ঐতিহ্যের মানচিত্রে এমন কিছু স্থাপনা আছে যাকে, খুব বেশি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। হাজিয়া সোফিয়া এমনই একটি স্থাপত্যকর্ম, যা ইতিহাসসমৃদ্ধ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সুপ্রাচীন সভ্যতার পরিচায়ক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংযোগস্থল হিসেবে খ্যাত তুরস্কের প্রাচীন নগর ইস্তাম্বুলে এর অবস্থান। সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ঘটনাবহুল ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি এই সোফিয়া। এক কালে রোম সাম্রাজ্যের গর্ব, পরবর্তী সময়ে তুর্কি সুলতান আর উত্তরকালে দুঃসাহসী কামাল পাশার দেশে যাঁরা বেড়াতে যাবেন আর কিছু না হলেও হাজিয়া সোফিয়া থাকবে ভ্রমণ তালিকার শীর্ষে। হাজিয়া সোফিয়া নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হলেও তুর্কি ভাষায় এর আসল নাম আয়া সোফিয়া। এই বিশাল স্থাপনার বিশালত্ব আসলেই দর্শনার্থীকে ছুঁয়ে যায়। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই সৌন্দর্য দেখার সবচেয়ে ভালো উপায় একটু সময় নিয়ে হেঁটে বেড়ানো।
ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের তত্ত্বাবধানে আয়া সোফিয়ার গোড়াপত্তন ঘটে। প্রায় হাজার বছর ধরে এটি ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ চার্চ কমপ্লেক্স। রোমান সমাজ-সংস্কৃতিতে, বিশেষত রাজশক্তির স্থায়িত্ব ও প্রতিপত্তির পেছনে ধর্মের ছিল বড় গুরুত্ব। আর চার্চ ছিল ক্রিস্টিয়ান রাস্ট্রের এক অর্থে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। বৃহৎ এই কমপ্লেক্স সমকালীন বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের মর্যাদা ও বড়ত্বের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। অবশ্য কারও কারও মতে হাজিয়া সোফিয়ার স্থলে আগেও একটি ছোট চার্চ ছিল। সম্রাট জাস্টিনিয়ানের সময়ে নানা অনিয়ম ও অপশাসনে বিরক্ত হয়ে জনগণের মধ্যে একবার বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা দেয়। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে বড় বড় বেশ কটি শহরে। কিন্তু সম্রাট তাঁর রাজশক্তি প্রয়োগ করে নির্মমভাবে দমন করে সে বিদ্রোহ। এ অস্থির সময়ে চার্চটি ভস্মীভূত হয়। জাস্টিনিয়ান এটিকে পুনর্নির্মাণ করে চার্চকে তার বিজয়ের প্রতীক হিসেবে প্রচার করতে উদ্বুদ্ধ হন। এই প্রেক্ষাপটে হাজিয়া সোফিয়ার পরিকল্পনা করা হয়। একটি রাজকীয় স্থাপনা হিসেবে আড়ম্বর ও জৌলুশসহকারে শেষ হয় এর নির্মাণ। হাজিয়া সোফিয়ার দুটি লেভেলে ফ্লোরের অবস্থান দেখে ধারণা করা হয় প্রভাবশালী ও সাধারণের জন্য ছিল বসার আলাদা ব্যবস্থা। ওপরতলায় গ্যালারি আর নিচতলা সমতল মুক্ত জায়গা। নারী ও পুরুষের জন্য ছিল আলাদা বসার ব্যবস্থা। ওপরের লেভেলে গ্যালারির একটা অংশ রাজকীয় আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিচতলার মুক্ত হলঘরে কখনো কখনো বসত অনানুষ্ঠানিক রাজসভা। তবে একটা সময় শুধু চার্চ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে থাকে। এই ব্যবহার অব্যাহত ছিল পনেরো শ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত। ১৪৫৩ সালে সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয় (তুর্কি ভায়ায় মেহমেত টু) কনস্ট্যান্টিনোপল অধিকার করেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে এই চার্চের এক প্রান্তে নামাজ আদায় করেন। মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চার্চের কাজকর্মে ভাটা পড়ে। আস্তে আস্তে একসময় এটি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। অযত্নে-অবহেলায় কমতে থাকে জৌলুশ। সুলতান মেহমেত একে মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়ে সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেন। হাজিয়া সোফিয়া কমপ্লেক্সের চারপাশে প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতার চারটি মিনার সংযোজন করা হয়। নির্মাণকালে এটি ছিল তখনকার দিনের সর্বো”” স্থাপনা। মসজিদের উপযোগী করার জন্য ভেতরের কিছু চিত্রকর্ম ঢেকে দিয়ে সুদৃশ্য ক্যালিওগ্রাফিসংবলিত প্লাস্টার এবং মার্বেল পাথরের অলংকরণ করা হয়। সামনে চমৎকার বাগান ও ফোয়ারার ব্যবহার পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সকে আকর্ষণীয় ও মনোরম করে তোলে। একপাশে আছে স্বয়ং সুলতানের সমাধি। তবে এ মসজিদকে একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ক্ষয়িষ্ণু উসমানিয়া খেলাফতের বিলুপ্ত ঘোষণা করে তুরস্কের শাসনভার নিজে গ্রহণ করেন। পুরো দেশকে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে মসজিদে নিয়মিত নামাজ বন্ধ করে দেন। এ সময় এটিকে মিউজিয়াম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৩৪ সাল থেকে এখনো এটি মিউজিয়াম হিসেবেই রয়েছে। সম্প্রতি এখানে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদ হিসেবে ঘোষণার কোনো খবর নেই।
হাজিয়া সোফিয়া শব্দের অর্থ পবিত্র জ্ঞান। এই জ্ঞানের আধার একটি বিশাল হলঘর, যাকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকে ঘোরানো প্রশস্ত বারান্দা। হলঘরের মাথার ওপরে বিশাল গম্ভুজ। এর চারদিকে রয়েছে আরও অনেক ছোট ছোট গম্ভুজ। স্টিল স্ট্রাকচার ছাড়া এত বড় স্থাপনা নির্মাণ আসলে ভাবাই যায় না। নকশা অনুযায়ী, এটি ২৭০ ফুট লম্বা ও ২৪০ ফুট চওড়া। গম্ভুজের ব্যস ১০৮ ফুট। মাটি থেকে গম্ভুজের চূড়ার অবস্থান প্রায় ১৮০ ফুট ওপরে। গম্ভুজের যে অংশ ছাদের ওপরে বসেছে, সেখানে চতুর্দিকে ঘোরানো ছোট ছোট অনেক জানালা। এসব জানালা থেকে মৃদু আলো প্রবেশ করে ভেতরকে আলোকিত করে রাখছে, নরম রোদে ঝকঝক করে দেয়ালের সোনালি রঙা মোজাইক আর বিচিত্র কারুকাজ করা নানা চিত্রকর্ম। পুরো দেয়ালের ভারীত্বকে অনেকটা প্রশমিত করছে এই রোদ আর ছায়ার খেলা। একটা অদ্ভুত রহস্যের জন্ম দিচ্ছে যেন। ক্যাথেড্রালের নারথেক্স থেকে নেভে প্রবেশের জন্য মোট নয়টি ডোরওয়ে আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে সুদৃশ্য ও অলংকৃত পথটি সম্রাট আর তাঁর সভাসদদের জন্য নির্দিষ্ট।
নির্মাণকাজের শুরুতে সম্র্রাট জাস্টিনিয়ান এন্থেমিয়াস ও আইসিডোর নামে দুজন ডিজাইনারের শরণাপন্ন হন। অবশ্য বর্তমান সময়ের লেখকেরা বলে থাকেন এই নাম কোনো ব্যক্তির নয়। সে আমলে ভবন নির্মাণ ও ডিজাইনের কাজে পারদর্শী ব্যক্তিদের এ রকম কয়েকটি বিশেষ নামে অভিহিত করা হতো। অল্প সময়ের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। মাত্র ছয় বছর সময় লাগে এই বিশাল স্থাপনাকে বাস্তব রূপ দিতে। এই অল্প সময়ের নির্মাণকাজে সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয় বিশালাকৃতির গম্ভুজ নির্মাণে। বেশ কয়েকবার ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এটি। কয়েকটি বিশালাকৃতির পায়ার ওপরে সম্পূর্ণ গম্ভুজের ভর স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আসলে পুরো গম্ভুজের ভার বহনের জন্য এ কয়েকটি পায়া যথেষ্ট ছিল না।
ডিজাইনার এন্থেমিয়াস ও আইসিডোর অনেকভাবে মেধা খাটিয়ে গম্ভুজটি বসান। বেশ দৃষ্টিনন্দন ছিল স্থাপনাটি। ভেতর থেকে তাকালে মনে হতো যেন অনেক সোনালি চেইন দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রহস্যময় একটি অনুভূতি তৈরি হতো দর্শনার্থীদের চোখে। ডিজাইনারের ভাষায় স্বর্গীয় একটি ছায়া ঢেকে রেখেছে প্রার্থনার জায়গাটিকে। তবে এই গম্ভুজটিও শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। দুই দশক পরে এটিকে সরিয়ে ফেলতে হয়। আইসিডোর তখনো বেঁচে ছিলেন। সুতরাং তাঁর ওপর দায়িত্ব পড়ে পুনরায় ডিজাইনের। এবার তিনি ডিজাইনকে খুব সরল করেন। চারটি বিশালাকৃতির পায়া থেকে ধনুকের মতো বাঁকানো ত্রিভুজাকৃতির অংশ বের হয়ে এসেছে ভেতরমুখী হয়ে। গম্ভুজটি সেই অংশের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৫০০ বছর ধরে সর্বশেষ ডিজাইনই রয়ে গেছে কিছু মেরামত সহযোগে।
বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম ছিল এখানে। দ্য লাস্ট সাপার, ক্রস অফ ক্রুসিফিকশনসহ যিশুখ্রিষ্টের জীবন ও কর্মের ইতিহাস সমৃদ্ধ আরও কিছু। বিভিন্ন ধরনের মোজাইক আর মার্বেল পাথরের অলংকরণে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল চারদিকের দেয়াল। বিগত কয়েক শ বছরজুড়ে এর দেয়ালের গায়ে মোজাইক পাথরের বিভিন্ন সময়কালে সম্রাটদের পোর্ট্রেট, তাঁদের পারিবারিক বিভিন্ন ছবি আর খ্রিষ্টের বিভিন্ন ঘটনাবহুল ইতিহাসের চিত্র অংকিত হয়েছে। জাস্টিনিয়ানের সময় থেকেই এ ধারা শুরু হয়েছিল। মাঝখানে ৭২৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দ এবং ৮১৫ থেকে ৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সম্র্রাটরা আবার ছিলেন এর বিরোধী। তাঁরা এভাবে মানুষের প্রতিকৃতি এবং অহেতুক অলংকরণকে নিরুৎসাহিত করতেন। এমনকি ধর্মীয় প্রতীক ক্রসকে তাঁরা ডেকোরেটিভ হিসেবে সাজানোর নির্দেশ দেন। তবে এর আগে-পরে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই নিজ নিজ প্রতিকৃতি সংযোজন করতেন।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ, ২০১৫