সবুজ স্থাপত্যে আমাদের ভালোবাসা

স্থাপত্য স্বপ্নের জন্মই সৌন্দর্যবোধ আর সুন্দরের প্রতি স্পর্শকাতরতা নিয়ে। বাস্তব অনুষঙ্গগুলো একটি দৃশ্যমান অস্তিত্ব লাভ করে স্থাপত্য মাধ্যমে। স্থাপত্য জগতে কল্পনা এবং বাস্তবতার যে লুকোচুরি তা কলা, বিজ্ঞান, গণিত, সমাজতত্ত্ব এবং ভাষার শৈল্পিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি পরিসর তৈরি করে, যা কি না একই সঙ্গে আমাদের বস্তু জাগতিক প্রয়োজন পূরণের জন্যও দরকারি। বাস করার জন্য আমাদের বাসস্থান যেমন দরকার, তেমনি শেখার জন্য বিদ্যায়তন, কেনাকাটার জন্য বাজার কিংবা আনন্দময় সময় কাটানোর জন্য থিয়েটার কিংবা নাট্যশালা। যা-ই বলি না কেন, এগুলো শুধু যে প্রয়োজনই মেটায় তা নয়, একই সঙ্গে আমাদের কাজের অনুপ্রেরণাও জোগায়।

বর্তমানে স্থাপত্য চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং এনার্জি সংকট। এই ইস্যুতে স্থাপত্যের একটি নতুন ধারণা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটিই গ্রিন আর্কিটেকটার বা বাংলায় সবুজ স্থাপত্য নামে খ্যাত। সবুজ স্থাপত্য বলতে আসলে আবহাওয়া ও আঞ্চলিকতা বিবেচনায় একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসংবলিত স্থাপত্য ধারণা বোঝায়।

মানুষের সাধারণ ধারণা সবুজ স্থাপত্য মানেই ডিজাইন বা নকশায় যথাসম্ভব সবুজের আধিক্য। আসলে সবুজ স্থাপত্যের মূল লক্ষ্য কিন্তু তা নয়, বরং এটি হচ্ছে ডিজাইনের একটি ধরন, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো নিরসনে সবিশেষ ভূমিকা পালন করে। সবুজ স্থপতি বা সবুজ ডিজাইনার পরিবেশবান্ধব কৌশল ও উপকরণ বাছাই করে বিশুদ্ধ বাতাস, সুপেয় পানি এবং সবুজ পৃথিবীর জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় উপাদানের সংরক্ষক হিসেবে ভূমিকা রাখে। টেকসই স্থাপত্যের আরেকটি প্রতিশব্দ হতে পারে।

ধারণা করা হয়, ১৯৭০ সালের এনার্জি সংকট বিশেষত খনিজ তেল এবং বিশ্বব্যাপী পরিবেশদূষণের চিন্তা থেকেই সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা টেকসই উন্নয়ন ধারণাটির উৎপত্তি। এই আন্দোলনের প্রসার ঘটে আরও বেশি এনার্জি স্বনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণচর্চার প্রয়োজন আর প্রত্যাশা থেকে। উন্নত দেশে সবুজ নির্মাণ আন্দোলনের সূচনালগ্নে টার্গেট করা হয়েছিল কৃত্রিম ও যান্ত্রিক উপকরণ ও কলাকৌশলের চেয়ে প্রাকৃতিক উপাদান ও সম্পদের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে। একই সঙ্গে সহজলভ্য প্রাকৃতিক সুবিধা ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও নেতিবাচক প্রভাব উত্তরণে। কিন্তু কালক্রমে সমগ্র পৃথিবীর জন্য এ আন্দোলন ফলপ্রসূ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

টেকসই সবুজ উদ্যোগ তিনটি আলাদা বিষয়ের ওপরে আলোকপাত করে। তিনটি ‘ই’-এর সাহায্যে একে পরিচিত করানো যায়- ইকোলজি, ইকোনমি ও ইক্যুইটি। সবুজ উন্নয়ন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উন্নয়ন প্রভাব কমানো এবং পারতপক্ষে দূর করার জন্য কৌশল এবং চর্চার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করতে পারে। 

বিশেষ করে সবুজ নির্মাণকৌশল আয়ত্ত করে আমরা অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত উভয়মুখী কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি। নতুন নির্মাণ, মেরামত, সংরক্ষণ, বর্ধিতকরণ, ভেঙে ফেলা ইত্যাদি যেকোনো অবস্থায়ই সবুজ স্থাপত্যকৌশলের প্রয়োগ শুরু করা যায়। যদিও নতুন যেকোনো প্রকল্পের শুরুতেই এই চর্চাকে একীভূত করে নিতে পারলে ফলাফল হয় আরও বেশি।

সবুজ স্থাপত্য কয়েকটি মূলনীতিকে সামনে রেখে কাজ করে-

  • প্রথমত, সহজলভ্য সম্পদের সর্বোচ্চ ক্ষমতার ব্যবহার
  • দ্বিতীয়ত সবুজ পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানুষের কর্মদক্ষতার পুরো ব্যবহার নিশ্চিত করা
  • অপচয়, দূষণ ও অতিরিক্ত শক্তিক্ষয় কমানোর ধারণা ও কৌশল ব্যবহার।

বিশ্বব্যাপী সবুজ স্থাপত্য বা সবুজ নির্মাণ অথবা সবুজ উন্নয়ন যে শিরোনামেই অভিহিত করা হোক না কেন, উপরিউক্ত তিনটি মূলনীতিকে সামনে রেখেই বাস্তব কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে। একাধিক সংস্থা সবুজায়নের এই ধারণাকৌশল নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল উল্লেখযোগ্য। তারা গ্রিন স্থাপনার যে মানদণ্ড তৈরি করেছে, তাকে অনুসরণ করছে আরও অনেকেই। যে কয়টি বিষয়ে তারা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে থাকে; সংক্ষেপে তা হলো-

এনার্জি

যেকোনো স্থাপনায় এনার্জি ব্যবহার অত্যাবশ্যক। তবে এই ব্যবহারের ধরন ও মাত্রার ওপর সবুজ বা টেকসইয়ের মাত্রা নির্ভর করে। সবুজ স্থাপনার বৈশিষ্ট্য অধিক কর্মক্ষম স্থাপনা পরিচালনায় কম এনার্জি প্রয়োজন হবে। এ জন্য বিভিন্ন ব্যবহারিক কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। যেমন- বড় জানালা দেওয়া হলে প্রচুর প্রাকৃতিক আলো পাওয়া যাবে। তাতে এনার্জি সরবরাহ কম হলেও চলবে। কিন্তু আবার সূর্যের সরাসরি আলো প্রবেশে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হবে, যা কাক্সিক্ষত নয়। সুতরাং এ জন্য জানালার ওপরে শেড দিয়ে সরাসরি আলোর পরিমাণ কমাতে হবে। আবার উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ছাদের ওপর রোদের প্রভাবে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হবে। এমনকি এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার করলে তাতে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হবে। কিন্তু যদি ছাদের ওপর বাগান করা হয়, তাহলে একদিকে নির্মল পরিবেশ তৈরি হবে, অপর দিকে ছায়া তৈরি হওয়ার ফলে তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। পরোক্ষ সৌরশক্তিভিত্তিক ডিজাইন আইডিয়া যেমন সোলার পাওয়ার, উইন্ড পাওয়ার, হাইড্রো পাওয়ার এবং বায়োগ্যাসের মতো স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত বিকল্প এনার্জি প্রয়োজন পূরণে অনেক বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।

পানি

পানির ব্যবহার কমানো এবং পানির গুণাগুণ সংরক্ষণ সবুজ উদ্যোগের আরেকটি বড় দিক। পানিকে পুনঃ পুনঃ ব্যবহার করে কীভাবে অনেক বেশি সুবিধা আদায় করা যায়, এটাই হচ্ছে মূল প্রতিপাদ্য। এ জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রথমত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ। এটা এনার্জি সেভিং করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। অধিক পরিমাণ পানির চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ময়লা পানি পরিশোধন করে পুনরায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পানিবাহিত দূষণের মাত্রাও কমে যাবে। এ ছাড়া সারফেস পানি ব্যবহারের জন্য আরও কিছু কৌশল আছে। যেমন- সাধারণ কনক্রিট ব্যবহার না করে ওয়াটার পারমিবল কংক্রিট ব্যবহার করা।

উপকরণ

নির্মাণের সবুজ উপাদান বলতে যেসব উপাদান বোঝায়, সেগুলো মূলত নবায়নযোগ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও কম ক্ষতিকর নন-টক্সিক।

পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ

সবুজ উদ্যোগকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আরেকটি বিষয় খুব জরুরি। সেটা হচ্ছে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ। পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং সিস্টেম না থাকলে সবুজ উদ্যোগ সহসাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সবুজ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এনার্জি, পানি, আন্তপরিবেশ ইত্যাদির কার্যকারিতা ধরে রাখতে হলে এই নীতিমালার বিকল্প নেই। যেমন- প্রাকৃতিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা যদি একটি সময় পরে অকেজো হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে বরং আরও বেশি অবনতির দিকে যাবে। 

অপচয় রোধ

পরিশেষে যে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, সেটি হচ্ছে অপচয় বা ক্ষতির মাত্রা কমানো। পুনর্ব্যবহার বা পরিশোধনের মাধ্যমে অপচয় কমানো সম্ভব। যেমন- বেসিনের ব্যবহৃত পানি সামান্য পরিশোধন করে কমোডে ব্যবহার করা। কিংবা কমোডের ময়লা পানিকে জৈব সার তৈরির কাজে ব্যবহার করলে পানির ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এনার্জি সাশ্রয় হবে এবং পানির অপচয় হবে কম।  

বিশ্বব্যাপী যখন আবহাওয়াগত বিষয়গুলো বিবেচনায় আসতে শুরু করেছে তখন থেকেই অধিকাংশের মধ্যে স্থানীয় ও নিজস্ব সম্পদের প্রতি স্পর্শকাতরতা তৈরি হচ্ছে। আমরা অনেকেই বুঝতে শিখেছি যে আমাদের সম্পদ অসীম নয় এবং এর ব্যবহারে আমাদের আরও সচেতন এবং বুদ্ধিমান হতে হবে। এবং আমরা অনেকেই তখন থেকে মনের দিক দিয়ে গ্রিন বা সবুজ। যেমন- আমরা যদি একটি রুম থেকে বের হওয়ার সময় এর বাতি নিভিয়ে আসি তাহলে এখানে কিছু এনার্জি সাশ্রয় সম্ভব এবং একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির বিপক্ষে খুব সামান্য হলেও একটি পদক্ষেপ। এগুলো আমাদের মানসিক দিক দিয়ে অন্যের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করে দেবে। যদি টেকসই ধরনের ডিজাইন চিন্তা করা হয় তবে ব্যবহার ও অপচয়ের মাত্রা অবশ্যই কমানো সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বয়ং নির্মাণ কারিগরকে মনে-প্রাণে সবুজ হওয়া জরুরি। এই সচেতনতার শুরু হোক শিক্ষানবিস পর্যায়ে এবং সমগ্র পেশাজীবনে এর চর্চা ও ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top