পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য থাই গ্র্যান্ড প্যালেস

গ্র্যান্ড প্যালেস। নাম শুনেই শিহরণ জাগে! দূর থেকে দেখেই শুরু হয় ভালো লাগা। কাছে গেলে সেই ভালো লাগা শুধুই বাড়ে। স্থাপত্যকর্ম সৃজনশীলতার অন্যতম প্রতিমা, যার প্রতিফলন মিলবে থাইল্যান্ডের গ্র্যান্ড প্যালেস বা মহাপ্রাসাদে। গ্র্যান্ড প্যালেস থাই স্থাপত্যশৈলীর সর্বোচ্চ প্রতীক। গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রতিষ্ঠা ১৭৮২ সালের ৬ মে, থাই রাজা প্রথম রামা, বুদ্ধ ইয়োদফা চুলালোকের হাত ধরে। চাও প্রায়া নদীর তীরে রাজধানী ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত এই মহাপ্রাসাদ। একটানা দেড় শ বছর এই প্রাসাদই ছিল থাই রাজ পরিবারের বাসস্থান ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। রাজপ্রাসাদ ছাড়াও প্রাসাদ এলাকায় ছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, উপাসনালয়, আনুষ্ঠানিক হল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে থাইল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র এই গ্র্যান্ড প্যালেসটি।

শুরুতে গ্র্যান্ড প্যালেস নির্মাণ করা হয় আজকের তুলনায় অত্যন্ত ছোট পরিসরে। পরে বিভিন্ন রাজা উত্তরাধিকার সূত্রে রাজ সিংহাসনে আসীন হয়ে ২০০ বছর যাবৎ প্রাসাদটির পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও আধুনিকীকরণ করেন। অবশেষে এটি রূপ নেয় চাকচিক্যময় ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে। চৌকোনাবিশিষ্ট এ প্রাসাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চারপাশের প্রাচীর ভিন্ন ভিন্ন অবকাঠামোতে নির্মিত। পুরো প্রাসাদটির রয়েছে চারটি আলাদা অংশ। যার প্রতিটি অংশের রয়েছে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য।

নির্মাণ ইতিহাস

গ্র্যান্ড প্যালেসের জায়গাটি অনেকটাই অপরিকল্পিত বা অগোছালোভাবে নির্ধারিত। ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্র চাও প্রায়া নদীর অতি সন্নিকটে প্রাসাদের অবস্থান। গ্র্যান্ড প্যালেসের এমন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সম্ভাব্য শক্রর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা সহজ হয়। চক্রী রাজবংশের স্থপতি প্রথম রাজা রামা এ স্থানটি রাজপ্রাসাদের জন্য উপযুক্ত বলে ঠিক করেন। কিন্তু ওই সময় সেখানে বাস করত চীনের বিপুল জনগোষ্ঠী। রাজা তাদের অন্যত্র স্থানান্তরে বাধ্য করেন। বর্তমানে এ জনগোষ্ঠী শহরের বাইরের যে এলাকায় বাস করে, তা এখন ‘চায়না টাউন’ নামে পরিচিত।

রাজার নির্দেশে ১৭৮২ সালে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৮০০ সাল পর্যন্ত চলে এর কাজ। ১৭৮২ সাল থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত গ্র্যান্ড প্যালেস থাইল্যান্ডের রাজ শাসকবর্গের বাসভবন ও প্রশাসনিক এমনকি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে এই প্রাসাদে রাজপরিবারের কেউ থাকে না, নেই প্রশাসনিক দপ্তরও। ১৯৩২ সালে প্রাসাদ থেকে সব ধরনের সরকারি বিভাগ সরিয়ে ফেলা হয়। এটি বর্তমানে ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান ও তীর্থক্ষেত্র এবং শুধু রাষ্ট্রীয় বিশেষ কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে প্রাসাদটির পুরো আঙিনা জনসাধারণের জন্য উš§ুক্ত নয়। কিন্তু যতটুকু দেখার সুযোগ রয়েছে তাতে দেখার আছে অনেক কিছুই।

স্মার্ট হিস্টোরি

প্রাসাদের নকশা

গ্র্যান্ড প্যালেস ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্রে ২ লাখ ১৮ হাজার বর্গমিটার প্লটজুড়ে অবস্থিত। মূল এলাকাটি পুরোপুরি না হলেও চৌকোনাবিশিষ্ট। প্রাসাদটি চারটি মূল এলাকার সমন্বয়ে গঠিত। এগুলোকে বলা হয়, আউটার কোর্ট (বাইরের অংশ), ইনার কোর্ট (অভ্যন্তরীণ অংশ), সেন্ট্রাল কোর্ট (কেন্দ্রীয় অংশ) ও এমারেল্ড বুদ্ধমন্দির। এ প্রতিটি অংশের রয়েছে আলাদা আলাদা কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যে। চৌকোনাবিশিষ্ট হওয়ায় পরিদর্শনের জন্য প্রাসাদটির চারদিকে অত্যন্ত সহজভাবে পথ নির্দেশিকা রয়েছে। এ চার অংশের মধ্যে কেবল বাইরের অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উš§ুক্ত। চারটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা গ্র্যান্ড প্যালেসের চারদিকে রয়েছে চারটি সড়ক। উত্তর দিকে সানাম লুয়াং ও না ফ্রা লান রোড, পশ্চিমে মহারাজা রোড, পূর্বে সানামচাই রোড ও দক্ষিণে থাই ওয়াং রোড অবস্থিত। রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অবকাঠামোর অসংখ্য ভবন, হল, প্যাভিলিয়ন, বাগান ও আঙিনা।

প্রাসাদের মূল অংশে ঢুকতেই চোখে পড়বে পাহারারত দানবাকৃতির গারুদা-মূর্তি। গারুদা হচ্ছে পৌরাণিক চরিত্র, যা শক্তির প্রতীক। আছে রামায়ণের কাহিনি সংবলিত সুনিপুণ দেয়ালচিত্র। চোখ ধাঁধানো কারুকার্য খচিত সব স্থাপনা। কোনোটা রাজদরবার, কোনোটা উপাসনালয়, থাকার ঘর, গ্রন্থাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সভা-সম্মেলনকক্ষ। প্রাসাদ চৌহদ্দির প্রতিটি স্থাপনাই অতুলনীয়, স্থপতিরা যেন তাঁদের সৃজনশীলতা ফুটিয়ে তুলতে কোনো কার্পণ্য করেননি। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে মূল উপাসনালয়টি, যেখানে অধিষ্ঠিত পান্নার তৈরি বুদ্ধমূর্তি, থাই ভাষায় যার নাম ‘ওয়াত প্রা ক্যাও’। সাধ ও সাধ্যের সুসমন্বয় ঘটিয়েই দেশি-বিদেশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই বুদ্ধমূর্তি দর্শনে আসেন। আর সাধারণ পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ বহুমাত্রিক। মহাপ্রাসাদের কিছু স্থাপনা থাই ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণ, যা রাজদরবার ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য থাই রাজা পঞ্চম রামা, চুলালংকর্ন ১৯ শতকে প্রতিষ্ঠা করেন।

আউটার কোর্ট

আউটার কোর্ট ‘খেল ফ্রা রাচা থান চান নর্ক’ নামে পরিচিত। প্রাসাদের এ অংশে রয়েছে পথনির্দেশিকা, আছে তথ্য কেন্দ্রও। এ ছাড়া এখানে একটি ছোট জাদুঘরও রয়েছে। পর্যটকেরা মূলত পরিদর্শন শুরু করেন এখান থেকেই। আসল বিষয় হলো আউটার কোর্টে ছিল রাজশাসকদের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিভাগের প্রশাসনিক দপ্তর। যেখানে ছিল রাজার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। এমনিভাবে সেখানে রয়েছে অস্ত্রাগার, রাজকীয় তক্ষশালা ও অন্যান্য সিভিল প্রশাসনের দপ্তর।

ইনার কোর্ট

গ্র্যান্ড প্যালেসের দক্ষিণের অধিকাংশ জায়গা নিয়ে ইনার কোর্ট গঠিত। সাধারণত এই অংশটি ক্ষমতাসীন রাজা ও তার স্ত্রীদের বিশেষ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। এ আবাসস্থলে রানী ও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র স্ত্রীলোকদের হেরেম রয়েছে। অন্য অধিবাসীদের মধ্যে কেবল রাজাদের শিশুসন্তানেরা ইনার কোর্টে থাকতে পারে। ইনার কোর্টে রয়েছে আবারও কয়েকটি অভ্যন্তরীণ আবাসস্থল। যেখানে প্রতিটি রানী বা রাজার অন্য নারীসঙ্গীদের জন্য রয়েছে ব্যক্তিগত আবাস, প্রতিটি আবার ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির এবং এসব বাসস্থানের রাজকীয়তা বা জাঁকজমকতা সেখানে বসবাসকারী স্ত্রীলোকের মান অনুযায়ী গড়ে তোলা হয়েছে। অধিকতর বড় আবাসস্থলটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ত্রীলোক বাস করেন। আর যে স্ত্রীলোক রাজসন্তান জন্ম দিতে পারেন তাঁর জন্য এখানে সবচেয়ে বেশি জায়গা বা সুবিধা সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাসাদের এ অংশে বসবাস করেন তিন হাজারের অধিক বাসিন্দা। যাঁদের অনেকে কখনোই আঙিনা ত্যাগ করে বাইরে আসেন না।

সেন্ট্রাল কোর্ট

গ্র্যান্ড প্যালেসের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মিডল কোর্ট। নাম থেকে বোঝা যায় মিডল কোর্টটি প্রাসাদের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত। এ অংশে অধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও বাসভবন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যবর্তী এ অংশটি আরও তিনটি উপবিভাগে বিভক্ত।

এমারেল্ড বুদ্ধমন্দির

এমারেল্ড বুদ্ধমন্দির ‘ওয়াত ফ্রা কায়েও’ নামে পরিচিত। গ্র্যান্ড প্যালেসের পর্যটকদের মূল উদ্দেশ্যে থাকে এ মন্দিরটি পরিদর্শন করা। মূল প্রাসাদের অব্যবহতি পরেই এটি নির্মাণ করা হয়। মন্দিরটির নির্মাণকাজ ১৭৮৩ সালে শেষ হয়। এ রাজকীয় উপসানালয়টি প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্মিত। এমারেল্ড বুদ্ধমন্দিরের মিউজিয়ামটি ফ্রা থিনাঙ্গ মহা প্রসাত গ্রুপের বিপরীতে অবস্থিত। মিউজিয়ামের এক তলায় বিভিন্ন শিল্পকর্মের চিত্রপ্রদর্শনী রয়েছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সভাগৃহটিতে সাদা হাতির অস্থি বা হাড় প্রদর্শন করা হয়। এই হাতিগুলোর গোলাপি রঙের কোমল চোখ ছিল। এগুলোর রাজপদের এক অপরিহার্য প্রতীক ছিল ও তাঁদের সম্পদশালীনতা রাজার খ্যাতিকে প্রভাবিত করেছিল; যাঁর যত সাদা হাতি তাঁর তত প্রতিপত্তি। এটাকে থাইল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্দির হিসেবে দেখা হয়।

ব্রিটানিকা

যদিও এটাকে এমারেল্ড বুদ্ধমন্দির বা ওয়াত ফ্রা কায়েও হিসেবে উল্লেখ করা হয় কিন্তু এটা মন্দির নয়, বরং একটি চ্যাপেল। মন্দির ও চ্যাপেলের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো মন্দিরে ঐতিহ্যগতভাবেই ভিক্ষুদের বাস। আর ওয়াত ফ্রা কায়েওতে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নেই। প্রকৃতপক্ষে এমারেল্ড বুদ্ধের মূর্তিটি যেখানে স্থাপন করা আছে, তার নিকটস্থ কোথাও পর্যটকদের যেতে দেওয়া হয় না। কেবল রাজা নিজেই সেখানে যেতে পারেন। বছরজুড়ে বুদ্ধটিকে ভিন্ন তিনটি মোড়ক দিয়ে সুরক্ষিত রাখা হয়। শীতকাল, গ্রীষ্মকাল ও বর্ষাকালÑ এ তিন মৌসুমে তিনটি মোড়ক দিয়ে আবৃত করা হয়। এ মোড়কে সংশ্লিষ্ট মৌসুমের চিত্র খচিত থাকে। বুদ্ধের কাপড় পরিবর্তন করা থাই সংস্কৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেবল রাজা নিজে এ কাপড় পরিবর্তনের কাজ করে থাকেন।

ড্রেস কোড বা পোশাকবিধি

গ্র্যান্ড প্যালেসের পর্যটকদের জন্য একটি ব্যতিক্রমী অবশ্য পালনীয় বিষয় হলো সেখানকার যথাযথ কঠোর ড্রেস কোড মেনে চলা। অর্থাৎ কেউ চাইলেই যেকোনো পোশাক পরে প্রাসাদে প্রবেশ করতে পারবে না। গ্র্যান্ড প্যালেসে শার্ট, মিনি স্কার্ট, আঁটসাঁট পাজামা, যেকোনো স্বচ্ছ পোশাক, স্যান্ডেল, সুইট সার্ট, সুইট প্যান্ট ও পাজামা পরে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি আপনার কাছে যদি কাঁধ ঢেকে রাখার জন্য শাল থাকে তাহলেও হয়তো নিরাপত্তা প্রহরী আপনাকে আটকে দিতে পারে। এ জন্য ঝামেলা এড়াতে যথোপযুক্ত পোশাক পরা ও সঙ্গে পানি রাখা। নতুবা দর্শনার্থীকে প্রাসাদের গেটেই আটকে থাকতে হবে।

এই গ্র্যান্ড প্যালেসটির মধ্যে প্রায় ৩৫টি আকর্ষণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি-

রাজ্যাভিষেকের পটমণ্ডপ, রাজকীয় অলংকরণ ও মুদ্রা জাদুঘরে- মুদ্রা, রাজপোশাক, অলংকারাদি, রাজদরবারে ব্যবহৃত রাজকীয় অলংকরণ প্রদর্শিত হয়। ফ্রা থিনাঙ্গ আমারিন উইনিটচাই মাহাইসূর্য ফিমান হলো এই ভবনটির গুরুত্বপূর্ণ এক ইমারত। এই থাইশৈলীর সিংহাসন সভাগৃহটি বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য নির্মিত হয়েছিল। গ্র্যান্ড প্যালেস ভবনের আরও অন্যান্য কিছু আগ্রহদীপ্ত পরিদর্শনমূলক স্থানের মধ্যে রয়েছে রাজপরিবারের দপ্তর, সালা লুক খুন নাই, সালা সাহাথাই সামাখোম, সিওয়ালাই বাগিচা, হো শাস্ত্রখোম, হো সুলালাই ফিমান ও হো ফ্রা দেট মোন্দিয়েন।

প্রাসাদ স্থানান্তরের ইতিবৃত্ত

১৭৮২ সালের ৬ মে রাজা বুদ্ধ ইয়োদফা চুলালোকে (রামা ১) নানা কারণে রাজধানী থনবুড়ি থেকে ব্যাংককে স্থানান্তর করেন। থনবুড়ির রাজা তাকসিনের কাছ থেকে মুকুট জব্দ করে রাজা রামা-১ তাঁর নতুন চক্রী রাজবংশের জন্য নতুন রাজধানীতে ভবন তৈরি করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাই থনবুড়ি শহর থেকে রাজপ্রাসাদ চাও ফ্রা নদীর পশ্চিম পাশে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর পূর্ব পাশেই অবস্থান ব্যাংককের।

প্রাসাদ তৈরির উপকরণ

এখন প্রাসাদ প্রাঙ্গণ যতটুকু এলাকাজুড়ে দেখা যায় নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার সময় এর চেয়ে তা ছিল অনেক ছোট। পরে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত ভবনগুলো বিভিন্ন রাজা উত্তরাধিকার সূত্রে নির্মাণ করেন। প্রত্যেক রাজাই গ্র্যান্ড প্যালেসে নিজ কৃতিত্ব যুক্ত করার বিষয়ে ছিলেন সমান আগ্রহী। মূলত উপযুক্ত উপকরণস্বল্পতার কারণে প্রাসাদটি প্রাথমিকভাবে সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। নির্মাণ শুরুর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ পর প্রাসাদটি রাজা রামার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হয়। ১৭৮২ সালের ১৩ জুন প্রাসাদটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাসভবন হিসেবে গ্রহণ করেন রাজা প্রথম রামা। রাজা পরবর্তী বছরগুলোতে ধীরে ধীরে কাঠের অবকাঠামো বিলাসবহুল উপকরণ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে রাজাদের জন্য উপযুক্ত করে এটিকে গড়ে তোলেন। প্রতিটি নতুন রাজা প্রাসাদটিতে তাঁদের নিজ নিজ অবদানকে জুড়ে দিয়েছেন। আবার অনেকে নতুন নতুন ভবন যুক্ত বা আরও আকর্ষণীয় উপকরণ দিয়ে বিদ্যমান ভবনগুলোকে করেছেন আরও দৃষ্টিনন্দন ও আর্কষণীয়।

উপকরণ সংগ্রহ

পর্যাপ্ত উপকরণ ও তহবিলের অভাবে প্রাসাদটি প্রাথমিকভাবে সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। ব্যাংকক থেকে ৮১ কি.মি. দূরে একদা শ্যামদেশের রাজধানী অযোধ্যা নগরীতে রয়েছে আরেক রাজবাড়ি। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্রোতস্বিণী ছাও ফ্রায়া নদী। এ নদীর ভাটিতে গ্র্যান্ড প্যালেস আর উজানের দিকে শ্যামদেশের ওই পুরোনো রাজধানী। ১৭৬৭ সালে বার্মা ও শ্যাম দেশের মধ্যে যুদ্ধে শহরটি ধ্বংস হয়। প্রাসাদ নির্মাণে বেশি বেশি উপকরণ সংগ্রহে রাজা প্রথম রামা তাঁর লোকজনকে উজানের এ পুরোনো রাজধানী শহর অযোধ্যা যাওয়ার নির্দেশ দেন। তারা সেখানে গিয়ে পুরোনো রাজবাড়ির সব ইট খুলতে ও সরাতে থাকে। তবে সেখানকার মন্দির থেকে কোন ইট সরানো হয়নি। তারা শহরটির কেল্লা ও প্রাচীর থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে। অবশেষে রাজার লোকজন পুরোনো রাজপ্রাসাদটি সম্পূর্ণ সমান করে ফেলে। পরে রণতরী ভরে ইট ও অন্যান্য উপকরণ চাও ফ্রা নদী দিয়ে বহন করে নিয়ে আসা হয়। পরে এসব ইট ব্যাংককের প্রাচীর ও প্রাসাদ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। প্রথম রাজা রামার আমলে গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রাথমিক নির্মাণের বেশির ভাগ কাজই শেষ হয়। জোরপূর্বক বা বিনা মজুরির শ্রম দিয়ে তৈরি করা হয় এটি। প্রাসাদের আনুষ্ঠানিক হলের চূড়ান্ত নির্মাণ সম্পন্ন হলে রাজা ১৭৮৫ সালে ঐতিহ্যগত অভিষেক অনুষ্ঠান গ্রহণ করেন। গ্র্যান্ড প্যালেসের নকশা অনেকটা অযোধ্যার রাজপ্রাসাদের মতো করা। বিভিন্ন পৃথক অঞ্চলে বিভক্ত, প্রাচীর, গেট ও কেল্লার গড়ে ওঠে এ নকশায়।

গ্র্যান্ড প্যালেস পরিদর্শন

ব্যাংককের কেন্দ্রে অবস্থিত গ্র্যান্ড প্যালেস শিয়ামের রাজাদের সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত। গ্র্যান্ড প্যালেস থেকে প্রায় ৩০ কি.মি. দূরে অবস্থিত নিকটবর্তী বিমানবন্দরটি হলো ডোন মুয়েয়াং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গ্র্যান্ড প্যালেস পরিভ্রমণের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায় মাধ্যম ওয়াটার ট্যাক্সি। গ্র্যান্ড প্যালেস, বছরের ৩৬৫ দিনই খোলা থাকে। তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানকার আবহাওয়া মনোরম থাকায় এই সময়ই গ্র্যান্ড প্যালেস পরিদর্শনের সেরা সময়। প্রাসাদটির চারদিক ঘুরতে চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময় ভোরবেলা। এ সময় মূল ধারার পর্যটকেরা সেখানে গিয়ে পৌঁছান না। দিনের একেবারে শুরুর দিকে তাপমাত্রাও থাকে অনেক সহনীয়।

গ্র্যান্ড প্যালেস দর্শনের সময়

প্যালেসটি প্রতিদিন সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। এই সময়ে গেটেই টিকিট পাওয়া যায়। একটি প্রবেশ টিকিটের মূল্য ৫০০ থাই বাথ। কোনো দর্শনার্থীর হোটেলটি যদি নদীর তীরবর্তী হয়, তাহলে খুব সহজেই ওয়াটার ট্যাক্সি ধরে সোজা প্রাসাদে চলে আসা যায়। কিন্তু গণপরিবহনযোগে প্যালেসটিতে যাওয়া বেশ কঠিন।

ব্যাংককের গ্র্যান্ড প্যালেস এলাকাটি পর্যটক ফাঁদ হিসেবেও খ্যাত। অসাধু চক্র পর্যটকদের এ এলাকার প্রতি আকর্ষণকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। এখানে এসব অসাধু চক্র পর্যটকদের বিশ^াসযোগ্য বন্ধু সেজে পর্যটকদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করে। পর্যটকদের ওই এলাকায় কম ভাড়ায় ভালো ভালো জায়গা ঘুরিয়ে দেখানোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু পর্যটকদের তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। আবার যদি কেউ বলে গ্র্যান্ড প্যালেস বন্ধ আছে, তবে অন্যান্য কিছু জায়গা আছে যা থেকে আপনি আরও বেশি বিনোদন পাবেন; সেখানে একই ধরনের সুন্দর মন্দির রয়েছে। পর্যটকদের নম্রভাবে এ ধরনের প্রস্তাব নাকচ করাই শ্রেয়।

পর্যটকের স্বর্গরাজ্য

থাইল্যান্ডের সদ্য প্রয়াত রাজা ভুমিবল (নবম রামা ) গ্র্যান্ড প্যালেসে কখনো বাস করেননি। তিনি চিত্রলাদা রয়াল ভিল্লার দুসিত প্যালেসে বসবাস করতেন। শুধু কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বা বিদেশি মেহমানদের অভ্যর্থনা ও ভোজসভার জন্য তিনি এই প্রাসাদ ব্যবহার করতেন। প্রতিবছর কয়েকটি রাজকীয় অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি প্যালেস প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, তাই এটা এখন পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top