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা থেকে চাহিদা মেটানোর মতো অবস্থায় যেতে অন্তত পাঁচ থেকে আট বছর সময় লাগে। অর্থাৎ, আজ একটা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের পরিকল্পনা করলে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ পেতে ২০১৮ সাল লেগে যাবে। আর সেই সঙ্গেই শুরু করা যাক সোলার, উইন্ড, বায়োম্যাস আর টাইডাল পাওয়ার নিয়ে পাইলট প্রজেক্ট। এগুলো থেকে যথেষ্ট বিদ্যুৎ পেতে ১০ থেকে ১২ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমগ্র বিশ্ব এখনো মূলত কয়লা, তেল, গ্যাস, জলশক্তি ও পারমাণবিক জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান বিশ্বে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ৫ শতাংশ তৈরি হয় নবায়নযোগ্য সৌর, বায়ু ও জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ৫০ থেকে ৬০ বছর পর বিশ্বে নবায়নযোগ্য সৌর, বায়ু ইত্যাদি শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ সহজলভ্য হবে এবং তখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বিদ্যুৎ সমস্যার বেশির ভাগই হ্রাস পাবে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি নিরাপত্তাহীন দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা কতটা নাজুক হতে পারে কিংবা তা সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকেরা চিন্তিত বৈকি! বর্তমানে দেশে প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট (দৈনিক সর্বোচ্চ) বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। ভবিষ্যৎ বিদ্যুতের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি ভাষ্যমতে, ২০২০ সালে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ২২ হাজার মেগাওয়াট, আর ২০৩০ সালে এ লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার মেগাওয়াট। ২০২০ সালে ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ পেতে হলে এখন থেকে গড়ে প্রতিবছর দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং বাড়াতে হবে তার পরের ১০ বছর গড়ে প্রতিবছর আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন।

এই যখন দেশের বিদ্যুতের চিত্র তখন আলোচিত পেভজেন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের এখানে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে এটা সব দিক দিয়েই উত্তম বিকল্প হতে পারে। এই মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মূলত যেটা প্রয়োজন তা হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণ ‘ফুটস্টেপ’। আমাদের মতো জনবহুল দেশে তাই ‘ফুটস্টেপ’ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন আদর্শ একটি পন্থা হওয়া অসম্ভব নয়। বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রামের কথা যদি আমরা হিসাব করি তাহলে দেখব এই প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জন্য খুবই সহায়ক। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর মানুষের আনাগোনা তথা চলাচলের। আমরা খুব ভালো করেই জানি, ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাস্তায় বা ফুটপাতে মানুষ চলাচলের কোনো কমতি নেই। সেই হিসাবে এটা আমাদের জন্য খুবই কার্যকরী ও আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা যেমন: ফার্মগেট, কাওরান বাজার, মিরপুর, মগবাজার, নীলক্ষেত, মতিঝিল, শাহবাগসহ প্রায় সম্পূর্ণ ঢাকা শহরে প্রচুর মানুষ চলাচল করে। এই জায়গাগুলোতে বিশেষ ধরনের এই টাইলস ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা নির্দিষ্ট ওই স্থানের চাহিদা পূরণ শেষে জাতীয় গ্রিডে প্রেরণ করা অসম্ভব নয়। এটা আমরা প্রয়োগ করতে পারি ফ্লাইওভারে, ফুটপাতে, রাস্তায়, স্টেডিয়ামে, বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে ও জনবহুল সমাবেশে। আমাদের দেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জনবহুল এলাকার জন্য এ পদ্ধতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে খুবই সহজসাধ্য ও সাশ্রয়ী। আমাদের রয়েছে বিশাল জনশক্তি, যা কিনা অফুরন্ত সম্ভাবনার উৎস।

পেভজেন পরিবেশবান্ধব, নবায়ণযোগ্য ও সাশ্রয়ী। পেভজেন প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ শুধু প্রাথমিক স্থাপনার খরচ বাদে সাশ্রয় করবে পুরো অর্থই। আগামী দুই থেকে চার বছরের মধ্যে এই পেভজেন প্রযুক্তি হয়ে উঠবে আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় বিষয়। শুধু শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, নিরাপত্তা প্রদানের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও অবদান রাখবে এ প্রযুক্তি। প্রতিটি ফুটস্টেপকে অ্যানালাইজ করার মতো ওয়ারলেস সক্ষমতা থাকবে এই টাইলসগুলোর। শক্তি উৎপন্নকারী টাইলস মানুষের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র একটি সূচনা হলেও ভবিষ্যতের জন্য অমিত সম্ভাবনাময় ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরু এখানেই। এখান থেকেই রিনিউয়েবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে একদিন। এখান থেকেই আমরা হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি। বাস্তবায়ন করতে পারি এমন এক ঢাকা শহরের, এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকব স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশে হবে না লোডশেডিং। তারের জঞ্জালমুক্ত ঢাকার বাসিন্দা হব আমরা। সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top