প্রজন্মের শেঁকড়ে ফেরা
লামিসা নিমোর দাদাবাড়ি

ভৈরব নদী-তীরবর্তী খুলনা; শিল্পনগরী নামেই সমধিক পরিচিত। খলিফাতাবাদ তথা খানজাহান আলী (রহ)-এর সমকালীন স্টাইলের ঐতিহাসিক কলোনিয়াল স্থাপনার নিদর্শন এ শহরে আজও বর্তমান। নদীবিধৌত নিসর্গের এই শহরের খালিশপুর; স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে এখানেই গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ এক শিল্পাঞ্চল। মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের আবাসনের প্রয়োজনেই ছোট ছোট প্লট সাজিয়ে গড়ে তোলা হয় আবাসিক এলাকা। নাইম আলম শিপন উত্তরাধিকার সূত্রে এমনই স্বল্পপরিসর  প্লটের স্বত্বাধিকারী। ছোট্ট পরিসর হওয়ায় এখানে পাশাপাশি নির্মিত দুই ভবনের মাঝে নেই কোনো উন্মুক্ত পরিসর। ফলে অন্তর্মুখী জানালা অথবা আলোর কূপ দিয়ে নিশ্চিত করতে হয় আলো-বাতাসের সংস্থান। নাইম আলমের বাবার পুরোনো এ বাড়িতে ছোট একটি টিনশেড ঘরের অস্তিত্ব ছিল। যদিও তিনি ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত। স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনে অভ্যস্তÍ কিন্তু ভোলেননি নিজের ফেলে আসা অতীতকে। আর তাই ছেলের সন্তান লামিসা ও নিমোর জন্য উপহার দিতে চেয়েছেন দাদাবাড়ি মধুময় স্মৃতি। এই আকাংখা থেকেই জন্ম অবকাশ বাড়ির। আর তার এই স্বপ্নের সারথি তরুণ স্থপতি মশিউর রহমান।

অবকাশ বাড়ির পরিসর খুব ছোট্ট হওয়ার কারণে স্থপতি মশিউর রহমানের এখানে কাজ শুরুটা অন্তর্মুখী নকশার ধারণা নিয়ে। প্রথা অনুযায়ী দুই পাশে কোনো জায়গা না ছেড়ে বহির্দেয়াল সোজা উঠে এসেছে একদম তিনতলা অবধি। শুরুতেই ক্লায়েন্টের সম্মতিতে ঠিক করা হয়েছিল বাড়িতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক স্বাদের পরিবেশ থাকবে। বাচ্চারা দাদুবাড়ির ব্যতিক্রমী স্বাদ খুঁজে পাবে ব্যস্ত এ শহরের ছোট্ট আঙিনায়। সবুজের কোলে ঘোরাঘুরি, বৃষ্টির ফোঁটায় মুগ্ধতা, পানির নহরে ক্লান্তিহীন দাপাদাপি, পাখির কলতান, পানিতে রংবেরঙের মাছের ঘুরে বেড়ানো, সূর্যের নরম রোদের মায়াবী কারুকাজ রাজধানী ঢাকার আধুনিক জীবনে এমন স্বাদ কল্পনাতীত। এ সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজন্ম শৈশবের সুখ আর অনাবিল ভালোবাসা। নকশার আগেই স্থপতি তাঁর কল্পনার তুলিতে তুলে আনেন ফেলা আসা শৈশবের সুমধুর সব স্মৃতি।

দাদাবাড়িটি ট্রিপ্লেক্স ধাঁচের স্থাপনা। তবে সবকিছু ধাপে ধাপে বিন্যস্ত হওয়ায় আলাদাভাবে তিনটি তলাকে পার্থক্য করা যায় সহজেই। নিচতলায় অতিথিশালা আর উš§ুক্ত রান্নাঘরসহ খাবার ঘর। প্রধান গেট দিয়ে ঢোকার পরেই গাড়িবারান্দাকে বামে রেখে পানির উঠোন পার হয়ে অতিথিশালায় যেতে হয়। খাবার ঘর আবার নেমেছে একটু নিচে। খাবার ঘরের লাগোয়া সবুজ বাগান আসলে পাখিদের কুঞ্জ। প্রবেশ বারান্দা থেকে কয়েক ধাপ নেমে বসা যাবে পাখিদের সান্নিধ্যে। অতিথিশালা এবং খাবার ঘরের মাঝ দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি। সাত ফুট উচ্চতায় সিঁড়ির প্রথম চৌকি বরাবর বাচ্চাদের শোবার ঘর। ছোট বারান্দা দিয়ে উঁকি দিলে চোখে পড়বে নিচে খাবার ঘরসংলগ্ন পাখি বাগান। প্রথম চৌকি ঘুরে ওপরে উঠতেই শুরু পারিবারিক পরিসরের। পারিবারিক পরিসরের সঙ্গে আছে উম্মুক্ত বাগান, কাচের পাল্লা সরিয়ে দিলেই সবুজ সতেজতা ছাপিয়ে যাবে পারিবারিক পরিসরকে। এর পাশেই প্রধান শয়নকক্ষ। আরেকটি শয়নকক্ষের অবস্থান ১৭ ফুট উচ্চতায় পরের ধাপে, ঠিক বাচ্চাদের প্রথম শোবার ঘর বরাবর। অবশিষ্ট সিঁড়ি পাড়ি দিলেই ওপরে খোলা ছাদ। ধাপে ধাপে বিন্যস্ত পরিসরগুলো প্রতিটি আলাদা আকর্ষণ আর অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তৈরি।

চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে একাত্মতা আর প্রয়োজনকে সামনে রেখে নকশা করা দাদাবাড়ির। সামান্য একটু জায়গায় এমন মজার মজার কিছু পরিসর তৈরি করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ প্রকল্পকে দিয়েছে অনন্যতা। মুক্ত আকাশের নিচে উš§ুক্ত পানির আধার, তার মধ্যে পায়ে হাঁটার ব্যবস্থা ভবনের প্রধান প্রবেশপথকে অলংকৃত করেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। পাশেই ঢালু পথ, যা বাচ্চাদের জন্য মজার জায়গা। অতিথিশালায় প্রবেশের আগেই যে বারান্দা তা আসলে একদমই উš§ুক্ত। মেঘহীন পরিচ্ছন্ন রাতে জোসনা চাঁদ তার মায়াবী আবেশ ছড়িয়ে দেয় ভবনের অভ্যন্তরে। ভবনের পাশে  সরু যে জায়গা অবহেলায় পড়ে থাকে আবর্জনা আর পরিত্যক্ত ময়লার ভাগাড় হয়ে, তার কোনো দেখা পাওয়া দুষ্কর বরং এখানে সেখানে তৈরি করা চিকন পানির ধারা পেছনের দেয়ালের প্রাকৃতিক ইটের সঙ্গে তৈরি করেছে দারুণ বন্ধুত্ব। ভবনের কয়েকটি জায়গাতেই রয়েছে আলোর কূপ, যেখানে কাঠের ল্যুভর দিয়ে ইটের দেয়াল মূল ভবনের কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত। প্রাকৃতিক আলো, বাতাস, ছায়া, ইটের সম্মিলনে জন্ম হয়েছে নাটকীয় পরিবেশের। সূর্যের আলো স্বচ্ছ কাচের ছাদের মধ্য দিয়ে এসে এমন নাটকীয়তাকে বাড়িয়েছে দ্বিগুণ মাত্রায়। ছায়াকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে কিছু বাঁকানো ল্যুভর। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই পানি এবং সূর্যোদয়ের বিপরীতে ইটের দেয়াল। দেয়ালে ইটের বিভিন্ন সজ্জায় তৈরি হওয়া নরম কারুকাজ। এর মাঝে মাঝে কবুতর ছিদ্র।

অতিথিশালার দুপাশ ঘিরে থাকা পানির আধারে মাছের চাষ, যা একই সঙ্গে বাষ্পীভূত পানির উৎস। সিঁড়ির অবধি চলে এসেছে পানি। সিঁড়ি যেন ঝুলে আছে পুকুরের ওপরে। পুকুরের যেভাবে ঘাট থাকে সেভাবে একটি কাঠের ডেক পানির ওপর ঝুলছে। চাইলেই পা দিয়ে পানি ছোঁয়া যায়। প্রাকৃতিক পাথর আর মাছের সঙ্গে আরও আছে পানিতে বেঁচে থাকা গাছ। ভাঁজ করা দরজা এখানে  সরিয়ে দিলেই পুকুর আর পরিসর একাত্ম হয়ে পড়ে। রোদের দিক যখন পরিবর্তন হয় তখন পানির বুকে তৈরি হয় ছায়ার কাঁপন। মাঝখানের পানির পরিসর এবং ছিদ্রযুক্ত দেয়ালের কারণে অতিথিশালা এবং খাবার ঘরের মধ্যে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান সংযোগ। পানির ওপরে তিনগুণ উচ্চতার সিঁড়িঘর শেষ হয়েছে দ্বিগুণ উচ্চতা নিয়ে। যার ওপরে কাচের ছাদ।

দিনের বিভিন্ন সময় ছায়া ঢেকে থাকে ভিন্ন আঙ্গিকে। পারিবারিক পরিসরসংলগ্ন বাগানের নাম  স্থপতি দিয়েছেন ‘বৃষ্টির উঠোন’, যা কি না কৃত্রিম ঘাসের চাদরে আচ্ছাদিত। বৃষ্টির উঠোন থেকে কাচের দেয়াল দিয়ে পারিবারিক পরিসরকে আলাদা করা হয়েছে সহজেই।

নির্মাণ উপকরণ পছন্দ করার সময় স্থপতি গুরুত্ব দিয়েছেন উপাদানের মূল বুননের প্রকাশকে। যেমন তেমনই রেখে দিয়েছেন অমসৃণ মেটে রঙের সিমেন্ট-কংক্রিটের দেয়াল আর পলেস্তারাবিহীন লাল ইটের গাঁথুনি। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক কাঠের কারুকাজ। সুতরাং এক দেখায় খুবই সাধারণ অথচ এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে জীবন ও যাপনের নাটকীয় গল্পের দারুণ সব প্লট।

স্থপতির কথা

স্থপতি মশিউর রহমানের জন্ম খুলনার নূরনগরের বয়রায়। বাবা শেখ মুজিবর রহমান এবং মা নাসিমা রহমান। খুলনা আইডিয়াল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে। ২০১২ সালে এখান থেকে স্থাপত্যে গ্র্যাজুয়েশন শেষে কর্মজীবন শুরু করেন ‘স্থাপত্য আর্কিটেক্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। একই সঙ্গে লিভিং সিস্টেম কনসালট্যান্টসে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবেও সময় দেন। বর্তমানে সময় কাটছে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ততায়। মশিউর রহমান স্থাপত্যের সরলতম ধারাকে অনুসরণ করে তাঁর চর্চার অনুকাঠামো সাজিয়েছেন। যেখানে খুব সাধারণ বহির্কাঠামোর মাঝেই অন্তস্থ পরিসরের সৌন্দর্য তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। সুইস স্থপতি পিটার জুনফরকে অধ্যয়ন করেন, তাঁর পরিসরের গভীরতা এবং প্রকৃতি ও পরিসরের কারুসজ্জার সূক্ষ¥তা তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করে। আমাদের দেশের স্বনামধন্য স্থপতি কাশেফ মেহবুব চৌধুরী বরাবরই তাঁর পছন্দের তালিকার শীর্ষে।

স্থপতি মশিউর রহমান বয়সে নবীন হলেও এরই মধ্যে তাঁর স্থাপত্যচর্চা সুধীজনের নজর কেড়েছেন। লামিসা নিমোর দাদাবাড়িতে ইটের কারুকাজ, মায়াবী রোদের খেলা, পানির শৈলী আর পরিসরের নাটকীয়তা সুষ্টিতে দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রত্যাশিতভাবেই আমন্ত্রণ পেয়েছেন ‘এ’  ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড অ্যান্ড কম্পিটিশন কর্তৃক আয়োজিত মিউজিয়াম অব আউটস্টান্ডিং ডিজাইন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের। প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রয়োজনের সমীকরণকে ধারণ করে স্থপতি মশিউর রহমান তাঁর স্থাপত্যচর্চাকে এগিয়ে নেবেন অনেক দূর- এমনটাই আশা সবার।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭২তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬।

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top