নীলাম্বরী বর্ষা। আকাশে ঘন-কালো মেঘ আর চরাচরে বৃষ্টির ঘনঘটা। বাংলার প্রকৃতিতে এখন পুরোদস্তুর বর্ষা। বারান্দা বা জানালার পাশে বসে এক কাপ কফির হাতে বর্ষার মায়াবী রূপ উপভোগ করতে বেশ লাগে। গ্রীষ্মের খরতাপ আর প্রচণ্ড গরমকে ছুটি দিয়ে মধুময় বর্ষা সবার জন্য বয়ে আনে শান্ত সমাহিত প্রশান্তি। চারদিকের সবুজ-সতেজ-স্নিগ্ধ প্রকৃতিও ছুঁয়ে যায় মনকে। কিন্তু বর্ষা এসব স্নিগ্ধতার পাশাপাশি ভবনের জন্য নানামাত্রিক সমস্যারও কারণ। কেননা বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু আর্দ্র। আর বর্ষায় এ আর্দ্রতা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তাই তো বর্ষায় স্বস্তি মিললেও আবাসন তথা ভবনের জন্য বয়ে আনে ক্ষতিকর নানা প্রভাব। তাই স্বাভাবিকভাবে ভবনের মালিক ও বসবাসকারীর দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। তবে কিছু প্রকৌশলগত পদক্ষেপ নিলে এ বর্ষায় ভবনের নিরাপত্তায়, যা কাজ করে সুরক্ষিত ছাতার মতোই। এটা শুধু বর্ষা থেকেই নয়, রক্ষা করবে প্রাকৃতিক নানা বৈরিতা থেকেও। যার সামান্য অবহেলায় এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে আপনার বহুমূল্যের সম্পদেও।
বর্ষাকালে ভবনে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যেমন, জলাবদ্ধতা, বাড়ির চারপাশে স্যাঁতসেঁতে ভাব, দেয়ালে সাদাকালো ও সবুজাভ ছোপ, দরজা-জানালায় কীট-পতঙ্গের আনাগোনাসহ নানা কিছু। মূলত বর্ষার বৃষ্টির ফলে মাটির স্তরে ও উন্মুক্ত স্থানে পানির প্রাচুর্যতা বেড়ে যায়। এতে কীট-পতঙ্গ ও অনুজীব ভবনে আশ্রয় নেয়। তা ছাড়া আর্দ্রতার মতো উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় ভবনকে ঘিরেও শুরু হয়ে যায় বিচিত্র এক জীবন চক্র। সক্রিয় হয়ে ওঠে ক্ষতিকারক পোকা-ব্যাকটেরিয়াসহ নানা অনুজীব। এসব অনুজীব ছত্রাক বা ফাঙ্গাস (Damp/Mould) সৃষ্টি করে দেয়ালের প্লাস্টার নষ্ট করে ফেলে। এ ছাড়া ক্রাকি, ক্রেজিং, ব্লিস্টারিং, পুষ্পায়ন, মরিচাজনিত দাগের মতো সমস্যার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে পুরোনো ভবনে এসব সমস্যা অধিক মাত্রায় লক্ষণীয়। এসব অবাঞ্ছিত জৈবের আক্রমণে স্থাপনার সৌন্দর্য হয় ম্লান। এটা শুধু ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করেই ক্ষ্যান্ত হয় না, উৎপন্ন করে ক্ষতিকর মাইক্রোটক্সিন (একধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক), যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া বদ্ধপরিবেশে যা দুর্গন্ধও ছড়ায়। ভবনের দেয়ালের পাশাপাশি বর্ষায় দরজা-জানালা ও কাঠের আসবাবেও বিভিন্ন ধরনের পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যায়।
বর্ষায় ভবনে যত সমস্যা
- ভবনের দেয়াল, ছাদ ও মেঝের ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ বা শোষণ
- ভবনের দেয়ালে ছত্রাক বা ফাঙ্গাসের আক্রমণ
- জলাময় এলাকা ও ভেজা মাটি থেকে ভবনের ফাউন্ডেশন বা ভিতের মাধ্যমে পানি শোষণ
- ড্রেনেজ সমস্যা
- জলাবদ্ধতা
- ছত্রাক, ফাঙ্গাস ও জলাবদ্ধতা থেকে নির্গত দুর্গন্ধ
- ভবনের দরজা-জানালা ও কাঠের আসবাবে পোকামাকড়ের উপদ্রব
- বৈদ্যুতিক সুইচ, সকেট ও যন্ত্রাংশ ড্যামেজ
- পানির ট্যাংকে নোংরা পানি প্রবেশের আশঙ্কা
- স্যাঁতসেঁতে অন্দরের আসবাব ও কার্পেট থেকে নির্গত দুর্গন্ধ।
প্রতিরোধে যত ব্যবস্থা
কোনো স্থাপনাই চিরস্থায়ী নয়। তবে প্রতিটি স্থাপনারই রয়েছে যৌক্তিক মেয়াদকাল। বর্ষাকালে উদ্ভব সমস্যাসমূহ যদি চিহ্নিত করে সমাধান করা না যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আয়ু কমে স্থাপনাকে করে তোলে দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য স্থাপনার দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং বসবাসকারীদের নিরাপত্তা বিধানে যত দ্রুত সম্ভব সমস্যা চিহ্নিত করে সময়োচিত যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত-
দেয়াল, ছাদ ও মেঝের ফাটল নিরাময়
কংক্রিটের স্থাপনায় যেকোনো ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ার পরে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। এই ফাটল দেখা যায় দেয়াল, কলাম, বিম এমনকি মেঝেতেও। এই ফাটল দিয়েই বর্ষার পানি ও আর্দ্রতা প্রবেশ করে ভবনের স্থায়িত্বে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। স্থাপনায় তখনই ফাটল বা চির দেখা যায়, যখন নির্মাণ উপকরণের শক্তির চেয়ে প্রযুক্ত চাপ হয় বেশি। চাপ সৃষ্টি হয় সাধারণত ভূকম্পীয় চাপ, অভ্যন্তরীণ তাপীয় গতি-প্রকৃতি, কংক্রিটের উপাদানের ভুল অনুপাতে মিশ্রণ, নিম্নমানের নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার, অসম কিউরিং, আর্দ্রতা পরিবর্তনের সঙ্গে মাটির সংকোচন ও প্রসারণের প্রভাব, ভিত প্রশমন বা হ্রাস, আর্দ্রতার পরিবর্তনের মতো বলের ফলে। ফাটলের আকার-আকৃতি বিবেচনায় যথাযথ ও উপযুক্ত সংস্কারপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করায়। ভবনে ফাটল ধরা পড়লে যে ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে-
- কংক্রিট দেয়ালের ফাটলযুক্ত স্থানকে প্রথমেই অমসৃণ করে নিতে হবে, যাতে নতুন কংক্রিট দৃঢ়ভাবে আটকে থাকতে পারে। এরপর সব ধরনের আলগাসামগ্রী সরিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে সিমেন্টের গ্রাউন্টিং প্রয়োগ করে নতুন কংক্রিট ঢালাই করে যথারীতি কিউরিং করতে হবে।
- কংক্রিট মেঝেতে কোনো গর্ত মেরামত করতে হলে প্রথমে গর্তটিকে ছেনি দিয়ে কেটে খাড়া পার্শ্ববিশিষ্ট বর্গাকার বা আয়তাকৃতিতে আনতে হবে। নতুন কংক্রিট ঢালাইয়ের আগে গর্তটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে গর্তের তলদেশে বালু ভরে দুরমুশ করতে হবে। তারপর কংক্রিট দিয়ে গর্ত ভরাট করে কম্প্যাকশন করতে হবে। কর্ণিকা দিয়ে উপরিপৃষ্ঠ সমান করতে হবে। কাজটি শেষে কিউরিং করতে হবে।
- কংক্রিট মেঝের উপরিপৃষ্ঠের নিট সিমেন্টে ফিনিশিং নষ্ট হয়ে গেলে তা চিজেল (Chisel) দিয়ে উঠিয়ে ফেলতে হবে। নিচের আর্দ্রতা প্রতিরোধের জন্য ২ x ১/২ সে.মি পুরুত্বে প্যাটেন্ট স্ট্যান ঢালাই (১ : ১ : ৫ : ৩) করতে হবে এবং এর সঙ্গে পডলো, পারমো বা সিকো নামের পানিরোধক/আর্দ্রতারোধক যোগ করে ব্যবহার করতে হবে। তারপর নিট সিমেন্ট ফিনিশিং করে নিয়মানুযায়ী কিউরিং করতে হবে।
- গ্রাউন্ড ফ্লোরে D.P.C দিতে হবে।
- কংক্রিট ফাটলের সর্বত্র ছড়িয়ে ভালোভাবে স্থাপন করতে হবে। কংক্রিট স্থাপনের পরপর Tamping শুরু করতে হয়, যাতে করে কংক্রিটের মধ্যে কোনো এয়ার পকেট বা ফাঁকা জায়গা না থাকে।
- এরপর মেরামতকৃত কংক্রিটের ফিনিশিং করতে হবে। কংক্রিট ফাটলের মধ্যে স্থাপনের পরে সেট হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হয়। কংক্রিট ভালোভাবে সেট হলে Existing Surface-এর সঙ্গে এটাকে মিলিয়ে ফিনিশিং করা হয়।
- এ ছাড়া কংক্রিটে ফাটল বা চিড় সংস্কারে বিশেষ ধরনের কংক্রিট সিলিং (Sealing) রেসিন বা আঠার দ্রবণ ব্যবহার করা যেতে পারে।
- ছাদে ফাটল বা ক্রাক সৃষ্টি হলে কংক্রিট সিলিং ব্যবহার করা যেতে পারে।
- ফাটল ছাদের কয়েক জায়গায় অথবা ফাটলে সূক্ষ্ম ছিদ্র বেশি হলে জলছাদ তৈরি করা যেতে পারে। ছাদ আর্দ্রতামুক্ত রাখতে, ছাদে বৃষ্টির পানি চুইয়ে যেন রডে মরিচা ধরতে না পারে এ জন্যও জলছাদ করা হয়। জলছাদ তৈরি করতে ছাদের ওপর চুন, সুরকি, খোঁয়া ও চিটাগুড়ের সাহায্যে কমপক্ষে তিন ইঞ্চি পুরুত্বের একটি আলাদা আবরণ প্রদান করাটাই মূলত জলছাদ।
ভবনের ছত্রাক বা ফাঙ্গাস দমনে
স্যাঁতসেঁতে সাদাকালো ও সবুজাভ ছোপ থেকেই বুঝতে হবে দেয়াল ছত্রাক বা ফাঙ্গাসে আক্রান্ত। সাধারণত ছত্রাক জন্মে ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে। বিশেষ করে বর্ষাকালে। বৃষ্টি ছাড়াও বন্যা, দেয়ালের অভ্যন্তরীণ পাইপে ছিদ্র বা লিকেজ, ছাদে ফাটল, বদ্ধপরিবেশসহ নানা কারণে দেখা দেয় এর প্রাদুর্ভাব। সাধারণত ভেজা দেয়ালে ধূলিকণা জমে সৃষ্টি করে ছত্রাকের। ভবনের যেসব স্থানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে না, সেসব স্থানে ঝুঁকি থাকে বেশি। স্বল্প পোড়ানো ইট ব্যবহার, জলমগ্ন স্থানে ভবন নির্মাণসহ নানা নির্মাণত্রুটিজনিত কারণও ছত্রাক জন্মানোর জন্য দায়ী। পুরকৌশল ভাষায় একে বলা হয় ড্যামনেস। যত দ্রুত সম্ভব ভবন থেকে ড্যামনেস দূর করা উচিত। এজেন্য ভবনে ছত্রাক প্রতিরোধ ও প্রতিকারে করণীয়-
- প্রথমেই ভবনের আর্দ্রতার উৎস শনাক্ত করতে হবে। ভবনের আশপাশে জমে থাকা পানি নালা করে বের করতে হবে।
- ছাদে যেন বৃষ্টির পানি জমে না থাকে সে জন্য সঠিক ঢাল রাখা এবং পাইপের মাধ্যমে যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
- ছাদের ওপরে গাছ থাকলে, দেখতে হবে সূর্যালোক ঠিকমতো পাচ্ছে কি না। প্রয়োজনে গাছের বাড়তি ডাল ও পাতা ছেঁটে দিতে হবে।
- বৃষ্টির পানি যেন অনেকক্ষণ ধরে দেয়াল বেয়ে চুইয়ে না পড়ে সে জন্য সানশেড নির্মাণ করতে হবে।
- ভবনের দেয়াল থেকে ধুলাবালি ও ময়লা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
- ভবনের ভেতরে যেন পর্যাপ্ত সৌরালোক প্রবেশ করে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
- ঘরগুলোতে যেন ভেন্টিলেশন বা বায়ু চলাচল ঠিকমতো হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে।
- দেয়ালের যেসব স্থানে ছত্রাক দেখা দেবে সেখানকার রং বা চুনের প্রলেপ ভালোভাবে সরিয়ে পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর আক্রান্ত স্থানে ফাঙ্গিসাইড বা ছত্রাকনাশক স্প্রে করে ভালোভাবে শুকিয়ে চুনকাম বা রং করতে হবে।
- ছত্রাকের পরিমাণ কম হলে গরম পানি কিংবা তাতে ডিটারজেন্ট সলিউশন মিশিয়ে স্পঞ্জের সাহায্যে পরিষ্কার করা যেতে পারে।
- ড্রাই আইস ব্লাসটিং ও সোডা ব্লাসটিং পদ্ধতিতেও দেয়াল বা কাঠ থেকে ছত্রাক সরানো যায়।
- দেয়ালে বিটুমিন শিট, প্লাস্টিক শিট, মেটাল শিট প্রভৃতি পানিনিরোধক আচ্ছাদন সংযোজনের মাধ্যমে ছত্রাক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
- ঘরের মেঝে ও কার্পেটে ছত্রাক দেখা দিলে ভিনেগার ও গরম পানি মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
- ছত্রাক যেহেতু একধরনের জৈব জীবাণু এবং বিষক্রিয়ায় ক্ষতি হতে পারে, সে জন্য পরিষ্কারকালে মুখোশ, দস্তানা ও নিরাপদ চশমা ব্যবহার করা উত্তম।
সমস্যা যখন ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতার
প্রাত্যহিক ব্যবহার্য পানি ভবনের পয়োনিষ্কাশন পাইপ ও ড্রেনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু বর্ষায় বাইরের ড্রেন পানিপূর্ণ থাকায় অনেক সময় নিষ্কাশন কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। জমে থাকা পানি সঠিকভাবে নিষ্কাষিত হতে পারে না বলেই ড্রেন উপচে পানি বাইরের রাস্তা কিংবা বাসগৃহে চলে আসে। অনেক সময় বাড়ির আশপাশে বা দুটি ভবনের মধ্যকার প্যাসেজে গৃহস্থালির বর্জ্যসহ বিভিন্ন প্রকার ময়লা-আবর্জনা ফেলে বর্জ্য পদার্থ জমে পানি যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। সেই সঙ্গে প্রকট দুর্গন্ধ। জলাবদ্ধতা রোধে সব সময় পয়োনিষ্কাশন লাইন ও ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না। দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির মতো ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ রোধে বাড়ির আশপাশে, নর্দমা ও ড্রেনে ব্লিচিং পাউডার ও ফিনাইল প্রয়োগ করা যেতে পারে।
ভবনে কাঠবিনাশী পোকার আক্রমণ রোধে
ভবনের দরজা-জানালা ও কাঠের আসবাবে ব্যাপক হারে কাঠবিনাশী পোকার সংক্রমণ দেখা দেয় বর্ষাকালে। ভবনে সাধারণত ড্রাই উড টারমাইট (ঘুণপোকা) ও সাবট্যারানিয়ান টারমাইট (উইপোকা) এ দুই ধরনের পোকা থাকে। এসব পোকা কাঠ ও অন্যান্য সেলুলোজ পদার্থ যেমন-মেলামাইন বোর্ড, প্লাইউড বোর্ড, ভিনিয়ার বোর্ডের মতো সামগ্রী খুব দ্রুতই খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। ড্রাই উড টারমাইট সাধারণত শুষ্ক স্থানে কাঠে বাস করে। এরা দরজা-জানালার চৌকাঠ, কাঠের আসবাবের মতো শুকনা কাঠের মধ্যে বসবাস করে। আস্তে আস্তে কাঠকে খেয়ে শস্য দানা বা পাউডারের মতো করে এটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
সাবট্যারানিয়ান টারমাইট-জাতীয় কাঠ ধ্বংসকারী পোকা মাটির সংস্পর্শ ছাড়া বাঁচতে পারে না। প্রথমে এরা মাটির নিচে বাসা তৈরি করে। অনেক সময় কাঠের রসের পচন থেকে অথবা কাঠের জলীয় অংশে এরা বংশবিস্তার করে। এরপর খাদ্য অন্বেষণে তৈরি করে সুড়ঙ্গ। কাঠকে খেয়ে দিনে দিনে এটিকে নষ্ট করে ফেলে। ভবনের গাঁথুনির ফাটল, জোড়া, মেঝের জয়েন্ট, পাইপ ইত্যাদির মাধ্যমেও ভবনে প্রবেশ করে থাকে। পরবর্তী সময়ে এরা বাসা করে কাঠের মধ্যেই স্থায়ী হয়। কাঠের কাঠামো শেষ হলে অপেক্ষাকৃত বেশি জলীয় কণাসমৃদ্ধ কাঠের অন্য আসবাবকে লক্ষ্য করে এরা ছড়িয়ে পড়ে ঘরের আনাচকানাচে। তাই বিভিন্ন প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কাঠবিনাশী পোকার হাত থেকে দালানকে রক্ষা করা জরুরি। প্রতিরোধে যা করণীয়-
- ভবনের সবখানে নিয়মিত নজর রাখা উচিত। কোথাও এদের আবাসস্থলের সন্ধান পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
- মাটিতে রাসায়নিক সলিউশন ব্যবহার করে কাঠ ধ্বংসকারী পোকার আক্রমণ থেকে ভবনকে রক্ষা করা যায়। সলিউশন তৈরি করতে অলড্রিন ০.৫ শতাংশ, হেপটাক্লোর ০.৫ শতাংশ ও ক্লোরডিন ১ শতাংশ যেকোনো একটি রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে মিশিয়ে ইমালশন প্রস্তুত করতে হবে।
- ভবনে যদি সাবট্যারানিয়ান টারমাইটের উপস্থিতি বেশি বোঝা যায়। তবে ভিত্তির মাটি ট্রিটমেন্ট করতে হবে। এ জন্য ভবনের বাইরে চারপাশে ০.৫ মিটার গভীর করে গর্ত খনন করে ক্রো-বারের সাহায্যে দেয়ালকে স্পর্শ করে ১৫০ মিমি পরপর ১৫ মিমি ব্যাসের ছিদ্র তৈরি করতে হবে। এরপর ছিদ্রগুলো রাসায়নিক ইমালশন দিয়ে পূর্ণ করে খননকৃত গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করতে হবে। প্রতি বর্গমিটারে ৭.৫ লিটার হারে ইমালশন ভরাট মাটিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
- প্রসারণ জোড়, নির্মাণ জোড় অথবা ফাটল দিয়ে টারমাইট ভেতরে উঠতে পারে। এ অবস্থায় মেঝের নিচের মাটি ট্রিটমেন্ট করতে জোড় ও ফাটলগুলোতে ট্রিলের সাহায্যে এর মধ্যে রাসায়নিক ইমালশন দিয়ে পূর্ণ করে মেঝের ছিদ্রগুলোকে বন্ধ করে দিতে হবে।
- যদি দেয়াল ভালোভাবে প্লাস্টার না করা থাকে অথবা ড্যাম্প প্রুফ কোর্স সঠিকভাবে করা না হয়, তাহলে ম্যাসনারির ফাঁকা স্থানের মাধ্যমে টারমাইট প্রবেশ করে। সে জন্য প্রয়োজন ম্যাসনারির ফাঁকা বা শূন্য স্থানে ট্রিটমেন্ট দেওয়া। প্লিন্থ লেভেলে দেয়ালের ভেতর এবং বাইরে উভয় দিকে ৪৫০ কাণে ৩০ সেমি পরপর ১২ মিমি ব্যাসের ছিদ্র করে তার ভেতর রাসায়নিক ইমালশন প্রয়োগ করতে হয়। সম্পূর্ণ ছিদ্র বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইমালশন প্রয়োগ চালিয়ে যেতে হবে।
- কেরোসিনযুক্ত রাসায়নিক ইমালশন ব্যবহার করেও উইপোকা দমন করা যায়। অনেক সময় উইপোকা মাটির সঙ্গে কাঠের কাঠামো সংযুক্ত করার জন্য মাটি আর দরজায় শেল্টার টিউব তৈরি করে। এ ধরনের মাটির সঙ্গে সরাসরি দালানের সম্পর্কযুক্ত স্থানকে ভেঙে দিয়ে রাসায়নিক প্রয়োগ করতে হবে।
- পোকা যেন আক্রমণ করতে না পারে এ জন্য রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট প্রয়োগ করার পর দরজা, জানালা, চৌকাঠ প্রভৃতি ভালোভাবে ঘষে বার্নিশ বা পেইন্ট করতে হবে। কাঠ ধ্বংসকারী পোকার আক্রমণ রোধে পেইন্টিং অনেক বেশি কার্যকরী।
বৈদ্যুতিক সুইচ, সকেট ও যন্ত্রাংশের সুরক্ষায়
পানি ও বিদ্যুতের মধ্যে রয়েছে একধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব। দেয়ালে লিকেজ বা পানির পাইপলাইনে কোনো ধরনের লিকেজ থাকলে তা ভবনের দেয়ালে তথা বৈদ্যুতিক সুইচ, সকেট ও যন্ত্রাংশের অনেক ক্ষতি করে। এতে যেমন ফিক্সারগুলো দ্রুত নষ্ট হয় তেমনি শর্টসার্কিট বা বৈদ্যুতিক শক লেগে ভবনের বসবাসরতদের বিপদ ঘটতে পারে। এ জন্য এসব ফিক্সারস কোনোভাবে আক্রান্ত হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। বৃষ্টির কবল থেকে রক্ষা করতে ভবনের বাইরের সুইচ ও সকেট ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বর্ষার অন্দরের সুস্থতায়
বর্ষায় ঠিকমতো আলো-বাতাস প্রবেশ করতে না পারায় অন্দরে গুমোট ভাব থাকে। হালকা অস্বস্তিকর গন্ধের সঙ্গে ঘটে জীবাণুর সংক্রমণ। পোকামাকড়ের উপদ্রবও হয় খুব বেশি। এ সময়ে ভবনের বাসিন্দাদের ফাংগাল ইনফেকশন বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের। তাই বর্ষায় এসব থেকে মুক্তি পেতে চাই বাড়তি সতর্কতা। সেক্ষেত্রে-
- ঘরে প্রচুর আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
- পোকামাকড় ও ফাঙ্গাস থেকে রক্ষা পেতে ফার্নিচার যতটা সম্ভব দেয়াল থেকে দূরে রাখুন।
- আসবাবে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক আক্রমণ করলে চা-পাতা জ্বাল দিয়ে কড়া লিকার বানিয়ে ঠান্ডা করে অল্প ভিনেগার মিশিয়ে নিন। এরপর নরম কাপড়ে ভিজিয়ে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করুন।
- মেঝে পরিষ্কার করার সময় ক্লিনার বা ফিনাইল ব্যবহার করলে মেঝে থাকবে জীবাণুমুক্ত।
- আলমারির তাক, কেবিনেট বা বইয়ের তাকের স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করতে তাতে ন্যাপথলিন, সিলিকা জেল ও শুকনো নিমপাতাও রাখতে পারেন।
- কার্পেট আর্দ্রতা শুষে নেয় খুব সহজে। এতে ভেজা কার্পেট থেকে কটুগন্ধ বের হয়। এ জন্য প্রতিদিন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কার্পেট পরিষ্কার করুন এবং রোদে দিন। কার্পেটের নিচে রাবার বা বাঁশের ম্যাট স্থাপন করলে তা শুষ্ক থাকবে।
- ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে অ্যালোভেরা, অর্কিড, পাম, স্পাইডার প্ল্যান্ট, পিস লিলি, মানিপ্ল্যান্ট প্রভৃতি ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট রাখতে পারেন।
আপনার ভবনটি যদি আলোচিত সমস্যাকবলিত হয় তাহলে আপনি হয়তো ভবনের রেনোভেশন পরিকল্পনা করতে পারেন এখনই। তবে এই ভরা বর্ষায় ভবনের অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারলেও কিছু করা উচিত বর্ষাকাল আসার আগেই কিংবা যখন বৃষ্টি বালাই থাকবে না। বর্ষার আগেই ভবনে যা করণীয়-
- ভবনে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা।
- ফাটল সংস্কার করা।
- সব ধরনের প্লাম্বিং পাইপ ও ড্রেন পরিষ্কার করা, যেন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হয়।
- অভিজ্ঞ প্রকৌশলী দিয়ে পরীক্ষা করানো
- অন্তত পাঁচ বছর পরপর ভবন রং করা। তবে নিম্নমানের রং ব্যবহার করলে দেয়ালে ড্যাম হতে পারে।
- ফাউন্ডেশন বা ভিত দিয়ে ভবনে পানি প্রবেশ করার আশঙ্কা থাকলে বর্ষার আগেই তা সমাধান করা।
- বর্ষায় পানিবাহিত রোগ ছড়ায় বেশি। এ জন্য ভবনের পানি সংরক্ষণ ট্যাংক জীবাণুমুক্ত রাখতে কোনোভাবেই যেন বাইরের পানি প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নিয়মিত ট্যাংক পরিষ্কার করা।
কোনো রোগ-ব্যাধি হলে শুরুতেই নিরাময় না করলে যেমন তা মারাত্মক আকার ধারণ করে, তেমনি ভবনের সমস্যাগুলোও দ্রুত চিহ্নিত করে তার সুরক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবনধসসহ বড় ধরনের ক্ষতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। এ জন্য আপনার আবাসস্থল বা ভবনটি নতুন হোক বা পুরোনো, কালবিলম্ব না করে কোনো অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বা ভবন রক্ষণাবেক্ষণ সেবা প্রদানকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সংস্কার করিয়ে নিন আজই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১১তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯।