প্রাচীন ঐতিহ্যের মসলিন আর অধুনা প্রায় হারিয়ে যাওয়া জামদানির সুখস্মৃতিকে সঙ্গী করে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সূচনা, বিকাশ ও ক্রমোন্নয়ন। আবহমান বাংলার সরল নারীদের মমতা আর নিপুণ হাতের সেলাইকর্ম এখন নকশিকাঁথার শীতল অঙ্গন পেরিয়ে বিশ্বায়নের এ যুগে ছড়িয়ে পড়েছে দেশীয় পোশাকের আকর্ষণীয় ব্র্যান্ড হিসেবে, যা উন্নত বিশ্বে পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনশক্তি, সুলভ শ্রমবাজার আর সুবিধাজনক ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় উন্নত বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাতে করছে ব্যাপক বিনিয়োগ। স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকের শেষ দিকে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা নিয়ে পোশাকশিল্পের পরীক্ষামূলক যাত্রার যে শুরু, ২০১৫ সালে এসে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় হাজারেরও বেশি। বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে এ দেশের পোশাক পণ্য জয় করেছে ক্রেতা-বিক্রেতার মন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এই দুটি খাতেই পোশাকশিল্প অবদান রাখছে সমভাবে। অপার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হওয়া পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ, দুর্ঘটনা, শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থাকলেও প্রয়োজনের তাগিদে এখন নতুন করে পরিবশেবান্ধব পোশাক কারখানা ভবন নির্মিত হচ্ছে এ দেশেই। আর তাই বাংলাদেশের পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক মানের নতুন বৈশ্বিক ব্রান্ডিং পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা।
কেন হতে হবে পরিবেশবান্ধব
বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউস ইফেক্ট, কার্বন নিঃসরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ ইত্যাদির মাধ্যমে বাসযোগ্য পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে পৃথিবীর; যার অন্যতম কারণ প্রকৃতিতে শিল্পকারখানার উৎপাদিত বর্জ্য নির্গমন। বিশ্বের সচেতন মানুষের তাই একটাই লক্ষ্য, শিল্পকারখানাকে যতটা সম্ভব পরিবেশবান্ধব করা। অবকাঠামো নির্মাণ খরচ বেড়ে যাবে, বাড়বে উৎপাদন ব্যয়, বিভিন্ন নিয়মকানুন মানতে হবে ইত্যাদি ভেবে অনাগ্রহী অনেকেই। অথচ পরিবেশবান্ধব কারখানার ভালো দিকগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
পরিবেশবান্ধব কারখানা অপ্রয়োজনে সবুজকে ধ্বংস করবে না বরং সবুজকে ব্যবহার করবে উৎপাদনশীলতার কাজে। সূর্যের রশ্মিকে আটকে দেবে না বরং ব্যবহার করবে কারখানাকে আলোকিত করতে কিংবা বিকল্প শক্তি উৎপাদনে। পরিবেশবান্ধব কারখানা ক্ষতিকর বর্জ্য ও আবর্জনায় পরিবেশ নষ্ট করার পরিবর্তে বর্জ্য পরিশোধন করে যতটা পারা যায় পুনর্ব্যবহার করবে। পরিবেশবান্ধব কারখানা তাই শুরুতে খরচ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়সাশ্রয়ী, অধিক উৎপাদনশীল ও একই সঙ্গে কর্মীবান্ধব।
পরিবেশবান্ধব কারখানার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ওয়ালমার্ট, ডিজনির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো অদূর ভবিষ্যতে সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব কারখানা ছাড়া উৎপাদন ও বিপণনে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তা ছাড়া কার্বন নিঃসরণ ইস্যুতে পরিবেশবাদী আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। অর্থাৎ সব ধরনের শিল্পকারখানার জন্য কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রস্তুত করা একসময় হবে বাধ্যতামূলক। এখন যাদের প্রস্তুতি থাকবে না, হঠাৎ করেই তাদের বড় ধরনের ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পড়তে হবে। সমাগত বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাকে আজ হোক কাল হোক অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে।
পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা
পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা গড়তে প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব কর্মকৌশল। ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া ও প্রচলনের প্রেক্ষাপটে এর ধরনে ভিন্নতার সুযোগ রয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রেই মোটা দাগে কয়েকটি ধাপে এগোনোর চিন্তা করা ভালো। প্রথমত, স্থাপত্য ও ডিজাইন; দ্বিতীয়ত, নির্মাণকৌশল ও নির্মাণ উপকরণ এবং তৃতীয়ত, শক্তির বা এনার্জি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ। তবে স্থাপত্য ও ডিজাইন প্রক্রিয়া শুরুর আগে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ইস্যুকে আগে গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত পোশাক কারখানার বিকেন্দ্রীকরণ। সাধারণভাবে যেকোনো কার্যকর কারখানার ক্ষেত্রে স্থান নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বর্তমানে টেকসই কারখানা নির্মাণ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় শ্রমিকেরা কর্মস্থলের জন্য স্থান পরিবর্তন করবে না বরং কারখানা শ্রমিকদের কাছে যাবে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এটি স্পষ্ট যে যদি পোশাক কারখানাটি শ্রমিকদের মূল অবস্থানের কাছাকাছি হয়, সে ক্ষেত্রে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুলাংশে কমবে। তারা তাদের বর্তমান মজুরিতে অনেক বেশি স্বচ্ছলতা ও সন্তুষ্টি নিয়ে পরিবারের সান্নিধ্যে প্রশান্তিসহকারে থাকতে পারবে। বাসস্থান ও কর্মস্থল নিজেদের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে হওয়ার যে সামাজিক সুবিধা ও পারিবারিক নিরাপত্তা তারা পাবে, তার মূল্য অনেক বেশি। তা ছাড়া পোশাক কারখানা গ্রামে হলে গ্রামের মানুষ ও গ্রামকেন্দ্রিক সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কিংবা ঢাকার আশপাশের এলাকায় কারখানা স্থানান্তর করা গেলে তাতে অন্তত শ্রমজীবী মানুষের ঢাকামুখী চাপকে অনেকাংশে কমানো যাবে। সেখানে বেশি জায়গা নিয়ে কম উচ্চতার অবকাঠামোগত সুবিধা নেওয়া যাবে। কম উচ্চতার ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ভবনের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি শক্তির চাহিদা হবে কম।
স্থাপত্য ও ডিজাইন
পরিবেশবান্ধব ধারণাটিকে সবুজ (গ্রিন), টেকসই (সাসটেইনেবল) এ রকম আরও কয়েকটি প্রতিশব্দে প্রায়ই প্রকাশ করা হয়। বিশেষত, গ্রিন বিল্ডিং বা সবুজ স্থাপনা এ সময়ে খুবই পরিচিত। অনেক স্থপতি ও প্রকৌশলীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, গ্রিন বিল্ডিং কনসেপ্ট মানে নতুন স্থাপনা কিংবা যেকোনো স্থাপনাতে গাছ লাগানো। প্রকৃতপক্ষে সবুজ ডিজাইন কতগুলো বিষয়কে সামনে রেখে করতে হয়, যা একটি স্থাপনাকে পরিবেশের প্রতি সহনীয় করে তোলে। যেমন-
- জায়গা নির্ধারণ
যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি দেখা জরুরি তা হলো যে জায়গাটিতে স্থাপনাটি হবে তার ধরন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা। যে ভূমিতে প্রকল্পটি হবে সেটি যদি কোনো আবাদি জমি হয় তবে প্রকল্পটিকে সরিয়ে আনতে হবে। বাসস্ট্যান্ড, দোকান, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুলের মতো সুবিধা নিশ্চিত হয় এমন জায়গার কাছাকাছি থাকতে যেন খুব বেশি যানবাহন ব্যবহার করতে না হয় বরং শ্রমিকেরা পায়ে হেঁটে চলাচলের চিন্তা করে। বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে মূল্যবান বনভূমি, বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি ঢাল, জলাশয়, দুর্লভ প্রাণী বা পতঙ্গের প্রজননক্ষেত্র যেন অক্ষত থাকে।
- দিক নির্বাচন
স্থাপনাটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা হলে নানা ধরনের সুবিধা পাওয়া যায়। উত্তর-দক্ষিণের বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগানো যায়, এতে স্থাপনা থাকে ঠান্ডা। পশ্চিমে রোদের তেজ কম হয়, তাপমাত্রা সহনীয় হওয়ায় কাজের চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয়।
- দিনের আলো ব্যবহার
আমাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের জন্য যে পরিমাণ আলো দরকার, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি আলো বাইরে বর্তমান। এই আলোকে কীভাবে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করানো যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাকৃতিক আলোর সংস্থান করতে গিয়ে অনেক সময় ভবনের আকৃতি, প্রস্থ, জানালার অবস্থান ও পরিমাণ, কার্নিশ, লাইট শেডে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হয়।
- জলাশয় সংরক্ষণ
প্রকল্পের আশপাশে কোনো জলাশয় থাকলে তাকে ভরাট না করে ব্যবহারোপযোগী করতে হবে। কারণ, পানির সংস্পর্শে বাতাস ঠান্ডা থাকায় সেই বাতাস যদি প্রকল্পের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, তবে অভ্যন্তরীণ স্বস্তি তৈরি হয়। তা ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটি উপযুক্ত আধার হতে পারে প্রাকৃতিক এ জলাশয়। প্রকল্পের মধ্যে বয়ে যাওয়া যেকোনো নালা বা পানির ধারাকে প্রবহমান রাখতে হবে। এতে জলাবদ্ধতার সুযোগ কমবে।
- উন্মুক্ত সবুজ কেন্দ্র
প্রতিটি প্রকল্পে কিছু জায়গা বাধ্যতামূলক ছেড়ে দিতে হয়। পরিবেশবান্ধব কারখানায় আরও বেশি জায়গা উš§ুক্ত রেখে একটি সবুজ প্রাকৃতিক অঙ্গনের পরিকল্পনা করা হয়। পরিচ্ছন্ন সবুজ উদ্যান কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে পরোক্ষ উপাদান, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অনেক সময় এই মুক্তভূমিতে গাছ রোপণ করে বাগান তৈরি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের চারপাশে স্থানীয় জাতের যেসব গাছপালা রয়েছে সেগুলোকে পছন্দের তালিকায় আনতে হবে।
- সবুজ ছাদ
সবুজ ছাদ বা গ্রিনরুফ বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়। প্রতিটি স্থাপনায় থাকে বিশাল উš§ুক্ত ছাদ। সারা দিনের সূর্যতাপে এটি প্রচুর তাপ শোষণ করে। ছাদকে ফেলে না রেখে সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ সবুজায়ন করা যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে একদিকে যেমন প্রকল্পটিতে তাপ শোষণ কম হবে, অন্যদিকে বাড়বে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। সবুজ ছাদের পাশাপাশি আরও কাজ করা যায় ‘সবুজ দেয়াল’ নিয়ে। বিশেষত আমাদের আবহাওয়ায় দেয়াল সবুজ আচ্ছাদিত করলে তা স্থাপনার অভ্যন্তরের তাপমাত্রা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
পরিবেশবান্ধব নির্মাণকৌশল
যেকোনো নির্মাণকাজ বহুমুখী উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়। যত পরিকল্পনাই করা হোক না কেন নির্মাণকাজে ভূমিবিন্যাস ও জীববৈচিত্র্যে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়। অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ পরিবেশের মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায়। পরিবেশবান্ধব নির্মাণকৌশল এমনভাবে প্রণীত হবে যেন এই পরিবর্তন ও বিঘ্নতাকে যতটা নিয়ন্ত্রণ ও কম করা যায়। কাজের শুরুতে এবং চলাকালীন নিতে হবে কতগুলো প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগ। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি অপচয় কমিয়ে পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারলে নির্মাণকাজ পরিবেশবান্ধব হিসেবে পূর্ণতা পাবে।
- পৃষ্ঠ মাটি সংরক্ষণ
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ভূপৃষ্ঠের মাটির একদম ওপরের পাতলা স্তর প্রাকৃতিক নিয়মে উর্বর, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ অনুজীবের উপকারী বাসস্থান। নির্মাণকাজের জন্য মাটি খনন করতে গেলে প্রথমেই একে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এটিই গাছপালা, সবুজ ঘাসসহ পরিবেশের জন্য সবচেয়ে উপকারী। নির্মাণকাজ করতে গিয়ে এই টপ সয়েল যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এ জন্য আলাদা জায়গায় একত্র করে ঢেকে রাখা হয়। অতঃপর কাজ শেষ হলে পুনরায় মাটিতে স্তরে স্তরে সাজিয়ে দিতে হয়।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যে আবর্জনা তৈরি হয়, সেগুলো দিয়ে অনেক সময় মাটি ভরাট করা হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করতে পারে। এ কারণে ওই আবর্জনা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং পুনরায় ব্যবহার করার কোনো সুযোগ আছে কি না, সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত অন্যত্র স্থানান্তরের ব্যবস্থাও করতে হবে।
- প্রকল্পের উপকরণ এবং পুনর্ব্যবহার
‘সবুজ ভবন’ নির্মাণকল্পে বর্তমানে সারা বিশ্বে যে বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে তা হলো পুরোনো উপকরণগুলোর যথেষ্ট ব্যবহার বা পুনর্ব্যবহার। উপকরণের পুনর্ব্যবহার একাধারে যেমন সাশ্রয়ী তেমনি পরিবেশবান্ধবও। এ জন্য প্রাপ্ত উপকরণগুলোকে ব্যবহার অনুযায়ী গ্রুপে ভাগ করে নির্মাণ সাইটে নির্দিষ্ট জায়গায় সুশৃঙ্খলভাবে রাখা যেতে পারে, যা পরে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় ব্যবহার করা যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপকরণ অন্যত্র বিক্রি বা অন্য কোনো প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারে। কোনো উপকরণ নতুনভাবে ক্রয় করার সময় বিক্রেতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে Reuse/Recycle-এর কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে কি না এই বিষয়টির দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
শক্তি বা এনার্জির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ
শিল্প সেক্টরে পানি এবং বিদ্যুৎ দুটি অতীব প্রয়োজনীয় এনার্জি। পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার অন্যতম চ্যলেঞ্জ এনার্জির পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উৎস ও জ্বালানিবিহীন বিকল্প উৎসকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজন বিশেষ পরিকল্পনার। একটি কারখানায় বিদ্যুতের ব্যবহার হয় প্রধানত দুটো কারণে; প্রথমত, মেশিন ও যন্ত্র ব্যবহার এবং দ্বিতীয়ত, সাধারণ বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন-ফ্যান, লাইট ইত্যাদির ব্যবহার। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী যন্ত্র ও সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এ ছাড়া সমগ্র বিদ্যুৎব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিকল্পনা এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ইউএসজিবিসির হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানার মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব, যা কারখানার বৈদ্যুতিক খরচকে বহুলাংশে কমিয়ে দেবে। এ জন্য থাকতে হবে যথাযথ সুইচ কন্ট্রোলিং ও সেন্সরের ব্যবস্থা।
প্রচলিত নিয়মে বিদ্যুৎ উপাদন করতে প্রচুর পরিমাণে তেল, গ্যাস, কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যয় হয়। এতে পরিবেশের ক্ষতি হয় বেশি। বিকল্প উৎস যেমন-সূর্যরশ্মি (সোলার), বায়ু (উইন্ড), পানি (হাইড্রো) ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ লাভজনক। সৌরবিদ্যুতের শুরুর খরচ বেশি বিধায় অনেকেই অনাগ্রহী থাকেন, তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে মানসম্পন্ন সোলার প্যানেল ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদি লাভ হয়।
পরিবেশবান্ধব স্থাপনা হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে পানি ব্যবহারে ব্যবহারকারীদের মধ্যে পরিমিতবোধ থাকা। স্থাপনায় সাশ্রয়ী সনদপ্রাপ্ত টয়লেট ফিক্সার ও ফিটিংস ব্যবহার করা, যাতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি পানি বের না হয়। তা ছাড়া টয়লেট ফিটিংস ও ফিক্সারে সেন্সর ব্যবহার করে অধিকমাত্রায় পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আবাসন ও শিল্প খাতে যে পরিমাণ পানি প্রতিদিন ব্যবহার করা হয়, যার ৪০ শতাংশ রিসাইক্লিলিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য। রিসাইকেল্ড পানি ফ্লোরওয়াশ, ক্লথ ক্লিনিং, ইয়ার্ড ক্লিনিং, গাড়ি ধোয়া, বাগানে পানি দেওয়া কিংবা টয়লেট ফ্লাসে অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। বৃষ্টিপ্রধান বাংলাদেশে প্রতিটি স্থাপনায় বৃষ্টির পানিকে ধরে রাখার সুব্যবস্থা করা হলে পরিবেশের দিক থেকে সেটি হবে উল্লেখযোগ্য অর্জন। দালানকোঠা, রাস্তাঘাট নির্মাণে খালি জায়গা ক্রমেই কমছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশ। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। তাই বৃষ্টির পানি ভবনের ছাদে অথবা মাটির নিচে আলাদা আধার করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বৃষ্টির পানি নিরাপদ। কেননা এটি আর্সেনিক ও রোগ-জীবাণুমুক্ত। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বছরের অন্তত চার মাস বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে খুব সহজেই সাধারণ শ্রমিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত পানির ৫০ শতাংশ চাহিদা মেটানো সম্ভব। সে ক্ষেত্রে পাম্পিং খরচটাও কমে যাবে। রক্ষিত হবে পরিবেশের ভারসাম্য।
তিনটি ধাপের পরেও আরেকটি গুরুত¦পূর্ণ ধাপ থেকে যায় সেটি রক্ষণাবেক্ষণ। পরিবেশবান্ধব কারখানার দীর্ঘমেয়াদি এবং কার্যকর সুফল পেতে হলে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনের জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকা চাই। অপচয় রোধ করার জন্য সবাইকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব স্বীকৃতি
পরিবেশবান্ধব যেকোনো স্থাপনা তার জীবনচক্রে কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত প্রতিটি অধ্যায়ে পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি স্পর্শকাতর প্রতিক্রিয়া দেখায়। একদম পরিকল্পনা থেকে শুরু করে নকশা তৈরি, ভবন নির্মাণ, পরিচলন, রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার এমনকি ভেঙে ফেলা কোনো কিছুই এর বাইরে নয়। সবুজ স্থাপনা সব সময়ই পরিবেশ আর এর কার্যকলাপের মধ্যে একধরনের ভারসাম্য বজায় রেখে কাজ করে। একটি স্থাপনা কতটুকু পরিবেশবান্ধব তা নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কিছু প্যারামিটার রয়েছে। পরিবেশ ইস্যু খুব পুরোনো না হলেও উন্নত দেশসমূহে বিভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির ব্যবস্থা আছে। যেমন-কানাডায় গ্রিন স্টার, যুক্তরাজ্যে ব্রিয়াম, মধ্যপ্রাচ্যে এস্ট্রোডার্মা, ভারতে গৃহ, জার্মানিতে ডিজিএনবি, জাপানে ক্যাসবি ইত্যাদি বিভিন্ন নামে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রিন রেটিং পদ্ধতির প্রচলন আছে।
বর্তমানে ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে সবুজ ভবনের উপকারিতা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। তারা এজ (এক্সেলেন্স ইন ডিজাইন ফর গ্রেটার ইফিসিয়েনসিজ) নামে একটি রেটিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল প্রবর্তিত লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সার্টিফিকেশন সিস্টেমটি পৃথিবীব্যাপী বেশি জনপ্রিয় ও সমাদৃত। আমাদের দেশের পোশাকশিল্প মূলত ইউএসজিবিসি থেকে লিড সনদ নিয়ে থাকে। LEED বা Leadership in Energy and Environmental Design হলো বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ও গ্রহণযোগ্য গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম, যা কোনো স্থাপনা বা ভবনের পরিবেশগত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯৯ সালে এই লিড সার্টিফিকেশন পদ্ধতিটি চালু হয়। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত পাঁচটি ক্ষেত্রে কোনো ভবনের টেকসই কার্যকারিতার পর্যালোচনা করে পয়েন্ট রেটিংয়ের মাধ্যমে লিড সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এই পাঁচটি ক্ষেত্র হলো- টেকসই সাইট, পানিসাশ্রয়, শক্তিসাশ্রয়, নির্মাণসামগ্রী নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ।
ভিন্ন ভিন্ন ভবনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন লিড সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। লিড সার্টিফিকেশনের চারটি মাত্রা রয়েছে। এগুলো হলো- সার্টিফাইড, সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম। লিড সনদ পেতে একটি কারখানাকে নির্মাণ থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত পরিবেশগত মান রক্ষা করতে হয়। নির্মাণপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা আলাদা মূল্যায়ন করা হয়।
পরিবেশবান্ধব কারখানা বাংলাদেশে
কারখানা মানেই শব্দ, ধুলো, এলোমেলো, আবর্জনা আর যতসব বিরক্তির উন্মেষ। তবে সময় বদলেছে, মানুষের মানসিকতা বদলেছে এবং বদলেছে সৌন্দর্যচিন্তার মাত্রা। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নানা ধরনের চড়াই-উতড়াই পেরিয়ে উৎকর্ষতা আর অনন্যতায় এখন সামনে এগিয়ে চলেছে। রানা প্লাজাধসের নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি সরিয়ে সবুজ কারখানার উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন প্রথম সারির একটি নাম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা বাস্তবায়ন খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। বিশেষত ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের গাইডলাইন অনুসরণ করে পোশাক কারখানা নির্মাণ কেবলই উদ্যোগের ব্যাপার মাত্র। আমাদের দেশের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ের। খুব অল্প কিছু সময় ব্যতীত আমাদের আছে পর্যাপ্ত সূর্যলোক, আমাদের দেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর, অল্প পরিশ্রমে সবুজের সমারোহে ছেয়ে যায় চারপাশ। পানি সুলভ ও সহজপ্রাপ্য উপাদান। সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের বিচিত্র এই বৈচিত্র্যকে ধরে রাখা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব কারখানা নির্মাণে আগ্রহ ও উদ্যোগ তৈরি হয়েছে। ২০১২ সালে ঈশ্বরদী ইপিজেডে ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও’ ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের পরিবেশবান্ধব সর্বোচ্চ লিড প্লাটিনাম সনদ অর্জন করে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। পোশাকশিল্প অঙ্গনে এ দেশীয় ভিনটেজ ডেনিম একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। আরও বেশ কিছু রুচিশীল পোশাক ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এসেছেন পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা নির্মাণে। ইউএসজিবিসির রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৩২টি কারখানা তাদের তালিকাভুক্ত, যাদের মধ্যে ২৭টি কারখানা বিভিন্ন লেভেলে সনদ অর্জন করেছে এবং বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত ‘প্লামি ফ্যাশন’ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব নিট পোশাক কারখানা হিসেবে সম্মানিত ও আদৃত। প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত কারখানার তালিকায় আরও আছে এনভয় টেক্সটাইল, জেনেসিস ওয়াশিং, তারাসিমা আ্যাপারেলস এবং এসকিউ গ্রুপের তিনটি কারখানা। এ ছাড়া ইপিলিয়ন স্টাইল, কেনপার্ক বিডি লি, হেলা ক্লোথিং, শ্রুতি টেক্সটাইল, ভিয়েলাটেক্স ইন্টারন্যাশরাল, একেএইচ ইকো অ্যাপারেলস, রিজেন্সি গার্মেন্টসসহ আরও কয়েকটি কারখানা অর্জন করেছে গোল্ড সনদ। পরিবেশবান্ধব কারখানা নিয়ে এখন প্রদর্শনী হচ্ছে, হচ্ছে প্রশিক্ষণ। স্থপতি, প্রকৌশলী, কারখানার মালিক, নির্মাতা সবার মধ্যেই তৈরি হচ্ছে সচেতনতা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশবান্ধব কারখানার অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতে হবে আরও বিকশিত।
প্লামি ফ্যাশন
স্থপতি মেহেরুন ফারজানা
প্লামি ফ্যাশন সারা বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার মধ্যে গুণগত বিবেচনায় শীর্ষ স্থানীয়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের স্বীকৃতি অনুযায়ী, প্লামি ফ্যাশন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রেটিংপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব সবুজ পোশাক কারখানা। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের উত্তর নরসিংহপুরে প্রায় ৫.৫ একর জায়গার ওপরে প্লামি ফ্যাশনের অবস্থান। স্থপতি মেহেরুন ফারজানার নেতৃত্বে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান আর্কভিজের ছয় সদস্যের একটি টিম ২০১৪ সালে প্লামি ফ্যাশনের কাজ শুরু করে।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় কারখানার মোট এলাকার ৫২ শতাংশ পরিসর একদম খোলা রাখা হয়েছে এবং হাঁটার পথ ছাড়া বাকি জায়গা ঢেকে দেওয়া হয়েছে অকৃত্রিম সবুজের চাদরে। উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত ৫০ হাজার বর্গফুটের লম্বাটে ভবনটি মূল কারখানা ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্য দুটি ভবন ব্যবহৃত হচ্ছে প্রশাসনিক ও লাইফস্টাইল ভবন হিসেবে। লাইফ স্টাইল ভবনে শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিনোদন, অনুষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা, শিশুপালন এবং অন্যান্য সুবিধা নিয়ে সাজানো হয়েছে। তিনটি ভবনের মাঝের সবুজ খোলা জায়গায় রয়েছে বসার জায়গা এবং উš§ুক্ত জলাশয়।
সবুজ কারখানা নির্মাণে ইউএসজিবিসির যথাযথ নির্দেশনা মেনে কারখানার সব ডিজাইন এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। মূল কারখানা ভবন এমনভাবে করা হয়েছে যেন দিনের আলো ব্যবহারেই দ্বিতীয় তলায় সব ধরনের উৎপাদন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে সবাই চলে আসতে পারবে ভবনের চতুষ্পার্শ্বস্থ বারান্দায়। তা ছাড়া বারান্দা থাকার কারণে সূর্যের তাপের তীব্রতা থেকে নিরাপদ থাকবে মূল ভবন। নির্মাণ উপকরণের ৯০ শতাংশই দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। কারখানাটি তৈরি করা হয়েছে পবিবেশবান্ধব উপকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। লাগানো হয়েছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন গাছ। ‘রিসাইক্লিং’ পদ্ধতিতে করা হচ্ছে কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। পানি পরিশোধন করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে।
প্লামি ফ্যাশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি শুরু হয়েছে ৫০ শতাংশ জ্বালানি ও পানিসাশ্রয়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোওয়াট বা ১৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া ২০১৯ সালে কারখানাটি ‘জিরো ডিসপোজাল’-এ চলে যাবে যেখানে শতভাগ পানি পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও
স্থপতি রাহাত মাহমুদ চৌধুরী
ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড আর শ্রমিক অসন্তোষের সংবাদে বাংলাদেশের পোশাক খাত যখন বিব্রত এবং বিপর্যস্ত ঠিক তেমনই একসময়ে ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও একটি স্বস্তিদায়ক সুখকর খবরের উৎস হয়ে ওঠে। ২০১২ সালে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল পরিবেশবান্ধব সর্বোচ্চ সনদ লিড প্লাটিনামে ভূষিত করে ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিওকে। বাংলাদেশের এবা গ্রুপের এ কারখানাটি ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় (ইপিজেডে) ৯.২ একর জমির ওপর গড়ে ওটা অন্যতম আকর্ষণীয় পোশাক কারখানা কমপ্লেক্স। সবুজ গাছগাছালি ঘেরা, শান্ত পানির জলাশয়, লাল প্রাকৃতিক ইটের তৈরি কারখানাটি যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
ইউএসজিবিসির পবিরবেশবান্ধব সনদ পেতে একটি কারখানাকে নির্মাণ থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিবেশগতমান রক্ষা করতে হয়। নির্মাণপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা আলাদা নম্বর আছে। ভিনটেজ ডেনিমের স্থপতি রাহাত মাহমুদ চৌধুরী তাঁর টিম নিয়ে সে অনুযায়ী সব কাজকে সুচারুরূপে সম্পন্ন করেন। কমপ্লেক্সের ৩০ শতাংশ জায়গা বিনোদন, খেলার মাঠ, চলাচলের করিডর ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য ছেড়ে দেওয়া। সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে গড়ে তোলা ২ লাখ ৯৮ হাজার বর্গফুটজুড়ে নির্মিত স্টিল কাঠামোর একতলা কারখানা ভবনটির নকশা এমনভাবে করা, যেন দিনের বেলায় শতভাগ সূর্যের আলো ব্যবহার করা যায়। স্টিলের কাঠামোর ভবনটির ছাদ তাপ শোষণ না করে বিকিরণ করে। ছাদের কোথাও কোথাও আলো প্রবেশের জন্য স্বচ্ছ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কারখানার ভেতরভাগ আলোকিত। এখানে স্থাপন করা হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় সোলার প্যানেল। ১৩ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে সোলার প্যানেল থেকে। কারখানাটি সাশ্রয় করে ৪৬ শতাংশ বিদ্যুৎ, পানি বিশুদ্ধ করার জন্য অনুসরণ করে সর্বোচ্চ মান। প্রতিষ্ঠানটি নানাভাবে ৫৩ শতাংশ পানিসাশ্রয় করে। কারখানাটির বর্জ্য শোধনের জন্য যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে প্রতি ঘণ্টায় ৭০ হাজার লিটার পানি পরিশোধন করা যায়।
কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ স্বাস্থ্যকর এবং শ্রমিকদের মানসিক বিকাশে সহায়ক। স্বচ্ছ কাচের দেয়াল চারদিকের সবুজের সঙ্গে কারখানার ভেতরের পরিবেশকে একাত্ম করে তোলে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার কারখানার ভেতরে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। অভ্যন্তরীণ দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে স্বাস্থ্যকর অর্গানিক রং।
শেষের আগে
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয় বহুল আলোচিত একটি বিষয়। পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যে হারে দিন দিন বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে অচিরেই পৃথিবী নামক গ্রহটি দ্রুতই হুমকির মুখে পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এ ধরণিকে রক্ষার জন্য চলছে নানা আয়োজন। অনুষ্ঠিত হচ্ছে পরিবেশ সম্মেলন। গঠিত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ফান্ড। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভৌগোলিক সাম্যাবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম বণ্টন এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের ওপর জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশে নির্ভরশীল। সে ক্ষেত্রে প্রকৌশলী এবং স্থপতিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দিন দিন বিভিন্ন চাহিদাকে মাথায় রেখে ভূপৃষ্ঠে যে হারে স্থাপনা গড়ে উঠছে, সেই একই হারে কমছে সবুজ বনভূমি, অগভীর জলাশয়, কাটা হচ্ছে পাহাড়, পরিবর্তন করা হচ্ছে নদ-নদীর গতিপথ। তাই প্রকৌশলী এবং স্থপতিদের হতে হবে আরও দায়িত্ববান। পরিবেশ রক্ষার্থে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে সর্বাগ্রে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।