সুইচ একধরনের বৈদ্যুতিক ডিভাইস, যা বৈদ্যুতিক উপকরণ (লাইট, ফ্যান, এসি, গিজার, পাম্প, ওভেন প্রভৃতি) চালু বা বন্ধ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। সুইচ অফ থাকলে বিদ্যুৎ প্রবাহ বাধাঁগ্রস্থ হতে পারে। এই সুইচ ও সকেটগুলো এক বা একাধিক বোর্ডের মাধ্যমে দেয়ালে স্থাপন করা হয়। এই বোর্ডে শুধু সুইচই নয় বরং আরও কিছু প্রয়োজনীয় সকেট সংযোজিত থাকে, যার সাহায্যে পোর্টঅ্যাবল ডিভাইসগুলো চালানো হয়। যাতে চলে ফ্যানের গতি নিয়ন্ত্রক রেগুলেটর, প্লাগ পিন, টিভি বা টেলিফোন সকেট, এমনকি ইউএসবি চার্জার সকেটও। যেকোনো ধরনের স্থাপনার জন্য ইলেকট্রিক্যাল কাজে সুইচ-সকেট বোর্ড স্থাপন অবধারিত।
পুরকৌশলে এই সুইচ-সকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি ভবনের পার্টিশন ওয়ালের কাজ শেষ করার পর শুরু হয় ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিংয়ের কাজ। এ সময়ে লাইট, ফ্যান, এসি, গিজার, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ, ওভেন ইত্যাদি কোথায় কোথায় কিসের ভিত্তিতে কয়টি পয়েন্টে থাকবে তা ড্রয়িংয়ে স্পষ্ট করা থাকে। এগুলোর প্রতিটির জন্য প্রয়োজন হয় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সুইচ ও সকেট। ইলেকট্রিক্যাল কাজগুলো সাধারণত দুই ধাপে করা হয়। তা হচ্ছে-
- ওয়্যারিং
- ফিটিংস ফিক্সারস স্থাপন।
পার্টিশন ওয়াল তৈরির পর ড্রয়িংয়ে নির্দেশিত পয়েন্ট অনুসারে তার টানার জন্য পাইপ বসানো এবং সুইচ-সকেট লাগানোর জন্য বক্স বসানোর কাজ আগেই সম্পন্ন করতে হয়, যা সাধারণত প্লাস্টার করা কিংবা ফিনিশিং কাজের আগেই করা হয়ে থাকে। এরপর রঙের ফাইনাল কোট দেওয়ার আগে ফিটিংস-ফিক্সারসসমূহ লাগানো হয়।
সাধারণত দুই ধরনের সুইচ বাজারে পাওয়া যায়-
- ম্যাকানিক্যাল সুইচ
- ইলেকট্রিক্যাল সুইচ।
ম্যাকানিক্যাল সুইচ
- সিঙ্গেল পোল সিঙ্গেল থ্রো
- সিঙ্গেল পোল ডাবল থ্রো
- ডাবল পোল সিঙ্গেল থ্রো
- ডাবল পোল ডাবল থ্রো
- টু পোল সিক্স থ্রো।
প্রতিটি ভবনেই রয়েছে সুইচ-সকেট বোর্ড। এই বোর্ডে এক বা একাধিক সুইচ ও সকেট পোল সংযোজিত থাকে। একক কোনো ডিভাইস চালাতে ব্যবহৃত হয় সিঙ্গেল পোল সুইচ। বৈদ্যুতিক চাপ বা ভোল্টেজের ওপরেই নির্ভর করে সুইচ বা সকেট কেমন হবে। টিভি, ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন, কম্পিউটার প্রভৃতি ডিভাইসের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৫ পিনবিশিষ্ট সকেট ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্লাগ পিনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ইউরোপিয়ান, এশিয়ান, আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান, রাশিয়ান ও অন্যান্য দেশভেদে সকেট আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। বিশেষ করে ছিদ্রের ধরন চারকোনা, চ্যাপ্টা ও গোলাকার হয়ে থাকে। পিনের সংখ্যাতেও থাকে বৈচিত্র্য। কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হয় মাল্টি স্ট্যান্ডার্ড সকেট। সম্প্রতি সকেট বোর্ডে ইন্টারনেট, টিভি, টেলিফোন সংযোগ সকেটের পাশাপাশি ইউএসবি পোর্টও যুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া সকেট বোর্ডে যেসব সুইচ লাগানো থাকে তার মধ্যে অন্যতম মোমেনটাম কন্ট্রোল সুইচ। এই সুইচের মধ্যে রয়েছে-
- পুশ বাটন সুইচ
- প্রেসার সুইচ
- টেমপারেচার সুইচ
- টগেল সুইচ
- রোটারি সুইচ।
বিদ্যুৎ সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য ভবন ও ভবনের বাসিন্দাদের সুরক্ষায় সকেট ও সুইচ বোর্ডগুলোকে নান্দনিক ডিজাইনের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নত কাঁচামাল। সাধারণত প্লাস্টিক, ফাইবার প্লাস্টিক, পিভিসি, পোরসেলিন ও সিরামিকে তৈরি করা হয় এ বোর্ডগুলো। এ ছাড়া ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করেও উৎপাদিত হয় পণ্যটি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ বর্তনীর জন্য ব্রাস শিট (কপার ও জিংকের সংমিশ্রণ), ব্রাস রড এবং ব্রোঞ্জ শিট (কপার ও টিনের সংমিশ্রণ) ব্যবহৃত হয় সুইচ-সকেটের মেটাল পার্টস তৈরিতে।
আগে সকেট ও সুইচ বোর্ড পুরোটাই আমদানিনির্ভর হলেও এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের পণ্য। এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, গুণেও অনন্য। তা ছাড়া দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন রঙে পাওয়া যাচ্ছে এ ধরনের অনুষঙ্গ। আরএফএল, ওয়ালটন, এসিআই, মার্সেল, এমকেসহ বিভিন্ন দেশি কোম্পানি উৎপাদন করছে বাহারি সব সকেট ও সুইচ বোর্ড। এ ছাড়া ইতালি, যুক্তরাজ্য, চীন, কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে আমদানি করা হয় উন্নতমানের সকেট, সুইচ বোর্ড।
কোনো স্থাপনায় সকেট ও সুইচ বোর্ড লাগানোর আগে অবশ্যই জানা দরকার কোন ধরনের ডিভাইসে কোন সুইস বা সকেট লাগে। শুধু তা-ই নয়, আবাসন ও কারখানার জন্যও প্রয়োজন উপযোগী এ পণ্য। বৈদ্যুতিক চাপ বা ভোল্টেজের ওপরেই নির্ভর করে সুইচ বা সকেট কেমন হবে। যে সুইচ-সকেট দিয়ে একটি ফ্যান বা লাইট জ্বালানো যায়, তা দিয়ে একটি আয়রন বা ইলেকট্রিক ওভেন চালানো যায় না। তাই এসি, ফ্রিজ, গিজার, আয়রন, ওভেন, লাইট, ফ্যান ইত্যাদি প্রতিটি উপকরণ চালানোর জন্য আলাদা আলাদাভাবে সুইচ-সকেট নির্ধারিত। আবাসিক একটি ইমারতের ইন্টারনাল ওয়্যারিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব সুইচ-সকেট ব্যবহার করা হয়, এর একটি তালিকা এমন-
- ১০ অ্যাম্পিয়ার ২-পিন
- ১৩ অ্যাম্পিয়ার ৩-পিন (চ্যাপ্টা)
- ১৫ অ্যাম্পিয়ার ৩-পিন (গোল)।
ইলেকট্রিক্যাল কাজসমূহ সুনির্দিষ্টভাবে সম্পাদন করা বেশ জটিল একটি বিষয়। এ জন্য সুষ্ঠুভাবে কাজটি করতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেওয়া অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি সকেট ও সুইচ বোর্ড তারের সংযোগ ঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য তদারকি অপরিহার্য। এ ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকলে মিস্ত্রি তাঁর ইচ্ছামতো কাজ করে, যাতে ভবিষ্যতে নানা ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। সামান্য একটি আনস্পেসিফাইড তার কিংবা সুইচ-সকেটের কারণে অত্যন্ত দামি সামগ্রী পুড়ে নষ্ট হতে পারে। এমনকি শর্টসার্কিট হয়ে পুরো বাড়িটিও জ্বলে যেতে পারে। অতএব, ইলেকট্রিক্যাল মালামাল নির্বাচন ও সঠিকভাবে স্থাপন করাসহ সব কাজের মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দরদাম
সুইচ, সকেট ও উভয় ধরনের বোর্ডের সাইজ, ডিজাইন, উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও ব্র্যান্ডভেদেই নির্ধারিত হয় এ ধরনের অনুষঙ্গের দাম। দেশে উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় আমদানি করা বিদেশি বোর্ডের দাম কিছুটা বেশি। তবে তা গুণগত মানসম্পন্ন ও দেখতেও সুন্দর। এ অনুষঙ্গগুলোর বাজারে এখনকার দরদাম-
সুইচ (পিয়ানো টাইপ)
| উপকরণ (প্র্রতি পিস) | দাম (টাকা) |
| সিঙ্গেল সুইচ | ২৫-৩০ |
| ডাবল সুইচ | ৩০-৩৫ |
| ট্রিপল সুইচ | ৩৫-৪০ |
| কোয়াডরাপল সুইচ | ৪০-৪৫ |
| পেনটাপোল সুইচ | ৪০-৭০ |
| কলবেল সুইচ | ৭০-১৫০ |
| ইনডিকেটর | ১৫-১০০ |
| ফ্যান রেগুলেটর | ১০০-৩০০ |
সুইচ (গক টাইপ)
| উপকরণ (প্র্রতি পিস) | দাম (টাকা) |
| সিঙ্গেল/১ গ্যাং সুইচ | ৭৫-২০০ |
| ডাবল/২ গ্যাং সুইচ | ১৫০-২৫০ |
| ট্রিপল/৩ গ্যাং সুইচ | ২০০-৩৫০ |
| কোয়াডরাপল/৪ গ্যাং সুইচ | ৩০০-৫৫০ |
| পেনটাপোল/৫ গ্যাং সুইচ | ৩৫০-১০০০ |
| ইউএসবি সুইচ/ কলবেল সুইচ | ৫০০-২০০০ |
| ইনডিকেটর | ৫০-১৫০ |
| ফ্যান রেগুলেটর | ৩০০-১০০০ |
| ডিমার (১-৫) গ্যাং | ১৫০-১০০০ |
সকেট
| উপকরণ (প্র্রতি পিস) | দাম (টাকা) |
| সকেট | ১৫০-৩০০ |
| টুপিন পিয়ানো টাইপ | ৩০-১০০ |
| গক টাইপ টুপিন (০৫-১০Amp) | ১৮০-১১০০ |
| গক টাইপ থ্রিপিন (১৩Amp) | ২০০-১৫০০ |
| সিক্সপিন গক টাইপ (১৩Amp) | ৩০০-২৫০০ |
| গক টাইপ থ্রিপিন (১৫-১৬Amp) | ৪৫০-৫০০০ |
| গক টাইপ টিভি পিন | ২০০-১০০০ |
| গক টাইপ টেলিফোন/ডিশ | ২০০-১০০০ |
| মাল্টি সকেট (টুপিন-থ্রিপিন) | ৫০-৩৫০ |
প্রাপ্তিস্থান
রাজধানীর হাতিরপুল, বাংলামোটর, স্টেডিয়াম মার্কেট, বায়তুল মোকাররম মার্কেট, পুরান ঢাকার নবাবপুর মার্কেটে মিলবে হরেক ডিজাইন ও ব্র্যান্ডের সুইচ ও সকেট বোর্ড। পাইকারি ও খুচরা উভয়ভাবেই বিক্রি হয় এসব মার্কেটে। এ ছাড়া নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুরের টাউন হল মার্কেট, মিরপুর মার্কেটসহ সারা দেশের ইলেকট্রিক্যাল পণ্য বিক্রির দোকানগুলোতে পাবেন আপনার পণ্য। এ ছাড়া আরএফএল, ওয়ালটন, এসিআই, মার্সেল, এমকেসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড শপেও পেয়ে যাবেন মানসম্মত পণ্য। সম্প্রতি কিছু ইলেকট্রনিকস দোকানেও মিলছে প্রয়োজনীয় এ সব অনুষঙ্গ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৫তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৮।