পুকুর, নদী, সমুদ্র-সবই হয়তো দেখেছেন। কিন্তু চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি আকাশে ভাসমান ‘সুইমিংপুল’ দেখেননি নিশ্চয়। কী? অবাক হচ্ছেন তাই না? আর অবাক না হলেও চলবে; এখনই ভণিতা ছেড়ে আসল কথাটা বলব। আসুন পরিচয় করিয়ে দিই লন্ডনের বিখ্যাত ‘ট্রান্সপারেন্ট স্কাই পুলের’ সঙ্গে। তবে আগেই বলেছি, আপনি চাইলেও কিন্তু এখনই নামতে পারবেন না অদ্ভুত এই সুইমিংপুলে। কারণ, এটা এখনো ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেইলিমোর জানাচ্ছে, তারা অচিরেই এর কাজ শেষ করবে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম যখন চলেই এল তখন নাহয় অদ্ভুত এই পুল তৈরির পেছনে তাদের পরিকল্পনার কথাটিও জানিয়ে রাখি। আসলে বেইলিমোর এমন একটা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স তৈরি করতে চেয়েছিল. যা কি না মিলিয়নিয়াররা লুফে নেবে। তাই বেইলিমোর পাশাপাশি দুইটি ১০ তলা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স বানিয়ে দুই ভবনের মাঝখানে জুড়ে দিয়েছে ফাইবার গ্লাসের তৈরি নীলাভ এক জলাধার। আর এই সুইমিংপুলের আকারও নেহাত কম নয়। ২৫ মিটার অর্থাৎ ৮০ ফুটেরও বেশি!
পৃথিবীর সবচেয়ে লেটেস্ট পুলের কথা যখন বলেই ফেললাম আসুন এবার জেনে নিই মানুষের তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে ‘ওল্ডেস্ট’ পুলের কথা। চলুন টাইম মেশিনে চড়ে এক লাফে ফেরত যাই ৫০০০ বছর পেছনে, পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারোর সিন্ধু সভ্যতায়। এই সভ্যতার মানুষেরা ঠিক বিনোদনের জন্য নয় বরং নাগরিক চাহিদা মেটাতেই শহরাঞ্চলে অনেক মানুষের একসঙ্গে গোসলের জন্য বানিয়েছিল ইটের তৈরি পুল। আর একই সঙ্গে শিশুদের সাঁতার শেখানোও ছিল অন্যতম একটা উদ্দেশ্য। ইতিহাসবেত্তারা এর নাম দিয়েছেন ‘দ্য গ্রেট বাথ’। যদিও এখন সেখানে আর পানি নেই, রয়েছে শুধুই হাজার বছরের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত পুলের কাঠামোটি।
আধুনিক-প্রাচীনতম পুলের কথা তো জানলাম, এবার আসুন জেনে নিই মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় পুলের কথা। বলছি দক্ষিণ আমেরিকার চিলির স্যান আলফানসো পুলের কথা। ২০ একর জায়গার ওপরে প্রশান্ত মহাসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থান এই সুইমিংপুলটির। লম্বায় এটি কিলোমিটারেরও বেশি। গভীরতা ৩ থেকে ১১ ফুট পর্যন্ত। এই পুলে পানি ধরে কত জানতে চান? বলে দিই তাহলে, এর পানি ধারণক্ষমতা ২৫০ মিলিয়ন লিটার! এখন নিশ্চয় ভাবছেন যে এই বিপুল পরিমাণ স্ফটিক স্বচ্ছ পানি আসে কোথা থেকে! হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন, এই সুইমিংপুলে পানি পাম্প করা হয় প্রশস্ত প্রশান্ত মহাসাগর থেকে। ফার্নান্ডো ফিস্কম্যানের তৈরি এই পুল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে সাড়ে তিন মিলিয়ন ইউএস ডলার!
ছাদের ওপরের সুইমিংপুলগুলো আসলেই অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এই যেমন ম্যারিনা বে স্যান্ডস রিসোর্ট সুইমিংপুলের কথাই ধরুন না কেন। সিঙ্গাপুরের এই সুইমিংপুলটি জগদ্বিখ্যাত। রিসোর্টের ছাদে নির্মিত এই পুলটি ২০১০ সালে খুলে দেওয়া হয় পর্যটকদের জন্য। এই পুল থেকে আপনি সিঙ্গাপুরের একটা ওভারভিউ পাবেন খুব সহজেই। সুইমিংপুলটির আকার ৪২৯ ফুট। এতে সাঁতার কাটার জন্য আপনাকে উচ্চ মূল্যের টিকিট কাটতে হবে; আর টিকিটের মূল্য পর্যটন মৌসুম আর চাহিদাভেদে ওঠানামা করে।
খরচের কথা যখন চলেই এল তখন আজ থেকে ১০০ বছর আগে নির্মিত হাঙ্গেরির ‘স্যাচনি বাথ হাউস’-এর কথা বলতেই হয়। ১৯১৩ সালে নির্মাণের সময় খরচ হয়েছিল সাড়ে তিন মিলিয়ন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান ক্রোনা। এটি আসলে বিভিন্ন আকার ও গভীরতার বেশ কয়েকটি সুইমিংপুলের সমন্বয়ে গঠিত। এতে রয়েছে ১৫টি ইনডোর ও তিনটি বিশালাকৃতির সুইমিংপুল। তবে সবচেয়ে মজার কথা হলো এই সুইমিংপুলটি একটি পাবলিক সুইমিংপুল। মাত্র ২০ ডলার দিয়ে এর মজা উপভোগ করতে পারবে যে কেউ।
বেলজিয়ামে নিমো ৩৩ নামের এই পুলটিতে নামতে হলে আপনাকে একেবারে ডুবুরির পোশাক পরে পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে নামতে হবে! কারণ, এটি মনুষ্য নির্মিত গভীরতম সুইমিংপুল। এর গভীরতা ১১৩ ফুট। তিন মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই পুলটিতে রয়েছে আন্ডার ওয়াটার টানেলও। আর যারা ড্রাইভিংয়ে পটু নয়, তাদের ডাইভিং শেখানোর বন্দোবস্তও রয়েছে এখানে।
শেষ করব, মনুষ্য নির্মিত প্রকৃতির সবচেয়ে কাছাকাছি একটা পুলের গল্প বলে। এর জন্য পাঠক আপনাকে নিয়ে যাব আফ্রিকার তাঞ্জানিয়ায়। বিখ্যাত পর্যটন কোম্পানি ফোর সিজনসের সাফারি লজ একেবারে আফ্রিকার গহিন অরণ্যে অবস্থিত। এই লজের সুইমিংপুলটির ঠিক কয়েক ফুট নিচেই একটা প্রাকৃতিক জলাধার রয়েছে। মনুষ্য বসতি থেকে বেশ দূরের এই লজে আপনি হয়তো সুইমিংপুলের ঠান্ডা জলরাশিতে গা ডুবিয়ে জিরোচ্ছেন, ঠিক এরকম সময় আপনাকে সজাগ হয়ে উঠতে হবে হাতির ডাকে! কারণ, সকাল-সন্ধ্যা এই পুলের নিচের জলরাশিতে পানি খেতে আসে হাতির পাল। মাঝে মাঝে ভাগ্য প্রসন্ন হলে দুই একটা সিংহ অথবা হায়েনারও দেখা পেতে পারেন। ভয় নেই, ফোর লজের এই রিসোর্টটি বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে আপনাকে রক্ষা করতে অনেক উঁচু করে বানানো। তাহলে আর দেরি কেন, প্রকৃতির সবচেয়ে কাছের সুইমিংপুল সম্পর্কে স্বপ্ন দেখা শুরু করতেই পারেন!
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।